মাঝে মাঝেই এরকম একটা রব ওঠে যে ‘আমরা সবাই রাজা…’। তার তোড়ে সব ভেসে যায়। ক্ষণকালের জন্য আমরা যারা আমজনতা– তারাও নিজেদের ‘রাজা’ ভাবতে শুরু করি। তখন কারোই এটা ভাবার অবকাশ থাকে না যে আজকের দুনিয়ায় রব তো আর নিজে নিজে ওঠে না, রব তোলা হয়। এটাও একটা রীতিমতো ব্যয়বহুল প্রকল্প। তবে আর দশটা প্রকল্পের মতো সাধারণ কোনো প্রকল্প নয়। এর সঙ্গে রাজনীতি ও অর্থনীতির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষায়িত এ প্রকল্পে উচ্চমানের শৈল্পিক ছোঁয়া থাকতে হয়– যাতে তার অন্তর্গত উদ্দেশ্যটি আড়াল করা যায়। সর্বোপরি, থাকতে হয় একটা নিরীহ ধরনের সর্বজনগ্রাহ্যতাও– যাতে সবাই তা লুফে নেয়। সংগত কারণেই রব তোলা হাটেবাজারে চাঁদা তোলার মতো সহজ কোনো কাজ নয়। এ জন্য বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়। শুধু কাঠখড় পোড়ালেই হয় না, প্রয়োজন হয় নানাবিধ কলাকৌশলেরও। সমাবেশ ঘটাতে হয় বিচিত্র ধরনের মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার। মুখ ও মুখোশের সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের সামর্থ্য সবার থাকেনা।
আগে এ ধরনের উচ্চ সংবেদনশীল প্রকল্পের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিমা দুনিয়ার ক্ষমতাধর রাষ্ট্রযন্ত্র বা সরকারের হাতে। তারাই কলকাঠি নাড়তো। নিজেদের খেয়ালখুশিমতো কাউকে ‘ফেরেশতা’ বানিয়ে রাজাসনে বসাতো, আবার কাউকে ‘দানব’ আখ্যা দিয়ে ছুড়ে ফেলতো ক্ষমতার মসনদ থেকে। তবে সময় বদলে গেছে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের সেই কর্তৃত্বকেও ছাপিয়ে উঠেছে অধিকতর প্রতাপশালী আরেকটি পক্ষ– যাদের হাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার শুধু নয়, আছে ‘আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ’ও। শেষের কথাটি আমি ধার করেছি ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের কাছ থেকে। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতের এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) হবে অনেকটা জাদুকরের দৈত্যের মতো। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৬ জুলাই ২০২৬)। অন্যদিকে, পৃথিবীর প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ক মনে করেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এআইয়ের কাছে মানুষ নিয়ন্ত্রণ হারাবে। কারণ, এআই ততদিনে মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হবে। (সমকাল, ২৮ জুলাই ২০২৬)। তবে বর্তমানেও যে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ভবিষ্যতের হবু দৈত্যটি’ হাতপা গুটিয়ে বসে নেই– সেটা তাঁরা খোলাসা করেনা বললেও পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ প্রতিমুহূর্তে তার সর্বময় উপস্থিতি অনুভব করছেন।
সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প– যাঁর নির্বাচনী রথের সারথি ছিলেন ইলন মাস্ক। এ মানুষটিকে আর কেউ না চিনুক, তাঁর দেশের জনগণ তো ভালো করেই চেনেন। তাঁর স্বভাবচরিত্র, পছন্দ-অপছন্দ ও মেজাজমর্জি কিছুই তাদের অজানা নয়। তারপরও দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য তিনি যখন প্রার্থী হলেন, তখনই একটা রব তোলা হলো। এ মানুষটিকেই তুলে ধরা হলো ‘ত্রাতা’ হিসেবে। শুধু কি অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত আমেরিকার ত্রাতা? না, তাঁকে তুলে ধরা হলো বিপন্ন দুনিয়ার ত্রাতা হিসেবে। বলা হলো, তিনি নির্বাচিত হলে শান্তি ও সমৃদ্ধির সুবাতাস বয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা-সমর্থনে দুনিয়াজুড়ে যে যুদ্ধ-উন্মাদনা চলছে তার আশু অবসান ঘটবে। কারণে-অকারণে অযাচিত হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার পথ থেকে তিনি সরে আসবেন। সবাই তা বিশ্বাসও করতে শুরু করলেন। যুদ্ধের আগুনে ক্ষত-বিক্ষত রাশিয়া-ইউক্রেনের জনগণ ভাবলেন, এবার সত্যি সত্যি যুদ্ধ বন্ধ হবে। তারা অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন। যুদ্ধের কারণে নাভিশ্বাস ওঠা দেশগুলোর মানুষ ভাবলেন, তাদের মুক্তি মিলবে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে। বাংলাদেশও ছিল এ তালিকায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাবাসী আশায় বুক বাঁধলেন। ভাবলেন, অভুক্ত সন্তানের রক্তাক্ত লাশ কাঁধে তাদের আর মাতম করতে হবে না। পালিয়ে বেড়াতে হবে না এক আশ্রয় শিবির থেকে অন্য আশ্রয় শিবিরে।
সব মিলিয়ে, দুনিয়াজুড়ে একটা ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে গেল। ঝড় বয়ে গেল ভোটের বাক্সে। তার তোড়ে সব ভেসে গেল। ব্যাপকভাবে অভিবাসী অধ্যুষিত বহুজাতিক, বহুভাষিক এবং নানা ধর্ম-বর্ণ ও মতের বিপুল বৈচিত্র্যমণ্ডিত দেশটিতে বাস্তবে যা ঘটলো ততটা হয়ত ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা তাঁর নির্বাচনী টিমও আশা করেননি। সেটা ছিল এমন একটি মুহূর্ত যখন সবাই নিজেকে সত্যি সত্যি ‘রাজা’ ভাবতে শুরু করেছিলেন। উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন এমন এক সোনার পাথরবাটির স্বপ্নে যা বাস্তবে কখনই সম্ভব নয়। সেই সম্মোহন কেটে যাওয়ার পর তারা নিজেদের শুধু প্রজা নয়, আগের চেয়ে হেয়তর প্রজা হিসেবে আবিষ্কার করলেন। অভিবাসীরা দেখলেন, তাদেরই শ্রমে-ঘামে গড়ে ওঠা দেশটিতে তারাই ‘পরবাসী’ হয়ে গেছেন। অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ তো বন্ধ হয়ইনি, বরং গাজা গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে আরও বিপজ্জনক এক রণাঙ্গন তিনি উদ্বোধন করেছেন তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে– যার উত্তাপে পুরো পৃথিবীই এখন টালমাটাল। তারপরও কণ্ঠে সেই পুরনো আস্ফালন, তাদের অবাধ্য হলে মুছে ফেলা হবে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে! ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সমর্থনে দীর্ঘকাল ধরে অবরুদ্ধ গাজা পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। সেখানে অবাধে চলছে গণহত্যা। প্রতিদিনই সম্প্রসারিত হচ্ছে আগ্রাসনের মাত্রা ও পরিধি। প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের গায়েও লাগতে শুরু করেছে তার তীব্র আঁচ। শুধু যে অর্থনৈতিক দুর্দশা বাড়ছে তাই নয়, নানাভাবে সংকুচিত হতে শুরু করেছে তাদের মৌলিক ও মানবিক অধিকারও। ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুল্লিতে পড়লে যা হয়!
এখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণই বলছেন যে ট্রাম্প রাজার মতো আচরণ করছেন! ট্রাম্প নিজেও যে ভিন্ন কিছু মনে করেন না তার উদাহরণ ভূরি ভূরি। যদি মনে করতেন তাহলে অন্য দেশ দখলের কথা বলতেন না; ক্ষমতার জোরে রাতের অন্ধকারে ধরে নিয়ে আসতেন না অন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে। হাত-পা বেঁধে চরম অসম্মানজনকভাবে কিছু অসহায় মানুষকে ছুড়ে ফেলতে পারতেন না এমন একটি দেশে যার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে বহ আগেই। শুধু তাই নয়, ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে একের পর এক ফরমান জারি করে যথেচ্ছভাবে শুল্ক চাপিয়ে দিয়ে বিশ্ববাণিজ্যে যে অস্থিরতা তিনি সৃষ্টি করেছেন তা এককথায় নজিরবিহীন। আইন-আদালতও থামাতে পারছে না তাঁকে। কে কী বললো তিনি তার পরোয়া করেন না।
প্রশ্ন হলো, যারা সারা পৃথিবীকে গণতন্ত্র, সুশাসন ও ন্যায়বিচারের সবক দেন তাদের অবস্থা যদি এই-ই হয়, তাহলে সম্প্রতি ইরানে যে বীভৎস শিশুহত্যা হলো– যেসব হতভাগ্য বাবা-মা তাদের আদরের সন্তানকে বোমার আঘাতে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যেতে দেখলেন তারা কার কাছে প্রতিকার চাইবেন? প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ শুরুর প্রথম কয়েক ঘন্টার মধ্যে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যখন এ বিমান হামলার ঘটনা ঘটে তখনো সেখানে ক্লাস চলছিল। হামলায় নিহত ১৫৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১২০ জনই ছিল শিশু। (বিবিসি বাংলা, ২৬ জুলাই ২০২৬)। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর চলমান হত্যাযজ্ঞে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ইতোমধ্যে ৭৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। তার মধ্যে শুধু শিশুর সংখ্যাই ২১ হাজারের বেশি। তথ্যগুলো এ কারণেই উল্লেখ করা হলো যে এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এখন বিচারকের আসনে যারা বসে আছেন, যারা অব্যাহতভাবে একে-ওকে শাসান, নানা ফরমান জারি করেন এবং পান থেকে চুন খসলেও শাস্তি দেন তাদের বিচার করবে কে?
বড় অদ্ভুত তাদের বিচারব্যবস্থা! বিচারের ধরন দেখে অনেকের লোককাহিনির সেই বাঘ আর হরিণশিশুর গল্প মনে পড়ে যেতে পারে। দুজনেই জল পান করছিল এক পাহাড়ি নদীতে। বাঘের ইচ্ছা হরিণটিকে খাবে। কিন্তু ইচ্ছে হলেই তো আর একটা বাচ্চার ঘাড় মটকানো যায় না, সেজন্য অন্তত একটা অজুহাত তো লাগে! ভেবেচিন্তে বাঘটি বললো, এই তুই আমার জল ঘোলা করলি কেন? হরিণশিশুটি বললো, হুজুর, আমি তো ভাটিতে, আপনি উজানে। আমি আপনার জল ঘোলা করলাম কীভাবে? উত্তেজিত বাঘটি বললো, অতশত বুঝি না, তুই ঘোলা না করলে নিশ্চয় তোর বাবা করেছিল! তারপরই ঘাড় মটকে দিল হরিণশিশুটির। দশকের পর দশক ধরে এমন দৃশ্য কোথায় না দেখেছি আমরা! হাস্যকর অজুহাতে আমাদের চোখের সামনে ধ্বংস করে ফেলা হলো কত না সমৃদ্ধ দেশ ও জনপদ। অথচ জন্মের পর থেকে সামরিক শাসনে নিষ্পেষিত হচ্ছে পাকিস্তান নামক দেশটি। প্রায় প্রতিদিনই সেখানে নির্বিচারে হত্যার ঘটনা ঘটছে। গুম হচ্ছে। পদদলিত হচ্ছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। তারপরও দেশটির ‘ফিল্ড মার্শাল’ই হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে পছন্দের মানুষ! একইভাবে বাংলাদেশে দুনিয়াকাঁপানো গণহত্যা সংঘটনের পরও দেশটির সামরিক একনায়ক ইয়াহিয়া খান ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। শুধু বিচার নয়, পুরো ব্যবস্থাটাই ক্ষমতাধরদের পছন্দ-অপছন্দ ও স্বার্থ-সম্পর্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পক্ষে থাকলে সাতখুন মাফ, বিপক্ষে গেলে খবর আছে!
এই যে তথাকথিত বিশ্বব্যবস্থা সেটা কোনো ন্যায্য ব্যবস্থা নয়। তাকে যে-নামেই ডাকা হোক না কেন, এটা নিরঙ্কুশভাবে ক্ষমতাবানদের ব্যবস্থা, ক্ষমতাবানদের দ্বারা পরিচালিত এবং ক্ষমতাবানদের জন্য নিবেদিত। যে-সভ্যতা নিয়ে আমরা এত বড়াই করি তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন আছে। এখানে শুধু সাম্প্রতিক একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেস ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) বলেছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ গাজা উপত্যকার তিন ভাগের দুই ভাগ বাসিন্দা তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে। বর্তমানে বেশির ভাগ পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক পরিবার ভিক্ষা করতে বা আবর্জনার স্তূপে খাদ্য খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। (প্রথম আলো, ২৪ জুলাই ২০২৬)। অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্ন কক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি ডলারের (১ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন) সামরিক ব্যয়-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস হয়েছে– যার সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ততা রয়েছে ইসরাইলের। (প্রথম আলো, ২৪ জুলাই ২০২৬)।
কাদের বিরুদ্ধে এ সমরসজ্জা? কে গাজাবাসীদের এরকম চরম অমানবিক অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে? বছরের পর বছর ধরে বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গা পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদেরকে নির্দয়ভাবে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। ভিটেমাটি শুধু নয়, কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাদের নাগরিকত্বের অধিকারও। এটাই কি সভ্যতা? ক্ষমতাধরদের অনুগ্রহপুষ্ট আন্তজার্তিকভাবে স্বীকৃত ‘সাধুসন্ত’রা হয়ত বলবেন, ‘কেন, আমরা কি সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখি নি?’ গাজা কিংবা রোহিঙ্গা শিবিরের মানুষ যেভাবে বেঁচে আছে এটাকে কি বাঁচা বলে? কারো দয়া বা দান-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করে যে-ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে সেটা কখনো ন্যায্য ব্যবস্থা হতে পারে না। এ পৃথিবী যেমন কারো একার নয়, তেমনি পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদের ওপর অধিকারও কারো একচেটিয়া হতে পারে না। কেউ ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক হয়ে সবার ওপর ছড়ি ঘোরাবে, আর কেউ চরম অবিচারের শিকার হয়ে না খেয়ে মরবে এটা হতে পারে না।
দৃশ্যত হরেক কিসিমের ‘রাজা’রা পৃথিবীটাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন। ‘নয়া বন্দোবস্তে’র মাধ্যমে দুর্বলের সম্পদ লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। তার মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো জনগণের ভোটে নির্বাচিত ‘রাজা’ যেমন আছে, তেমনি বিত্তবৈভবে ডুবে থাকা ‘রাজা-বাদশাহ’ তকমাধারীর সংখ্যাও কম নয়। আলাদা করা যাবে না পুতিন-শি জিনপিংকেও। তারা মানুষ দেখেন না, শুধু সম্পদ দেখেন। হোক সেটা বালুচিস্তান, ভেনিজুয়েলা কিংবা মিয়ানমার– চিত্র সর্বত্রই অভিন্ন! সম্পদ লুণ্ঠনের এই যে নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা তার শিকার হচ্ছে প্রান্তিক মানুষ। সেটা বালুচ কিংবা রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনি পশ্চিমা দুনিয়ার বিপন্ন অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও কোনো অংশে কম সত্য নয়। তথাকথিত এ রাজাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জরুরি। তবে তার চেয়েও জরুরি হলো রাজাদেরও ছাপিয়ে অন্যায্য যে-ব্যবস্থা সিন্দবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসে আছে কয়েকশ কোটি মানুষের ঘাড়ে, তাকে ছুড়ে ফেলা। নির্বাচিত-অনির্বাচিত নির্বিশেষে ‘রাজা’রা আসলে পৃথক কোনো সত্তা নয়, চরম অমানবিক যে-ব্যবস্থা কোটি কোটি মানুষকে নানা কৌশলে ক্রমাগত যুদ্ধ, হানাহানি, ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও বঞ্চনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে তারই প্রতিচ্ছবি মাত্র। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটি বাঁধবে কে?
কাজটি সহজ নয়। পথও কণ্টকাকীর্ণ। ওত পেতে আছে ঠগি-বর্গির দল। তারপরও পৃথিবী এখনো আশায় বুক বেঁধে আছে সেই শিশুটির জন্য যে বলবে ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’ (উলঙ্গ রাজা/নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।)

