পড়শী অর্থচিত্র বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগ – তৎপরতা ও বাস্তবতা

বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগ – তৎপরতা ও বাস্তবতা

Post Views: 16
18 min read

কিছু দিন পর পর খবর আসে এক ধরণের অনুষ্ঠানের – কোনো বিনিয়োগ সামিট, কোনো ‘রোড শো’ কিংবা বড়ো বড়ো কোনো কোম্পানির উর্ধতন কর্মকর্তার সাথে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক। কয়েকদিন আগে নিউ ইয়র্কে প্রধান মন্ত্রী মিলিত হলেন ওয়াল স্ট্রিটের বড়ো বড়ো বিনিয়োগ কোম্পানির শীর্ষ কিছু প্রতিনিধির সাথে। তার কয়েকদিন পর সিলিকন ভ্যালিতে প্রধান মন্ত্রীর প্রতিনিধি দলের কিছু সদস্য বৈঠক করলেন প্রযুক্তি খাতের বিশ্ব বিখ্যাত কিছু কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাথে, মিলিত হলেন সিলিকন ভ্যালিতে কর্মরত বেশ কিছু বাংলাদেশির সাথে। এই তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি আকৃষ্ট করা। এ ধরণের তৎপরতা অতীতেও অনেক দেখা গেছে।

সেই তৎপরতা থেকে বাস্তবে আমরা কী ফল পেয়েছি সে বিষয়ে যাবার আগে বলে নেয়া ভালো যে এ ধরণের উদ্যোগের প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিদেশী বিনিয়োগের একটি ভূমিকা থাকবে এবং সেই বিনিয়োগের একটি বড়ো অংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবে এটা আশা করা মোটেই অযৌতিক নয়।

তা হলে বাস্তবে আমরা কী দেখছি? এখানে বলে রাখি আমি বিদেশী বিনিয়োগ বলতে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (FDI) এর কথাই বলছি, পুঁজি বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ (যার পরিমান এমনিতেই বাংলাদেশে কম), তার কথা নয়।

বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের উপর সব চাইতে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিসংখ্যান পাওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে। প্রতি ছয় মাস অন্তর বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক Foreign Direct Investment and External Debt এই শিরোনামে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের উপর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে বহু বছর ধরে বাংলাদেশে আসা বিদেশী বিনিয়োগের পুঞ্জীভূত অর্থাৎ স্টক হিসাব যেমন পাওয়া যায়, তেমনি প্রতি বছর যে বিনিয়োগ আসে, অর্থাৎ বার্ষিক বিনিয়োগের প্রবাহ, তার উপরও পরিসংখ্যান থাকে। এখানে বলে রাখা ভালো যে বাংলাদেশ ব্যাংকার এই প্রতিবেদনে বিনিয়োগের যে স্টক মূল্য দেখানো হয় সেটি বুক ভ্যালু, বর্তমানের বাজার মূল্য নয়।

এই পরিসংখ্যানে আমরা কী দেখি? প্রথমত: নিকট অতীতে একটি সময় ছিল যখন যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশে সবচাইতে বড়ো বিদেশী বিনিয়োগের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের স্টকের হিসাবভুক্ত মূল্য (বুক ভ্যালু) ছিল ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বহু বছর ধরে যে বিনিয়োগ এসেছে তা থেকে যে বিনিয়োগ চলে গেছে (যদি সে রকম কোনো বিনিয়োগ চলে যেয়ে থাকে) তা বাদ দিলে ২০১৮ সালের শেষে যে স্টকটি ছিল তার পরিমান। সে হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ছিল শীর্ষে, দ্বিতীয় স্থানে ছিল যুক্তরাজ্য (২ বিলিয়ন ডলার), তারপর চীন (১.৪ বিলিয়ন ডলার; হংকং এর বিনিয়োগ যোগ করলে ২.২ বিলিয়ন ডলার)। কিন্ত তারপর আমরা কী দেখছি? সর্বশেষ প্রকাশিত রিপোর্টিতে আমরা ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ পরিস্থিতির একটি চিত্র পাচ্ছি । সেখানে কী দেখছি আমরা?

এই প্রতিবেদনে প্রদত্ত পরিসংখ্যানে আমেরিকান বিনিয়োগে একটি বিরাট নিম্নগতি দেখা যায়। ২০১৮ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের স্টকের বুক ভ্যালু যেখানে ছিল ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালের শেষে তা নেমে আসে মাত্র ১.০৮ বিলিয়ন ডলারে। একসময় বাংলাদেশে এককভাবে বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থাকলেও, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের স্টকের মাত্র ৫.৪ শতাংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দখলে।
অন্যান্য বিনিয়োগকারী দেশের সাথে তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ, বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩.২২ বিলিয়ন ডলার, সিঙ্গাপুরের ২.২৫ বিলিয়ন ডলার, চীনের ১.৯২ বিলিয়ন ডলার ও দক্ষিণ কোরিয়ার ১.৮৪ বিলিয়ন ডলার। ১.০৮ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম স্থানে নেমে গিয়েছিল।

আবারো বলছি এটি হচ্ছে স্টক হিসাব, অর্থাৎ বহু বছরের বিনিয়োগের পুঞ্জীভূত রূপ, কোনো একটি বছরে আগত বিনিয়োগ নয়। বিনিয়োগের স্টক এর মূল্য কী ভাবে কমে, বিশেষ করে এত নাটকীয় ভাবে? এমন কি হতে পারে যে আমেরিকান কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাচ্ছে? ব্যাপারটা তা নয়। এখানে বিদেশী বিনিয়োগ পরিমাপের একটি পদ্ধতিগত বিষয় আছে যা একটু জটিল হলেও, সংক্ষেপে আলোচনা করা দরকার।

বাংলাদেশে ২০১৯-২৫ সালের বিদেশী বিনিয়োগের পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ (BPM6) নামের একটি নির্দেশিকা অনুযায়ী সংশোধন করা হয়েছে – বাংলাদেশ ব্যাংক তার বিদেশী বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এটি উল্লেখ করেছে। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী একটি বিদেশী কোম্পানি যদি কোনো বছর লোকসান করে কিংবা যা লাভ করে তার থেকে বেশি ডলার নিজ দেশে নিয়ে যায়, তা হলে বছর শেষে তার পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের হিসেব থেকে তা কেটে রাখতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক আগে থেকেই বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুসরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। তবে পরবর্তীতে আইএমএফের পর্যবেক্ষণের পর ২০১৯ সাল থেকে পরিসংখ্যান সংশোধন করা হয়। এই সংশোধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানির লোকসানকে ঋণাত্মক পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় (negative reinvested earnings) হিসেবে যথাযথভাবে হিসাব করা।

বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগের প্রথম পর্যায়টি ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। ২০১৮ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের যে স্টক ছিল (৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার) তার সিংহ ভাগ, অর্থাৎ প্রায় ২.৭০ বিলিয়ন ডলারই ছিল গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম খাতে একটি কোম্পানি, অর্থাৎ শেভরন (Chevron) এর বিনিয়োগ। এই পরিমান বিনিয়োগের মাধ্যমে শেভরন এককভাবে বাংলাদেশের বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উৎপাদক হয়ে ওঠে।

২০১৯ সালে সংশোধিত হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের যে হ্রাস দেখা যায়, তার পরিমাণ প্রায় ২.৬৩ বিলিয়ন ডলার। দুটি সংখ্যার এই আশ্চর্যজনক নৈকট্য ইঙ্গিত দেয় যে পরিসংখ্যানগত পরিবর্তনের একটি বড় অংশ সম্ভবত গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম খাতের বিনিয়োগের হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে প্রকাশিত তথ্য থেকে ঠিক কীভাবে এই পরিবর্তন ঘটেছে তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে গেলে আরো গবেষণার প্রয়োজন। তবে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে দীর্ঘ সময় ধরে করা শেভরনের বিনিয়োগ ছিল বিশাল ও পুঁজি-নিবিড় (ক্যাপিটাল-ইনটেনসিভ)। গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনকাল অতিবাহিত হওয়া এবং স্থায়ী সম্পদের অবচয় (depreciation) ঘটার ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেগুলোর হিসাবভুক্ত মূল্য (বুক ভ্যালু) কমে যায়, যদি না নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে তা পূরণ করা হয়।

এসব কিছুর পরও বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগের স্টক হিসেব এতটা কমতো না যদি গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম খাতের বাইরে অন্যান্য খাতে প্রচুর বিনিয়োগ আসতো। বাস্তবে তা হয়নি। আমেরিকান বিনিয়োগের সেই পুরোনো ও কেন্দ্রীভূত প্রথম পর্যায়টির জায়গায়, দ্বিতীয় পর্যায়ে নতুন কোনো খাতে পর্যাপ্ত পরিমানে বা বড় আকারের বিনিয়োগ আসেনি।

এই ধারণা পাকাপোক্ত হয় যখন বহু বছর ধরে আগত বিনিয়োগের পুঞ্জীভূত পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সাম্প্রতিক কালের বিনিয়োগ প্রবাহের তথ্য আমরা যাচাই করে দেখি। ২০২১ সালে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ৩৯৪ মিলিয়ন ডলার; ২০২৫ সালে তা হয়ে যায় ঋণাত্মক, অর্থাৎ -৬৩ মিলিয়ন ডলার।

অন্যভাবে যদি দেখি, ২০২১ থেকে ২০২৫, এই সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের নিট এফডিআই-এর মোট পরিমাণ ছিল মাত্র ৬১২ মিলিয়ন ডলারের মতো। অন্য দিকে শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডস থেকে ৫৪৫ মিলিয়ন ডলার, চীন থেকে ৩২১ মিলিয়ন ডলার, সিঙ্গাপুর থেকে ১৯২ মিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১৭২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পায় (সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ এফডিআই প্রতিবেদন)।

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ভৌগোলিক উৎসের যে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্টতই তা বুঝা যাচ্ছে। এই শতাব্দীর শুরুর দিকে, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সমানে সমান অবস্থানে থেকে শীর্ষস্থান দখল করে ছিল; বাংলাদেশের বার্ষিক এফডিআই প্রবাহে উভয়েরই অবদান ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। সে সময় এফডিআই প্রবাহে চীনের অবদান ছিল আধা শতাংশেরও কম, অর্থাৎ মানচিত্রে তাদের উপস্থিতি ছিল প্রায় নগণ্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে চীনের অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমান সহস্রাব্দের প্রথম দেড় দশকে ধীরগতিতে ও নীরবে এগোলেও, এরপর তাদের প্রবৃদ্ধি ছিল অত্যন্ত দ্রুত ও জোরালো। এক্ষেত্রে নতুন খেলোয়াড় হিসেবে চীন স্পষ্টতই তার প্রভাব ও সক্ষমতা প্রদর্শন করছে।

যেমনটি শুরুতেই বলেছি বাংলাদেশ বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টায় বেশ কিছুটা সময় ও অর্থ খরচ করেছে। আমেরিকান ব্যবসায়ীদের সাথে বিনিয়োগ সম্মেলন, রোডশো এবং বারবার উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় ও আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে। বিনিয়োগ সম্মেলন ও প্রচারণামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বারবার নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

তাই মূল সমস্যাটি প্রচারণার অভাব নয়; বরং এই প্রচারণাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বড় আকারের নতুন প্রজন্মের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ অতীতে গ্যাস, পেট্রোলিয়াম, বিদ্যুৎ ও আর্থিক খাতে মার্কিন পুঁজি আকৃষ্ট করতে সফল হয়েছিল। কিন্তু সেই বিনিয়োগগুলো পূর্ণতা পাওয়ার পর ইলেকট্রনিক্স, প্রকৌশল, ডিজিটাল সেবা, লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যসেবা বা অন্যান্য উদীয়মান খাতে অনুরূপ কোনো বিনিয়োগ-প্রবাহ তৈরি হয়নি। তাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা বিদেশী বিনিয়োগের মজুদে যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, তাকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ঘটনা হিসেবে না দেখে বরং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে তা পূরণ ও বৈচিত্র্যকরণের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা উচিত। অন্য ভাবে যদি বলি বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মার্কিন বিনিয়োগের এক প্রজন্মের জায়গায় অন্য প্রজন্মকে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিভিন্ন ধরণের বিদেশী বিনিয়োগকে একই ঝুড়ির মধ্যে ফেলে যাচাই করাটা ঠিক না। বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে যারা কাজ করে তারা সচরাচর তিন ধরণের বিদেশী বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য করে: ক) প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণকারী বিনিয়োগ (যেমন গ্যাস খাতে বিনিয়োগ) যা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের লক্ষ্যে একটি দেশে আসে; খ) বাজার-সন্ধানী বিনিয়োগ (যেমন বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ বা ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগ) যা স্থানীয় বাজারকে কাজে লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে আসে; এবং গ) দক্ষতা-সন্ধানী বিনিয়োগ (যেমন পোশাক শিল্পে বা ইলেট্রনিক্স শিল্পে বিনিয়োগ) যা বিদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে উৎপাদনের দক্ষতা বা কম খরচের সুবিধা কাজে লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে আসে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কৌশলে বলা হয়েছে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণের কথা, ব্যক্ত হয়েছে তৈরি পোশাকের মতো সাধারণ পণ্য থেকে সরে এসে ইলেকট্রনিক্স বা গাড়ির যন্ত্রাংশের মতো অধিকতর উন্নত ও জটিল পণ্য উৎপাদনের অভিপ্রায়ের কথা। বাংলাদেশে আমরা আরো বেশি করে রপ্তানিমুখী কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাই, বিশেষ করে এমন সব খাতে যা আমাদের জন্য নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি করবে এবং বিভিন্ন সম্ভাবনাময়ী পণ্যের গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে প্রবেশ করতে কিংবা অবস্থান সুদৃঢ় করতে সাহায্য করবে।

আগেই বলেছি ঐতিহাসিক ভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা বিনিয়োগের বড় অংশই ছিল প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণকেন্দ্রিক। অন্য দিকে যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিনিয়োগের বড় অংশ ছিল বাজার-সন্ধানী; আর দক্ষিণ কোরিয়া (এবং কিছুটা কম মাত্রায় হংকং) থেকে আসা বিনিয়োগ ছিল মূলত দক্ষতা-সন্ধানী। আমাদের রপ্তানি বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আগে যা বলেছি, তার প্রেক্ষিতে বিচার করলে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের বর্তমান কাঠামোয় উন্নতির যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশে উল্লেখ করার মতো অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, সেখানে ‘দক্ষতা-সন্ধানী’ বা ‘দক্ষতা-ভিত্তিক’ বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্ব খুব স্পষ্ট। এই ধরনের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে এমন একটি দক্ষ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করবে, যেখান থেকে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের জন্য পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। তাই প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ করবে কি না। বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষতা-সন্ধানী বিনিয়োগের পরবর্তী প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার জন্য বাংলাদেশ কী করছে।

এ ধরনের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখতে পারি। মালয়েশিয়ার কথা ধরা যাক। ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগেই মালয়েশিয়া ইলেকট্রনিক্স ও বৈদ্যুতিক পণ্য শিল্প গড়ে তোলার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে; তারা সিদ্ধান্ত নেয় এসব পণ্যের বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হবার জন্যে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার। আর এ ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সক্রিয় ও উদ্যোগী কৌশল গ্রহণ করে।

এই উদ্যোগের পথিকৃৎ ছিল পেনাং প্রদেশের সরকার। এই প্রাদেশিক সরকারের বিনিয়োগ-সহায়ক সংস্থা ‘পেনাং ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’ এর কর্মকর্তারা বিদেশে গিয়ে সংশ্লিষ্ট খাতের শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে এবং তাদের মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁদের এই প্রচেষ্টা অচিরেই ফল দেয়। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকেই আটটি কোম্পানি মালয়েশিয়ার ইলেকট্রনিক্স ও বৈদ্যুতিক পণ্য শিল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ‘এইট সামুরাই’ নামে অভিহিত এই কোম্পানির মধ্যে ছিল ইন্টেল, হিউলেট প্যাকার্ড, এবং অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস এর মতো শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো।

সরকার বিনিয়োকারীদের বিভিন্ন ধরণের প্রণোদনা দিয়েছিলো, যার মধ্যে ছিল মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে জমি বরাদ্দ, কর অবকাশ, বিনিয়োগ কর রেয়াত এবং রপ্তানি প্রণোদনা। তবে তারা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল। তারা নিশ্চিত করেছিল যে আগত বিনিয়োগকারীরা সন্তুষ্ট থাকে। বিনিয়োগকারীদের উত্থাপিত যে কোনো উদ্বেগের বিষয়ে সরকার যে কেবল দ্রুত সাড়া দিয়েছে তাই নয়, বিনিয়োগকারীরা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে কি না, তা জানতে সরকারি কর্মচারীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে, নিয়মিতভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতো। যে বিনিয়োগকারী ইতিমধ্যে একটি দেশে বিনিয়োগ করেছে, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা প্রথমেই তাদের কাছে যায়, একটি দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের খুঁটিনাটি খোঁজ খবর নিতে। একটি দেশে অবস্থানকারী বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতা যদি সুখকর হয়, তখন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হয়; আর তাদের কাছ থেকে যদি নেতিবাচক ইশারা পাওয়া যায় অন্যরা পিছপা হয়।

এ জায়গায় বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের ঘাটতি আছে। বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগকারীদের দেখভালের ক্ষেত্রে আমাদের আচরণ খুব একটা সন্তোষজনক নয়। উদাহরণস্বরূপ, আমরা প্রায়শই এ ধরনের বিনিয়োগকারীদের ওপর হটাৎ করেই বিপুল করের বোঝা চাপিয়ে দিই। সরকারের এ ধরনের আচরণের জেরে উচ্চ-পর্যায়ের আইনি বিরোধের ঘটনাও ঘটেছে।

সময়ের সাথে সাথে মালয়েশিয়ায় পরিস্থিতির বিবর্তন কীভাবে ঘটেছে, তা লক্ষ্য করা যেতে পারে। মালয়েশিয়ার ইলেকট্রনিক্স ও বৈদ্যুতিক শিল্পের বিকাশের প্রথম পর্যায়টি স্থায়ী ছিল প্রায় দুই দশক, অর্থাৎ ১৯৭০-এর দশকের শুরু থেকে ১৯৮০-র দশকের শেষ পর্যন্ত। এই পর্যায়ে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে শ্রম-নিবিড় এবং কম মূল্য সংযোজনকারী অংশের ওপরই মূলত মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল। এই শিল্প বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ে, অর্থাৎ ১৯৮০-র দশকের শেষ থেকে ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত, উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ও উৎকর্ষ সাধিত হয়। বিদেশি কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে অধিক মূল্য সংযোজনকারী কার্যক্রমের দিকে সরে আসে; উদাহরণস্বরূপ, সাধারণ সংযোজন (এসেমব্লি) প্রক্রিয়া থেকে স্বয়ংক্রিয় সংযোজন এবং পণ্য ও প্রক্রিয়া নকশার (ডিসাইন) মতো কাজের দিকে তারা অর্থ ও মনোযোগ বিনিয়োগ করে।

বাংলাদেশের কয়েকটি কোম্পানি ইতিমধ্যেই অত্যাধুনিক চিপ ডিজাইন সেবার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে, প্রবেশ করেছে এবং ধীরে ধীরে সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনের অন্যান্য ধাপের দিকে, যেমন প্রি-ফ্যাব্রিকেশন সেবার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে টেস্ট প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট, চিপ টেস্টিং এবং প্যাকেজিং। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর বিশ্ব ব্যাপী বাজারের আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। এই শিল্পের সাথে জড়িত বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা মনে করেন যে, সঠিক পদক্ষেপ নিলে আমরা এই বাজারের প্রায় ৩-৪ শতাংশ দখল করতে পারব। আমরা এখানে ৩০-৪০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রপ্তানির কথা বলছি, যা বর্তমানে তৈরি পোশাক খাত থেকে আমাদের আয়ের চেয়ে সামান্য কম।

আমরা কীভাবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি? একটি উপায় হলো এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, যার মধ্যে রয়েছে এ শিল্পে ইতিমধ্যে সক্রিয় বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার গঠন। আমরা জানি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায়শই এমন নির্ভরযোগ্য স্থানীয় অংশীদার খোঁজে যারা স্থানীয় পরিস্থিতি ও পরিবেশ সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির মধ্যে ৫-৬টিই যুক্তরাষ্ট্রের। তাই, সেমিকন্ডাক্টর বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখলে নিতে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ইলেকট্রনিক্স শিল্পের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। ইলেকট্রনিক্স খাতের শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনেকগুলি যুক্তরাষ্ট্রের, যেমন অ্যাপল, এনভিডিয়া, ডেল এবং এএমডি। সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আমাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি অর্জন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল লাভ এবং আমাদের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য ও মান বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে আমাদের যথাযথ প্রস্তুতি ও উদ্যোগ নিতে হবে। আধুনিক ও সুনিশ্চিত আইনি ও নীতিগত কাঠামোর সহায়তায় সক্রিয় ও সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ প্রচার কার্যক্রমের মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়ার সূচনা করা যেতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও দক্ষ জনশক্তির ভিত্তি উন্নত করা।

১ অক্টোবর, ২০২৬

পটোম্যাক, মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র

অথনীতিবিদ। পেশাগত জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে বিশ্বব্যাংকে, সেখানে তিনি বিশ্বজুড়ে কাজ করেছেন মানুষের উদ্যোক্তাসুলভ উদ্দীপনা ও প্রতিভার বিকাশে সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে। আখতার মাহমুদ সমাজ ও অর্থনীতির দীর্ঘ মেয়াদি বিবর্তন বোঝার বিষয়ে আগ্রহী।


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।