পড়শী হাসতে নেই মানা দ্য রিলস্‌ মাস্টার

দ্য রিলস্‌ মাস্টার

Post Views: 23
11 min read

(১)

সেনবাগের ইমরান হোসেনকে এলাকার মানুষ আগে চিনত ‘রিলস বা টিকটক ইমরান’ নামে। পকেটে টাকা না থাকলেও চুল কাটার স্টাইলে কোনো কমতি ছিল না। বাঁ পাশের চুল ছেঁটে একদম জিরো, আর ডান পাশের চুল উল্টে দিয়ে এমন এক ঢেউ খেলানো ভাব—যেন মেঘনা নদীর একটা ছোট ঢেউ এসে তার কপালে থমকে গেছে।

ইমরানের মূল লক্ষ্য ছিল জীবনে বিখ্যাত হওয়া। কিন্তু সমস্যা হলো, ইন্টারনেটে বিখ্যাত হওয়ার প্রতিযোগিতা এখন কঠিন। কেউ কাঁচা বাদাম গেয়ে ভাইরাল হয়, কেউ বাইক থেকে উল্টে পড়ে ভাইরাল হয়। ইমরান অনেক চেষ্টা করেছে। কখনও মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে লিপসিঙ্গ করেছে, কখনও চলন্ত রিকশা থেকে লাফ দেওয়ার অভিনয় করতে গিয়ে নিজের হাঁটু ছিলে ফেলছে। কিন্তু ভিউ ওই মোটে ১২৪, যার মধ্যে ১০ বার সে নিজেই দেখেছে।

অবশেষে ভাগ্যের চাকা ঘুরল তার দুলাভাই মঞ্জুর আলমের কৃপায়। মঞ্জুর সাহেব রায়পুরের বাংলাবাজারে একটা ছোট মাদ্রাসা চালান। শিক্ষক সংকটে পড়ে তিনি শ্যালককে ডেকে বললেন, “ইমরান, তোরে তো ফ্রিতে খাওয়াচ্ছি। এক কাজ কর, মাদ্রাসার ছোট ক্লাসের ছেলেদের একটু আলিফ-বা-তা শেখা। আর বাচ্চাদের উপর একটু খেয়াল রাখবি, যেন পড়ায় না ফাঁকি দেয়।”

ইমরান প্রস্তাব শুনে আকাশ থেকে পড়ল, “আমি? আরবি শিক্ষক?”

মঞ্জুর সাহেব চোখ ছোট ছোট করে বললেন, “আরে, তোরে কি তাফসির তরজমা পড়াইতে বলছি? কায়দা পড়াবি। আর পোলাপাইন যেন চিল্লাচিল্লি না করে, হাতে একটা বেত রাখবি। একটু ভয় দেখাবি, ব্যাস।”

ইমরান ভেবে দেখল, আইডিয়াটা খারাপ না। প্রথমত, একটা চাকরি পাওয়া গেল। দ্বিতীয়ত, ক্লাসরুম মানেই তো একদল রেডিমেড অডিয়েন্স! ইউটিউবাররা অডিয়েন্স পাওয়ার জন্য কত টাকা খরচ করে, আর সে প্রতিদিন ২৫-৩০ টা বাচ্চা ফ্রিতে পাচ্ছে! এ এক দারুন সুযোগ!

(২)

প্রথম কয়েকদিন ইমরানের ভালোই কাটল। কিন্তু টিকটকার রক্ত কি আর বেশিক্ষণ শান্ত থাকে? তিনদিনের মাথায় সে আবিষ্কার করল, ক্লাস টু-এর ছোট বাচ্চাগুলো যখন ভয়ে কাঁদে, তখন তাদের মুখমণ্ডল থেকে অদ্ভুত সব এক্সপ্রেশন বের হয়। কোনো বাচ্চা চোখের পানি ফেলে নিঃশব্দে ঠোঁট কাঁপায়, কেউ আবার একদম মাইক বাজিয়ে হাউমাউ করে ওঠে।

ইমরান তার কমদামী স্মার্টফোনটি টেবিলের ওপর এক গাদা বইয়ের পেছনে আড়াল করে দাঁড় করাল। পড়া না পারায় সাত বছরের এক পুচকে ছেলেকে ইমরান ডেকে আনলো। বাচ্চাটার নাম শফিক। রোগা-পাতলা শরীর, পরনে ঢোলা জামা।

“বল, আলিফ এর পর কী?” ইমরান গম্ভীর গলায় শুধাল।

শফিক চোখ গোল গোল করে বলল, “বা…”

“হু, এবার বল, তার পরেরটা কী?”

শফিক ভয় পেয়ে থতমত খেয়ে গেল। সে একবার বেতের দিকে তাকায়, একবার শিক্ষকের চশমার ফ্রেমের দিকে তাকায়। তারপর কচি গলায় ভুল করে বলে ফেলল, “ছা…”

“ভুল!” ইমরান চেঁচিয়ে উঠল। সে ক্যামেরাটা অন করার জন্য গোপনে স্ক্রিনে একটা চাপ দিল। তারপর হাতের সরু বেতটা শফিকের দিকে বাড়িয়ে দিল।

শফিক ভেবেছিল বেত দিয়ে হাতে মারবে। সে ছোট হাত দুটো সামনে বাড়াল। কিন্তু ইমরান এক অদ্ভুত ‘ক্রিয়েটিভ’ বুদ্ধি খাটাল। সে বেতের আগাটা শফিকের কচি মুখের দিকে বাড়িয়ে দিল। শফিক আতঙ্কে মুখ বন্ধ করতে গিয়েও কান্না ধরে রাখতে পারল না। বেতের আগাটা তার ঠোঁটের ফাঁকে স্পর্শ করতেই সে ভয়ে দুই হাত দিয়ে বেত সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। চোখের পানিতে তার গাল ভেসে গেল।

ইমরান অবশ্য মারছে না, সে কেবল নাটকটা দীর্ঘায়িত করছে। ক্যামেরা কোণটা যেন নিখুঁত হয়! শফিক যত কাঁদছে, ইমরান মনে মনে তত হিসাব করছে—’এই সিনটাতে যে ইমোশন আছে, অন্তত দশ হাজার লাইক তো নিশ্চিত!’

এক হাতে বেত ধরে রেখে ইমরান অন্য হাতে নিজের চুলটা একটু ঠিক করে নিল। মনে মনে বলল, “ডিরেক্টর হিসেবে আমি তো সত্যজিৎ রায়কে পেছনে ফেলে দেব আজ!”

ভিডিও পোস্ট করার সময় ইমরান একটা ভারী কাব্যিক ক্যাপশন দিল: ‘পিচ্চি পোলাপানকে কান্না করাতে ভালোই লাগে।’

তার মতে, এটি ছিল অত্যন্ত সৎ এবং শৈল্পিক একটি ক্যাপশন। সে এতই শৈল্পিক মনের মানুষ যে নিজের ভেতরের আনন্দটা সবার সাথে শেয়ার না করে স্থির থাকতে পারেনি!

(৩)

ভিডিও আপলোড করার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা ইমরান বারবার ফোন আনলক করে দেখল।

ভিউ: ৫০… ১০০… ৫০০…

ইমরান মুচকি হাসল। ‘হাহা’ রিঅ্যাক্ট আসছে প্রচুর, সাথে কিছু কমেন্টও। ইমরান ভাবল, এগুলো নিশ্চয়ই তার কৌতুকবোধের প্রশংসা। কিন্তু রাত ১২টার দিকে হঠাৎ দেখা গেল ভিউয়ের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

৫,০০০… ৫০,০০০… ১,০০,০০০!

ইমরানের বুকটা গর্ভে ফুলে উঠল। অবশেষে! সেনবাগের ইমরান আজ টিকটক সেলিব্রিটি! সে সকালে উঠে কী পোশাক পরে লাইভে আসবে, তা নিয়ে মনে মনে পরিকল্পনা করতে লাগল।

কিন্তু পরদিন সকালে দুলাভাই মঞ্জুর সাহেবের চিল্লাচিল্লিতে ইমরানের ঘুম ভাঙল।

“ইমরান! ও ইমরান! তুই কী করছোস রে শালা!” মঞ্জুর সাহেবের মুখ শুকিয়ে পানসে হয়ে গেছে।

ইমরান চোখ ডলতে ডলতে বলল, “কেন দুলাভাই? ভিডিও ভাইরাল হইছে না? বলছিলাম না আমি একদিন বিখ্যাত হবই!”

“বিখ্যাত না রে হালার পুত, তুই আমাদের সব অর্জন এক ভিডিওতেই শেষ করে দিছোস!” মঞ্জুর সাহেব নিজের মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।

“ফেসবুকে তোকে গালি দিয়ে বন্যা হয়ে যাচ্ছে! রায়পুর থানার ওসি নাকি পুলিশ পাঠাচ্ছ! আর ওদিকে ওই শফিকের বাপ-চাচারা লাঠিসোটা নিয়ে মাদ্রাসার দিকে আসতেছে!”

ইমরান আকাশ থেকে পড়ল, “মানে? মানুষ কি আজকাল একটু বিনোদনও বোঝে না? আমি তো ওরে মারি নাই! খালি মুখ দিয়ে একটু এক্সপ্রেসন বের করার জন্য বেতটা ব্যবহার করেছি!”

“তোর এক্সপ্রেসন তোকেই গিলাবে জনতা!” মঞ্জুর সাহেব গর্জে উঠলেন। “এখনই বিদায় হ এখান থেকে! তোকে আমি বরখাস্ত করলাম! তিন মাসের বকেয়া বেতন চাইবি না, আর কোনোদিন বাংলাবাজারে মুখ দেখাবি না!”

এক কাপড়ে ইমরানকে মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে যেতে হলো। যে সেলিব্রিটি হওয়ার স্বপ্নে সে রাতে ঘুমিয়েছিল, সকালে সে এক পলাতক আসামী!

(৪)

সেনবাগের দূরের কোন এক ধানক্ষেতের আইলে বসে ইমরান ফেসবুক স্ক্রোল করছিল। পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল শিরোনাম করেছে: “মাদ্রাসা শিক্ষকের নির্মমতা!”, “মাসুম বাচ্চাকে বেত দিয়ে নির্যাতন!”

ইউটিউবাররা রোস্টিং ভিডিও বানাচ্ছে। কমেন্ট বক্সে সবাই তার ডিজিটাল ফাঁসি দাবি করছে। ইমরান বুঝতে পারল, ক্যারিয়ার বাঁচানোর একটাই উপায়—অভিনয়! তাকে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষ সাজতে হবে।
সন্ধ্যাবেলা সে একটা লাইভে আসল। ব্যাকগ্রাউন্ডে অন্ধকারের মধ্যে একটা মেহগনি গাছ দেখা যাচ্ছে। ইমরানের চোখে কৃত্রিম কান্নার চেষ্টা, কিন্তু কান্না আসছে না। সে চোখ ডলে লাল করার চেষ্টা করল।

“আসসালামু আলাইকুম ভিউয়ার্স…” ইমরান গলা ভাঙা সুর করে বলল। “ভিডিওটি আমিই বানিয়েছিলাম, কথা সত্য। কিন্তু আপনারা বিষয়টাকে ভুল বুঝছেন। শফিক আমার ছোট ভাইয়ের মতো। সে পড়া না পেরে কাঁদছিল, আমি তো জাস্ট দুষ্টামি করছিলাম। ওর কান্না থামানোর জন্য মুখের সামনে একটু লাঠি ধরেছিলাম। আমি তো মারি নাই ভাই! মারছি? আপনারা বলেন?”

লাইভের নিচে কমেন্ট আসছে বিদ্যুৎ বেগে:
— “তোর মুখে লাঠি ঢোকানো দরকার!”
— “অভিনয় বন্ধ কর শালার পুত, পুলিশ তোকে খুঁজছে!”
— “অস্কার দেওয়া উচিত এই ছাগল টিকটকারকে!”

ইমরান আরও একটু কান্না মেশানোর চেষ্টা করে বলল, “আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি ফেসবুক আর ইউটিউব অ্যাকাউন্ট ডিলেট করে দিচ্ছি। আপনারা আমাকে মাফ করে দেন। আমি আর কোনোদিন শিক্ষকতা করব না, কোনোদিন টিকটকও করব না!”

লাইভ শেষ করে ইমরান দ্রুত নিজের অ্যাকাউন্টটা ডিলেট করে দিল। তারপর সিম কার্ডটা খুলে ধানক্ষেতে ছুড়ে মারল।

(৫)

কয়েকদিন পর।

রায়পুরের সেই মাদ্রাসাটা এখন বন্ধ। পুলিশ এসে ঘুরে গেছে, কিন্তু ইমরান তো অনেক আগেই হাওয়া। শফিকের বাবা অবশ্য আর মামলা বাড়াননি, কারণ ইমরানকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং সে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

শফিক এখন স্বস্তিতে গ্রামে গোল্লাছুট খেলছে, তার মুখে বেতের কোনো চিহ্ন নেই, তবে তার ভাব বেড়েছে—কারণ সে এখন মাদ্রাসার ‘ভাইরাল বয়’!

অন্যদিকে নোয়াখালীর এক অজপাড়াগাঁয়ে ইমরানের এক দূরসম্পর্কের খালার বাড়ি। ইমরান ঘরের কোণে বসে একটা সাধারণ বাটন ফোনে টিকটকের খবর নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তার ফোন নাম্বার নেই, অ্যাকাউন্ট নেই, ইন্টারনেটের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সে বুঝতে পেরেছে, বিখ্যাত হওয়ার চক্করে সে এখন নিজ দেশে পরবাসী।

একদিন বিকেলে খালার বাড়ির উঠানে বসে ইমরান দেখল, একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা মাটিতে বসে কাঁদছে। তার হাতে এক টুকরো বিস্কুট ছিল, যা একটা মুরগি এসে ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে।

বাচ্চাটার কাঁদার স্টাইলটা বেশ দারুণ। ঠোঁট দুটো উল্টে দিয়ে কাঁদে, একেবারে খাঁটি গ্রামীণ ট্র্যাজেডি!

ইমরান পকেট থেকে তার বাটন ফোনটা বের করল। ক্যামেরা নেই। সে নিশ্বাস ফেলল। হাতটা আপনা-আপনি পকেটে গেল একটা সরু ডালের খোঁজে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মনে পড়ল ওসির ভয়ঙ্কর চেহারা আর দুলাভাইয়ের সেই চিল চিৎকার।

ইমরান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আকাশে দিকে তাকাল। মনে মনে বলল, “এ জগৎ সত্যিই তার মতো একজন গুণী শিল্পীর কদর বুঝল না! এত সুন্দর একটা এক্সপ্রেসন বাচ্চাটার… আহা ভিডিওটা যদি বানাতে পারতাম, অন্তত দুই মিলিয়ন ভিউ হতো!”

ইমরান একজন ট্র্যাজিক হিরোর মতো তাল গাছের ছায়ায় গিয়ে বসে রইল, যার কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো অডিয়েন্স নেই—কেবল আছে এক অসীম নিরবতা এবং ভাইরাল হওয়ার প্রবল আকুতি!

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

সরকারি চাকুরীজীবি, পাশাপাশি লেখালেখি ও গবেষণা কাজে লিপ্ত। ছোটগল্প, ছোট উপন্যাস ও রম্য রচনা প্রধানত লেখার মুলধারা।


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।