পড়শী পড়শীর আরশি প্রতিটা মানুষই মশারীর মতো একটা আবরণে ঢাকা

প্রতিটা মানুষই মশারীর মতো একটা আবরণে ঢাকা


নিতান্তই শিশুকালের ঘটনা। ক্লাস টু বা থ্রি-তে পড়ি।

আমার এক দূরসম্পর্কের ফুপাতো বোন দুপুরের পরের কোনো এক সময়ে চুলার পাশে ভাত খেতে বসেছিলেন। সদ্য বিবাহিত বোনটির পরনে ছিলো সিন্থেটিক শাড়ী, কোমড় সমান চুল ছিলো ছাড়া। চুলার অপর দিকে রাখা লবনের কৌটা নিতে গিয়ে তাঁর শাড়ীতে আগুন ধরে যায়। আগুনের আঁচে গলে যাওয়া শাড়ী আর পুড়ে যাওয়া চুল নিয়ে উনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন।

মা তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সমাজকল্যাণ অফিসার। সেই সময়ে যেকোনো প্রয়োজনে রংপুর এবং কুমিল্লা থেকে আসা সব আত্মীয়রা আমাদের আজিমপুর কলোনির বাসায় উঠতেন। রেওয়াজে মেনে ফুপা, ফুপু আমাদের বাসায় থেকে হাসপাতাল ডিউটি দিতে লাগলেন।

বাচ্চা মানুষ বিধায় বোনের চিকিৎসার বিষয়টা আমার কাছ থেকে লুকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন মা। বেড়ে ওঠার আশ্রয় হারুনের মা চাচীর কাছে শুনেছিলাম, দগদগে পোড়া শরীরে কোনো কাপড় রাখা যেতো না বলে মশারীর মতো একটা গোল ঢাকনা দিয়ে বোনটিকে ঢেকে রাখা হতো। ড্রেসিং করার সময় ওনার আর্তনাদ মানুষ বা পাখির পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিলো না।

ঘটনাটা আমার শিশু মনে কতোটা গভীর দাগ কেটেছিল, এখন বুঝি। ইদানীং মাঝে মাঝেই মনে হয়, প্রতিটা মানুষই মশারীর মতো একটা আবরণে ঢাকা। বাইরের চকচকে, ঝকঝকে সেই আবরণের ভেতরে থাকে সময়ের আঁচে ঝলসে যাওয়া পোড়া আত্মা।
প্রবঞ্চনা, প্রতারণা, শোক, ক্ষোভ, অতৃপ্তি, হেরে যাওয়া, না পাওয়া বা হারিয়ে ফেলার তীব্র কষ্টে আত্মা আর্তনাদ করে। হাসি, আনন্দ, চোখের পানি বা কাজলের আড়ালে চাপা পরে যায় সেই আর্তনাদ। পোড়া আত্মার দগদগে ঘা বহন করে মানুষ কাটাতে থাকে নশ্বর জীবন।

খোলসের আড়ালে ক্ষয়ে যেতে যেতে, পঁচে যেতে যেতে নিজেকেই নিজে স্বান্তনা দেয়, অনেকটা ড্রেসিং করার মতো! আত্মা পোড়ার অসহ্য যন্ত্রণা সয়ে জীবন বয়ে যায় নদীর মতো। নদীর মতোই একেকটা জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে অসংখ্য কাহিনী।

জীবন ভাঙ্গে, জীবন গড়ে। ধ্বসে যাওয়া জীবন জেগে ওঠে ধ্বংসস্তূপ থেকে। শত যন্ত্রণা, শত প্রবঞ্চনা, শত হেরে যাওয়ার পরেও জীবন থামে না!

লিখতে বসেছি পোড়া আত্মার জীবন নিয়ে আর চিন্তামণি এলো শ্রীমদভগবদগীতা (গীতা) নিয়ে! ইদানীং ওর চটুলতা কিছু কমে গেছে। খোঁচা মারা কথায় রাগিয়ে না দিয়ে চুপচাপ কি যেন চিন্তা করে। অবশ্য চিন্তা করা ছাড়া চিন্তামণি করবেই বা কি!

চিন্তামণি পরেছে গীতার ২/১৭ নম্বর শ্লোকে বলা আছে, “যা সমগ্র শরীরে পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে, তাকে তুমি অবিনাশী বলে জানবে৷ সেই অব্যয় আত্মাকে কেউ বিনাশ করতে সক্ষম নয়।”
(গীতা ২/১৭)

আসলেই তো তাই! পোড়া হোক, পঁচা হোক, দাগ পরে নষ্ট হয়ে যাওয়া হোক, নশ্বর শরীরে বাস করে অবিনশ্বর আত্মা! এ যেন নিত্য, অনিত্যের খেলা! এ খেলায় জিতে যাক সকল আত্মা। পোড়ার কষ্ট সয়ে সয়ে টিকে থাকুক শরীরের শেষ পর্যন্ত।

যতোক্ষণ শ্বাস ততোক্ষণ আশ! শেষ পর্যন্ত ভালো থাকার, ভালো রাখার চেষ্টা। সমস্ত আত্মা শান্তি পাক। শান্তিতে থাকুক।


কিশোয়ার জাবীন | ঢাকা, বাংলাদেশ

পোশাক রপ্তানি শিল্পের সাথে জড়িত। লেখালেখির শুরু ২০১৯ সালে। “ছকে বাঁধা রানী” নামে প্রথম কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে ২০২২ সালের বই মেলায়। “চিন্তামণি” নামেও পাঠকরা চেনেন।


Previous Post
Next Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *