এই অক্টোবর মাসে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে। বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রতিভাদীপ্ত মানুষকে সম্মানিত করা হয় নোবেল পুরস্কার প্রদান করে, সেই ১৯০১ সাল থেকে। বস্তুত আলফ্রেড নোবেল, যিনি একাধারে একজন বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক, ব্যবসায়ী ছিলেন, লিখেছেন কিছু কবিতা এবং নাটকও, তিনিই এই পুরস্কারটি প্রবর্তন করেন ১৮৯৫ সালে তাঁর স্বাক্ষরিত এক উইল-এর মাধ্যমে। পরের বছর ডিসেম্বর মাসে তিনি লোকান্তরিত হন কিন্তু তাঁর উইল অনুযায়ী এই নোবেল পুরস্কারের প্রথা অব্যাহত থাকে।
সাধারণত প্রতিবছর অক্টোবর মাসে এই নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয় এবং ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিক ভাবে পুরস্কারটি বিজয়ীদের দেয়া হয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা শাস্ত্র, সাহিত্য ও শান্তি স্থাপনে সর্বাপেক্ষা অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য এই নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
তবে পরিহাসের বিষয় হচ্ছে এই যে আলফ্রেড নোবেল, যিনি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার চালু করতে বলে গিয়েছিলেন, সেই ব্যক্তি ডিনামাইটসহ একাধিক বিস্ফোরক দ্রব্য আবিষ্কার করে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে আলফ্রেড নোবেল একজন বহুমুখী প্রতিভা ছিলেন তাঁর জন্ম যদিও সুইডেনে, তিনি তাঁর কৈশোর ও যৌবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছেন রাশিয়ায় ও ফ্রান্সে। তিনি তাঁর চিন্তার বিকাশের জন্য একাকিত্ব পছন্দ করতেন। সাহিত্যের প্রতি, বিশেষথ ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হয়েছেন। ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগের কবি বাইরন এবং শেলী তাঁর লেখনীতে প্রভাব ফেলেছেন। বিশেষত শেলীর মতোই জীবনের প্রতি তাঁর আদর্শ কাজ করেছে, একদিকে তিনি ছিলেন প্রচুর আদর্শবাদী, শান্তিকামী এবং আবার কখনও কখনও চরমপন্থি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে আলফ্রেড তাঁর আত্মজীবনীর প্রথম পর্বটি চমৎকার ইংরেজিতে লেখেন। তিনি জীবন, ঈশ্বর ও অনন্তকাল নিয়ে ভেবেছেন এবং তাঁর একাকিত্বকে সৃজনশীল করে তুলেছেন।
তবে এই লেখাটি আলফ্রেড নোবেলকে নিয়ে নয়, যে নোবেল পুরস্কার তিনি প্রবর্তন করেন সেই সর্বোচ্চ সম্মানের পুরস্কার যাঁরা পেয়েছেন কিংবা পাচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে। নিঃসন্দেহেই গত ১২৫ বছরে বিশ্ব জুড়ে অনেক যোগ্য ব্যক্তি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন এবং আগামিতেও পাবেন। তবে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত সকলেই যে বিতর্কের ঊর্ধ্বে তা নয়, বিশেষত শান্তির জন্য যাঁরা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাঁদের কেউ কেউ প্রচন্ড ভাবে বিতর্কিত। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার যিনি ১৯৭৩ সালে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পান। সমালোচকরা বলেন কিসিঞ্জিারের এই পুরস্কার পাওয়া শান্তির জন্য নয়, বস্তুত যুদ্ধের জন্যই; যদিও ভিয়েৎনাম যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, ১৯৭৫ সালে সায়গনের পতনের আগে পর্যন্ত যুদ্ধ চলছিলো। সম্ভবত পাকিস্তানের মাধ্যমে চীনে তাঁর গোপন সফর এবং পরবর্তীতে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপনের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়ে থাকতে পারেন কিন্তু তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে সে কথা কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। এখানে আরও একটি কথা উল্লেখযোগ্য যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সহায়তায় কিসিঞ্জার যখন চীনে যান, তখন কিন্তু খোদ পাকিস্তান বাংলাদেশে নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছিল। গণহত্যকারী কোন রাষ্ট্রের সহায়তায় যে শান্তি স্থাপন করা যায় না সেটা বলাই বাহুল্য।
১৯৯৪ সালে ইসরায়েলের ইৎজাক রাবিন ও শিমন পেরেজের সঙ্গে ইয়াসের আরাফাতকে যে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়, সেটিও বিতর্কাতীত নয়। তখন অসলো চুক্তির কারণে এই নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল বটে কিন্তু আজ অবধি সেই অঞ্চলে কোন রকম শান্তি আসেনি আর তাই সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকেই যায় যে এই নোবেল শান্তি পুরস্কার কি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণীত পুরস্কারের রূপ ধারণ করছে।
আমরা এখন শুনছি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও চাইছেন যে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হোক। জানা যায় তিনি ইতোমধ্যেই ক্যাম্বোডিয়া, ইসরায়েল এবং পাকিস্তানের কাছ থেকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাবার এই তোড়জোড়েরও যে একটি রাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে সে কথা বলাই বাহুল্য। এমনকী বারাক ওবামাকেও ২০০৯ সালে যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় এমন এক সময়ে যখন তিনি তাঁর প্রেসিডেন্ট পদের মেয়াদ কেবলমাত্র শুরু করেছিলেন, কোন রকম শান্তির প্রয়াসও নেননি, তখন তাঁর এই নোবেল পুরস্কার পাওয়া কতখানি যুক্তিসঙ্গত সে জিজ্ঞাসাও রয়েছে অনেকের মনে।
নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে এখনকার সময়ে বাংলাদেশে সবচাইতে বিতর্কিত ব্যক্তি হচ্ছেন ২০০৬ সালে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তি ড. মুহাম্মদ ইউনুস। ড. ইউনুস প্রতিষ্ঠিত গ্রামী ব্যাংক এবং তিনি নিজে মাক্রোক্রেডিটের ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের জন্য এই নোবেল পুরস্কার পান। বাংলাদেশের মানুষও তাঁর এই নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় প্রথমদিকে স্বভাবতই গর্ব বোধ করেছিল কিন্তু নোবেল পুরস্কার পাওয়ার এক বছর পর ২০০৭ সালেই তিনি তাঁর রাজনৈতিক অভিলাষ ব্যক্ত করায় তাঁর এই নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তির কথিত গৌরব ক্রমশই ধূলিষ্মাৎ হতে থাকে। গরীবের ব্যাঙ্ক বলে পরিচিত এই গ্রামীন ব্যাংক যে পরিমাণ সুদ আদায় করে সেটা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে বিস্তর। ক্লিন্টন ফাউন্ডেশানে ড. ইউনুসের আর্থিক অনুদানের কথাও আমরা শুনতে পাই। নরওয়ের নোবেল কমিটির কাছে ক্লিন্টন ব্যক্তিগতভাবে এ রকম তদবির করেন যেন ইউনুসকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের অবসানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুস যখন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন থেকে তিনি সমালোচনার কেন্দ্রস্থলে চলে আসেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর বিরোধীতা ছিল কারণ শেখ হাসিনা বুঝেছিলেন যে নোবেল পুরস্কার পেয়েও ইউনুস তৃপ্ত নন, তিনি রাজনীতির ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী, বিষয়টি প্রমাণিত হয় আরও পরে যখন তিনি বাংলাদেশের তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হন। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর বিরোধীতাটাই বড় কথা নয়, তিনি বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে বস্তুত অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর আমলে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি যা পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্সে উস্কানী দিয়ে অশান্তির চরম অবস্থানে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন যে ড. ইউনুস এবং যাঁর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়াটা প্রশ্নাতীত নয় আদৌ।
আমাদের উপমহাদেশের জন্য গৌরবের কথা এটা যে এখানে বেশ কিছু ব্যক্তি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যাঁরা সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে, যাঁদের প্রতিভা অপরিসীম। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি কেবল প্রথম ভারতীয়ই নন, প্রথম এশিয়ান যিনি নোবেল পুরস্কার পান। তা ছাড়া পদার্থ বিদ্যায় ১৯৩০ সালে সি ভি রামান, ১৯৭৯ সালে পদার্থ বিদ্যায় অধ্যাপক আব্দুস সালাম এবং একই বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান মাদার টেরেসা। ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন অমর্ত্য সেন। তা ছাড়া আরও অনেকেই নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যাঁরা বিতর্কিত নন।
পরবর্তীতে মরণোত্তর নোবেল পুরস্কারের প্রথা চালু হ’লে আরও অনেকেই নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সেটিও সম্পূর্ণ বিতর্কাতীত নয়। মহাত্মা গান্ধী যিনি শান্তির কথা বলেছেন বার বার, হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ থামানোর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন; তাঁকে কেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলো না, সে প্রশ্নও উঠতে পারে। তা হ’লে কি তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন ভারতে, সে জন্যেই তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়নি। আসলে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি যেমন সম্মানের বিষয়, তেমনি এই পুরস্কারই যে শুধু সম্মান বয়ে নিয়ে আসে তাতো নয়। এই বিশ্বে মহাত্মা গান্ধীর মতো এমন অনেক ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁরা হয়ত কোন পুরস্কারই পাননি কিন্তু নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাঁদের অবদানও অবজ্ঞা করার মতো নয়। তবু সকলেই চাইবেন যে বিশ্বখ্যাত এই নোবেল পুরস্কার থাকুক সকল বিতর্ক ও বিভাজনের ঊর্ধ্বে।

