পড়শী পড়শীর আরশি বাঁচানো সময়গুলো কোথায় গেল?

বাঁচানো সময়গুলো কোথায় গেল?

Post Views: 34
9 min read

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত হয়ে গেছে।

সারাদিনে এমন অনেক কাজই করেছি, যেগুলোর জন্য একসময় আলাদা করে সময় বের করতে হতো। এখন আর লাগে না। বিল দিতে ব্যাংকে যেতে হয়নি, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে দোকানে ঘুরতে হয়নি, প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলতে কোথাও যেতে হয়নি। একটা ছোট যন্ত্র হাতে নিয়েই কত কাজ হয়ে গেছে।

তবু দিনের শেষে সেই পুরোনো কথাটাই – সময় পেলাম না।

কথাটা মাঝে মাঝে অদ্ভুত লাগে। মানুষ যুগের পর যুগ কত কিছু আবিষ্কার করেছে শুধু কাজ সহজ করার জন্য, দূরত্ব কমানোর জন্য, সময় বাঁচানোর জন্য। চিঠির জায়গায় ইমেইল এসেছে, ব্যাংকের লাইনের জায়গায় অ্যাপ, দোকানের বদলে অনলাইন অর্ডার। দূরের মানুষকে দেখতে এখন আর মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় না। একটা বোতাম চাপলেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মুখটাও সামনে চলে আসে।

এখন তো আরও সহজ। কয়েকটা শব্দ লিখলে যন্ত্র আমাদের হয়ে তথ্য খুঁজে দেয়, হিসাব করে, ছবি বানায়, চিঠি লেখে। যে কাজের পেছনে একসময় ঘণ্টা চলে যেত, তার কিছু এখন কয়েক মিনিটেই হয়ে যায়।

তাহলে এত বাঁচানো সময় গেল কোথায়? হয়তো প্রশ্নটা শুধু সময়ের নয়।

জীবনের প্রথম চিঠিটা পেয়েছিলাম কলেজে পড়ার সময়। একটা ছেলে লিখেছিল আমাকে। এলোমেলো কথা, অগোছালো বাক্য, মাঝে মাঝে এমন কিছু লাইন যা তখন বুঝতে পারিনি, পরে বুঝেছি।

যেখানে আমার নাম থাকার কথা, সেখানে লেখা ছিল—

—
প্রিয়,
কাজল চোখের মেঘ বালিকা

আর চিঠির শেষে তার নিজের নামের জায়গায়—

ইতি,
অচেনা মানুষ
—

চিঠিটা আমি একবার পড়িনি। কতবার পড়েছিলাম, মনে নেই।

তখন একটা চিঠি আসবে— এই অপেক্ষাটারও একটা জীবন ছিল। খামের ওপর হাতের লেখা, ভেতরে কয়েকটা পাতা। একই চিঠি একবার পড়ে ফেলে দেওয়া হতো না। কখনো আবার পড়া হতো, কখনো যত্ন করে রেখে দেওয়া হতো।

আজ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে লেখা দুটো শব্দ এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে পৌঁছে যায়।

“কেমন আছ?”

কথোপকথন সহজ হয়েছে। দূরত্বও কমেছে। শুধু মুহূর্তগুলোতে যেন মায়াটা বড্ড কম।

চিঠি ভালো ছিল আর টেক্সট মেসেজ খারাপ – কথাটা তা নয়।

মায়ের চোখের ছানি অপারেশনের দিন আমি হাসপাতালে ছিলাম না। ছিলাম কয়েক হাজার মাইল দূরে, একটা ছোট স্ক্রিনের সামনে। অপারেশনের পর কেউ ফোনটা ধরল, আর আমি মায়ের মুখটা দেখলাম— চোখে ব্যান্ডেজ, ক্লান্ত, কিন্তু ভালো আছেন।

কোনো চিঠি ওই মুহূর্তটা আমাকে দিতে পারত না।

দূরত্ব আজ সত্যিই অনেক ছোট। তবু সেদিন বুঝেছিলাম, ছোট হওয়া আর মুছে যাওয়া এক জিনিস নয়।

কিন্তু দূরত্ব কমাতে কমাতে আমরা কি অপেক্ষা করার ক্ষমতাটাও একটু কমিয়ে ফেলেছি?

শুধু চিঠি কেন? একসময় ছবি তোলার পর ছবিটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এখন একই মুহূর্তের দশটা ছবি তুলি, পছন্দ না হলে এগারো নম্বরটা তুলি। একটা গান খুঁজে পাওয়া একসময় আনন্দের ঘটনা ছিল; এখন লক্ষ গান আঙুলের নিচে। কোনো সিনেমা দেখার জন্য নির্দিষ্ট দিনের অপেক্ষা ছিল, এখন একটা শেষ হওয়ার আগেই পরেরটার তালিকা তৈরি।

আমাদের কাছে জিনিস কম নেই।

বরং এত বেশি যে, একটা জিনিসের কাছে বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর প্রয়োজনটাই যেন কমে গেছে।

এই দ্রুততার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো কাজের জায়গায়।

প্রযুক্তি একটা কাজের সময় অর্ধেক করে দিলে আমরা অর্ধেক দিন কাজ করে বাড়ি ফিরিনি। সেই ফাঁকা জায়গায় আরেকটা কাজ এসেছে। তারপর আরেকটা।

নিজের কাজেই দেখি— যে রিপোর্ট তৈরি করতে একসময় সারা দিন লাগত, আজ সেটা অনেক কম সময়ে দাঁড় করানো যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাকি সময়টা আমার হয়ে গেল। বরং সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন আসে— আর কী করা সম্ভব?

কাজ সহজ হয়েছে। কাজের পরিমাণও বেড়েছে। আর কোথাও কোথাও কাজ সহজ হতে হতে কাজটার পেছনের শ্রমটাও চোখের আড়ালে চলে গেছে।

কয়েক সেকেন্ডে একটা ছবি তৈরি হলে ছবির পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করা মানুষটির মূল্য আমরা কতটা মনে রাখি? মুহূর্তে লেখা তৈরি হলে একটা বাক্যের পেছনে বসে থাকা সময়টার মূল্য কতটা থাকে? একটা উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া গেলে সেই উত্তর খুঁজতে শেখার ধৈর্যটুকুর কী হয়?

সহজে পাওয়ার অভ্যাস শুধু আমাদের সময়ের ধারণা বদলায়নি। হয়তো মূল্যের ধারণাটাও বদলেছে।

তবে গল্পটা এখানেও থামে না। কারণ যে রাস্তা দিয়ে ভালো জিনিস দ্রুত আমাদের কাছে আসে, সেই রাস্তা দিয়ে খারাপ জিনিসও আসে।

একটা মিথ্যা ছড়াতে এখন আর অনেক মানুষের দরকার হয় না। একটা স্ক্রিন আর কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। কাউকে অপমান করতে তার সামনে দাঁড়াতে হয় না। ভুয়া পরিচয়ে বিশ্বাস অর্জন করা যায়, অন্যের ছবি মুহূর্তে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, একটা গুজব সত্যের আগেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

প্রযুক্তি মানুষের উপকার করার অনেক পথ সহজ করেছে। ক্ষতি করার কিছু পথও সহজ করেছে।

একসময় কাউকে আঘাত করার অনেক পথেই কিছুটা দূরত্ব পেরোতে হতো। এখন কখনো একটা নামহীন অ্যাকাউন্টের আড়াল থেকেই একজন মানুষের দিনের পর দিন শান্তি নষ্ট করা যায়।

এখানেই আমার মাঝে মাঝে মনে হয়— আমরা শুধু সময় বাঁচাইনি। অনেক কাজ থেকে দূরত্বটাও সরিয়ে দিয়েছি।
আর দূরত্ব সব সময় বাধা ছিল না।

কিছু দূরত্ব মানুষকে ভাবার সময় দিত। একটা চিঠি লিখে পোস্ট করার আগে আবার পড়ার সময় ছিল। রাগের কথাটা কাউকে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হয়তো রাগটা একটু কমত। এখন রাগ আর “send” বাটনের মাঝখানে দূরত্ব কয়েক মিলিমিটার।

আঙুল আগে পৌঁছে যায়। অনুশোচনা কখনো পরে আসে।

প্রযুক্তি এখন আর শুধু আমাদের কাজ সহজ করার যন্ত্রও নয়। ধীরে ধীরে সে আমাদের জীবনের এমন সব জায়গায় ঢুকে পড়েছে, যেখানে একসময় শুধু মানুষেরই প্রবেশ ছিল।

কখনো সারাদিনের ক্লান্তি, কাজের চাপ, সম্পর্কের জটিলতা কিংবা এমন কোনো কথা – যেটা পরিচিত কাউকে বলতে সংকোচ হয় – মানুষ আজ একটা যন্ত্রকেও বলে।

ওপাশের যন্ত্রটা হয়তো কিছুই অনুভব করে না। আমার মন খারাপ হলে তার মন খারাপ হয় না। আমার একাকিত্ব সে নিজের ভেতরে বহন করে না।

তবু সে শোনে। মাঝপথে থামিয়ে নিজের গল্প বলতে শুরু করে না। বিরক্ত হয় না। কথার জন্য বিচার করে না। রাত দুটো বাজলেও বলে না – আজ থাক, কাল কথা হবে।

সে একাকিত্ব বোঝে না। শুধু একা মানুষটাকে কিছুক্ষণ কথা বলার জায়গা দেয়।

সেটা সঙ্গ নয়, কিন্তু নীরবতার চেয়ে কম নিঃসঙ্গ। এতে মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। বরং প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে ওঠে –

এত সহজে একে অন্যের কাছে পৌঁছাতে পারার যুগে মানুষ কেন এমন কিছু কথা একটা যন্ত্রকে বলতে স্বস্তি পায়, যা আরেকজন মানুষকে বলতে পারে না?

হয়তো যন্ত্র মানুষের মতো হচ্ছে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন – মানুষ কি মানুষের জন্য যথেষ্ট সময় রাখছে?
তাই দোষটা হয়তো যন্ত্রের নয়।

প্রশ্নটা সম্ভবত- আমরা যন্ত্রের গতির সঙ্গে নিজেদের কতটা বদলে ফেলেছি?

আমরা দ্রুত উত্তর চাই। দ্রুত ফল চাই। দ্রুত সাফল্য চাই। সম্পর্কেও কখনো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিই। একটা মানুষকে জানার আগেই তার কয়েকটা ছবি, কয়েকটা বাক্য, কয়েকটা মতামত দেখে তাকে বুঝে ফেলেছি বলে ধরে নিই।

অথচ মানুষ তো কয়েক সেকেন্ডে পড়ে ফেলা কোনো ফাইল নয়।

মানুষকে জানতে সময় লাগে।

বিশ্বাস তৈরি হতে সময় লাগে।

কোনো কাজ ভালোভাবে শিখতে সময় লাগে।

ভুল বুঝতে এবং বদলাতেও সময় লাগে।

সম্ভবত কিছু জিনিস দ্রুত হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।

একটা বীজকে দ্রুত টেনে বড় করা যায় না। একটা শিশুকে একদিনে বড় করা যায় না। ভালোবাসাকে তাড়াহুড়ো করে পাওয়া যায় না। শোককেও দ্রুত পার হয়ে যাওয়া যায় না।

মানুষের জীবনের কিছু অংশ এখনও পুরোনো ঘড়িতেই চলে। অথচ আমরা সেখানে নতুন পৃথিবীর গতি বসাতে চাই।

হয়তো সেই কারণেই এত কিছু সহজ হওয়ার পরও আমরা ক্লান্ত। এত যোগাযোগের পরও কখনো একা। এত বিনোদনের মধ্যেও বিরক্ত। এত তথ্যের মধ্যেও বিভ্রান্ত।

আর এত সময় বাঁচিয়েও বলি – সময় নেই। হয়তো বাঁচানো সময়গুলো কোথাও হারিয়ে যায়নি। আমরাই সেগুলো আবার কাজ দিয়ে, শব্দ দিয়ে, নোটিফিকেশন দিয়ে, তাড়াহুড়ো দিয়ে ভরে দিয়েছি।

আমি এই পৃথিবী ছেড়ে পুরোনো পৃথিবীতে ফিরতে চাই না। তবে বাঁচানো সময়ের কিছুটা যদি আবার মানুষের জন্য রাখতে পারতাম।

২ অক্টোবর, ২০২৬

শার্লট, নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। স্মৃতি, মানুষ ও জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন।


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।