পড়শী মূল রচনাবলী নোবেল পুরস্কার দেবার নিয়মাবলী, অর্থমূল্য ও মেডেল

নোবেল পুরস্কার দেবার নিয়মাবলী, অর্থমূল্য ও মেডেল

Post Views: 17
14 min read

নোবেল পুরস্কার হলো সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যা বিজ্ঞান, সাহিত্য, শান্তি ও অর্থনীতিতে অসামান্য মানবিক অর্জনের জন্য প্রতি বছর প্রদান করা হয়।

নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন ও চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠোর, দীর্ঘ এবং গোপনীয় নিয়মের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালের মূল উইলের ওপর ভিত্তি করে নোবেল ফাউন্ডেশন প্রতি বছর এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করে।

নিচে মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচনের ধাপগুলো এবং বিবেচ্য বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. মনোনয়ন প্রক্রিয়া (জানুয়ারি)
  • নিজেকে নিজে মনোনয়ন দেওয়া নিষেধ: কোনো ব্যক্তি কখনোই নোবেল পুরস্কারের জন্য নিজেকে নিজে মনোনীত করতে পারেন না।
  • আমন্ত্রণমূলক মনোনয়ন: নোবেল কমিটি প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩,০০০ যোগ্য ও নির্বাচিত ব্যক্তিদের (যেমন: পূর্বের নোবেল বিজয়ী, নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও সংসদ সদস্য) গোপন ফর্ম বা আমন্ত্রণপত্র পাঠান। কেবল তাদের পাঠানো মনোনয়নই গ্রহণযোগ্য হয়।
  • শান্তি পুরস্কারের ব্যতিক্রম: নোবেল শান্তি পুরস্কারের ক্ষেত্রে কোনো আগাম আমন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না। নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা (যেমন: রাষ্ট্রপ্রধান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি/অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক আদালতের সদস্য) সরাসরি যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারেন।
  • সময়সীমা: প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারির মধ্যে মনোনয়নের আবেদন জমা দিতে হয়।
 
২. যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন (ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর)
  • প্রাথমিক তালিকা: ফেব্রুয়ারি মাসে নোবেল কমিটিগুলো (প্রতিটি শাখায় ৫-১০ জন সদস্য থাকে) সমস্ত বৈধ মনোনয়ন সংগ্রহ করে একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করে। সাধারণত এখানে ২৫০ থেকে ৩৫০ জন প্রার্থীর নাম থাকে।
  • সংক্ষিপ্ত তালিকা (শর্টলিস্ট): বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে মার্চ ও এপ্রিল মাসের মধ্যে এই তালিকা থেকে মাত্র ১৫-২০ জন বা আরও কম প্রার্থীর একটি শর্টলিস্ট প্রস্তুত করা হয়।
  • বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা: মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত নোবেল কমিটির সদস্যরা এবং আন্তর্জাতিক স্তরের বিশেষজ্ঞরা এই সংক্ষিপ্ত তালিকার প্রার্থীদের কাজগুলো (গবেষণা, সাহিত্য বা শান্তি প্রচেষ্টা) গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন করেন এবং প্রতিবেদন তৈরি করেন।
 
৩. চূড়ান্ত নির্বাচন ও ভোটগ্রহণ (অক্টোবর)
  • চূড়ান্ত সুপারিশ: সেপ্টেম্বর মাসে নোবেল কমিটি তাদের তৈরি করা প্রতিবেদন ও চূড়ান্ত সুপারিশ সংশ্লিষ্ট রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি বা কমিটির কাছে পেশ করে।
  • ভোটগ্রহণ: অক্টোবরের শুরুতে পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন: রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস বা নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি) সভায় বসে। সেখানে মেজরিটি বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ভিত্তিতে চূড়ান্ত বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করার নিয়ম নেই।
  • ঘোষণা: অক্টোবরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
 
৪. পুরস্কার বিতরণী (ডিসেম্বর)

চূড়ান্ত নির্বাচনের পর প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর (আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী) সুইডেনের স্টকহোমে এবং নরওয়ের অসলোতে সুইডেন ও নরওয়ের রাজা বা কমিটির প্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের হাতে মেডেল ও সার্টিফিকেট তুলে দেন।

নোবেল পুরস্কারে কি কি বিষয় বিবেচনা করা হয়?

বিজয়ী নির্বাচনে প্রধানত আলফ্রেড নোবেলের উইল এবং নোবেল ফাউন্ডেশনের কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম বিবেচনা করা হয়:

  • মানবজাতির জন্য সর্বোচ্চ কল্যাণ: প্রার্থীর কাজ বা আবিষ্কারটি যেন মানবজাতির জন্য বৈপ্লবিক এবং সর্বোচ্চ কল্যাণকর প্রমাণিত হয়।
  • সর্বোচ্চ ৩ জন অংশীদার: একটি নির্দিষ্ট পুরস্কার যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৩ জন ব্যক্তি এবং সর্বোচ্চ দুটি ভিন্ন কাজের জন্য ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।
  • জীবিত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার: নোবেল পুরস্কার মরণোত্তর (মৃত্যুর পর) দেওয়া হয় না। তবে মনোনয়নের পর এবং অক্টোবরে নাম ঘোষণার আগে যদি প্রার্থীর মৃত্যু হয়, তবে তিনি পুরস্কার পাবেন।
  • ব্যক্তি বনাম সংস্থা: পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, অর্থনীতি ও সাহিত্যের পুরস্কার কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেই দেওয়া যায়। তবে নোবেল শান্তি পুরস্কার কোনো ব্যক্তি বা কোনো সংস্থাকে (যেমন: জাতিসংঘ বা রেড ক্রস) দেওয়া সম্ভব।
  • ৫০ বছরের কঠোর গোপনীয়তা: নোবেল পুরস্কারের অন্যতম বড় নিয়ম হলো— কারা মনোনীত হয়েছিলেন, কারা মনোনয়ন দিয়েছিলেন বা সিলেকশনের সময় কী আলোচনা হয়েছিল, তা পুরস্কার দেওয়ার পরবর্তী ৫০ বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়।
 
পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ

পুরস্কারের বিষয়ে ভোটদান ও তা প্রদানের চূড়ান্ত ক্ষমতা চারটি পৃথক সংস্থার হাতে ন্যস্ত রয়েছে:

  • রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস: পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং অর্থনীতিতে পুরস্কার প্রদান করে।
  • ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি: শরীরতত্ত্ব বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরস্কার প্রদান করে।
  • সুইডিশ একাডেমি: সাহিত্যে পুরস্কার প্রদান করে।
  • নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি: নরওয়ের পার্লামেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি, যারা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে।
 
নোবেল পদার্থবিজ্ঞান পুরস্কার

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার হলো আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালের মূল উইলে উল্লিখিত পাঁচটি পুরস্কারের একটি। পদার্থবিজ্ঞানে যুগান্তকারী আবিষ্কার বা অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়। নোবেল ফাউন্ডেশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী এর মূল নিয়মাবলী নিচে দেওয়া হলো:

কারা মনোনয়ন দিতে পারবেন:

পদার্থবিজ্ঞানে যে কেউ মনোনয়ন দিতে পারেন না। প্রতি বছর নোবেল কমিটি সারা বিশ্বের যোগ্য ব্যক্তিদের কাছে গোপন আমন্ত্রণপত্র পাঠায়। যারা মনোনয়ন দেওয়ার যোগ্য:

  • রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস-এর সুইডিশ এবং বিদেশি সদস্যরা।
  • পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল কমিটির সদস্যরা।
  • পদার্থবিজ্ঞানে পূর্ববর্তী নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা।
  • সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও নরওয়ের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউটের পদার্থবিজ্ঞানের স্থায়ী অধ্যাপকরা।
  • একাডেমির আমন্ত্রিত বিশ্বের অন্যান্য স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিজ্ঞানীরা।
 
নোবেল রসায়ন পুরস্কার

পদার্থবিজ্ঞান ও অর্থনীতির মতোই রসায়নে নোবেল পুরস্কার হলো আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালের মূল উইলে প্রতিষ্ঠিত পাঁচটি পুরস্কারের একটি। রসায়নশাস্ত্রে অসামান্য আবিষ্কার বা যুগান্তকারী অবদানের জন্য এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। পদার্থবিজ্ঞানের মতোই রসায়ন পুরস্কারের নিয়মাবলীও প্রায় অভিন্ন। নিচে এর প্রধান নিয়মাবলীগুলো তুলে ধরা হলো:

কারা মনোনয়ন দিতে পারবেন:
  • রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস-এর সুইডিশ এবং বিদেশি সদস্যরা।
  • রসায়নে নোবেল কমিটির (Nobel Committee for Chemistry) সদস্যরা।
  • রসায়নে এবং পদার্থবিজ্ঞানে পূর্ববর্তী নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা।
  • সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও নরওয়ের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউটের রসায়নের স্থায়ী অধ্যাপকরা।
  • একাডেমির আমন্ত্রিত বিশ্বের অন্যান্য স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও বিজ্ঞানীরা।
 
নোবেল চিকিৎসাবিজ্ঞান পুরস্কার

চিকিৎসাবিজ্ঞানে (মূলত শারীরতত্ত্ব ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে) নোবেল পুরস্কার হলো আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালের মূল উইলে প্রতিষ্ঠিত পাঁচটি পুরস্কারের একটি। মানবকল্যাণে চিকিৎসাবিজ্ঞান বা শারীরতত্ত্বে যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। এর প্রধান নিয়মাবলী নিচে দেওয়া হলো:

কারা মনোনয়ন দিতে পারবেন:
  • ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের (Karolinska Institutet) নোবেল অ্যাসেম্বলির সদস্যরা।
  • চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল কমিটির সদস্যরা।
  • চিকিৎসাবিজ্ঞান বা রসায়নে পূর্ববর্তী নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা।
  • সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও নরওয়ের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্থায়ী অধ্যাপকরা।
  • নোবেল কমিটি কর্তৃক আমন্ত্রিত বিশ্বের অন্যান্য স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিজ্ঞানীরা।
 
নোবেল সাহিত্য পুরস্কার

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার হলো আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালের মূল উইলে প্রতিষ্ঠিত পাঁচটি পুরস্কারের একটি। সাহিত্যে “আদর্শিক দিকে সবচেয়ে অসামান্য কাজ”-এর জন্য প্রতি বছর এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। নোবেল ফাউন্ডেশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী এর প্রধান নিয়মাবলী নিচে দেওয়া হলো:

কারা মনোনয়ন দিতে পারবেন:

যে কেউ সাহিত্যে নোবেলের জন্য মনোনয়ন দিতে পারেন না। মনোনয়ন করার অধিকার কেবল নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির রয়েছে:

  • সুইডিশ একাডেমি (Swedish Academy) এবং অন্যান্য দেশের সমকক্ষ একাডেমি, প্রতিষ্ঠান বা সাহিত্য সমিতির সদস্যরা।
  • বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বের (Literature and Linguistics) অধ্যাপকরা।
  • সাহিত্যে পূর্ববর্তী নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা।
  • যেসব লেখক বা সাহিত্যিক সমিতি নিজ নিজ দেশের সাহিত্যকর্মের প্রতিনিধিত্ব করে (যেমন: রাইটার্স গিল্ড বা লেখক সংঘ), তাদের সভাপতিরা।
 
নির্বাচন কমিটি:

সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী নির্বাচনের চূড়ান্ত দায়িত্ব সুইডেনের সুইডিশ একাডেমি (Swedish Academy)-এর ওপর ন্যস্ত। এই একাডেমির ১৮ জন আজীবন সদস্য রয়েছেন। একাডেমির ‘নোবেল কমিটি ফর লিটারেচার’ প্রাপ্ত হাজার হাজার মনোনয়ন থেকে কয়েক ধাপে তালিকা ছোট করে ৫ জনের একটি শর্টলিস্ট তৈরি করে। এরপর একাডেমির সদস্যরা এই ৫ জনের কাজ নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচন করেন।

মরণোত্তর পুরস্কার:

১৯৭৪ সালের সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো লেখককে মরণোত্তর (মৃত্যুর পর) নোবেল পুরস্কার দেওয়া যায় না। উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সালের আগে সাহিত্যে মরণোত্তর নোবেল দেওয়ার নজির ছিল (যেমন ১৯৩১ সালে এরিক এক্সেল কার্লফেল্ডকে মৃত্যুর পর নোবেল দেওয়া হয়েছিল)।

নোবেল শান্তি পুরস্কার

নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে আলফ্রেড নোবেলের উইল এবং নোবেল ফাউন্ডেশনের প্রণীত কিছু সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নিয়মাবলী অনুসরণ করা হয়। নিচে এর প্রধান নিয়মাবলীগুলো তুলে ধরা হলো:

কারা মনোনয়ন দিতে পারবেন:

যেকোনো সাধারণ মানুষ নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য কাউকে মনোনীত করতে পারেন না। কেবল নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই মনোনয়ন প্রস্তাব করার অধিকার রাখেন:

  • যেকোনো সার্বভৌম দেশের জাতীয় আইনসভার (সংসদ) সদস্য, সরকারের মন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধানরা।
  • হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) এবং স্থায়ী সালিশি আদালতের সদস্যরা।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, আইন, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব এবং ধর্ম বিষয়ের অধ্যাপক, ইমেরিটাস অধ্যাপক, রেক্টর বা ডিরেক্টররা।
  • শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (Peace Research Institutes) এবং পররাষ্ট্র নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা।
  • অতীতে যারা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন (ব্যক্তিগতভাবে বা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে)।
  • নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির বর্তমান ও প্রাক্তন সদস্যরা এবং কমিটির প্রাক্তন উপদেষ্টারা।
 
কাকে মনোনয়ন দেওয়া যাবে:
  • শর্ত পূরণকারী যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে (সংগঠন) শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা যেতে পারে।
  • স্ব-মনোনয়ন নিষিদ্ধ: কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেকে নিজে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করতে পারবেন না। কেউ নিজেকে নিজে মনোনীত করলে তা সরাসরি বাতিল হয়ে যায়।
 
নির্বাচন কমিটি:
  • অন্যান্য নোবেল পুরস্কার সুইডেন থেকে দেওয়া হলেও, আলফ্রেড নোবেলের নির্দেশ অনুযায়ী শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় নরওয়ে থেকে।
  • নরওয়ের পার্লামেন্ট (Storting) কর্তৃক নিযুক্ত ৫ সদস্যের ‘নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি’ সমস্ত মনোনয়ন যাচাই-বাছাই করে এবং চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচন করে। এই কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, এর বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো সুযোগ নেই।
 
নোবেল অর্থনীতি পুরস্কার

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক নাম হলো ‘আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতিতে অর্থনীতিতে ভেরিজেস রিক্সবাংক পুরস্কার’ (Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel)। এটি আলফ্রেড নোবেলের মূল উইলে (১৮৯৫) ছিল না; বরং ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ভেরিজেস রিক্সবাংক’ এর ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এটি প্রবর্তন করে। মূল নোবেল পুরস্কার না হলেও, নোবেল ফাউন্ডেশন অন্যান্য পুরস্কারের মতোই কঠোর নিয়মে এটি পরিচালনা করে।

কারা মনোনয়ন দিতে পারবেন:
  • রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস-এর সদস্যরা।
  • অর্থনীতিতে নোবেল কমিটির সদস্যরা।
  • অর্থনীতিতে পুরস্কার পাওয়া অতীতের নোবেল জয়ীরা।
  • সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও নরওয়ের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের অর্থনীতির স্থায়ী অধ্যাপকরা।
  • নোবেল একাডেমি কর্তৃক নির্বাচিত বিশ্বের অন্যান্য স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অধ্যাপকরা।
 
নোবেল পুরস্কারের আর্থিক মূল্য ও এর উৎস
  • উৎস: নোবেল পুরস্কারের সম্পূর্ণ অর্থ আসে বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের রেখে যাওয়া ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে। ১৮৯৫ সালে করা উইল অনুযায়ী, তিনি তাঁর সম্পদের প্রায় ৯৪ শতাংশ (তৎকালীন ৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা) একটি তহবিলে দান করে যান। এই তহবিলের অর্থ বিভিন্ন নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করা হয় এবং সেই বিনিয়োগ থেকে আসা লভ্যাংশ দিয়েই প্রতি বছর বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়।
  • বর্তমান অর্থমূল্য: নোবেল ফাউন্ডেশনের তহবিলের আয়ের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় পুরস্কারের অর্থমূল্য পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে (২০২৩-২০২৬ সাল পর্যন্ত) প্রতিটি বিভাগে পুরস্কারের অর্থমূল্য হলো ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (১১ মিলিয়ন SEK)। এটি প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমতুল্য।
  • অর্থের ভাগাভাগি: কোনো একটি নির্দিষ্ট বিভাগে যদি একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পান, তবে এই ১ কোটি ১০ লাখ ক্রোনা তাদের মধ্যে সমান বা আনুপাতিক হারে ভাগ করে দেওয়া হয়।
 
নোবেল মেডেল

অর্থমূল্যের পাশাপাশি প্রত্যেক নোবেল বিজয়ীকে একটি সোনার মেডেল এবং একটি ডিপ্লোমা বা সনদ প্রদান করা হয়।

  • উপাদান বা ধাতু: ১৯৮০ সালের আগে পর্যন্ত প্রতিটি নোবেল মেডেল সম্পূর্ণ ২৩-ক্যারেট স্বর্ণ দিয়ে তৈরি হতো। কিন্তু ১৯৮০ সালের পর থেকে মেডেলগুলো ১৮-ক্যারেট “গ্রিন গোল্ড” বা পুনর্ব্যবহৃত স্বর্ণ (recycled gold) দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে, যার ওপর ২৪-ক্যারেট খাঁটি স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া থাকে।
  • ওজন ও আকার: প্রতিটি মেডেলের ব্যাস সাধারণত ৬৬ মিলিমিটার (২.৬ ইঞ্চি) হয়ে থাকে। মেডেলগুলোর ওজন ক্যাটাগরি ভেদে ১৭৫ থেকে ১৮৫ গ্রামের মধ্যে হয়। অর্থনীতিতে নোবেল মেডেলটি অন্যান্য মেডেলের তুলনায় ওজনে সামান্য ভিন্ন হতে পারে।
  • ইতিহাস ও নকশা: ১৯০১ সালে প্রথমবার নোবেল মেডেল প্রদান করা হয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সাহিত্যের মেডেলগুলোর প্রাথমিক নকশা করেছিলেন প্রখ্যাত সুইডিশ ভাস্কর এরিক লিন্ডবার্গ। অন্যদিকে, নোবেল শান্তি পুরস্কারের মেডেলটির নকশা করেছিলেন নরওয়েজিয়ান ভাস্কর গুস্তাভ ভিজিল্যান্ড।
  • মেডেলের দুই পাশের দৃশ্য: সমস্ত নোবেল মেডেলের সামনের অংশে আলফ্রেড নোবেলের প্রতিকৃতি এবং তাঁর জন্ম ও মৃত্যুর সাল (১৮৩৩-১৮৯৬) ল্যাটিন অক্ষরে খোদাই করা থাকে। তবে মেডেলের পেছনের দিকের নকশা পুরস্কারের বিভাগ অনুযায়ী আলাদা হয়। যেমন- পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মেডেলে বিজ্ঞানের দেবীর ছবি থাকে, আবার শান্তি পুরস্কারের মেডেলে তিনজন মানুষের একে অপরকে আলিঙ্গন করার দৃশ্য খোদাই করা থাকে।

১-৫ অক্টোবর, ২০২৬


ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র / টরন্টো, কানাডা

পুরকৌশলী, স্ট্রাকচারাল ও সফটওয়্যার প্রকৌশলী। শৈশব ও কৈশোরে চিত্রশিল্পে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। বর্তমানে চিত্রকর্ম, মঞ্চসজ্জা, লোগো, প্রচ্ছদ ও ওয়েব ডিজাইন হলো শখ।


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।