পড়শী বই আলোচনা বেঁচে থাকার সৌন্দর্য

বেঁচে থাকার সৌন্দর্য


বইয়ের পাতা থেকে আজ আমি তুলে ধরব জাপানের জনপ্রিয় লেখক এবং আমার প্রিয় লেখক হারুকি মুরাকামির উপন্যাস – What I Talk About When I Talk About Running থেকে কিছু অংশ।

“যারা প্রতিদিন দৌড়াদৌড়ি করে, লোকজন তাদেরকে উপহাস করে থাকে। বলে যে, এরা বেশিদিন বাঁচার জন্যে জীবনে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু সত্য হলো যে, বেশিদিন বাঁচার জন্যে অধিকাংশ দৌড়বিদই দৌড়ান না; তারা দৌড়ান প্রাণবন্ত ও পরিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার জন্য।

তুমি যদি জীবনের সময়গুলোকে স্বাচ্ছন্দ্যে অতিবাহিত করতে চাও, তাহলে তোমার উচিত হবে পরিষ্কার উদ্দেশ্য নিয়ে পরিপূর্ণভাবে জীবনকে যাপন করা। আমি বিশ্বাস করি যে, দৌড় আমাদেরকে এমন একটি জীবন যাপন করতে সহায়তা করে থাকে। আসল কথা হলো, ব্যক্তি হিসেবে নিজেদের সকল সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও আমাদেরকে পূর্ণভাবে সত্তার বিকাশ ঘটাতে হবে। দৌড়ানোর মূল কথা ও জীবনের রূপক এটাই। শুধু তাই নয়, নিজের ও সার্বিকভাবে লেখালেখির জন্যেও এটা প্রয়োজন। আমি বিশ্বাস করি অনেক দৌড়বিদরাই আমার সাথে একমত হবেন।”

মূলঃ Haruki Murakami/ হারুকি মুরাকামি
উপন্যাস – What I Talk About When I Talk About Running

অনুবাদ: আসাদুজ্জামান

লেখক এখানে দৌড়কে শুধু শরীরচর্চা হিসেবে দেখেননি, বরং জীবনের গভীর এক রূপক হিসেবে দেখেছেন। এই কথাগুলোর ভেতরে মানুষের বেঁচে থাকার এক নীরব দর্শন লুকিয়ে আছে।

মানুষ সাধারণত মনে করে, যারা নিয়মিত দৌড়ায় তারা মৃত্যুকে ভয় পায়, তাই আয়ু বাড়ানোর জন্য এত চেষ্টা করে। কিন্তু মুরাকামি বলতে চেয়েছেন, সত্যিকারের অর্থে মানুষ আয়ু বাড়ানোর জন্য নয় তারা জীবনের ভেতরকার প্রাণটাকে জাগিয়ে রাখতে চান, শরীরটাকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি মনের সৌন্দর্যও বাড়াতে চান অর্থাৎ “কতদিন বাঁচলাম” তার চেয়ে “কীভাবে বাঁচলাম” অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনে আমরা প্রায়ই স্বাচ্ছন্দ্যকে সুখ ভেবে ভুল করি। সহজ, অলস, নিশ্চিন্ত জীবনকে নিরাপদ মনে হয়। কিন্তু মানুষ তখনই সবচেয়ে বেশি জীবন্ত থাকে, যখন সে নিজের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে একটু একটু করে লড়াই করে। দৌড় সেই লড়াইয়ের প্রতীক।

প্রতিদিন নিজের ক্লান্তি, অনীহা, ব্যর্থতা, বয়স, হতাশাকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। জীবনও ঠিক তাই।

মুরাকামি “পরিষ্কার উদ্দেশ্য” কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে বলেছেন। উদ্দেশ্যহীন জীবন ধীরে ধীরে মানুষকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়। দৌড়ের মতোই জীবনেরও একটা ছন্দ দরকার, একটা গন্তব্য দরকার। কেউ লেখালেখির মাধ্যমে, কেউ শিল্পে, কেউ ভালোবাসায়, কেউ দায়িত্বে নিজের সেই দৌড় বা স্পীড খুঁজে পায় আর সেভাবে জীবন অতিবাহিত করলে ফিরে পাবে বেঁচে থাকার সৌন্দর্য।

আরেকটি গভীর বিষয় হলো, তিনি সীমাবদ্ধতার মধ্যেও “পূর্ণ সত্তার বিকাশ”-এর কথা বলেছেন। মানুষ কখনোই নিখুঁত নয়। কারও শরীর দুর্বল, কারও মন ভাঙা, কারও জীবন অসম্পূর্ণ। তবু সেই অসম্পূর্ণতার ভেতর থেকেই নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করাই আসল জীবন। দৌড় এখানে জয়ের প্রতীক নয়, বরং ভালোভাবে টিকে থাকার এবং সৌন্দর্যের প্রতীক।

এই লেখার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এটি আমাদের শেখায় যে জীবনের অর্থ বাহ্যিক সাফল্যে নয়, বরং প্রতিদিন নিজের ভেতরের মানুষটিকে একটু একটু করে জাগিয়ে রাখার মধ্যে। কেউ শরীরচর্চায়, কেউ সংসারের উন্নতির জন্য, কেউ লেখালেখির মাধ্যমে মনের সৌন্দর্য প্রকাশ করে, কেউ ভালোবাসায়, কেউবা নীরব সংগ্রামে সেই কাজটাই করে যায়। আসল কথা হলো “বাঁচবো জীবনকে উপভোগ করে। মনের মাধুর্য মিশিয়ে সৌন্দর্য বিলিয়ে বেঁচে থাকার মতো বাঁচবো”


নিঘাত কারিম | হিউস্টন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত বই – ‘গোধূলির ছোঁয়া’ ও ‘প্রতিবিম্বের কাছাকাছি’। প্রকাশিত ছোট গল্পের ই-বুক – যা কিছু গল্প হয়ে রয়।



Previous Post
Next Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *