পড়শী মূল রচনাবলী নোবেল পুরস্কার: পরিসংখ্যানের গল্প

নোবেল পুরস্কার: পরিসংখ্যানের গল্প

Post Views: 94
21 min read

একবার, ১৮৮৮ সালে, ভাই লুডভিগের মৃত্যুর পর এক ফরাসি পত্রিকা ভুল করে আলফ্রেড নোবেলেরই মৃত্যুসংবাদ ছেপেছিল, শিরোনামে তাঁকে ডাকা হয়েছিল ‘মৃত্যুর সওদাগর’। ডিনামাইটের আবিষ্কর্তা ও কারবারি সেই আলফ্রেড নোবেলই শেষ পর্যন্ত তাঁর সম্পদের সিংহভাগ লিখে দিলেন শান্তি আর জ্ঞানের পুরস্কারে। কী বলা যায় একে? ইতিহাসের পরিহাস?

এরপর ১৯০১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত নোবেল দেওয়া হয়েছে ৬৩৯ বার। বিজয়ী ১,০০০ জন মানুষ ও ২৮টি সংগঠন (এ বছরই ব্যক্তি-বিজয়ীর সংখ্যা হাজার ছুঁয়েছে ); একাধিকবার পাওয়ার কারণে মোট ‘প্রাপ্তি’ ১,০৩৬টি। পুরস্কারের অঙ্ক এখন ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার। আজ তাহলে দেখা যাক, কার ঝুলিতে কত নোবেল, কে নিলেন না, আর কে পেলেন না।

৬৩৯
নোবেল দেওয়া হয়েছে
১,০০০
বিজয়ী মানুষ
২৮টি
সংগঠন
১,০৩৬টি
মোট ‘প্রাপ্তি’

নোবেলের তালিকা শুধু প্রতিভার তালিকা নয়; আমি বলব, প্রতিভা কোথায় পাওয়া যায়, তার একটা মানচিত্র। এই মানচিত্র দেখতে বসলে যে প্রশ্নগুলো মাথায় আসে-

কোন দেশ, ধর্ম বা লিঙ্গের মানুষ নোবেল পাওয়ায় এগিয়ে? আর সেটা কি মেধার ফল, নাকি সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকা আর যোগাযোগের?
২৫ কোটিরও বেশি মানুষের ভাষা বাংলা, অথচ বাংলাভাষীদের মধ্যে নোবেল এসেছে মাত্র চারবার। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা আর উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর মতো নাম পাশে রেখেও আমাদের স্কোরবোর্ডের এই হাল কেন?
নোবেলজয়ী রাষ্ট্র: কার ঝুলিতে কত

দেশভিত্তিক তালিকা নিয়ে সব সূত্র একমত নয়; যাঁর একাধিক দেশের সঙ্গে যোগ আছে, তাঁকে কোন দেশে ধরা হবে, তা নিয়ে একেক তালিকার একেক নিয়ম। তবে মোটা দাগে ছবিটা এক (সংখ্যা ২০২৫ পর্যন্ত; ২০২৬-এর হিসাব নিচে):

যুক্তরাষ্ট্রপ্রায় ৪২৩ থেকে ৪৩০
যুক্তরাজ্যপ্রায় ১৪৩ থেকে ১৪৫
জার্মানিপ্রায় ১১৫ থেকে ১১৬
ফ্রান্সপ্রায় ৭৬ থেকে ৮০
সুইডেন৩৪
জাপান ও রাশিয়া (সোভিয়েত আমলসহ)প্রায় ৩১ করে

১৯০১ সালে বিজয়ী সবাই ছিলেন ইউরোপীয়। ১৯৩০-এর দশক থেকে নোবেল আটলান্টিক পেরোতে শুরু করে, আর যুদ্ধোত্তর যুক্তরাষ্ট্র গবেষণায় বিপুল অর্থ ঢেলে আজ এক নম্বরে। তবে মাথাপিছু হিসাব অন্যরকম, ২০১৩ পর্যন্ত প্রতি এক কোটি মানুষে যুক্তরাজ্যে ছিল প্রায় ১৯ জন, জার্মানিতে সাড়ে ১২ জন, যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ১০.৮ জন নোবেলজয়ী।

প্রতি এক কোটি মানুষে
যুক্তরাজ্যপ্রায় ১৯ জন
জার্মানিসাড়ে ১২ জন
যুক্তরাষ্ট্রমাত্র ১০.৮ জন

আমাদের অঞ্চলে বাংলাদেশের ঝুলিতে একটিই, মুহাম্মদ ইউনূস (২০০৬, শান্তি)। পাকিস্তানের দুটি, আবদুস সালাম (১৯৭৯, পদার্থ) ও মালালা ইউসুফজাই (২০১৪, শান্তি)। ভারতের সংখ্যা গণনাপদ্ধতিভেদে ১০ থেকে ১৩।

বাংলাদেশ১
পাকিস্তান২
ভারত১০ থেকে ১৩
২০২৬-এর আসর:
পুরস্কার বিজয়ী দেশ কীসের জন্য
চিকিৎসাকার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেমান, গেয়র্গ নাগেলযুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিআলো ব্যবহার করে মস্তিষ্কের কাজ বোঝার প্রযুক্তি, অপটোজেনেটিক্স
পদার্থফ্রান্সিস হালজেনবেলজিয়ামে জন্ম, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরতআইসকিউব মান-মন্দির ও মহাজাগতিক উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তকরণ
রসায়নঅঁরি কাগান (৯৫), কেনসো সোআই (৭৬)ফ্রান্স, জাপান‘আয়নার প্রতিবিম্ব’ অণুর ধাঁধা: অসম জৈব সংশ্লেষণে অ-রৈখিক প্রভাব ও স্বয়ং-প্রভাবনা
সাহিত্যঅ্যান কারসনকানাডাধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে খেলাচ্ছলে সংলাপে সাহিত্যের নতুন রূপ গড়ার জন্য
শান্তিনাভি পিল্লাই (৮৫)দক্ষিণ আফ্রিকাশান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারে
অর্থনীতিরবার্ট হল (স্ট্যানফোর্ড), মাইকেল উডফোর্ড (কলম্বিয়া)যুক্তরাষ্ট্রসামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সূক্ষ্ম-অর্থনৈতিক ভিত্তি; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদনীতির তাত্ত্বিক ভিত

এই আসর যোগ করলে যুক্তরাষ্ট্রের খাতা আরও চার (ডাইসেরথ, হালজেন, হল ও উডফোর্ড; হালজেন বেলজিয়ামে জন্ম নিলেও কর্মরত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানে), অর্থাৎ প্রায় ৪২৭ থেকে ৪৩৪। জার্মানি দুই; ফ্রান্স, জাপান, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকা এক করে বাড়ল। ছয়টি পুরস্কারের তিনটিতেই (চিকিৎসা, পদার্থ, অর্থনীতি) মার্কিন নাম আছে। যুক্তরাজ্য এবার খালি হাতে।

দেখা যাচ্ছে, বিজয়ীর জন্মদেশ আর কর্মদেশ প্রায়ই মেলে না, হালজেনের মতো। নোবেল আসলে সেখানেই জমা হয়, যেখানে দীর্ঘ মেয়াদে গবেষণার অর্থ, প্রতিষ্ঠান আর স্থিতি আছে।
ধর্মের হিসাব: নোবেলজয়ীরা কোন ধর্মে বিশ্বাসী?

নোবেল কমিটি বিজয়ীর ধর্ম জিজ্ঞেস করে না। তাই এ হিসাব আসলে গবেষকদের সংকলন। সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত বারুচ শালেভের গবেষণা (১৯০১–২০০০, মোট ৬৫৪ জন বিজয়ী) বলছে:

খ্রিস্টান বা খ্রিস্টীয় পটভূমির৬৫.৪%
ইহুদি২০%-এর বেশি (১৩৮ জন)
নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী বা মুক্তচিন্তক১০.৫%
মুসলিম মাত্র ৫ জন, বৌদ্ধ ৭ জন, হিন্দু ৩ জন

সাহিত্যে নাস্তিক-অজ্ঞেয়বাদীর হার লাফিয়ে প্রায় ৩৫%-এ ওঠে। শান্তি পুরস্কারে খ্রিস্টানদের ভাগ সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭৮%। ইহুদিরা বিশ্বজনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম, অথচ নোবেলে তাঁদের ভাগ পাঁচ ভাগের এক ভাগ। তখনকার বিশ্বে প্রতি পাঁচজনে একজন মুসলিম, কিন্তু নোবেলে তাঁরা এক শতাংশেরও কম। ২০০০-এর পর শিরিন এবাদি, ওরহান পামুক, মুহাম্মদ ইউনূস ও মালালা ইউসুফজাইয়ের মতো কয়েকজন যোগ হয়েছেন, কিন্তু অনুপাত তেমন একটা বদলায়নি।

সংখ্যাগুলো যা দেখাচ্ছে, তার চেয়ে যা দেখাচ্ছে না, সেটাই বেশি জরুরি- ধর্ম মেধার মাপকাঠি নয়। এগুলো বরং বলছে, কোন সমাজে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, অর্থ আর সুযোগ বেশি ছিল। তা ছাড়া অনেকে ধর্মকে বিশ্বাস নয়, সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে ধরেন। তাই নোবেলের ক্ষেত্রে বিজয়ী কোন ধর্মের, সেটা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক আলাপ।
নারী ও পুরুষ: সাম্যের দুনিয়ায় অসাম্য?

১৯০১ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে নারীদের হাতে নোবেল গেছে ৬৮ বার; ২০২৬-এ অ্যান কারসন ও নাভি পিল্লাইকে ধরলে ৭০ বার। নারী বিজয়ী এখন ৬৯ জন (২০২৫ পর্যন্ত ৬৭), কারণ মারি কুরি দুবার পেয়েছেন: ১৯০৩-এ পদার্থে, ১৯১১-তে রসায়নে। ১,০০০ জন ব্যক্তির মধ্যে ৬৯ জন মানে ঠিক ৬.৯ শতাংশ। বাকি প্রায় ৯৩ শতাংশই পুরুষ।

নারী ৬৯ জন
পুরুষ ৯৩১ জন

বিজ্ঞানে ছবিটা আরও কঠিন। এএফপির হিসাবে ২০২৫ পর্যন্ত পদার্থে ২৩০ জনের মধ্যে নারী মাত্র ৫, রসায়নে ২০০ জনের মধ্যে ৮, চিকিৎসায় ২৩২ জনের মধ্যে ১৪, অর্থনীতিতে ৯৯ জনের মধ্যে ৩। নারীরা তুলনামূলক এগিয়ে শান্তি ও সাহিত্যে। এ বছর অ্যান কারসন সাহিত্যের ১৯তম নারী বিজয়ী, আর শান্তিতে ৮৫ বছর বয়সী নাভি পিল্লাই। কিন্তু ২০২৬-এর চিকিৎসা, পদার্থ, রসায়ন ও অর্থনীতি, এই চারটি পুরস্কারের সব বিজয়ীই পুরুষ।

পদার্থ২৩০ জনের মধ্যে ৫
রসায়ন২০০ জনের মধ্যে ৮
চিকিৎসা২৩২ জনের মধ্যে ১৪
অর্থনীতি৯৯ জনের মধ্যে ৩
এদিকে, কুরি পরিবারে নোবেল এসেছে পাঁচবার, চারজনের হাতে- পিয়ের কুরি, মারি (দুবার), তাঁদের কন্যা ইরেন ও জামাতা ফ্রেদেরিক জোলিও-কুরি।
সর্বকনিষ্ঠ বিজয়ী মালালা (১৭ বছর, ২০১৪)।
সর্বজ্যেষ্ঠ বিজয়ী জন গুডএনাফ (৯৭ বছর, ২০১৯, রসায়ন)।
তার মানে, ৬৯ জন নারীর সামনে ৯৩১ জন পুরুষ। সমাজের অর্ধেক মেধাই যেন নোবেলের হিসাবের বাইরে থেকে গেছে।
যাঁরা নোবেল নেননি, নিতে পারেননি

নিজের ইচ্ছায় পুরস্কার ফিরিয়েছেন মাত্র দুজন। ফরাসি দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্র ১৯৬৪ সালে সাহিত্যে নোবেল ফিরিয়ে দেন, কারণ তিনি সব সরকারি সম্মানই প্রত্যাখ্যান করতেন। ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামের লে ডুক থো শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে দেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের আলোচনার জন্য তাঁর সঙ্গে পুরস্কার ভাগ করেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। থো-র যুক্তি ছিল, দেশে তখনো শান্তি আসেনি।

আরও চারজনকে নিতে দেননি শাসকেরা। হিটলার তিন জার্মান বিজয়ী, রিখার্ড কুন, আডল্ফ বুটেনান্ট ও গেরহার্ট ডোমাককে, পুরস্কার নিতে নিষেধ করেন। পরে তাঁরা ডিপ্লোমা ও পদক পেলেও টাকা পাননি। রুশ লেখক বরিস পাস্তেরনাক ১৯৫৮ সালে প্রথমে পুরস্কার গ্রহণ করেও সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের চাপে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন।

আর পাঁচজন শান্তি-বিজয়ী পুরস্কারের সময় ছিলেন বন্দী বা গৃহবন্দী- কার্ল ফন ওসিয়েৎস্কি, অং সান সু চি, লিউ শিয়াওবো, আলেস বিয়ালিয়াৎস্কি ও নার্গিস মোহাম্মদি। লিউর বেলায় অসলোর অনুষ্ঠানে তাঁর চেয়ারটি ফাঁকা পড়ে ছিল।

১৯৭৪ থেকে মরণোত্তর নোবেল নিষিদ্ধ। তার আগে দেওয়া হয়েছিল মাত্র দুবার- দাগ হামারশোল্ড (১৯৬১) ও এরিক আক্সেল কার্লফেল্টকে (১৯৩১)। ২০১১ সালে চিকিৎসার বিজয়ী রালফ স্টাইনম্যান ঘোষণার তিন দিন আগে মারা গিয়েছিলেন; কমিটি তা জানত না, তাই তিনি বিজয়ীই রয়ে যান। আর জর্জ বার্নার্ড শ ১৯২৫ সালে সম্মান নিলেও পুরস্কারের টাকা নিতে অস্বীকার করেন।

দেখা যাচ্ছে, নোবেলের খাতা শুধু বিজ্ঞান আর সাহিত্যের নয়, রাজনীতিরও। বারবার দেখা গেছে, মুক্ত সমাজ আর মুক্ত গবেষণা ছাড়া পুরস্কারের মঞ্চে কেউ সহজে উঠতে পারেন না।
আমেরিকার নোবেল আমদানি

যুক্তরাষ্ট্রের সোয়া চারশ নোবেলের কতটা আসলে ‘আমদানি’? ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর আমেরিকান পলিসির (এনএফএপি) হিসাবে ১৯০১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত রসায়ন, পদার্থ ও চিকিৎসায় মার্কিন নোবেলের প্রায় ৩৬ শতাংশ গেছে অভিবাসীদের হাতে। ২০০০ সালের পর অনুপাত ৪০ শতাংশ, অথচ দেশের জনসংখ্যায় অভিবাসী প্রায় ১৫ শতাংশ।

অভিবাসীদের হাতে (১৯০১–২০২৫)প্রায় ৩৬ শতাংশ
২০০০ সালের পর৪০ শতাংশ
দেশের জনসংখ্যায় অভিবাসীপ্রায় ১৫ শতাংশ

২০২৫ সালে ছয় মার্কিন বিজ্ঞান-বিজয়ীর তিনজনই অভিবাসী- জর্ডানে জন্ম ওমর ইয়াঘি, যুক্তরাজ্যে জন্ম জন ক্লার্ক ও ফ্রান্সে জন্ম মিশেল ডেভোরে। এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী ২০১৬ সালে মার্কিন ছয় বিজয়ীর সবাই ছিলেন অভিবাসী। এবারও পদার্থের একক বিজয়ী হালজেন বেলজিয়ামে জন্ম নিয়ে আজ যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত। ইয়াঘির গল্পটা খুব ইন্টারেস্টিং- যে ছোট ঘরে তিনি বড় হয়েছেন, সেখানে পরিবারের গবাদি পশুও থাকত।

দক্ষিণ এশিয়ার চেনা নামও আছে। হরগোবিন্দ খোরানা (১৯৬৮, চিকিৎসা) ও সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর (১৯৮৩, পদার্থ) ভারতে জন্ম নিয়ে মার্কিন নাগরিক হয়েছিলেন।

তার মানে, যে দেশ বিশ্বের সেরা মাথাগুলোকে টানতে পারে, নোবেলের খাতাও তার ভারী হয়। ভিসা, বৃত্তি আর গবেষণা-তহবিলের নীতি তাই নোবেলেরও নীতি। তাহলে এখন প্রশ্ন, আমেরিকা কি নোবেল আমদানি করে যাচ্ছে বছরের পর বছর?
বাংলার নোবেল: যাঁরা পেলেন, যাঁরা পেলেন না

বাংলাভাষী ঘর থেকে নোবেল এসেছে চারবার। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য, প্রথম অ-ইউরোপীয় বিজয়ী। ২০০৪ সালে বিশ্বভারতী থেকে তাঁর নোবেল পদক চুরি যায়, বহু তদন্তেও যার হদিস মেলেনি। ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে অমর্ত্য সেন; শান্তিনিকেতনে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির নাম নাকি রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। ২০০৬ সালে শান্তিতে মুহাম্মদ ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে। আর ২০১৯ সালে অর্থনীতিতে অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়: মুম্বাইয়ে জন্ম, বাঙালি পরিবারের সন্তান, কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র।

১৯১৩
সাহিত্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৯৯৮
অর্থনীতি
অমর্ত্য সেন
২০০৬
শান্তি
মুহাম্মদ ইউনূস
২০১৯
অর্থনীতি
অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

কিন্তু না-পাওয়ার তালিকাটা আরও দীর্ঘ, আরও বেদনার।

জগদীশচন্দ্র বসু। ১৮৯৫ সালে কলকাতার টাউন হলে তিনি দূর থেকে তারহীন তরঙ্গে ঘণ্টা বাজিয়ে আর বারুদে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেখিয়েছিলেন। ১৯০৯ সালের পদার্থের নোবেল গেল মার্কনি ও কার্ল ব্রাউনের ঝুলিতে, বেতার-প্রযুক্তির বিকাশের স্বীকৃতিতে। বসুর ১৯০৪ সালের মার্কিন পেটেন্ট নিয়ে নোবেলজয়ী নেভিল মট নাকি বলেছিলেন, বসু সময়ের অন্তত ষাট বছর এগিয়ে ছিলেন। ২০১২ সালে আইইইই তাঁর মিলিমিটার-তরঙ্গের পরীক্ষাকে ‘মাইলফলক’ স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু নোবেল বসুর অধরা রয়ে গেছে।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ১৯২৪ সালে আলোর কণার পরিসংখ্যান নিয়ে লেখা পাণ্ডুলিপি তিনি পাঠান আইনস্টাইনকে। আইনস্টাইন নিজে জার্মানে অনুবাদ করে সেটি ছাপার ব্যবস্থা করেন। কণার একটি গোটা শ্রেণির নাম হয়ে গেল ‘বোসন’, বসুর নামে (নামটি ডিরাকের দেওয়া বলে ধরা হয়)। বোস–আইনস্টাইন কনডেনসেটের পরীক্ষার জন্য নোবেল পেলেন কর্নেল, কেটারলে ও ওয়াইম্যান (২০০১), আর ‘হিগস বোসন’-এর তত্ত্বে এঙ্গলের্ট ও হিগস (২০১৩)। অথচ নোবেল আর্কাইভ বলছে, ১৯৫৬ থেকে ১৯৭২-এর মধ্যে বসু মনোনীত হয়েছিলেন ১১ বার। একবারও জেতেননি।

মেঘনাদ সাহা মনোনীত হয়েছিলেন ৭ বার (১৯৩০–১৯৫৫)। জন্ম ঢাকার সেওড়াতলীতে, আজকের গাজীপুরে। তাঁর ‘সাহা আয়নীকরণ সমীকরণ’ আজও নক্ষত্রের গঠন বোঝার ভিত্তি।

উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী কালাজ্বরের ওষুধ ইউরিয়া স্টিবামিনের আবিষ্কর্তা, চিকিৎসায় মনোনীত হয়েছিলেন দুবার।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু১১ বার
মেঘনাদ সাহা৭ বার
উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীদুবার

নোবেলের মনোনয়ন-নথি ৫০ বছর গোপন থাকে; তাই এই ‘না-পাওয়া’র হিসাব আমরা জানতে পারি দশকের পর দশক পরে।

এখানে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার খেয়াল করেছেন? চারজনের তিনজন, সেন, ইউনূস ও বন্দ্যোপাধ্যায়, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বড় অংশ করেছেন পশ্চিমের প্রতিষ্ঠানে (কেমব্রিজ, ভ্যান্ডারবিল্ট, হার্ভার্ড)। রবীন্দ্রনাথের নোবেল এসেছে নিজের ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র হাত ধরে, আর সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে ছাপার অক্ষরে তুলতে লেগেছে আইনস্টাইনের কলম। বাঙালির প্রতিভা আসলে কম পড়েনি; কম পড়েছে সেই প্রতিভাকে বিশ্বের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার সেতু- ভাষা, নেটওয়ার্ক, প্রতিষ্ঠান।
‘শান্তি’ এরপর কার?

নোবেলের হিসাবের গম্ভীর খাতা বন্ধ করার আগে একটু হাসা যাক, কারণ নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসটা একটা সিটকম ছাড়া আর কিছুই না।

১৯৭৩ সাল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থামানোর আলোচনার জন্য দুজনকে শান্তি নোবেল দেওয়া হলো। একজন হচ্ছেন আমেরিকার হেনরি কিসিঞ্জার, অন্যজন ভিয়েতনামের লি ডাক থো। থো জানালেন, তার দেশে এখনো প্রকৃত শান্তি আসেনি এবং যুদ্ধ পুরোপুরি থামেনি। স্পষ্ট কন্ঠে বললেন “যখন প্যারিস চুক্তিকে সম্মান জানানো হবে, অস্ত্রগুলো নীরব হবে এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামে প্রকৃত শান্তি ফিরে আসবে, কেবল তখনই আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করার কথা বিবেচনা করব।” নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এই সম্মান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আর অন্য বিজয়ী, কিসিঞ্জার, মাত্র এক বছর আগে যিনি ভিয়েতনামে ইতিহাসের ভয়াবহতম কার্পেট বম্বিং এর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি অবশ্য নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন! যদিও প্রবল প্রতিবাদের মুখে তিনি অসলোতে সশরীরে উপস্থিত হন নি শেষ পর্যন্ত।

২০০৯ সালে বারাক ওবামা দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় নয় মাসের মাথায় পেয়ে গেলেন, কমিটির ভাষায় আন্তর্জাতিক কূটনীতি জোরদারের ‘অসাধারণ প্রচেষ্টা’র জন্য। আমাদের ভাষায় একে বলে অগ্রিম বায়না! অসলোর মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেই মেনে নিলেন, তিনি দুই যুদ্ধে জড়ানো এক দেশের সেনাপতি; অর্থাৎ শান্তির পদক নিচ্ছেন যুদ্ধের জুতো পায়ে! কি প্রহসন! এরপর ২০২৫-এ ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকটি যুদ্ধ থামানোর দাবি করে প্রকাশ্যে বললেন, পুরস্কারটা তাঁরই প্রাপ্য। অথচ কমিটি দিল মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে। এবারে, ২০২৬-এও ট্রাম্প পেলেন না। তাঁর আবেদন নাকি এখনো ‘পেন্ডিং’ ফোল্ডারে! এদিকে ঋণের টাকা বাকি থাকলে ঋণ গ্রহীতার বাড়ির গরু-ছাগল জোরপূর্বক তুলে নিয়ে আসার অভিযোগ আছে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের নামে!

ওবামা, গ্রামীণ ব্যাংক আর কিসিঞ্জারের নজির থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আগামীর সম্ভাব্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের কিছু সুপারিশ:

ডোনাল্ড ট্রাম্প, সর্বোচ্চ শান্তি-ঘোষণার জন্য: রোজই এত যুদ্ধ থামানোর দাবি করেন যে, নোবেল কমিটির কয়েক বছর লাগবে ওসব দাবি গুণে শেষ করতে, পুরস্কার তো পরের কথা।
ইলন মাস্ক, একাই একশো হিসেবে: তাঁর এক পোস্টে এক্স কেঁপে ওঠে, শেয়ারবাজারে নামে ধস। মঙ্গলে বসতির যে প্রতিশ্রুতি তিনি দেন, দুর্জনেরা বলে, তা আসলে পৃথিবীতে যেসব গ্যাঞ্জাম তিনি প্রায়ই বাধান, সেসব থেকে প্রস্থানের এক মহাজাগতিক উপায়!
জেনসেন হুয়াং (এনভিডিয়া), গ্রাফিক্স কার্ডের লাইনে শান্তির জন্য পুরস্কার: এআইয়ের জন্য চিপ বানাতে বানাতে গ্রাফিক্স কার্ড আর র‍্যামের এমন আকাল ও আকাশছোঁয়া দাম করেছেন যে, দুনিয়ার মানুষ এখন যুদ্ধের বদলে গ্রাফিক্স কার্ডের দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। আর লাইনে দাঁড়ানো মানুষের যুদ্ধ করার সময় কোথায়! হুয়াং হচ্ছেন লেদার জ্যাকেট পরিহিত এক শান্তিদূত, সম্ভবত T-1000 মডেলের!
স্যাম অল্টম্যান (চ্যাটজিপিটি), হোমওয়ার্ক শান্তি পুরস্কার: তিনি ছাত্রদের দিয়েছেন শান্তিময় রাতের ঘুম, অশান্তি এখন শুধু শিক্ষকদের, তারা খাতা দেখেন আর ভাবেন, এটা ছাত্রের লেখা, না জিপিটির? এটাও ভাবেন যে খাতা দেখার কাজটাই না পরদিন থেকে উঠে যায়!
দারিও আমোদেই (অ্যানথ্রপিক), অতি-ভদ্রতার জন্য: এমন নিরাপদ আর ভদ্র এআই বানিয়েছেন যে, সে মাঝেমধ্যে বিনয়ের সঙ্গে বলে, “দুঃখিত, এটা করতে পারব না।” এআইয়ের অতি ব্যবহারে কিউসেকের পর কিউসেক মিঠাপানি খরচ আর বিশ্ব উষ্ণায়ন ঠেকিয়ে, বিশ্বশান্তি রক্ষায় এর চেয়ে বড় অবদান আর কী হতে পারে? কাজ না করে পরিবেশ বাঁচানো, এর চেয়ে মহৎ উদ্যোগ আর আছে নাকি?
নোবেল পাওয়ার টোটকা (Not on a serious note!)

তো, পরিসংখ্যান ঘেঁটে পাওয়া নোবেলজয়ের কিছু ‘টোটকা’ এখানে শেয়ার করছি, আপনারা যারা নোবেল পেতে আগ্রহী, তারা এগুলো কাজে লাগাতে পারেন:

নিয়মিত ফান্ডিং, ভালো কাজের পরিবেশ আর ভালো সহকর্মী: বিজয়ীদের কর্মস্থলে রয়েছে দীর্ঘ মেয়াদের গবেষণা-তহবিল আর স্থিতিশীল ল্যাব, সঙ্গে তাঁরা পান বিশ্বমানের সহকর্মী। কাজেই নোবেল পেতে হলে আপনাকে আগে এমন একটা কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিভাবানদের জন্য খোলা দরজা: যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান-নোবেলের প্রায় ৩৬ শতাংশ অভিবাসীদের। যে দেশ প্রতিভাকে বরণ করে নেয়, নোবেল সেখানেই জমা হয়। তাই যেখানে আপনার প্রতিভার সঠিক বিকাশ হবে, সেখানেই তাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন।
ভাষা, নেটওয়ার্ক আর সুপারিশকারী: রবীন্দ্রনাথের ছিল ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ছিল আইনস্টাইন, সেন-ইউনূস-বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়। কাজেই আপনার কাজ বিশ্বজনীন ভাষায় (প্রধানত ইংরেজিতে) পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আপনাকে বা অন্য কাউকে নিতে হবে। আর মনোনয়নের পেছনে কাউকে লেগে থাকতে হয়, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ১১টি মনোনয়নের পাঁচটি এসেছে একজনেরই কাছ থেকে, এম. জি. কে. মেননের (মাম্বিলিকালাথিল গোবিন্দ কুমার মেনন, প্রখ্যাত ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী, ১৯৭২ সালে স্বল্পকালের জন্য ইসরোর চেয়ারম্যান), আর মেঘনাদ সাহার সাতটির চারটিই শিশিরকুমার মিত্রের (এস. কে. মিত্র, ভারতে আয়নোস্ফিয়ার-বিজ্ঞান ও বেতারপ্রযুক্তির পথিকৃৎ)। এমন শক্তিশালী সুপারিশকারী থাকলে নোবেলের দৌড়ে আপনি এগিয়ে থাকবেন!
সত্যেন্দ্রনাথ বসু১১টির পাঁচটি
মেঘনাদ সাহাসাতটির চারটি
শেষ কথা
নোবেল অবশ্যই বড় স্বীকৃতি, কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। সত্যেন্দ্রনাথ বসু নোবেল পাননি, অথচ ‘বোসন’ শব্দটি আজও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিটি পাঠ্যবইয়ে বেঁচে আছে। সাহার নাম বেঁচে আছে নক্ষত্রবিজ্ঞানের সমীকরণে। আর নিউটনের কথা ভাবুন, তাঁর কাজের স্বীকৃতি দিতে নোবেল পুরস্কারই ছিল না, তাতে তাঁর অবদান কি একটুও ম্লান হয়েছে? শেষ পর্যন্ত পুরস্কারের পদক নয়, মানুষের জ্ঞানভান্ডারে আর মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় কে কতটা স্থায়ী ছাপ রেখে গেলেন, সেটাই আসল।
তথ্যসূত্র ও টীকা

সব সংখ্যা ১২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত। দেশভিত্তিক ও ধর্মভিত্তিক সংখ্যা সূত্রভেদে কিছুটা আলাদা; ২০২৬-এর ছয়টি পুরস্কারই ধরা হয়েছে।

১২ অক্টোবর, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

স্থপতি, শিক্ষা উন্নয়ন কর্মী। শিল্প-স্থাপত্য নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চায় থাকি।


Next

3 Responses

  1. খুব সুন্দর গুছিয়ে লিখেছেন। নোবেল নিয়ে এত ডিটেইলস আর ডাটা এক জায়গায় পেয়ে বেশ ভালো লাগলো। এরকম ইনফরমেটিভ লেখা আরও চাই!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।