দু’টি কবিতা


১.
এক বাউলের গল্প

একদিন এক বাউলের দেখা পেয়েছিলাম
যখন সে এসেছিল তখন ছিল হেমন্ত
ধানের গন্ধে ভরে ছিল পথ
পুকুরের জলে আকাশ নামছিল ধীরে
দূরের গাছেরা দাঁড়িয়ে ছিল শোনার ভঙ্গিতে
বাতাসে ছিল অচেনা ডাকে ভেজা শান্তি।

যখন বাউল এসেছিল
তার গলায় ছিল ধুলো আর আলো একসাথে
তার গান ছিল আগুন পোহানো শীতের মতো উষ্ণ
তার সুরে জড়িয়ে ছিল হারানো যত কথা
কী নরম, কী গভীর!

সে এসেছিল দরজার চৌকাঠ কেঁপে উঠল
মনের ভেতর জমে থাকা নীরবতা
হঠাৎ খুলে গেল
আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ল গানের পা
মাটির শরীরে আঁকতে লাগল বৃত্ত।

আমার তখন অনেক হিসেব
ঘরের চালে ফুটো
উনুনে হাঁড়ি
মানুষের কষ্ট
নিজের ব‍্যথা
সব মিলিয়ে অনেক।

মনটা উঠল, নামল
ভেতর থেকে কেউ বলল
এখনই যাও
কিন্তু আমার অনেক দেরি হয়ে গেল
আমার নিয়ম
আমার অভ্যাস
আমার ভয়
আমার প্রতিদিনের
থামা না শেখা হাঁটা আমাকে বেঁধে রাখল।

সব শেষে যখন বেরোলাম পথ তখন ফাঁকা
রোদ ঝিমিয়ে পড়েছে
বাউলের একতারা পড়ে ছিল ধুলো মাখা
গোধূলির আলোয় একটা ক্লান্ত পাখির মতো।

আমি তাকে খুঁজলাম,
ডাকলাম, কিন্তু সে নেই।
আকাশে প্রথম সন্ধ্যাতারাটি  জ্বলে উঠল
যেন বলে উঠল 
যা আসে
সবকিছুর জন্য তখন সময় থাকে না।

২.
শেষ গন্তব্য

দূরের আকাশে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে আলো,
নদীর জলে ভেসে যায় দিনের শেষ নিঃশ্বাস
মানুষ হাঁটে কখনও স্বপ্নের পেছনে,
কখনও স্মৃতির ছায়ায়।

হাত বাড়ায়, স্পর্শ পায় না,
শব্দ আসে, আবার হারিয়ে যায় নিঃশব্দে।
প্রতিটি মুহূর্তে আমরা ছুঁই না কিছুই,
কিন্তু সমস্ত কিছু আমাদের ছুঁয়ে যায়।

একটি পাখি উড়ে যায়, পাতার ছায়া নাড়া দেয়,
বাতাসে গন্ধ, মাটির উষ্ণতা
সবই মিলিয়ে যায় একটি অদৃশ্য পথে।

শেষে আমরা কিছুই রাখি না
শুধু নিঃশ্বাস ফেলে যাই তারপর
ধূলি, আলো, ছায়া সবই মিলিয়ে যায় অনন্তে
এটাই আমাদের শেষ গন্তব্য,
যেখানে পথ কখনো শেষ হয় না,
শুধু চলতে থাকা, নিঃশেষ নীরব যাত্রা।


নিঘাত কারিম | হিউস্টন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত বই – ‘গোধূলির ছোঁয়া’ ও ‘প্রতিবিম্বের কাছাকাছি’। প্রকাশিত ছোট গল্পের ই-বুক – যা কিছু গল্প হয়ে রয়।



Previous Post
Next Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *