আজকের এই অনলাইনের যুগে নতুন করে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস নিয়ে লেখার যদিও কোনো অর্থ নেই, তবুও পড়শীর পাঠকদের জন্য কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তথ্যগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারি, যদিও তথ্য সংগ্রহের জন্য আমিও গুগলের কাছেই হাত পেতেছি। অক্টোবর শুরু মানে নোবেলের মৌসুম। অক্টোবরের প্রথম সোমবার থেকে ছয় দিনব্যাপী সারা বিশ্বের ছয়জন পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা শুরু হয়। প্রথম দিন ঘোষণা করা হয় চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল বিজয়ীর নাম এবং অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয় বছরের মোট ছয়টি শাখায় নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা। পড়শীর এই সংখ্যা যখন পাঠকের কাছে যাবে ততদিনে তাই ২০২৬ এর নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম সবার জানা হয়ে যাবে।
সুইডেনের স্টকহোমে ১৮৩৩-এর ২১ অক্টোবর জন্ম আলফ্রেড নোবেলের। শুধু বিজ্ঞানী কিংবা উদ্ভাবকই ছিলেন না, ছিলেন শিল্পপতিও। অর্থের অভাব তাই ছিল না। সবাই জানি তিনিই মৃত্যুঘাতী ডিনামাইটের আবিষ্কারক। হয়তো এই আবিষ্কার না করলে আমরা আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মনজনক নোবেল পুরস্কারের সূচনা দেখতাম না। ১৮৮৮ সালে একটি পত্রিকা ভুলবশত আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করে এবং তাঁকে “মৃত্যুর ব্যবসায়ী” (Merchant of Death) বলে উল্লেখ করে। এতে তিনি দুঃখ পান এবং অনুতপ্ত হন। তার চাওয়া হয়ে উঠে, মানুষ যেন তাঁকে ধ্বংসের নয়, বরং কল্যাণের জন্য স্মরণ করে। নোবেল তাঁর উইলে উল্লেখ করেন, তার সম্পদ থেকে একটি তহবিল গঠন করা হবে, যা থেকে প্রতি বছর এমন ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করা হবে, যারা মানবজাতির উন্নতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী, প্রথম নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় পাঁচটি শাখায়— রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসা, সাহিত্য এবং শান্তি। পরে ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে অর্থনীতিতেও নোবেল পুরস্কার যোগ হয়, যার আনুষ্ঠানিক নাম ব্যাংক অব সুইডেন প্রাইস।
যখন নোবেল ফাউন্ডেশন ও তার নীতিমালাগুলো চূড়ান্ত হলো তখন থেকেই নোবেল কমিটি প্রথম পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন সংগ্রহ করা শুরু করে। পরবর্তীতে তারা প্রাথমিক নির্বাচিত প্রার্থীদের একটি তালিকাও পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে দেয়। নোবেলের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ১৯০১ সালের ১০ ডিসেম্বর ইতিহাসের পাতায় যোগ হয় এক নতুন অধ্যায়—প্রথমবারের মতো নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি জরজেন লভল্যান্ড, জর্ন স্টার্ন জর্নসন এবং জোহানিজ স্টিনের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রদানের জন্য নিয়োগ দেয়। সেই কমিটি বিখ্যাত দুই জনকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করে, যারা ১৯ শতকের শেষের দিকে শান্তি আন্দোলনকে বেগবান করেছিল। তারা ছিলেন আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়নের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফেদ্রিক পাসি ও রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠাতা অঁরি দ্যুনঁ। চিকিৎসা শাখায় পুরস্কার পান এমিল ভন বেহরি। পদার্থ বিজ্ঞানে ভিলহেল্ম রন্টগেন, রসায়নে ফান্ট হফ, সাহিত্যে স্যুলি প্র্যুদম। নোবেল কমিটির পদার্থের পুরস্কারের জন্য মনোনীতের তালিকায় ছিলেন এক্স রশ্মি আবিষ্কারের জন্য ভিলহেল্ম কনরাড রন্টগেন এবং ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে কাজ করার জন্য ফিলিপ লেনার্ড। পরে বিজ্ঞান একাডেমি রন্টগেনকে নির্বাচিত করে।
১৯ শতকের শেষ দশকে অনেক রসায়নবিদ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তাই রসায়নে পুরস্কার দেবার ক্ষেত্রে একাডেমি এতজন বিজ্ঞানীর মধ্যে কাকে পুরস্কৃত করা যায় তা নিয়ে সামান্য সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। একাডেমি ২০টি মনোনয়ন পায়। তার মধ্যে ১১টিকেই ছিল ফান্ট হফের নাম। রাসায়নিক তাপগতিবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করার জন্য তিনি এই পুরস্কারে ভূষিত হন। সুইডিশ একাডেমি সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে কবি সূলি প্রুধমকে। লেখক, কবি ও সাহিত্য সমালোচকদের ৪২ জনের একটি দল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে যারা এর জন্য লিও টলস্তয়কে প্রত্যাশা করছিল। বার্টন ফেল্ডম্যানের মতো অনেকেই এই পুরস্কারের সমালোচনা করেছিল কারণ তারা প্রুধমকে মধ্যমসারির কবি মনে করত। ফেল্ডম্যানের ব্যাখ্যানুযায়ী, একাডেমির অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যের ভক্ত। তাই তারা সেরকম একজন কবিকেই বেছে নিয়েছেন। চিকিসায় প্রথম নোবেল পুরস্কার পান জার্মান চিকিৎসক ও অনুপ্রাণবিজ্ঞানী এমিলি ভন বেরিংকে। ১৮৯০ এর দশকে তিনি ডিপথেরিয়া প্রতিরোধক তৈরি করেন, যা আজ পর্যন্ত প্রতি বছর হাজার লোকের জীবন রক্ষা করে চলছে।
১৯০২ সাল থেকে সুইডেনের রাজা স্টকহোমে পুরস্কার বিতরণ করে আসছেন। প্রথম বছর সুইডেনের রাজা ছিলেন রাজা ২য় অস্কার; তিনি এতো মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কার বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার বিরোধী ছিলেন। এজন্য তিনি পু্রষ্কার প্রদানে সম্মত হননি। পরবর্তীতে অবশ্য জনপ্রিয়তা রক্ষার জন্য এবং সুইডেনের সম্মান রক্ষার খাতিরেই তাকে মত পরিবর্তন করতে হয়েছে। ১৯০৪ সালে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি গঠিত হয়। এর আগে নরওয়ের রাষ্ট্রপতি নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতার দায়িত্ব পালন করতেন। গঠনের পর কমিটির ৫ জন সদস্য শান্তি পুরস্কার দেবার জন্য গবেষণামূলক কার্যক্রমের দায়িত্ব পালন করে। তাদেরকে নরওয়েজীয় আইনসভা মনোনয়ন দেয়, তথাপি তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। নরওয়ের আইনসভার সদস্যরা এই কমিটিতে অংশ নিতে পারেন না।
৫টি শাখার প্রতিটি পুরস্কারের মূল্য ৯ লাখ মার্কিন ডলার। যদিও বিজয়ীদের নাম অক্টোবরের মাঝামাঝি জানা হয়ে যায়, কিন্তু প্রতিবছর ডিসেম্বরের ১০ তারিখ বিজয়ীর হাতে পুরস্কারের অর্থ তুলে দেওয়া হয়। ১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেল মারা যান। সে জন্য এই তারিখেই বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় নরওয়েতে। কিন্তু সাহিত্য ও অর্থনীতির মতো অন্যান্য পুরস্কার সুইডেন থেকে দেওয়া হয়। আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাতেই এমনটি করা হয়। এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি। আলফ্রেড নোবেল বেঁচে থাকার সময় নরওয়ে ও সুইডেন একটি ইউনিয়নে অর্ন্তভুক্ত ছিল। ১৯০৫ সালে যা ভেঙে যায়। কখনো কখনো স্টকহোমের নোবেল ফাউন্ডেশনের সঙ্গে অসলোর শান্তি পুরস্কার কমিটির সম্পর্কে তিক্ততাও দেখা যায়।
বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মানুষ নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন জমা দিতে পারেন। তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আইনপ্রণেতা, পূর্ববর্তী নোবেল বিজয়ী এবং কমিটির সদস্যরাও রয়েছেন। যদিও মনোনয়নগুলো ৫০ বছরের জন্য গোপন রাখা হয়। তবে আবেদনকারীদের অনেকে নিজেরাই প্রকাশ্যে তাঁদের নাম ঘোষণা করেন। বিশেষ করে, নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য আবেদনকারীরা এ কাজ বেশি করেন।
১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে এডলফ হিটলার জার্মানির তিন জন পুরস্কারপ্রাপ্তকে (রিচার্ড কুন, গার্হার্ড ডোমাগ ও এডলফ ফ্রেদরিক জোহান বুতেন্ড) তাদের পুরস্কার নেয়া থেকে বিরত থাকতে বলেন। পরবর্তীতে তাদের সকলেই পদক ও সনদ গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। যদিও সুইডেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরপেক্ষ ভূমিকায় ছিল, তারপরও সে সময় নোবেল পুরস্কার অনিয়মিতভাবে দেয়া হয়েছিল। ১৯৩৯ সালে শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়নি। নরওয়ের উপর জার্মানির অন্যায্য অধিকারের জন্য এই ক্ষেত্রে ১৯৪০-৪২ সাল পর্যন্ত কোনো পুরস্কার প্রদান করা হয় নি। এই বছরগুলোতে সাহিত্য ও শান্তি ছাড়া বাকি সব বিষয়গুলোতে পুরস্কার প্রদান করা হয়।
যদিও মৃত্যুপরবর্তী মনোনয়ন অনুমোদিত নয়, তথাপিও যদি প্রার্থীর মৃত্যু মনোনয়ন প্রদান ও নোবেল কমিটির পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ে হলে তবে তা নির্বাচিত হবার যোগ্য হবে। ইতিহাসে এমনটি দুইবার ঘটেছে: ১৯৩১ সালে সাহিত্যে এরিক এক্সেল কার্লফেল্ড এবং ১৯৬১ সালে শান্তিতে জাতিসংঘের মহাসচিব ড্যাগ হেমার্শেল্ড। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত এমনটি ভাবা হত যে অক্টোবরের ঘোষণা পর্যন্ত বিজয়ী বেঁচে থাকবেন। উইলিয়াম ভিক্রী নামক একজন নোবেল বিজয়ী ১৯৯৬ সালে পুরস্কার (অর্থনীতিতে) ঘোষণার পর কিন্তু প্রদানের আগে মারা যান। ৩ অক্টোবর ২০১১ চিকিৎসায় নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়; তদ্যাবধি কমিটি জানতো না যে বিজয়ীদের একজন রালফ স্টেইনম্যান তিন দিন আগে মারা গেছেন। কমিটিতে রালফ স্টেইনম্যানের পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক চলছিল কারণ মরণোত্তর পুরস্কার নিয়মের পরিপন্থী। পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
প্রতিবছর অক্টোবরের আগে থেকেই জল্পনা কল্পনার শুরু হয় কে পেতে যাচ্ছেন নোবেল পুরষ্কার। আমাদের আশা যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন যেন এই পুরষ্কার প্রদান অব্যাহত থাকে। তবে প্রত্যাশা, যেন যোগ্য লোকের হাতেই পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যদাপূর্ণ এই পুরষ্কারটি সবসময় উঠে। যদিও নোবেল পুরষ্কার নিয়ে আজ অবধি অনেক বিতর্কই সৃষ্টি হয়েছে, তবুও নোবেল এখন অবধি সবচেয়ে কাঙ্খিত পুরষ্কার। হয়তো থাকবেও। আর নোবেল প্রাপ্তির ইতিহাসও এগিয়ে চলবে মানুষের ইতিহাসের সাথেই।

