পড়শী খেলা খেলা ১৭৫ নম্বরের আয়নায় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন

১৭৫ নম্বরের আয়নায় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন

Post Views: 124
13 min read

ক্রীড়াঙ্গনের ব্যর্থতা সাধারণত স্কোরবোর্ডে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একটি ম্যাচ হারা, একটি টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়া কিংবা কোনো গেমসে পদক না পাওয়া, এসব দিয়ে আপাতভাবে একটি দেশের খেলাধুলার হালহকিকত বোঝার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা আসলে কেমন, তা কোনো একটি ম্যাচ, কোনো একটি দল কিংবা কোনো একটি গেমসের পদক দিয়ে পুরোপুরিভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয় না।

২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্রীড়া র‌্যাংকিং অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস র‍্যাংকিং (ডব্লিউএসআর)-এ বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। ২০২টি দেশের মধ্যে ৩ হাজার ৪৩৮ পয়েন্ট নিয়ে এই অবস্থান। গত বছর অবস্থান ছিল ১২৭তম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পতন ৪৮ ধাপ। দক্ষিণ এশিয়াতেও বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। ভারত ৪৬, পাকিস্তান ৮৯, নেপাল ১১৩, শ্রীলংকা ১২৬, মালদ্বীপ ১৩৬ ও ভুটান ১৬৪। সংখ্যাগুলো তাই কেবল একটি র‌্যাংকিংয়ের হিসাব নয়, এ দেশের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার সামনে রাখা একটি প্রতিবিম্ব। তাতে প্রতিফলিত হয় সার্বিক সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি।

বৈশ্বিক ক্রীড়া র‌্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য কে কতটি পদক পেলো, তা গণনা করা নয়। ডব্লিউএসআর আর ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকিং অফ কান্ট্রিজ ইন এলিট স্পোর্ট’ (ডব্লিউআরসিইএস) বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন খেলায় আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্সকে একটি সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করে। এতে অলিম্পিকের পাশাপাশি নন-অলিম্পিক খেলাও অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং খেলাভেদে জনপ্রিয়তা ও বৈশ্বিক বিস্তারের মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে র‌্যাংকিং নির্ধারণ করা হয়।

এ কারণে বাংলাদেশের অবস্থানকে নির্দিষ্ট কোনো খেলার পারফরম্যান্স দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ক্রিকেট দেশের সবচেয়ে সংগঠিত, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত খেলা। অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক ক্রীড়া কাঠামোর সঙ্গে ক্রিকেটকে পুরোপুরিভাবে এক করে দেখার সুযোগ নেই। ক্রিকেট দলের ভালো করার অর্থ এই নয় যে, দেশের সার্বিক ক্রীড়াঙ্গনও একই মাত্রায় ভালো। ক্রিকেট দল কেমন করছে, ফুটবল দল কত নম্বরে আছে কিংবা কোনো একজন অ্যাথলেট পদক পেলেন কি না, এসবের কোনোটিতেই পুরো দৃশ্যপট ফুটে উঠে না।

বিষয়টি হচ্ছে, একটি দেশ কতগুলো প্রতিযোগিতামূলক খেলায় নিয়মিত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশ নিচ্ছে এবং কতগুলো খেলায় সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি করছে, সামগ্রিকভাবে সেটাই বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের দুর্বলতা। র‌্যাংকিংকে অবশ্যই চূড়ান্ত বা একমাত্র মূল্যায়ন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বিভিন্ন র‌্যাংকিংয়ের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, একটি আন্তর্জাতিক সূচকে ১৭৫তম অবস্থান এবং এক বছরে ৪৮ ধাপ পতনকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বরং এটি কেন ঘটলো, সেই প্রশ্নটিই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রধানতম গলদ হলো খেলোয়াড় গড়ে তোলার ব্যবস্থাপনায়। প্রতিভার অভাব আছে, সে কথা বলা যাবে না। বরং বিভিন্ন সময় ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, দাবা, সাঁতার, শুটিং, আর্চারি, ভারোত্তোলন, তায়কোয়ান্দো, বক্সিং, অ্যাথলেটিকস, জিমন্যাস্টিকস, কাবাডি, কারাতে, টেবিল টেনিসসহ নানান খেলায় প্রতিভাবান খেলোয়াড় পাওয়া গেছে।

কিন্তু প্রতিভা পাওয়া আর প্রতিভা তৈরি করার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। একজন প্রতিভাবান কিশোর বা কিশোরীকে খুঁজে বের করলেই হবে না, তাকে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, যথাযথ কোচ, নিয়মিত প্রতিযোগিতা, পুষ্টি, চিকিৎসা, ফিটনেস, মানসিক প্রস্তুতি, আধুনিক সরঞ্জাম, পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। এই পুরো পরিক্রমাই ক্রীড়াবিদ গড়ে তোলার একটি পথরেখা। এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এই পথরেখাটি এখনো সুসংগঠিত নয়। প্রতিভা শনাক্তকরণ থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সিঁড়ি থাকে, সেই সিঁড়ির অনেকগুলো ধাপই দুর্বল, বিচ্ছিন্ন অথবা অনিয়মিত।

বাংলাদেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। দর্শক, স্পনসর, সম্প্রচারস্বত্ব, সংবাদমাধ্যম -সব ক্ষেত্রেই ক্রিকেট অন্য খেলাগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে। সমস্যা হচ্ছে, ক্রিকেটের জন্য তৈরি অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে অন্য খেলাগুলোর কোনো কার্যকর সংযোগ তৈরি হয় না। অথচ একটি শক্তিশালী ক্রিকেট ব্যবস্থাপনা ক্রীড়া অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

কিন্তু সেই অর্থনীতি যদি অন্য খেলাগুলোর অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া বিজ্ঞান কিংবা প্রতিভা উন্নয়নে কোনো উল্লেখযোগ্য বহুমুখী প্রভাব না ফেলে, তাহলে জাতীয় ক্রীড়ার সামগ্রিক শক্তি বাড়ে না। ক্রিকেটের জন্য কোচ, ফিজিও, ট্রেনার, ভিডিও অ্যানালিস্ট, পুষ্টিবিদ, ডেটা অ্যানালিস্ট -একটি পূর্ণাঙ্গ পেশাদার সহায়ক কাঠামো গড়ে ওঠেছে। কিন্তু অধিকাংশ খেলায় এ ধরনের সহায়তা এখনও সীমিত। ফলে ক্রিকেট একটি আলাদা দ্বীপের মতো। জাতীয় ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সেই দ্বীপের সংযোগ যতটা হওয়া দরকার, ততটা হয়নি।

একসময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারেনি। ফুটবলে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দীর্ঘমেয়াদি বয়সভিত্তিক কাঠামোর অভাব। সাফল্যের জন্য শুধু জাতীয় দল নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। নিয়মিত বিভিন্ন বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, কোচিং ও খেলোয়াড় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। বয়সভিত্তিক ফুটবল কখনো হয়, কখনো বন্ধ হয়। আবার কখনো প্রকল্পভিত্তিকভাবে চালু হয়েছে। এভাবে কি এগিয়ে যাওয়া যায়?

নারী ফুটবলে সাম্প্রতিক সাফল্য অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মেয়েদের ফুটবলে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতা ও একটি স্পষ্ট পথরেখা তৈরি হলে আঞ্চলিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করার সুযোগ রয়েছে। নারী দল দুইবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এবং এএফসি নারী এশিয়ান কাপে জায়গা করে নিয়েছে। অর্থাৎ সুযোগ, কাঠামো ও লক্ষ্য এক জায়গায় মিললে সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

অনেক ক্রীড়া ফেডারেশনের কার্যক্রম মূলত প্রতিযোগিতা আয়োজন, দল নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক সফরকে ঘিরে আবর্তিত হয়। কিন্তু একটি আধুনিক ক্রীড়া ফেডারেশনের দায়িত্ব এর চেয়ে অনেক বেশি। একটি ফেডারেশনের অধীনে কতজন শিশু-কিশোর খেলছে, কতজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, জেলা পর্যায়ে কতজন প্রতিভাবান খেলোয়াড় শনাক্ত হয়েছে, কোন বয়সে তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, কতজন কোচ আন্তর্জাতিক মানের, গত বিগত বছরগুলোতে কোন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স কতটা উন্নত হয়েছে, কেন একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড় দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে, কোন কোন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে খেলোয়াড়ের উন্নতি হবে, এই বিষয়ে তথ্যভিত্তিক একটি জাতীয় ক্রীড়া ডাটাবেস থাকা প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও এ নিয়ে কারও কোনো হেলদোল নেই।

ফেডারেশনের সাফল্য শুধু বছরে কতটি টুর্নামেন্ট আয়োজন হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং কতজন আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হলো, আন্তর্জাতিক আসরে কী সাফল্য এলো, সেটি হওয়া উচিত বড় সূচক। প্রয়োজনীয় ক্রীড়া অবকাঠামোর সংকট আছে। কিন্তু যে সব অবকাঠামো আছে, সেগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা কোথায়? কেবল নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ করলেই খেলাধুলার উন্নয়ন হবে না।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্মিত অনেক মাঠ ও স্টেডিয়ামের পূর্ণ ব্যবহার হয় না। কোথাও নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেই, কোথাও আন্তর্জাতিক মানের সরঞ্জাম নেই, কোথাও রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা, কোথাও আবার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় অবকাঠামো থাকলেও খেলোয়াড় তৈরির কাজে তা ব্যবহার হচ্ছে না। অবকাঠামো যা আছে, সেগুলোকে কীভাবে বছরভর কাজে লাগানো যায়, সে ক্ষেত্রে মনোযোগী হওয়া দরকার।

ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায়ে আঞ্চলিক ক্রীড়া উন্নয়নকেন্দ্র তৈরি করা গেলে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। প্রতিটি বিভাগে কয়েকটি নির্দিষ্ট খেলাকে কেন্দ্র করে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। একটি জেলার মাঠ শুধু টুর্নামেন্টের সময় নয়, প্রতিদিন সকাল-বিকেল শিশু-কিশোরদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকাটা অত্যাবশ্যক।

বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) এককভাবে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে বদলাতে পারবে না। এই প্রতিষ্ঠানে যে খেলোয়াড় তৈরি হয়, তাদের বাইরে হাজার হাজার প্রতিভাবান শিশু-কিশোর রয়েছে। তাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব শুধু বিকেএসপি’র নয়। স্কুল, জেলা ক্রীড়া সংস্থা, স্থানীয় ক্লাব, ফেডারেশন, একাডেমি ও জাতীয় ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান, সবাইকে একই ব্যবস্থার অংশ হতে হবে। ধরা যাক, কোনো জেলা শহরে অল্প বয়সী একজন অসাধারণ অ্যাথলেট পাওয়া গেলো। তাকে সংশ্লিষ্ট জেলাতেই যদি আধুনিক প্রশিক্ষণ, পুষ্টি, ফিটনেস, কোচিং ও প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে খেলোয়াড়টি নিজের পরিবেশে থেকে বড় হতে পারবে।

ক্রীড়ার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে স্কুল পর্যায়ে। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে শিশু-কিশোর আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কে কোন খেলায় সম্ভাবনাময়, তা নিয়মিতভাবে শনাক্ত করার ব্যবস্থা দুর্বল। একসময় স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল প্রতিভা খোঁজার বড় জায়গা। এখন সেটিকে আরও আধুনিক করা দরকার। প্রতিটি স্কুলে কেবল বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বছরজুড়ে নির্দিষ্ট খেলায় প্রতিযোগিতা থাকা প্রয়োজন।

উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে বিভাগ, বিভাগ থেকে জাতীয় পর্যায়, একটি সুস্পষ্ট প্রতিযোগিতা কাঠামো থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিও ব্যবহার করা যায়। একজন খেলোয়াড়ের বয়স, উচ্চতা, গতি, শক্তি, সহনশীলতা, দক্ষতা, প্রতিযোগিতার ফল, সবকিছু ডিজিটাল ডাটাবেসে রাখা হলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দেরকে নিয়ে পরিকল্পনা করা সহজ হয়।

ক্রীড়ায় এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোতে খেলোয়াড় শুধু মাঠে প্রশিক্ষণ নেয় না। তাঁর শরীর, খাবার, ঘুম, মানসিক প্রস্তুতি, চোট, পুনর্বাসন ও পারফরম্যান্সের প্রতিটি বিষয় নিয়ে কাজ করা হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ খেলায় এটা তেমন একটা অনুসরণ করা হয় না। একজন খেলোয়াড়কে দিনে কত ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নিতে হবে, এটি কোচের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে পারে, কিন্তু আধুনিক ব্যবস্থায় ডেটাও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ হয়ে ওঠেছে।

কোন ধরনের ব্যায়ামে খেলোয়াড়ের গতি বাড়ছে, কোথায় আহত হওয়ার ঝুঁকি বেশি, তার খাদ্যতালিকা কেমন হবে, কখন রিকভারি (শারীরিক পুনরুদ্ধার) প্রয়োজন, এসবের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা দরকার। ফিজিওথেরাপিস্ট, স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচ, পুষ্টিবিদ, ক্রীড়া মনস্তত্ত্ববিদ ও পারফরম্যান্স বিশ্লেষক, এ সব কোনো বিলাসিতা নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রে এগুলো অত্যন্ত স্বাভাবিক ও আবশ্যক অংশ। বাংলাদেশ যদি এগিয়ে যেতে চায়, তাহলে ক্রীড়া বিজ্ঞানকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

একজন তরুণ খেলোয়াড় কেন খেলবে? যদি তার সামনে থাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, সীমিত আয়, চাকরির নিশ্চয়তার অভাব ও চোট পেলে চিকিৎসার অনিশ্চয়তা, তাহলে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় একটি পর্যায়ে এসে খেলা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাবে। প্রতিনিয়তই যাচ্ছে। তাই ক্রীড়াবিদদের কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক। জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের জন্য ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা, বিমা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা থাকা উচিত। ক্রীড়া জীবন শেষ হওয়ার পরও খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা থাকাটা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের অনেক খেলোয়াড় কালেভদ্রে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। অথচ আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি করতে নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রয়োজন। শুধু বড় আসরে গিয়ে পদক প্রত্যাশা করা অনেকটা পরীক্ষার আগে বই খুলে ভালো ফল করার চেষ্টা করার মতো। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাই হলো প্রস্তুতির পরীক্ষাগার। সেই পরীক্ষাগারে বাংলাদেশ অবস্থান মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।

র‌্যাংকিংয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে থাকার অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি খেলায় এসব দেশ বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। বরং সামগ্রিক ক্রীড়া কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্সের যোগফলেই এই পার্থক্য তৈরি হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোথায় কতটা পিছিয়ে আছে, তা খেলা ধরে ধরে বিশ্লেষণ করা। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের পক্ষে সব খেলাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। আবার শুধু জনপ্রিয় খেলার পেছনে সব অর্থ ব্যয় করাও যুক্তিসঙ্গত নয়।

কিছু খেলায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে। কিছু খেলায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ বেশি। কিছু খেলায় তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব। আবার কিছু খেলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই শ্রেণিবিন্যাসটি আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে করতে হয়।একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রতি তিন, চার কিংবা পাঁচ বছর পরপর জাতীয় ক্রীড়ানীতিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে। আসলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া পরিবর্তন হবে না। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধারাবাহিকতা।

র‌্যাংকিংয়ে ১৭৫তম অবস্থান থেকে উপরে উঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজ। কিন্তু সেটি অর্জনের জন্য কতজন খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে, কতটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র কার্যকর করতে হবে, কতজন কোচকে আন্তর্জাতিক মানে নিতে হবে, কতটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় খেলতে হবে, সেই হিসাবটাই আসল। একটি ভালো ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা তৈরি হলে র‌্যাংকিং আপনা-আপনি বদলাবে। কিন্তু সেটা বদলানোর জন্য তেমন ব্যবস্থাপনা কবে গড়ে ওঠবে?

১ অক্টোবর, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

ক্রীড়ালেখক ও ক্রীড়াবিষয়ক গবেষক। সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন বিষয়ে লেখার প্রতি ঝোঁক রয়েছে। কয়েকটি গ্রন্থের প্রণেতা।


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।