পড়শী মূল রচনাবলী বিজ্ঞানের নোবেল: প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি ও পরিহাস

বিজ্ঞানের নোবেল: প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি ও পরিহাস

Post Views: 40
16 min read

২০২৬-এর নোবেল ঋতু চলে এলো। মানুষের কীর্তিকে ধরে রাখতে এই পুরস্কারের ওপরে হয়তো কিছু নেই, কিন্তু একই সাথে সৃজনশীলতার বহু অঙ্গনকে আলফ্রেড নোবেল যে অগ্রাহ্য করেছিলেন তা এখনকার সময়ে স্পষ্ট। গণিত ও ভূতত্ত্বের মতন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে, প্রকৌশল বিদ্যার চমকপ্রদ উদ্ভাবন যা মানব সমাজকে সরাসরি সাহায্য করছে সেগুলো ঠাঁই পায়নি। পৃথিবীর টেকটনিক সঞ্চালন আবিষ্কার, প্রথম বিমান কিংবা জেট ইঞ্জিনের মত বৈপ্লবিক সৃষ্টির উদ্ভাবকদের উপেক্ষা করা হয়েছে। তাদের জন্য হয়তো পেশাজীবি সংস্থার পুরস্কার বরাদ্দ ছিল, কিন্তু সামগ্রিকভাবে নোবেলের যে সম্মান সেগুলো তাদের ভাগ্যে জোটেনি।

নোবেল পুরস্কার যে কিছুটা আরবিট্রারি, যাকে বাংলায় বলা যায় যদৃচ্ছ, সেটা সাহিত্য কিংবা শান্তি পুরস্কারের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি; কিন্তু আমি আমার আলোচনাটা রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব। অর্থাৎ এই বিভাগগুলোর বাইরের মানুষদের জন্য কেন নোবেল নেই তা নিয়ে হা-হুতাশ করব না। এই আলোচনায় আমি কিছুটা অতীতে ফিরে যাব, কয়েকটি বিশেষ পুরস্কার পাওয়া এবং না-পাওয়ার কাহিনীর প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞানের এবং নৈতিকতার মানদণ্ড কীভাবে বদলেছে তা নিয়ে কিছু কথা বলব।

ফ্রিটজ হাবের

আমার তালিকায় এক নম্বরে আছেন ফ্রিটজ হাবের। জার্মানির হাবের ১৯১৮ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। হাবের এমন একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছিলেন, যাতে বাতাসের নাইট্রোজেন থেকে অ্যামোনিয়া তৈরি করা যায়। পরে কার্ল বশ সেই প্রক্রিয়াকে শিল্পোৎপাদনের উপযোগী করে তোলেন। এই হাবের–বশ প্রক্রিয়ায় তৈরি নাইট্রোজেন সার পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদনে বিপ্লব ঘটায়; আজও পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষের খাদ্য উৎপাদন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের ওপর নির্ভরশীল।

অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এই হাবেরই ছিলেন রাসায়নিক মারণাস্ত্র ব্যবহারের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। শত্রুসেনার বিরুদ্ধে ক্লোরিন গ্যাসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পদ্ধতি তৈরিতেই তিনি ক্ষান্ত হননি; ১৯১৫ সালে বেলজিয়ামে এক যুদ্ধে এই মারণাস্ত্রের প্রথম বৃহৎ প্রয়োগ তিনি নিজে তদারকি করেছিলেন। একই মানুষের হাতে কোটি মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা হলো, আবার তাঁর হাতেই বিষাক্ত গ্যাস যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে উঠল।

নোবেল কমিটি কি তাঁর এই শেষের কাজটির কথা জানত? না জানার কোনো কারণ ছিল না। ১৯১৮ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে, যুদ্ধের ক্ষত তখনও শুকায়নি; হাবেরের রাসায়নিক যুদ্ধের ভূমিকা তখন অজানা তো ছিলই না, বরং তাঁকে নোবেল দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সে সময়েই প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। তবু সেই হাবেরকেই ১৯১৮ সালের রসায়নের নোবেল পুরস্কারের জন্য বেছে নেওয়া হলো।

এগাস মনিজ

তালিকার দুই নম্বরে আছেন পর্তুগালের এগাস মনিজ। ১৯৪৯ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন। কিসের জন্য পেয়েছিলেন? এমন একটি শল্যচিকিৎসার জন্য, যার নাম এখন শুনলেই আতঙ্ক জাগে। তিনি পুরস্কৃত হয়েছিলেন prefrontal leucotomy প্রবর্তনের জন্য। একে সহজ ভাষায় লবোটমি বলা হয়। এই পদ্ধতিতে মানসিক রোগীদের মস্তিষ্কের সামনের অংশের সঙ্গে অন্যান্য অংশের স্নায়ুসংযোগ কেটে দেওয়া হতো।

তাঁকে পুরস্কার দেবার কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল, এই পদ্ধতিতে রোগীর উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে। অনেকের ব্যক্তিত্ব বদলে যাচ্ছে, স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা ও আবেগের ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ১৯৫০-এর দশকে নতুন ওষুধ আসার পর লবোটমির ব্যবহার দ্রুত কমে গেল এবং একসময় প্রায় বন্ধই হয়ে গেল। নোবেল ওয়েবসাইটেও এখন লবোটমির গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে। আজ আমরা এটা কল্পনাই করতে পারি না যে, লবোটমির জন্য কাউকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হতে পারে।

এখানে একটা irony বা ভাগ্যের পরিহাসের ব্যাপার আছে। মনিজের আরেকটি আবিষ্কার ছিল cerebral angiography। এটি হলো একটি রাসায়নিক পদার্থ রক্তনালিতে ঢুকিয়ে এক্স-রে দিয়ে মস্তিষ্কের ছবি তোলার পদ্ধতি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য এটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এবং এর জন্যও মনিজ একাধিকবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু এর জন্য তিনি নোবেল পেলেন না। নোবেল পেলেন লবোটমির জন্য, যে চিকিৎসাপদ্ধতি পরে উঠেই গেল।

গুস্তাফ দালেন

এবার আর একটি নোবেল পুরস্কার নিয়ে কথা বলতে চাই যেখানে কোনো ট্র‍্যাজেডি নেই, কিন্তু এত বছর পরে সেটি কিছুটা হাস্যকর ঠেকবে। ১৯১২ সনের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন সুইডেনের গুস্তাফ দালেন। পেয়েছিলেন সমুদ্র তীরে বাতিঘরের গ্যাসের বাতিগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তির জন্য। এর আগে নোবেল কমিটি গুলিয়েলমো মার্কনি এবং কার্ল ফের্দিনান্দ ব্রাউনকে বেতার টেলিগ্রাফির বিকাশে তাঁদের অবদানের জন্য পুরস্কার দিয়েছিল। কাজেই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য নোবেল দেবার উদাহরণ ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। অথচ গুস্তাফ দালেনের সময়, আমার মতে, বাতিঘরের বাতির স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণের চাইতে আরো বৈপ্লবিক কারিগরি উদ্ভাবন হয়েছিল, যেগুলোর জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি। ১৯০৩ সালে উইলবার ও অরভিল রাইট ভাইয়েরা ইঞ্জিনচালিত উড়োজাহাজকে আকাশে উড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯০৬ সালে লি ডি ফরেস্ট ভ্যাকুয়াম টিউব উদ্ভাবন করলেন – রেডিও, টেলিফোন এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রের বিকাশে এটার গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। প্রায় একই সময়ে এলমার স্পেরি জাহাজের দিক নির্ণয়ের জন্য কার্যকর জাইরোকম্পাস তৈরি করলেন যা কিনা বর্তমানে পৃথিবীর স্যাটেলাইটগুলোতেও ব্যবহার হয়। এঁদের কেউই নোবেল পুরস্কার পাননি।

অন্যদিকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে তখন একের পর এক বিপ্লব ঘটে চলেছে। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক কৃষ্ণবস্তুর বর্ণালী ব্যাখ্যা করতে কোয়ান্টামে ধারণা ব্যবহার করেছিলেন ১৯০০ সালে, আর আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে তাঁর তিনটি বিখ্যাত পেপারে বিশেষ আপেক্ষিকতা, আলোক-কোয়ান্টাম ও ব্রাউনীয় গতির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ১৯১২ সালে তাঁদের কাউকেই তখনও নোবেল দেওয়া হয়নি; সে বছর পদার্থবিজ্ঞানের একমাত্র নোবেলটি গেল বাতিঘরের গ্যাসবাতির স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণের জন্য গুস্তাফ দালেনের হাতে।

তাহলে দালেন কেন পেলেন? তিনি সুইডেনের মানুষ ছিলেন বলে কি? তার কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই, কাজেই সে অভিযোগ করা ঠিক হবে না। কিন্তু একশো বছরেরও বেশি সময় পরে, ওই সময়ের অন্যান্য আবিষ্কার ও উদ্ভাবনগুলোর সাথে তুলনা করলে দালেনের নোবেল পুরস্কারের নির্বাচনে যে কিছুটা যদৃচ্ছতা ছিল, সেটা আমরা বুঝতে পারি। তবে কোন আবিষ্কার মানুষের ভবিষ্যৎ কতটা বদলে দেবে, সেটা সেই সময়ে বিচার করা কঠিন; ভবিষ্যতের মানুষ হয়তো বর্তমানের উপেক্ষিত কোনো আবিষ্কারকে বৈপ্লবিক বলবে – আমাদের এখন তা জানার উপায় নেই।

এডউইন হাবল

এতক্ষণ আমরা যাদের কথা বললাম তাঁরা নোবেল পেয়েছেন, কিন্তু সেই পাওয়ার মধ্যে যে irony বা পরিহাস ছিল তা নিয়ে আলোচনা করলাম। এবার আমরা কথা বলব এমন মানুষদের নিয়ে যাদের হয়তো এই পুরস্কারটি দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু ভাগ্যচক্রে তাঁরা সেটি পাননি। এখানেই প্রথমে নাম করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের এডউইন হাবলের। ১৯২০-এর দশক পর্যন্ত আমাদের ধারণা ছিল পুরো মহাবিশ্ব বলতে শুধু আমাদের গ্যালাক্সিই আছে। হাবল দেখালেন যে আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে বহু দূরে অন্য গ্যালাক্সিরা বর্তমান। শুধু তাই না – সেই সমস্ত গ্যালাক্সি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অর্থাৎ মহাবিশ্বের প্রসারণ হচ্ছে। যে মানুষটি সমগ্র মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের হাজার হাজার বছরের ধারণা পাল্টে দিলেন তিনি কিন্তু নোবেল পেলেন না।

এটা একটা ঐতিহাসিক পরিহাস বলা যেতে পারে, তবে তখনও জ্যোতির্বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার দেবার চল শুরু হয়নি। হাবল নিজে নোবেলে পেতে উৎসাহিত ছিলেন এবং তাঁকে পুরস্কারের জন্য কয়েকবার মনোনীতও করা হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের মনোনীত তালিকায় অনেকের মধ্যে তিনি ছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত সেই বছরই তিনি মারা যান।

অথচ এর পরে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা নোবেলের একেবারে কেন্দ্রে চলে আসে। ১৯৭৪ সালে মার্টিন রাইল ও অ্যান্টনি হিউইশ রেডিও জ্যোতির্বিদ্যা, ১৯৭৮ সালে আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ আবিষ্কার, ১৯৮৩ সালে সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর নক্ষত্রের গঠন ও বিবর্তনের তত্ত্ব, ১৯৯৩ সালে রাসেল হাল্‌স ও জোসেফ টেলর বাইনারি পালসার ও মহাকর্ষীয় বিকিরণ, ২০০২ সালে রেমন্ড ডেভিস, মাসাতোশি কোশিবা ও রিকার্ডো জিয়াকোনি নিউট্রিনো ও এক্স-রে জ্যোতির্বিদ্যা, ২০০৬ সালে জন ম্যাথার ও জর্জ স্মুট মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ, ২০১১ সালে সল পার্লমাটার, ব্রায়ান শ্মিট ও অ্যাডাম রিস মহাবিশ্বের ত্বরিত প্রসারণ আবিষ্কারের জন্য পুরস্কার পেলেন। এরপর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, বহির্গ্রহ, এবং কৃষ্ণগহ্বর নোবেল পুরস্কারের বিষয় হয়েছে। ২০১৭ সালে রাইনার ওয়াইস, ব্যারি ব্যারিশ ও কিপ থর্ন মহাকর্ষীয় তরঙ্গে, ২০১৯ সালে জেমস পিবলস কসমোলজি এবং মিশেল মেয়র ও দিদিয়ের কেলোজ বহির্গ্রহে, আর ২০২০ সালে রজার পেনরোজ কৃষ্ণগহ্বরের তত্ত্ব এবং রাইনহার্ড গেনজেল ও আন্দ্রেয়া গেজ আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রের অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে কাজের জন্য নোবেল পেয়েছেন। যে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে একসময় নোবেল কমিটি স্বীকার করতে চাননি, আজ এক শতাব্দী পরে সেটিই পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়ার অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লিজে মাইটনার

মহাবিশ্বের প্রসারণ যেমন আমাদের বর্তমান বিজ্ঞান-চেতনার একটি বড় ভিত্তি, পরমাণুকে ভেঙে সেখান থেকে শক্তি আহরণ তেমনই আর একটি বড় বৈজ্ঞানিক স্তম্ভ। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, সেই স্তম্ভটির অন্যতম রূপকারও নোবেল পাননি। নাৎসি জার্মানিতে ইহুদি-বিরোধী নির্যাতনের কারণে লিজে মাইটনার ১৯৩৮ সালে জার্মানি থেকে পালিয়ে সুইডেনে আশ্রয় নেন। এর মধ্যে, ১৯৩৮-এর শেষে বার্লিনে, ওটো হান ও ফ্রিৎজ স্ট্রাসমানের পরীক্ষায় নিউট্রনের আঘাতে ইউরেনিয়াম থেকে ব্যারিয়াম পাওয়া গেল। মাইটনার, তাঁর ভাগ্নে ওটো ফ্রিশের সঙ্গে, এর একটা ভৌত ব্যাখ্যা দিলেন— নিউট্রনের আঘাতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভক্ত হচ্ছে। ১৯৩৯ সালে মাইটনার ও ফ্রিশ তাঁদের এই ব্যাখ্যা Nature পত্রিকায় প্রকাশ করেন এবং এই প্রক্রিয়ার নাম দেন ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’।

তারপর শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধের কারণে ১৯৪৪ সালের রসায়নের নোবেল তখন দেওয়া হয়নি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৫ সালে যখন সেই পুরস্কার ঘোষণা করা হলো, সেটি পেলেন ওটো হান একা। অথচ ততদিনে মাইটনার ও ফ্রিশের গবেষণা Nature-এ প্রকাশিত হয়ে ছয় বছর কেটে গেছে। ম্যাক্স প্লাঙ্ক এবং জেমস ফ্র‍্যাঙ্কের মতো নোবেল জয়ীরাও মাইটনারকে নোবেলের জন্য মনোনীত করেছিলেন। তখন পর্যন্ত বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন মাত্র দুজন নারী—ম্যারি কুরি এবং তাঁর কন্যা ইরেন জোলিও-কুরি। লিজে মাইটনারের নারী হওয়া নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল কি না, তা আজও আলোচনার বিষয়। আজ এই নিউক্লিয়ার ফিশন একদিকে পারমাণবিক বোমা, অন্যদিকে শান্তিপূর্ণভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং পারমাণবিক গবেষণায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

অসওয়াল্ড অ্যাভেরি

কানাডীয়-মার্কিন বিজ্ঞানী অসওয়াল্ড অ্যাভেরির নোবেল না পাওয়াকে সম্ভবত নোবেল কমিটির অন্যতম বড় ভুল বলা যায়। অ্যাভেরি, কলিন ম্যাকলাউড ও ম্যাকলিন ম্যাককার্টি ১৯৪৪ সালে দেখালেন, বংশগত তথ্য বহনকারী পদার্থটি হলো ডিএনএ। অথচ এই আবিষ্কারের জন্য তিনজনের কেউই নোবেল পেলেন না। এমন নয় যে নোবেল কমিটি অন্তত অ্যাভেরির কাজের কথা জানত না, তাঁকে নোবেল পুরস্কারের জন্য ৩৮ বার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল; ১৯৫১ সালের একটি মনোনয়নে সরাসরি ডিএনএর ভূমিকার কথাও বলা হয়েছিল। এর আঠারো বছর পরে ডিএনএর গঠন আবিষ্কারের জন্য জেমস ওয়াটসন, ফ্রান্সিস ক্রিক ও মরিস উইলকিন্স নোবেল পেলেন। ততদিনে অবশ্য অ্যাভেরি মারা গিয়েছেন।

রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন

১৯৬২ সালে ওয়াটসন, ক্রিক ও উইলকিন্স ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারের জন্য নোবেল পেলেন। তাঁদের এই আবিষ্কারের পেছনে আর একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের ডিএনএ-র এক্স-রে বিচ্ছুরণের ছবি ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ওয়াটসন ও ক্রিক তাঁদের মডেল তৈরিতে ফ্র্যাঙ্কলিনের অনুমতি ছাড়াই ফ্র্যাঙ্কলিনের অপ্রকাশিত গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যবহার করেছিলেন।

ওয়াটসন ও ক্রিক ডিএনএ-র দুটি প্যাঁচানো শৃঙ্খলের গঠন নিয়ে তাঁদের বিখ্যাত গবেষণাপত্রটি ১৯৫৩ সালে Nature পত্রিকায় প্রকাশ করেন। একই সংখ্যায় ফ্র্যাঙ্কলিন ও তাঁর ছাত্র রেমন্ড গসলিং-এর একটি গবেষণাপত্রও প্রকাশিত হয়েছিল। এর পাঁচ বছর পরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ফ্র্যাঙ্কলিন মারা যান; তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৭ বছর। আরও চার বছর পরে, ১৯৬২ সালে, ওয়াটসন, ক্রিক ও উইলকিন্স নোবেল পেলেন। ফ্র্যাঙ্কলিন তখন আর জীবিত নেই।

জোসেলিন বেল বার্নেল

১৯৬৭ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্রী জোসেলিন বেল তাঁর তত্ত্বাবধায়ক অ্যান্টনি হিউইশের অধীনে রেডিও জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। হিউইশের পরিকল্পনায় তৈরি একটি নতুন রেডিও টেলিস্কোপের উদ্দেশ্য ছিল, আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে, বহু দূরের খুব শক্তিশালী কোয়েজার নামের উৎস থেকে আসা রেডিও সংকেতের পর্যবেক্ষণ করা। টেলিস্কোপটি তৈরিতেও বেল অন্যদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। কিন্তু আসল শ্রমসাধ্য কাজটি ছিল যন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসা পর্যবেক্ষণের দীর্ঘ কাগজের চার্ট পরীক্ষা করা।

সেই চার্টের মধ্যে বেলের চোখে পড়ল আকাশের একই জায়গা থেকে আসা একটি অস্বাভাবিক সংকেত। সংকেতটি অত্যন্ত নিয়মিত— প্রায় প্রতি ১.৩৩ সেকেন্ড অন্তর একটি স্পন্দন আসছে। এত নিয়মিত কম্পাঙ্কের মহাজাগতিক রেডিও সংকেত আগে কেউ দেখেনি। প্রথমে মজা করে এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘LGM-1’—Little Green Men, অর্থাৎ ‘ছোট সবুজ মানুষ’; হয়তো কোনো ভিনগ্রহের সভ্যতা এরকম নিয়মিত সংকেত পাঠাচ্ছে। কিন্তু পরে আরও একই ধরনের উৎস পাওয়া গেল এবং বোঝা গেল এগুলো দ্রুত ঘূর্ণায়মান নিউট্রন তারা। এদেরই নাম হলো পালসার।

১৯৭৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল ভাগ করে দেওয়া হলো মার্টিন রাইল ও অ্যান্টনি হিউইশকে। রাইল পুরস্কৃত হলেন রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর অবদানের জন্য, আর হিউইশ পেলেন পালসার আবিষ্কারে তাঁর ভূমিকার জন্য। কিন্তু যে পিএইচডি ছাত্রী প্রথম সেই অদ্ভুত সংকেতটি খুঁজে পেয়েছিলেন, জোসেলিন বেল, তিনি নোবেল পেলেন না।

বেলকে নোবেল দেওয়া উচিত ছিল কি না, তা নিয়ে তখন থেকেই অনেক বিতর্ক হয়েছে। আমার মতে তাঁকে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে পালসার আবিষ্কারের পুরো কাজটি বেলই করেছিলেন। তিনি ছিলেন হিউইশের পিএইচডি ছাত্রী এবং তাঁর গবেষণা প্রকল্পের মধ্যেই কাজটি করেছিলেন। তবে যে সংকেত থেকে শেষ পর্যন্ত পালসার আবিষ্কৃত হলো, সেটি প্রথম শনাক্ত করেছিলেন বেল।

এর উনিশ বছর পরে, ১৯৯৩ সালে, আর এক পিএইচডি ছাত্র রাসেল হাল্‌স তাঁর গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক জোসেফ টেলরের সঙ্গে বাইনারি পালসার আবিষ্কারের জন্য নোবেল পেলেন। বেলের ঘটনাটি তখনও বিজ্ঞানজগতে আলোচিত ছিল বলে এই দুই ঘটনার তুলনা অনেকেই করেছেন।

এই কাহিনীগুলো থেকে বোঝা যায়, নোবেল পুরস্কার বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হলেও তার বিচার সবসময় নির্ভুল ছিল না। শেষ পর্যন্ত জ্ঞান ও সভ্যতার বিকাশে কোন আবিষ্কার কতটা ভূমিকা রাখবে তা একমাত্র ইতিহাসই বলতে পারে। আর একটা ব্যাপার– আমাদের আলোচনায় না-পাওয়ার তালিকায় ছিলেন তিনজন নারী। ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে নারীদের বঞ্চিত করা হয়েছে কিনা সেটি আমরা বলতে পারব না, কিন্তু একটি পুরুষ-প্রধান তালিকাকে তাঁরা যে কিছুটা ভারসাম্য এনে দিতে পারতেন তা অনস্বীকার্য।

৬ অক্টোবর, ২০২৬

মোরেনো ভ্যালি, ক্যালিফোর্নিয়া

শৈশব-কৈশোর ঢাকায়, বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ানিবাসী। জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা নিয়ে তাঁর পড়াশোনা, গবেষণা ও অধ্যাপনা। লেখেন গল্প ও বিজ্ঞান কল্পসাহিত্য।


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।