পড়শী সাহিত্য ও শিল্প মায়াবিনীর হেঁশেল

মায়াবিনীর হেঁশেল


আকাশটা আজ উনুনের পাশে বসে থাকা বিমর্ষ এক নারী—
ধোঁয়াটে শাড়ির আঁচল সামান্য সরিয়ে,
চাল ঝাড়ছে এই বিদ্যুৎ-চমকানো বিকেলে;
তার বিষণ্ণ কুলোর ওপর ঝরে পড়ছে
কয়েকটা মরা নক্ষত্রের ছাই,
মহাকালের বুক থেকে খসে পড়া যেন এক-একটা নীরব দীর্ঘশ্বাস।

পাশে এক তপ্ত কড়াই নামিয়ে রাখা—
ঠিক যেন কোনো পরিত্যক্ত বাসনা, এখনো ধোঁয়া উঠছে সেখান থেকে;
বাতাসের ঘাড়ে চেপে বসা সেই অবাধ্য বাষ্প
ভীষণ অস্বস্তিকর, বড্ড বেশি ভারী—
একটা অশরীরী সওয়ারির মতো।

মেঘগুলো ঠিক মেঘ নয়, ওগুলো সেই একশ বছর আগের
স্মৃতি-ডোবানো শাড়ি—
যাকে নীল জলে ডুবিয়ে গাঢ় নীল করা হয়েছিল কোনো এক বিস্মৃত উৎসবে;
আজ সেই সব রঙ ধুয়ে গিয়ে পড়ে আছে শুধু এক অনন্ত ধূসরতা,
এক চিরস্থায়ী কুয়াশা মেখে দাঁড়িয়ে আছে যেন মহাজাগতিক কোনো বারান্দায়।

বাতাসে আজ ভিজে ধূপের অবাধ্য গন্ধ,
বিদেহী কোনো ছায়া যেন রান্নাঘরের ধোঁয়ার গোলকধাঁধায়—
এখনো হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছে তার পুরনো আলমারির মরচে ধরা চাবি।
হাতের কাঁচের চুড়িগুলো হঠাৎ কথা বলে ওঠে ঠিক ভাঙা আয়নার মতো,
ওরা তো কাঁচ নয়—একেকটা অন্ধকার চক্রব্যূহ,
যেখানে জন্ম-জন্মান্তর ধরে বন্দি হয়ে আছে কোনো প্রাচীন অভিমান।

উনুনের পাশে ঝুলে থাকা ওই তপ্ত লোহার খুন্তিটা—
এক নিঃশব্দ তলোয়ারের মত, শাণিত হচ্ছে অন্ধকারের গায়ে,
আজ রাতের জমাট বিষাদ কাটবে বলে।
হাঁড়িগুলো একেকটা গভীর কুয়ো, ভেতরে কিছুই নেই—
শুধু জমে আছে কয়েক জনমের না-বলা সব না-পাওয়া।

বৃষ্টির আগে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা এই থমথমে জাদুকরী আবেশ—
আকাশরূপী সেই নারী যেন তার রহস্যময় আঁচলের নিচে
চুরি করে লুকিয়ে রেখেছে আস্ত একটা দুপুর।

আকাশটা আজ আরও নিচু হয়ে নেমে এসেছে,
ঠিক যেমন মা ঝুঁকে আসতেন কপালে হাত রাখতে—
যখন তীব্র জ্বরে শরীর পুড়ে যেত;
আজও শরীর পুড়ছে, অথচ কী আশ্চর্য—
আজকের এই স্পর্শটা শ্যাওলার মতো শীতল, পাথর-শীতল!
তাতে লেগে আছে এক পশলা না-ঝরা বৃষ্টির
কোনো প্রাগৈতিহাসিক রহস্য।


লীনা ফেরদৌস | ঢাকা, বাংলাদেশ

একাধারে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ, কিডজ লিডজ চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। কবি, ফিচার লেখক ও শিশুসাহিত্যিক। প্রকাশিত বই সাতটি; ৪টি শিশুতোষ ও ৩টি কাব্যগ্রন্থ।



Previous Post
Next Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *