হাস্যবদনা

Post Views: 75
6 min read

রান্না করতে করতে তেলের ঝাঁঝ চোখে লেগে যাওয়ায় উমা বাইরের ড্রয়িং রুমে বেরিয়ে এলো। চোখের জল মুছতে মুছতে দেখলেন মেয়ে ঐশীর স্নান করা ভিজে গামছাটা সোফার উপরে। গরম তেলের মতো ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “আবার তুই ভিজে জিনিসটা সোফার উপরে রেখে দিয়েছিস, কী ভেবেছিস? পরের ঘরে তুই এরকম কাজ করে পার পেয়ে যাবি? তোর সংসার করা লাটে উঠে যাবে। মনে রাখিস।”

ব্যস লেগে গেল তেরেপাট মা-মেয়ের মধ্যে। ত্রিপুরা ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মেয়ে কি নীরব থাকবে? মেয়ের মত অনুযায়ী ও ভুলে গেলে কি করতে পারে? ইচ্ছে করে এসব করছে না। কিন্তু মাকে অনেক বলেও বোঝানো যাচ্ছে না। আজকাল মায়ের কথাগুলো চামড়তে না লেগে একেবারে হাড়ে গিয়ে বিঁধছে। অনেক সহ্য করেছে, কিন্তু এখন সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।

মেয়ের অন্য কত রকমের কাজ থাকে, এর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট অন্যতম, চাকরির চিন্তাও টুকটাক আছে। সেগুলো চিন্তা করতে করতে এসব ছোটখাটো ব্যাপার মনে থাকে না। এর জন্য কী বর বা শাশুড়ি ওকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে? মায়ের জ্বালাতন আর নীরবে সহ্য করা যাচ্ছে না। প্রতিবাদ করবে। কিন্তু প্রতিবাদ করতে গেলে প্রথম যে গুণটা দরকার, ‘রাগ‘ সেটা তো ওর নেই।

মুখে সব সময় হাসি, সেটাও মায়ের সহ্য হয় না। মেয়েছেলের কেন এত হাসি? হাসি মেয়ের একটা বদগুন। এরা নাকি অলুক্ষণে। তাই মেয়ের এই হাসি মায়ের উচ্চ রাগের কারণ হয়ে যায়, তখন প্রতিবেশীরও মুখে হাসি ফুটিয়ে দেয়। ওরাও মজা নেয়। কারণ একই, মেয়েমানুষ কেন এত হাসে? কেন আনন্দে আছে, কেন ভালো থাকবে? সেরকম তো চাকরি বাকরি করে না। তাই মেয়েটির প্রতি আক্রোশ ঠিক আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। পুড়িয়ে দিতে চায় মেয়েটির হাসির সঙ্গে ওর সুখ, আনন্দ।

মা-মেয়ের এই কাজিয়া যখন তখন ঐশীদের বাড়ির নীরবতা খানখান করে ভেঙে দেয়। নিন্দুকেরাও নীরবে ছেড়ে দেয় না, আড়ালে আবডালে অনেক কিছু বলে। কিন্তু নিষ্পাপ হাসির ফুল আবার পল্লবিত হয় কারণ অকারণে, মুখরিত হয় সমস্ত দুঃখ, বাধা অতিক্রম করে।

মা রেগে গেলেও পরক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে গিয়ে মেয়ের সঙ্গে মজা করে। তাও ঝগড়ার মাধ্যমে। ভেতরে ভেতরে আনন্দ পেলেও তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে না। মনে মনে একমাত্র সন্তানের সঙ্গে অভিনয় করতে থাকেন। জানেন মেয়ের সরলতা আর সব কিছু ভুলে যাওয়া।

কলেজ, ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের সঙ্গে হৈ হুল্লোড় করে মেয়েকে আনন্দ করতে দেখলে মুখে আপত্তি করে। কিন্তু অন্তর থেকে নিজের তারুণ্যের সময়ে ফিরে যান। কিন্তু একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করেন। পরের বাড়িতে কেউ কি মেনে নেবে এই হাসি বা হৈ হুল্লোড়? তাই শাসনদণ্ড তুলে নিতে বাধ্য হন বারবারই।

বাড়ির অন্দরমহলে মায়ের বিরোধিতা করার ঐশীর একমাত্র মোক্ষম অস্ত্র হাসি। মায়ের রাগ দেখলে ঐশীর সেই হাসির জোয়ারে টান পড়লেও বন্ধ হয় না, ‘মুচকি’ হয়ে যায়। সেই মুচকি ছন্দে মাকে আগরতলার ভাষায় জানায়- “তুমি আমার কোন জন্মত শত্রু আছিলা, না হইলে আমার মত শান্ত মাইয়াডারে এমন দরে রাগ দেইখাও।”

এরপর মা সেই হাসির সংক্রমণে জর্জরিত হয়ে যান। পালে হাওয়া পেয়ে ঐশী মাকে ঘিরে ধরে- “আচ্ছা কও ছ্যান, কি দেইখা আমাগো বাবা তুমারে ঘরে নিয়া আইছিল, বাবা অনেক ভালা মানুষ, তুমি এইকেরে বাবার যইগ্য নও।”

এবার মায়ের হাসি আর মুচকি পর্যায়ে নেই, অট্ট স্তরে উন্নীত হয়। এরপর মেয়েও অট্টতে যোগদান না করে থাকতে পারে না। মাকে আবার প্রশ্ন করে- “মা তুমি কি পুইণ্য করেছিলা কও ছ্যান?” মায়ের অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন- “কেন!”

ততক্ষণে মেয়ের মনে যেটুকু রাগের উদ্রেক হয়েছিল, তার ষোলআনা উবে গেছে। এর শুধু প্রকাশ পেতে বাকি। মেয়ে গাল ফুলিয়ে নকল রাগ দেখিয়ে বলল- “আমারে কী কইর্যা পাইছ? কোন সুকর্মর ফলর কারণ?”

এরপরের পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়। মা আর অভিনয় করতে পারেন না। ওঁর সমস্ত ঝাঁঝ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলেন- “তুই সত্যি অন্যরকম। জানি পূর্বজন্মে কিছু ভালো কাজ করেছিলাম। তাই তোকে পেয়েছি। কিন্তু যখন তোর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি, তখন মাথাটা ঠিক থাকে না।”

ঐশী উত্তর দেয়- “আচ্ছা মা, তুমি যে কও হাসি ভালা না। কিন্তু কেরে ভালা না? পার্কত লাফিং ক্লাব তুমাদের বয়সর মানুষজন বুকার মতো হাইসে। তার থাইক্যা আমার হাসি তো নির্ভেজাল। আমার সঙ্গত যারা ঘর করব, দ্যাইখা লাও তাদের ব্লাড প্রেসার থাকব না, সুগার হইব না। তুমি দেইখো, আমি তাদের আয়ু বিশ বছর বাইড়ে দিতাম।”

মা জানে কথাটা সর্বৈব সত্য। তবুও এক নতুন ঘরে এক অপরিচিত বউয়ের হাসি মেনে নেবে ক’জন? কোন শাশুড়ি চায় ছেলের বৌ হাসিখুশী ও আনন্দে থাকুক!

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

হাওড়া, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

আকাশবাণীতে কর্মরত, সাহিত্য ভালোবাসেন। পাঠক।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।