১. নোবেলের মঞ্চে বাঙালি
এশিয়ার নোবেলজয়ীদের কথা বলার শুরুতেই আমরা প্রথমেই স্বজাতির দিকে তাকাব। মানে এই বাংলা ও বাঙালির দিকে। কেননা নোবেলের ইতিহাসে এশিয়ার প্রথম যে মানুষটি এই সম্মান অর্জন করেছিলেন, তিনি একজন বাঙালি— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে যে যাত্রার শুরু, তার একশ বছরেরও বেশি সময় পরও নোবেলের মঞ্চে বাঙালির পদচিহ্ন অমলিন। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির আত্মপরিচয়ের অহংকারকে বিস্তৃতি দিয়েছে। বাঙালির ভাষা ও সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ বাঙালিকে দিয়েছে এক অমূল্য জীবন–দর্শণ।
রবীন্দ্রনাথের পর দীর্ঘ বিরতি। তারপর অর্থনীতির জটিল তত্ত্বকে মানুষের জীবন, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত করে ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন অমর্ত্য সেন। তাঁর জন্ম শান্তিনিকেতনে, আর তাঁর পারিবারিক শিকড় ঢাকায়। নোবেল কমিটির ভাষায়, তাঁর গবেষণার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও মানুষের কল্যাণের প্রশ্ন।
এরপর ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পেলেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সন্তান মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক। দরিদ্র মানুষের কাছে ক্ষুদ্রঋণ পৌঁছে দিয়ে নিচ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের যে ধারণা তিনি বাস্তবায়ন করেছিলেন, নোবেল কমিটি তারই স্বীকৃতি দিয়েছিল। অর্থাৎ বাঙালির নোবেলযাত্রায় এবার যুক্ত হলো দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই ও শান্তির এক নতুন ভাষা।
আর সর্বশেষ, ২০১৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়— এস্তার দুফলো ও মাইকেল ক্রেমারের সঙ্গে যৌথভাবে। মুম্বাইয়ে জন্ম নেওয়া অভিজিৎ কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছেন, তাঁর বাবা ছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক। বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য কমানোর কার্যকর পদ্ধতি খুঁজতে পরীক্ষামূলক গবেষণার নতুন পদ্ধতি গড়ে তোলার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁরা এই পুরস্কার পান।
চারটি নাম, চারটি সময়, তিনটি ভিন্ন ক্ষেত্র— সাহিত্য, অর্থনীতি ও শান্তি। কিন্তু তাঁদের সবার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে বাংলা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক পরিসর। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্য দিয়ে যে দরজা খুলেছিল, অমর্ত্য সেনের চিন্তা, মুহাম্মদ ইউনূসের সামাজিক উদ্যোগ এবং অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দারিদ্র্যবিষয়ক গবেষণা সেই দরজাকে আরও বিস্তৃত করেছে।
নোবেলের দীর্ঘ ইতিহাসে এশিয়ার অবদান অবশ্যই বাঙালির চেয়ে অনেক বড়। চীন, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, তুরস্কসহ এশিয়ার বহু দেশ থেকে বিজ্ঞান, সাহিত্য, অর্থনীতি, শান্তি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নোবেলজয়ীরা এসেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা, তাঁদের সময় আলাদা, তাঁদের কাজের ক্ষেত্রও আলাদা। কিন্তু এশিয়ার সেই দীর্ঘ নোবেল-ইতিহাসের প্রথম পাতাতেই যে নামটি লেখা আছে, সেটি একজন বাঙালির— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
২. এশিয়ার নোবেলযাত্রা
বাংলার পর এশিয়ার নোবেলযাত্রার দিকে তাকালে প্রথমেই যে দেশটির কথা মনে আসে, সেটি জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর যে দেশটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে অসাধারণ উত্থান ঘটিয়েছিল, নোবেলের মঞ্চেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। ১৯৪৯ সালে জাপানের হিদেকি ইউকাওয়া পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান। পারমাণবিক শক্তির তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় মেসনের অস্তিত্বের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাঁর সেই পূর্বাভাস পরীক্ষায় সত্য প্রমাণিত হয়।
জাপানের নোবেল ইতিহাস শুধু বিজ্ঞানের নয়, সাহিত্যেরও। ১৯৬৮ সালে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা সাহিত্যে নোবেল পান। তাঁর লেখায় জাপানি মনন, সৌন্দর্যবোধ ও প্রকৃতির প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা ফুটে উঠেছে। এরপর ১৯৯৪ সালে কেনজাবুরো ওয়ে সাহিত্যে নোবেল পান। তাঁর লেখায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক ধ্বংস এবং মানুষের নৈতিক সংকট বারবার ফিরে এসেছে।
বিজ্ঞানের অগ্রগতিতেও জাপানের অবদান অপরিসীম। ২০০৮ সালে ইয়োইচিরো নাম্বু, মাকোতো কোবায়াশি ও তোশিহিদে মাসকাওয়া পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান। ২০১২ সালে শিনিয়া ইয়ামানাকা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান পরিণত কোষকে পুনরায় বহুমুখী কোষে রূপান্তরের পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য। আর ২০২৫ সালে জাপানের সুসুমু কিতাগাওয়া রসায়নে নোবেল পান ধাতু-জৈব কাঠামো বা Metal–Organic Frameworks-এর উন্নয়নে অবদানের জন্য।
জাপানের পর যে নামটি অনিবার্যভাবে চলে আসে সেটি হলো চীন। এই দেশের বহুমাত্রিক। ১৯৫৭ সালে চীনে জন্ম নেওয়া পদার্থবিজ্ঞানী স্যুং-দাও লি, চেন-নিং ইয়াংয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান। তাঁরা দুর্বল পারমাণবিক ক্রিয়ায় parity বা সমতার সূত্র ভঙ্গ হওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাজ করেছিলেন। পরে চীনা সাহিত্যের শক্তিশালী উপস্থিতি দেখা যায় গাও শিংজিয়েন ও মো ইয়ানের মাধ্যমে। গাও শিংজিয়েন ২০০০ সালে সাহিত্যে নোবেল পান আর মো ইয়ান ২০১২ সালে নোবেল পান তাঁর কল্পনাপ্রবণ বাস্তববাদী সাহিত্যভঙ্গির জন্য।
চীনের বিজ্ঞানচর্চায় আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাম তু ইউইউ। ২০১৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া এই বিজ্ঞানী ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় কার্যকর আর্টেমিসিনিন আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ঐতিহ্যবাহী চীনা ভেষজ চিকিৎসার জ্ঞান থেকে গবেষণার সূত্র নিয়ে তিনি এমন একটি ওষুধ আবিষ্কার করেন, যা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারতের নোবেল ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। এরপর ১৯৩০ সালে সি. ভি. রমন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান। আলোর বিচ্ছুরণ নিয়ে তাঁর গবেষণা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘রমন এফেক্ট’ নামে স্থায়ী হয়ে আছে। ভারতীয় মাটিতে গবেষণা করে নোবেল পাওয়ার কারণে তাঁর অর্জন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ভারতের নোবেল-তালিকায় আরও কয়েকটি নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাদার তেরেসা ১৯৭৯ সালে শান্তিতে নোবেল পান মানবদুঃখ লাঘবে তাঁর কাজের জন্য। হর গোবিন্দ খোরানা— যিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রায়পুরে জন্মেছিলেন—১৯৬৮ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান জেনেটিক কোড ও প্রোটিন সংশ্লেষণ বিষয়ে গবেষণার জন্য। আর ১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পান কল্যাণ অর্থনীতিতে তাঁর অবদানের জন্য।
ভারতের নোবেলযাত্রার একটি মানবিক অধ্যায় নতুন করে উজ্জ্বল হয় ২০১৪ সালে। একই সঙ্গে ভারতের কৈলাশ সত্যার্থী এবং পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই শান্তিতে নোবেল পান— শিশু ও তরুণদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং প্রত্যেক শিশুর শিক্ষার অধিকারের পক্ষে তাঁদের সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে।
পাকিস্তানের নোবেল ইতিহাসে অবশ্য তার আগেই একজন অসামান্য বিজ্ঞানীর নাম লেখা হয়ে গেছে। ১৯৭৯ সালে আবদুস সালাম পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান। তিনি দুর্বল ও তড়িৎচুম্বকীয় পারমাণবিক বলকে একটি তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে একীভূত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ঝাং মাগিয়ানা অঞ্চলে, যা বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত।
এরপর মালালা। পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকার এক কিশোরী, যে মেয়েদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলেছিল, তালেবানের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিল, কিন্তু থেমে যায়নি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০১৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়ে মালালা হয়ে ওঠে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ী। তার কণ্ঠে একটি মেয়ের শিক্ষার দাবি পরিণত হয় বিশ্বের কোটি কোটি শিশুর অধিকারের দাবিতে।
ইরানের নোবেল ইতিহাস আরও এক অর্থে গুরুত্বপূর্ণ— এখানে নোবেল এসেছে নাগরিক অধিকার ও নারীর স্বাধীনতার সংগ্রামের স্বীকৃতি হয়ে। ২০০৩ সালে শিরিন এবাদি শান্তিতে নোবেল পান গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য তাঁর সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ; বিশেষভাবে তিনি নারী ও শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন।
দুই দশক পর ২০২৩ সালে একই দেশ থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন নার্গিস মোহাম্মাদি। তাঁর লড়াই ছিল ইরানে নারীর ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং মানবাধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে। কারাগারে থেকেও তাঁর সংগ্রাম থামেনি। শিরিন এবাদির পর নার্গিস মোহাম্মাদি হয়ে উঠলেন ইরানের দ্বিতীয় নোবেল শান্তিজয়ী।
তুরস্কের নোবেল ইতিহাস তুলনামূলকভাবে ছোট, কিন্তু সাহিত্যে তার উপস্থিতি গভীর। ২০০৬ সালে ইস্তাম্বুলের সন্তান ওরহান পামুক সাহিত্যে নোবেল পান। তাঁর লেখায় পূর্ব ও পশ্চিমের মূল্যবোধ, পরিচয়ের সংকট এবং নিজের শহর ইস্তাম্বুলের ইতিহাস ও বিষণ্ন আত্মার অনুসন্ধান বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এশিয়ার নোবেল মানচিত্র অবশ্য এই কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও নোবেলের আলো পৌঁছেছে। মিয়ানমারের অং সান সু চি ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য অহিংস সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে শান্তিতে নোবেল পান। ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসা ২০২১ সালে রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পান— স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামের স্বীকৃতিতে।
দক্ষিণ এশিয়ার আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া আবদুস সালাম, ভারতের জন্মভূমি থেকে উঠে আসা রমন ও খোরানা, বাংলাদেশের ইউনূস, ভারতের অমর্ত্য সেন ও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, পাকিস্তানের মালালা—তাঁদের কাজের ক্ষেত্র এক নয়। কেউ বিজ্ঞানী, কেউ অর্থনীতিবিদ, কেউ মানবাধিকারকর্মী। কিন্তু তাঁদের সাফল্যের ভেতর দিয়ে একটি বড় সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে— এশিয়ার নোবেলযাত্রা কেবল পুরস্কারের ইতিহাস নয়,এটি এশিয়ার মানুষের জ্ঞান, সৃজনশীলতা, মানবিকতা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার স্বপ্নের ইতিহাস।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে ইউকাওয়ার মেসন, রমনের আলোর বিচ্ছুরণ থেকে তু ইউইউর ম্যালেরিয়ার ওষুধ, কাওয়াবাতার সাহিত্য থেকে পামুকের ইস্তাম্বুল, আর শিরিন এবাদি থেকে মালালা ও নার্গিস মোহাম্মাদির অধিকার-সংগ্রাম— নোবেলের মঞ্চে এশিয়া যেন বারবার নিজের বহুরূপী মুখটি পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছে।
৩. নোবেলের আলোয় এশিয়া
এশিয়ার নোবেল মানচিত্রে আরও কয়েকটি দেশ আছে, যাদের নাম আলাদাভাবে স্মরণ করা প্রয়োজন। দক্ষিণ কোরিয়ার নোবেল ইতিহাস শুরু হয় রাজনীতি ও শান্তির মধ্য দিয়ে। ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম দে-জুং নোবেল শান্তি পুরস্কার পান দক্ষিণ কোরিয়া ও পূর্ব এশিয়ায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য তাঁর কাজ এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে শান্তি ও পুনর্মিলনের প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ।
দক্ষিণ কোরিয়ার নোবেল-গল্প অবশ্য সেখানেই শেষ নয়। ২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পান হান কাং। তাঁর লেখায় ঐতিহাসিক আঘাত, মানুষের শরীর ও মনের ভঙ্গুরতা এবং সহিংসতার গভীর অভিঘাত উঠে এসেছে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার নোবেলযাত্রায় রাজনীতির পর সাহিত্যও নিজস্ব একটি শক্তিশালী জায়গা করে নেয়।
ভিয়েতনামের গল্পটি আরও ব্যতিক্রমী। ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামের নেতা ও আলোচক লে দুক থো এবং যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি কিসিঞ্জারকে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার জন্য। কিন্তু লে দুক থো পুরস্কার গ্রহণ করেননি। তাঁর যুক্তি ছিল, তখনও ভিয়েতনামে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মিয়ানমারের নোবেল ইতিহাসে অং সান সু চির নাম অনিবার্য। ১৯৯১ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পান গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য তাঁর অহিংস সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ। পুরস্কার ঘোষণার সময় তিনি গৃহবন্দী ছিলেন, তাঁর দুই ছেলে ও পরিবারের সদস্যরা তাঁর হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন।
ফিলিপাইনের নাম নোবেলের ইতিহাসে বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সাংবাদিক মারিয়া রেসার মাধ্যমে। ২০২১ সালে রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পান তিনি। ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতা ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তাঁদের এই স্বীকৃতি। রেসা বিশেষভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও জনমতকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধেও কাজ করেছেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে এই নোবেল আমাদের জন্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ— কারণ সত্য ও স্বাধীন সাংবাদিকতা যে শান্তি ও গণতন্ত্রেরই অন্যতম ভিত্তি, নোবেল কমিটি তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ইসরায়েলের নোবেল ইতিহাস আরও দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। সাহিত্যে শ্মুয়েল ইয়োসেফ আগনন ১৯৬৬ সালে নোবেল পান। শান্তিতে মেনাখেম বেগিন ১৯৭৮ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পান মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার জন্য। বিজ্ঞানেও ইসরায়েলের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে— আভ্রাম হার্শকো, অ্যারন সিশানোভার, আডা ইয়োনাথ, ড্যানিয়েল শেখটম্যান, আরিয়েহ ওয়ারশেল প্রমুখ বিজ্ঞানী নোবেল পেয়েছেন। অর্থনীতিতেও ড্যানিয়েল কানেম্যান ও রবার্ট অমানের মতো নাম রয়েছে।
ফলে এশিয়ার নোবেল মানচিত্রটি দেখলে একটি চমৎকার বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। কোথাও বিজ্ঞান এগিয়ে এসেছে, কোথাও সাহিত্য,কোথাও অর্থনীতি মানুষের দারিদ্র্য ও কল্যাণের প্রশ্নকে সামনে এনেছে, কোথাও নোবেল হয়েছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সংগ্রামের স্বীকৃতি। আবার কোথাও যুদ্ধের মধ্যে শান্তির সন্ধান করতে গিয়ে নোবেলজয়ী নিজেই পুরস্কার গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন।
এই তালিকায় তিব্বতের দালাই লামার কথাও মনে পড়ে। ১৯৮৯ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পান তিব্বতের মুক্তির প্রশ্নে অহিংস সংগ্রাম এবং মানুষের সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির পক্ষে তাঁর অবস্থানের জন্য। তাঁর নোবেল এশিয়ার আধ্যাত্মিক ও মানবিক চিন্তার আরেকটি দরজা খুলে দেয়।
চীনের লিউ শিয়াওবোও এই ইতিহাসের এক বেদনাময় অধ্যায়। ২০১০ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পান চীনে মৌলিক মানবাধিকারের জন্য তাঁর দীর্ঘ ও অহিংস সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার সময় তিনি কারাগারে ছিলেন। নোবেল কমিটির ইতিহাসে তিনি সেই অল্প কয়েকজন শান্তিজয়ীর একজন, যাঁরা পুরস্কার ঘোষণার সময় বন্দী ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত এশিয়ার নোবেল-ইতিহাসের দিকে তাকালে মনে হয়, এই মহাদেশের গল্প আসলে শুধু পুরস্কার পাওয়ার গল্প নয়। এটি মানুষের জানার, সৃষ্টির, প্রশ্ন করার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর গল্প।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে রমনের আলো, ইউকাওয়ার কণিকা থেকে তু ইউইউর ওষুধ, অমর্ত্য সেনের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিয়ে চিন্তা থেকে মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ, হান কাংয়ের ইতিহাসের ক্ষত থেকে ওরহান পামুকের পূর্ব-পশ্চিমের দ্বন্দ্ব— এশিয়া তার নোবেলজয়ীদের মাধ্যমে পৃথিবীকে বারবার নতুন কিছু ভাবতে শিখিয়েছে।
আর শান্তির নোবেলজয়ীদের দিকে তাকালে সেই ছবিটি আরও গভীর হয়। মালালার হাতে বই, শিরিন এবাদির কণ্ঠে মানবাধিকার, নার্গিস মোহাম্মাদির প্রতিবাদ, মারিয়া রেসার সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান, অং সান সু চির অহিংস গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, লে দুক থোর প্রত্যাখ্যান— সব মিলিয়ে নোবেলের মঞ্চে এশিয়া কখনো বিজ্ঞানীর ল্যাবরেটরি, কখনো কবির নিভৃত ঘর, কখনো যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ, আবার কখনো কারাগারের অন্ধকার কক্ষ হয়ে উঠেছে।
নোবেল পুরস্কার তাই এশিয়ার জন্য কেবল বিশ্বস্বীকৃতির একটি পদক নয়। এ যেন এক বিশাল আয়না— যেখানে দেখা যায় এশিয়ার জ্ঞান, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দারিদ্র্য, যুদ্ধ, শান্তি, স্বাধীনতা ও মানুষের মর্যাদার দীর্ঘ সংগ্রামের মুখ।
আর সেই আয়নার প্রথম আলোটি এসেছিল বাংলারই ঘর থেকে— ১৯১৩ সালে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। তারপর সেই আলো ছড়িয়ে গেছে জাপান থেকে ইরান, ভারত থেকে চীন, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান, কোরিয়া থেকে ফিলিপাইন—পুরো এশিয়াজুড়ে। নোবেলের মঞ্চে এশিয়ার এই দীর্ঘ যাত্রা শেষ হয়নি; বরং প্রতিটি নতুন প্রজন্মের হাতে তা নতুন কোনো প্রশ্ন, নতুন কোনো আবিষ্কার কিংবা নতুন কোনো স্বপ্ন হয়ে ফিরে আসছে।


শান্তিতে নোবেল পেলে অশান্তি ভর করে তার দেশে
বদ্দারে ও বদ্দা— অ্যাঁরার শান্তিতে নোবেল আর নঅ লাইবো!
খবর অই-গিয়ে!