পড়শী প্রবাসীর জীবন আমাদের সমাজ: ম্রিয়মান মূল্যবোধ

আমাদের সমাজ: ম্রিয়মান মূল্যবোধ

Post Views: 12
8 min read

আমরা অনেকেই দীর্ঘদিন প্রাবাসে বসবাস করছি । শুধু স্বপ্নের তাড়নায় নয়, এর পেছনে কাজ করে মানুষের মনোজগতের এক চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা— উত্তরণ। আরও ভালো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা, নিজের জীবনকে একটি কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছে দেওয়ার অদম্য বাসনা মানুষকে প্রবাসের পথে নিয়ে আসে। প্রবাসজীবন তাই কেবল স্থানান্তরের গল্প নয়; এটি এক প্রত্যয়ী অভিযাত্রা— প্রাপ্তি, সংগ্রাম, অভিযোজন এবং আত্মঅন্বেষণেরও গল্প।

ভালো কিছু পাওয়ার অদম্য আখাঙ্খা তাড়িত হয়ে কাঙ্খিত প্রাপ্তির জন্য প্রবাসীদের এ এক প্রত্যয়ী অভিযাত্রা!!! আদিম থেকে আধুনিক— এক বিশাল সময়ের স্তরে স্তরে গড়ে উঠেছে মানবসমাজের ইতিহাস। সভ্যতার নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও আধুনিকতার পথে কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তির আশায়। কিন্তু এ উপাখ্যান অতীত আর বর্তমানের বিশ্লেষণের জন্য নয়, তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরার জন্য নয়, বরং পরিবর্তিত এই সময়ের প্রেক্ষাপটে স্বদেশে-প্রবাসে আমরা কিভাবে জীবনযাপন করছি, আমাদের মূল্যবোধ কিভাবে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক আর সমাজ জীবনকে প্রভাবিত করছে… আমরা আগামীর জন্য কীধরণের সামাজিক জীবন গড়ে তুলছি, আমরা কীভাবে এক বিরাট সন্ধিক্ষণ পার করে যাচ্ছি… তারই কিছুটা সহভাগিতার প্রয়াস।

সময়ের বিবর্তনে জীবনের পথ পরিক্রমায় আমাদের নানা বাঁকে নানা পট পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মানুষের অন্তর্লোকের গভীরে প্রোথিত ইচ্ছে মানুষকে অনুপ্রেরণা যোগায় এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, যা আমাদের তাড়িত করে প্রতিনিয়ত। বিগত প্রায় শতবর্ষের ব্যবধানে বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে বিশ্বের প্রতিটি জায়গায় পরিবর্তনের যে জোয়ার এসেছে, সাংস্কৃতিক বিবর্তন ঘটেছে, সেটা ভীষণভাবে লক্ষণীয় এবং উল্লেখযোগ্য। আমরা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি, কীভাবে গ্রহণ করছি… সেটাই মুখ্য বিষয়।

আমরা প্রবাসী বাঙালিরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাস করছি। প্রায় সব জায়গাতেই গড়ে উঠেছে আমাদের নিজস্ব বাঙালি সমাজ। সারা বছরজুড়ে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের শেকড়, ঐতিহ্য ও পরিচয়কে ধারণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু শত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আমাদের প্রথম পরিচয়—আমরা মানুষ; তারপর আমরা বাঙালি, এবং এরপর আমরা বৃহত্তর অভিবাসী সমাজের অংশ।

শত হলেও আমরা প্রথমত মানুষ, তারপর বাঙালি, তারপর অভিবাসী সমাজের অংশ। আজ যে বিষয়টির উপর বিশেষভাবে অবতারণা করার ইচ্ছে করছে, তা হলো আমাদের প্রবাসী সামাজিক জীবন এবং মানুষ হিসেবে আমাদের স্বকীয় মূল্যবোধ। বিশ্ব নাগরিকতার প্রেক্ষাপট মানব সমাজের পরিবর্তন নিয়ে বা গভীর কোন সামাজিক বিশ্লেষণে না গিয়ে আজ চলমান সামাজিক জীবনের ছোটখাট দু’একটি বিষয়ে নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবনাগুলো সংক্ষিপ্তভাবে সহভাগিতা করছি।

আমরা মানুষ হয়ে জন্মগ্রহন করি, কিন্তু আমাদের নিজেদের সত্যিকার অর্থে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়। আর নিজেকে গড়ে তোলার জন্য যেসব বিষয়গুলো আমাদের জীবনকে বিশেভাবে প্রভাবিত করে, সেগুলোর সুচারু পরিচর্যা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়- মনুষ্যত্ব, মূল্যবোধ ও মননশীলতা একজন মানুষের অন্তর্লোকের বহিঃপ্রকাশ। একজন আলোকিত মানুষের আলো শুধু তার চারপাশের মানুষকেই সমৃদ্ধ করে না, দূরের মানুষকেও স্পর্শ করে যায়! সে আলোর স্পর্শে সমাজ-সংসারের কল্যাণ হয়। তাই শুধু মানুষ হবার প্রয়াস নয়, একজন আলোকিত মানুষ হওয়াই আমাদের সবার লক্ষ্য হওয়া উচিৎ, সাধনা হওয়া উচিৎ।

ব্যক্তি জীবন এবং সামাজিক জীবন, দু’টিই আমাদের দৈনন্দিন অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। জীবনের টানে এখানে অভিবাসী হয়ে এসে নানা জন নানা পেশায় যুক্ত হয়ে প্রত্যেকেই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জীবন ও জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।তবে এখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীতেই শুধু নয়, আমাদের সমাজেও সামাজিক বৈষম্য, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং ম্রিয়মাণ মানবিকতার কিছু লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বর্তমান রয়েছে সোশ্যাল ডিসক্রিমিনেশন, মূল্যবোধের অবক্ষয়। মানুষে মানুষে ভেদ সৃষ্টি করে আমরা খুব সহজেই মানুষের মধ্যে অদৃশ্য একটি শ্রেণিবিভাগ তৈরি করে ফেলি। কার জীবনযাত্রার মান কেমন, কার সামাজিক অবস্থান কতটা উঁচু— এসবের ভিত্তিতে আমরা নিজের অজান্তেই মানুষের জন্য আলাদা আলাদা মানদণ্ড নির্ধারণ করি।

একজনের পেশাগত জীবন, তার জীবনধারা, তার সম্পদের পাহাড় কতটা উঁচু, তার বাড়ি কতটা প্রাসাদোপম, তার গাড়ির মডেল তেসলার মতো স্ট্যাটাস বহন করে কি না… তা থেকে আমরা সমাজের মানুষের মাঝে একটি ক্লাসিফিকেশন তৈরি করে ফেলি অনায়াসে। তার জীবনযাপনের স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে বা তাদের সামাজিক স্ট্যাটাস নিয়ে আমরা একটি গ্রূপিং তৈরি করে ফেলি নিজেদের মনে মনে, তাদের জন্য ভিন্ন অলিখিত ক্লাসিফিকেশন দাঁড় করিয়ে দেই… আমাদের সামাজিক মেলামেশা আর আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সেটা অনেক সময়ই অগোচরে প্রকাশ পেয়ে যায়।

সম্পদই আর স্ট্যাটাসই যেন আমাদের সমাজে একজন মানুষের মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি এতটাই স্থুল মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, তা বলতেও রুচিতে বাধে। নিজেদের ‘এলিট’ ভাবার প্রবণতা আমাদের মানসিক উদারতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, আমরা নিজেকে উপরে তুলতে গিয়ে নিজেদের যে মাটিতে নামিয়ে নিয়ে আসছি, তে বোধ করি অনুভব করার মননশীলতা বা বোধও আমাদের নেই। কিন্তু নিজেদের অহমিকার এক অঘোষিত দর্প আমাদের আচরণে প্রকাশ পায় নিজেদেরই অজান্তে- হ্যান্ডশেকের স্পর্শ বা কোলাকুলির নৈকট্য তা বলে দেয় আমাদের, আমরা অনুভব করতে পারি আমি কোথায় এবং কীভাবে মূল্যায়িত। এই বিভেদ, মানুষকে হেয় করে দেখার প্রবৃত্তি, মানুষের মনুষ্যত্বকে অবমাননা করা এবং মানবিক গুণাবলীর অবহেলা করা আমাদের মানুষ হিসেবে কদর্য করে তোলে… ভীষণভাবে কুন্ঠিত হয়ে পড়ি মানুষের হীন মানসিকতা দেখে। ক্ষণকালীন জীবনের অর্জিত প্রাপ্তির অহংবোধে বা ঐশর্য্যের প্রভাবে আমরা ভুলে যাই চিরন্তন মানবকিতার মূল্য, ভুলে যাই আমাদের নশ্বর জীবনের কথা, ভুলে যাই ধর্মগ্রন্থের সেই চিরন্তন বাণী:

“ধূলি তুমি ধুলিতেই মিশে যাবে”!

যারা সামাজিকভাবে অবহেলিত, অপাংক্তেয়… তথাকথিত সোশ্যাল ক্লাসিফিকেশনে পিছিয়ে আছে, তারাও এ অঘোষিত লড়াইয়ে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পরে। প্রবাসের জীবনধারায়, সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেসব বিষয়গুলোতে বিবেকের দংশন হতো, কোন এক সময় অগ্রহণযোগ্য মনে হলেও এক সময় তা গা সওয়া হয়ে যায়, গ্রহণযোগ্য করে নেই আমরা, সাংঘর্ষিক অবস্থান উপেক্ষা করার জন্য মানসিকভাবে আমরা যেন নিজেদের মনেই শান্তিচুক্তি করে ফেলি… এটাই আমাদের সামাজিক বাস্তবতা, এটাই আমাদের চলমান জীবনের অংশ। তাই বর্তমান অস্থির বিশ্বে বিরাজমান মানবিক অবক্ষয়, সভ্যতার আড়ালে অসভ্যতার হিংস্রতা, আমাদের চারপাশে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়— এসব নিয়ে মানসিক উদ্বেগ মানুষের জীবন থেকে প্রশান্তি ছিনিয়ে নিয়ে এক শূন্যতার সৃষ্টি করছে।

তাইতো সুস্থ্য শান্তিপূর্ণ জীবনধারার জন্য, আগামীর জন্য সামাজিক মূল্যবোধ ভীষণ অত্যাবশ্যকীয়! আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপন হোক আমাদের প্রার্থনা, আমাদের কর্মের মাঝে হোক আমাদের অন্তরের প্রতিফলন, আমাদের ভালোবাসা ও সহমর্মিতার স্পর্শে আলোকিত হোক, সমৃদ্ধ হোক আমাদের চারপাশের মানুষ ও আমাদের সমাজ। অহংকারের দর্প নয়, আমাদের ভালোবাসা ও মূল্যবোধ হোক আমাদের পাথেয়, কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সম্পদ, পেশা কিংবা সামাজিক মর্যাদা নয়— তার মনুষ্যত্ব। তখন হয়তো বিনীত আনন্দে আমরা রবীন্দ্রনাথের সেই চিরন্তন প্রার্থনার মর্ম উপলব্ধি করতে পারব—

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে।
সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥
নিজেরে করিতে গৌরব দান
নিজেরে কেবলি করি অপমান,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে।
সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥
আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে,
তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ আমার জীবনমাঝে।

৭ অক্টোবর, ২০২৬

উডব্রিজ, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক, সম্পাদক, সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মী। লেখালেখি এবং সম্পাদনার সাথে সম্পৃক্ত দীর্ঘ চার দশকেরও বেশী সময় ধরে। প্রকাশিত গ্রন্থ দু’টি।


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।