পড়শী খেলা খেলা প্রাপ্তির খোঁজে কানাডা

প্রাপ্তির খোঁজে কানাডা


সকারের সবচে বনেদি ও জৌলুসময় আসর ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ নিয়ে উৎকন্ঠা, উত্তেজনা এবং হিসেব-নিকেশের অন্ত নেই। সকারপ্রেমীদের এখন আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু হচ্ছে ১১ জুন থেকে শুরু হওয়া ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। 

তিন স্বাগতিক দেশের অন্যতম হচ্ছে কানাডা। এবারের বিশ্বকাপে কানাডার কৌশলগত পারফরম্যান্স নিয়ে চলছে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ। সকার কানাডার সবচে জনপ্রিয় খেলা নয়। আইস হকি, বেইস বল, আমেরিকান ফুটবল কিংবা বাস্কেটবল নিয়েও কানাডিয়ানদের আগ্রহের কমতি নেই। সেই ক্ষেত্রে সকারকেও জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে মুখোমুখি হতে  হয় অন্য খেলাগুলোর সাথে। যে কোনো খেলার সংবেদনশীল বিষয়টি হলো খেলায় ধারাবাহিক সাফল্য। তাই এবারের ফিফা বিশ্বকাপ কানাডার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো, কানাডায় সকারের জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। জনপ্রিয়তার উর্দ্ধমুখি রেখচিত্র অব্যাহত থাকবে যদি এই বিশ্বকাপে কানাডা প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারে।  

কানাডা এবার খেলবে বি গ্রুপে কাতার, সুইজারল্যান্ড এবং বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে। তুলনামূলক বিচারে এই গ্রুপটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল। স্বাগতিক দেশ হিসেবে কানাডা নিশ্চয়ই বাড়তি সুবিধা কাজে লাগাবে। নিজ দেশের মাটিতে যে কোন দলের বিরুদ্ধে জয় অসম্ভব কিছু নয়। কানাডা দলের অন্যতম তারকা খেলোয়াড় আলফনসো ডেভিস এবং জোনাথন ডেভিড যদি তাঁদের সহজাত নৈপুণ্য মেলে ধরতে পারে, সেটা পুরো দলকে উজ্জীবিত করবে। কানাডার দুই উইং জুড়ে গতি আছে, আক্রমনাত্ত্বক প্রেসিং আছে এবং এক দলীয় বোঝাপড়া ভালো। তবে রক্ষনভাগের দুর্বলতা নিয়ে সমর্থকদের মাঝে উৎকন্ঠা আছ। সে সাথে ডেভিসের হ্যামস্ট্রিংয়ের ইনজুরি সমস্যা নিয়ে দলের ভেতর উৎকন্ঠা রয়েছে। 

শুধুমাত্র ডেভিড কিংবা  ডেভিসের উপর ভরসা করে কানাডা কখনোই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। দলে সমন্বিত প্রয়াস থাকতে হবে। একে অন্যের ভেতর যোগসূত্রতা থাকা জরুরী। কোচ জেসি মার্স দলের ব্যাপারে খুবই আশা বাদী। তিনি যুক্তি দেখাচ্ছেন এর আগে কানাডার খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছিল ২৭, এবারে এসে দাঁড়িয়েছে ২৫ বছর। তারুণ্যের উদ্দীপনা রয়েছে দলটিকে ঘিরে। এটাকে ইতিবাচক দিক মনে করছেন। তাঁর মতে এবারের দলটি কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে সুসংহত দল। প্রতিপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করে জয় ছিনিয়ে আনা কঠিন কাজ হবে না। তিনি তাঁর দলকে আক্রমনাত্মক পদ্ধতিতে খেলাবেন। উদ্যমী পরিশ্রমী ছেলেদেরকে তিনি সেই মনস্তাত্ত্বিক বার্তাই পৌঁছে দিয়েছেন। 

বিগত ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে কানাডা প্রাথমিক গ্রুপ পর্বে বেলজিয়াম, ক্রোশিয়া এবং মরোক্কের কাছে হেরেছিল। ক্রোশিয়ার বিপক্ষে শুরুর  ৪৭ সেকেন্ডে ডেভিডের দেয়া গোলটি ছাড়া তেমন  কোন অর্জন ছিল না। সেই সময় কানাডা আক্রমনাত্মক ফুটবল না খেললেও নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলেছে। এবার হয়তো কানাডা আরো বেশী পরিণত ফুটবল খেলবে। ডেভিড-ডেভিস ছাড়াও দলে আছে কুশলী তাহন বুকানন, জ্যাকব শ্যাফেলবার্গ, লিয়াম মিলারের মতো খেলোয়াড়। একাধিক খেলোয়াড়রা ইউরোপ লীগে নিয়মিত খেলছে এবং এ কারণেই  বিশ্বমানের খেলার চর্চা অব্যাহত রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি দলীয় সমন্বয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা টুর্নামেন্টে কানাডার সাফল্য ছিলো ঈর্ষণীয়। আত্মবিশ্বাসের পারদ এখন উর্দ্ধমুখি। কোচ জেসি বরাবরই একটি একমুখী  শারীরিক প্রেসিং শৈলী চান। এটা কানাডাকে শক্তি ও আগ্রাসনের খোরাক জোগাবে। ফলে প্রতিপক্ষের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। এটার নেতিবাচক দিকটি হলো, হঠাৎ রক্ষনভাগে বিপদজনক গ্যাপ তৈরি হতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় ফাউল করার প্রবনতা দেখা দিতে পারে। 

বিশ্বকাপ খেলার আগে টিম কানাডা আমেরিকার নর্থ ক্যারোলাইনায় অনুশীলন ক্যাম্পের আয়োজন করেছে দলীয় বোঝাপড়ার অনুসঙ্গটি মাথায় রেখে।  মূল খেলার আগে কানাডা অনানুষ্ঠানিক ম্যাচ খেলবে উজবেকিস্তান এবং আয়ারল্যান্ডের সাথে। বিশ্বকাপে খেলার সব ধরনের প্রস্তুতি কানাডা অনুসরণ করছে। এ মুহূর্তে কানাডার বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে অধিনায়ক আলফোনসো ডেভিসের ইনজুরি। ডেভিস হলো দলের নিউক্লিয়াস। তাঁর উপস্থিতি দলকে সব সময় উজ্জীবিত করে এবং কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করে। সুতরাং ডেভিসের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরী। কোচ জেসির হয়তো বিকল্প চিন্তা ভাবনা আছে। যেকোন স্বাগতিক দলের বড় সুবিধা হচ্ছে  চেনা কন্ডিশন এবং দর্শকদের মুহূ মুহূ হৃদয় উজাড় করা সমর্থন। এটা কানাডার জন্য বাড়তি প্রাপ্তি। গ্রুপ পর্বে প্রথম দু’টো দল এবং তৃতীয় স্থান ধারী সেরা আটটি দল পরবর্তী নক আউট রাউন্ডে যাবে। পারফরম্যান্স বিচারে গ্রুপ পর্বে কানাডার সেরা দুই অবস্থানে থাকাটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে নক আউট পর্বে কানাডাকে মুখোমুখি হতে হবে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দলকে। কোচ জেসি ভীষণ আশাবাদী দলের তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে। তাঁর পরিকল্পনা হলো অল আউট ফুটবল খেলা। প্রতিপক্ষকে সব সময় চাপের মধ্যে রাখা। এই আগ্রাসী কৌশল হয়তো ইতিবাচক ফল নিয়ে আসতে পারে। যদি খেলোয়াড়দের ইনজুরি সমস্যা না থাকে এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী নৈপুণ্য দেখাতে পারে, তাহলে চমকপ্রদ ফলাফল আশা করা যেতেই পারে। 

সেই আলোকে বলা যায় কানাডার কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যাওয়া কোন অলীক কল্পনা নয়। কানাডার সমর্থকরা এখন সেই আশা জাগানিয়া প্রাপ্তির প্রত্যাশায় আছে। 


নকিব আহমেদ | এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা

ক্রিড়া লেখক। পেশায় যন্ত্র প্রকৌশলী।



Previous Post
Next Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *