পড়শী মূল রচনাবলী অধরা নোবেল

অধরা নোবেল

Post Views: 40
19 min read

১৯২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে সত্যেন্দ্রনাথ বসু সম্ভবত কল্পনাও করেননি, তাঁর লেখা একটি গবেষণাপত্র একদিন পদার্থবিজ্ঞানের অভিধানেই তাঁর নামটি বসিয়ে দেবে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, যে মানুষটির নামে আজ মহাবিশ্বের গোটা একটি শ্রেণির কণার নাম ‘বোসন’, সেই মানুষটিই কোনো দিন নোবেল পুরস্কার পাননি।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু একা নন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন অনেক বিজ্ঞানী আছেন, যাঁদের কাজ আমাদের প্রকৃতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। কেউ নতুন বিজ্ঞানের দরজা খুলে দিয়েছেন। কারও কাজের ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী প্রজন্ম নোবেল পেয়েছে। অথচ তাঁদের নিজেদের হাতে সেই পুরস্কার ওঠেনি।

নোবেল কমিটি কি কখনো গুরুত্বপূর্ণ কাউকে বাদ দিয়ে যায়? নাকি বিজ্ঞানের বড় বড় আবিষ্কারগুলো আসলে এত মানুষের সম্মিলিত অবদানে গড়ে উঠে যে নোবেল পুরস্কারের স্বীকৃতিতে সবার কৃতিত্ব ধরা সম্ভব হয় না?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে বেশ কিছু অসাধারণ গল্প।

বসুর কোয়ান্টাম জগৎ

গল্পের শুরু ঢাকা থেকে। সত্যেন্দ্রনাথ বসু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। কোয়ান্টাম তত্ত্ব তখনও নতুন। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, আলবার্ট আইনস্টাইন ও নীলস বোরর যুগান্তকারী কাজ পদার্থবিদদের চেনা জগৎটাকে ওলটপালট করে দিচ্ছে।

সে সময় সত্যেন্দ্রনাথ বসু আলো বা ফোটনের আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমস্যাটিকে একেবারে নতুনভাবে দেখলেন। তাঁর মূল কৃতিত্ব ছিল কোয়ান্টাম কণাকে গণনা করার এক নতুন পদ্ধতি বের করা। তিনি দেখালেন, একই ধরনের ফোটনকে আলাদা আলাদা পরিচয়ের কণা হিসেবে গণনা করা ঠিক নয়। কোয়ান্টাম কণাকে গণনা করার প্রচলিত পদ্ধতি থেকে সরে এসে তিনি তৈরি করলেন নতুন এক পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি।

তাঁর গবেষণাপত্রটি প্রথমে ব্রিটিশ সাময়িকী ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে সেটি প্রকাশিত হয়নি। তিনি তখন এমন একটি কাজ করলেন, যেটা বিজ্ঞানের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। গবেষণাপত্রটি সরাসরি পাঠিয়ে দিলেন আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছে। আইনস্টাইনের খ্যাতি তখন বিশ্ব জোড়া।

কথায় বলে, জহুরী রত্ন চিনতে ভুল করে না। আইনস্টাইনও এর গুরুত্ব বুঝতে ভুল করেননি। তিনি নিজে গবেষণাপত্রটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করলেন এবং প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন। শুধু তাই নয়, বসুর ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেলেন। জন্ম নিল,বোস–আইনস্টাইন পরিসংখ্যান।

পরবর্তীতে, যে কণাগুলো এই পরিসংখ্যান মেনে চলে, তাদেরই বলা হলো ‘বোসন’- সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নাম অনুসারে। ফোটন একটি বোসন। হিগস কণাও বোসন। বোসন হলো পূর্ণসংখ্যার স্পিনযুক্ত কণা; তারা বোস- আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে এবং একাধিক বোসন একই কোয়ান্টাম অবস্থায় থাকতে পারে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভাষার মধ্যেই স্থায়ীভাবে ঢুকে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অসাধারণ অধ্যাপকের নাম।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। বসু ও আইনস্টাইনের কাজ থেকে আরও বিস্ময়কর একটি ভবিষ্যদ্বাণী বেরিয়ে এল। কিছু বোসনিক পরমাণুর গ্যাসকে প্রায় পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি নিয়ে গেলে বিপুলসংখ্যক পরমাণু একই কোয়ান্টাম অবস্থায় জমা হতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে কোয়ান্টাম আচরণ দেখাতে পারে। এর নাম ‘বোস–আইনস্টাইন কনডেনসেট’কিন্তু ১৯২০-এর দশকে এমন অবস্থা পরীক্ষাগারে তৈরি করার মতো প্রযুক্তি ছিল না। এর জন্য অপেক্ষা করতে হলো প্রায় সাত দশক।

১৯৯৫ সালে এরিক কর্নেল ও কার্ল উইম্যান রুবিডিয়াম পরমাণুকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ঠান্ডা করে প্রথম বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট তৈরি করলেন। প্রায় একই সময়ে উলফগ্যাং কেটারলেও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক অগ্রগতি ঘটালেন।

২০০১ সালে কর্নেল, উইম্যান ও কেটারলে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন। নোবেল পুরস্কারের নিজস্ব ইতিহাসেও বসুর কাজ এবং আইনস্টাইনের সেটিকে পরমাণুর ক্ষেত্রে সম্প্রসারণের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসে, যে ধারণার শিকড় বসুর ১৯২৪ সালের কাজে, সেই ধারার পরীক্ষামূলক সাফল্য প্রায় সাত দশক পরে নোবেল পেল, অথচ বসু কেন পেলেন না?

এখানে একটি তথ্য জানা দরকার। ২০০১ সালের নোবেল বসুর তত্ত্ব আবিষ্কারের জন্য দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়েছিল বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেশন পরীক্ষাগারে অর্জন এবং সেই নতুন পদার্থ-অবস্থা নিয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য। কিন্তু এর ঐতিহাসিক যোগসূত্রটি অসাধারণ।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু জীবদ্দশায় একাধিকবার নোবেলের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। নোবেল আর্কাইভে ১৯৫৬, ১৯৫৯ ও ১৯৬২ সালসহ তাঁর একাধিক মনোনয়নের নথি রয়েছে। তবু তাঁর ভাগ্যে নোবেল পুরস্কার আসেনি। কেন আসেনি, তার কোনো একক নিশ্চিত উত্তর নেই। তাঁর ১৯২৪ সালের কাজের গভীরতা নিয়ে আজ সন্দেহের সুযোগ নেই। কিন্তু নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় নির্দিষ্ট সময়ে, তখনকার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে। বসুর কাজের বহুদূরপ্রসারী ফলগুলোর অনেকটাই বাস্তবে দেখা গেছে তাঁর সময়ের বহু পরে।

১৯৭৪ সালে সত্যেন্দ্রনাথ বসু মারা যান। নোবেল অধরাই থেকে গেল। কিন্তু বিজ্ঞান তাঁকে অন্যভাবে পুরস্কৃত করেছে। মহাবিশ্বের এক বিশাল শ্রেনির কণা আজ তাঁর নামেই পরিচিত।

সাহার নক্ষত্র

আকাশের তারাগুলো কতটা উত্তপ্ত?

আজ প্রশ্নটি খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একশ বছর আগে দূরের নক্ষত্রের তাপমাত্রা নির্ণয় করা ছিল বিরাট সমস্যা। সেখানে তো থার্মোমিটার নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মেঘনাদ সাহা দেখালেন, সেটার দরকারও নেই। নক্ষত্রের আলোই তার ভৌত অবস্থার খবর নিয়ে আসে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তখন নক্ষত্রের আলো ভেঙে বর্ণালী বিশ্লেষণ করছিলেন। সেখানে বিভিন্ন মৌলের রেখাও দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু কেন এক ধরনের নক্ষত্রে একটি মৌলের নির্দিষ্ট রেখা শক্তিশালী, আবার অন্য নক্ষত্রে তা দুর্বল, তার পূর্ণাঙ্গ ভৌত ব্যাখ্যা ছিল না।

মেঘনাদ সাহা তাপগতিবিদ্যা, পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যা ও পরমাণু পদার্থবিদ্যাকে এক জায়গায় নিয়ে এলেন। তৈরি হলো ‘সাহা আয়নীকরণ সমীকরণ’। সহজভাবে বললে, তাপমাত্রা, চাপ বা কণার ঘনত্বের সঙ্গে কোনো গ্যাসে পরমাণুর বিভিন্ন আয়নীকরণ অবস্থার অনুপাতের সম্পর্ক এই সমীকরণ দিয়ে নির্ণয় করা যায়। এর ফলে নক্ষত্রের বর্ণালী হয়ে উঠল এক ধরনের মহাজাগতিক থার্মোমিটার। পৃথিবীতে বসেই নক্ষত্রের ভৌত অবস্থা বোঝার নতুন পথ খুলে গেল।

সাহার কাজ যে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে গুরুত্ব পেয়েছিল, তার একটি বড় প্রমাণ তাঁর নোবেল মনোনয়ন। নোবেল আর্কাইভে ১৯৩০, ১৯৩৭, ১৯৩৯, ১৯৪০, ১৯৫১ ও ১৯৫৫ সালে তাঁর মনোনয়নের রেকর্ড পাওয়া যায়। ১৯৩৭ ও ১৯৪০ সালে তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন নোবেলজয়ী মার্কিন পদার্থবিদ আর্থার কম্পটন। এমনকি পরবর্তী সময়ে সাহা নিজেও নোবেলের জন্য অন্য বিজ্ঞানীকে মনোনয়ন দেওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের একজন ছিলেন।

অর্থাৎ সাহা নোবেল কমিটির নজরের বাইরে ছিলেন, এ কথা বলা যাবে না। তাহলে পেলেন না কেন?

এখানেই গল্পটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। ঐতিহাসিক আলোচনায় একটি ব্যাখ্যা বারবার সামনে আসে, সাহার কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিকে সম্পূর্ণ নতুন মৌলিক ভৌত সূত্রের আবিষ্কার হিসেবে দেখা হবে, নাকি আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত তাপগতিবিদ্যা ও পরমাণু তত্ত্বের অসাধারণ সফল প্রয়োগ হিসেবে দেখা হবে?

এই মূল্যায়ন তাঁর নোবেল না পাওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হিসেবে আলোচিত হয়েছে। তবে এটিকে নোবেল কমিটির একমাত্র এবং চূড়ান্ত কারণ বলা ঠিক হবে না। আজ অবশ্য পাল্টা প্রশ্ন করাই যায়, একটি ‘প্রয়োগ’ যদি নক্ষত্র বোঝার পদ্ধতিই বদলে দেয়, তবে মৌলিক আবিষ্কার আর প্রয়োগের সীমারেখা ঠিক কোথায়?

সাহার ঘটনা তাই শুধু একজন বিজ্ঞানীর নোবেল না পাওয়ার গল্প নয়। এটি দেখায়, বিজ্ঞানে একটি কাজের গুরুত্ব আর পুরস্কারের সংজ্ঞা সবসময় একই পথে চলে না।

মাইটনারের ফিশন

১৯৩৮ সালে অটো হান ও ফ্রিটজ স্ট্রাসমান ইউরেনিয়াম নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে অদ্ভুত ফল পেলেন। সেখানে পাওয়া গেল বেরিয়াম। কিন্তু এর উত্তর তাঁদের জানা ছিল না।

তখন নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে যাওয়া পদার্থবিদ লিজে মাইটনার সুইডেনে অবস্থান করছেন। অটো হানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা ছিল। মাইটনার ও তাঁর ভাগ্নে অটো ফ্রিশ ফলাফলটির ভৌত ব্যাখ্যা দিলেন। তাঁরা বললেন, ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস ভেঙে যাচ্ছে। এটাই নিউক্লিয়ার ফিশন।

তাঁরা আরও দেখালেন, এই প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যাওয়া সামান্য ভর আইনস্টাইনের ভর-শক্তি সম্পর্ক অনুযায়ী বিপুল শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। নিউক্লিয়ার ফিশনের আবিষ্কার পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বৈজ্ঞানিক ভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৪৪ সালের রসায়নের নোবেল এককভাবে পেলেন অটো হান, “ভারী নিউক্লিয়াসের ফিশন আবিষ্কারের জন্য”। মাইটনার পেলেন না। ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মাইটনার ও হানকে যৌথভাবেও নোবেলের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। কেন তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেটা নিয়ে বিজ্ঞান-ইতিহাসে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। পরীক্ষামূলক ও তাত্ত্বিক অবদানের আলাদা মূল্যায়ন এবং মাইটনারের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্ব না পাওয়া, সবই আলোচনায় এসেছে।

নোবেল না পেলেও ইতিহাস অবশ্য তাঁকে বাদ দিতে পারেনি। পর্যায় সারণির ১০৯ নম্বর মৌলের নাম ‘মাইটনারিয়াম’।

উ-র পরীক্ষা

পঞ্চাশের দশকের পদার্থবিদ্যায় একটি ধারণা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করা হতো, প্রকৃতি আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলেও একই ভৌত নিয়মই মেনে চলে। একে বলা হয়, প্যারিটি সংরক্ষণ।

সুং-দাও লি ও চেন-নিং ইয়াং প্রশ্ন তুললেন, দুর্বল নিউক্লীয় বলের ক্ষেত্রেও কি সত্যিই তাই হয়? প্রশ্নটি তাঁদের। কিন্তু উত্তর পেতে দরকার ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি পরীক্ষা। সেই কাজটি করলেন চীনা-মার্কিন পদার্থবিদ চিয়েন-শিয়ুং উ এবং তাঁর সহযোগীরা। কোবাল্ট-৬০ নিয়ে তাঁদের পরীক্ষায় দেখা গেল, দুর্বল নিউক্লীয় প্রক্রিয়ায় প্যারিটি সংরক্ষিত থাকে না। পদার্থবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা ভেঙে পড়ল।

১৯৫৭ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পেলেন লি ও ইয়াং। উ পেলেন না। কেন নোবেল কমিটি তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করেনি, তার নিশ্চিত কোন ব্যাখ্যা নেই। তাই কোনো একটি কারণকে দায়ী করা ঠিক হবে না। কিন্তু উ এবং তাঁর সহযোগীদের পরীক্ষাটি যে প্যারিটি ভঙ্গের পরীক্ষামূলক প্রমাণ দিয়েছিল, সেটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

পালসারের সংকেত

জোসেলিন বেল বার্নেল তখন পিএইচডি ছাত্রী। রেডিও টেলিস্কোপ থেকে আসা বিপুল পরিমাণ তথ্য তাঁকে কাগজের চার্ট দেখে দেখে পরীক্ষা করতে হতো। একদিন সেখানে চোখে পড়ল অদ্ভুত একটি সংকেত। খুব দ্রুত আসছে। আবার আসছে। অবিশ্বাস্য রকম নিয়মিত। এতটাই অদ্ভুত যে প্রথম দিকে সম্ভাব্য বহির্জাগতিক উৎসের কথা ভেবে মজা করে ‘লিটল গ্রিন মেন’ নামও ব্যবহার করা হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত জানা গেল, এলিয়েন নয়। এটি দ্রুত ঘূর্ণায়মান নিউট্রন তারা, যাকে আজ আমরা পালসার বলে চিনি। জ্যোতির্বিজ্ঞানে সম্পূর্ণ নতুন এক জানালা খুলে গেল। ১৯৭৪ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলে এই আবিষ্কারের স্বীকৃতি এল। জোসেলিন বেল বার্নেলের পিএইচডি সুপারভাইজার অ্যান্টনি হিউইশ পুরস্কার পেলেন পালসার আবিষ্কারে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য। একই নোবেলের অংশীদার মার্টিন রাইল পুরস্কৃত হন রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর অগ্রণী কাজের জন্য। নোবেল পুরস্কারের নিজস্ব ইতিহাসেও বেল বার্নেলকে প্রথম অস্বাভাবিক সংকেত শনাক্তকারী গবেষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু বেল বার্নেল পুরস্কারের অংশ হলেন না। এ নিয়ে বিতর্ক আজও আছে। তবে তিনি নিজে বিষয়টি নিয়ে বরাবরই সংযত ছিলেন।

অ্যাভেরির ডিএনএ

আজ স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও জানে, আমাদের বংশগত তথ্য বহন করে ডিএনএ। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে কথাটি মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। অনেক বিজ্ঞানীই ভাবতেন, প্রোটিনের মতো জটিল অণুই সম্ভবত বংশগতির তথ্য বহন করে। ১৯৪৪ সালে অসওয়াল্ড অ্যাভেরি, কলিন ম্যাকলিওড ও ম্যাকলিন ম্যাককার্টি পরীক্ষার মাধ্যমে শক্তিশালী প্রমাণ দিলেন, ব্যাকটেরিয়ার বংশগত বৈশিষ্ট্য বদলে দেওয়ার ট্রান্সফর্মিং প্রিন্সিপলের মূল উপাদান ডিএনএ।

ফলাফলটি ছিল যুগান্তকারী। কিন্তু সবাই সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করেনি। পরবর্তী কয়েক বছরে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো। ধীরে ধীরে ডিএনএর কেন্দ্রীয় ভূমিকা পরিষ্কার হয়ে উঠল। তারপর এল ডিএনএর ডাবল হেলিক্স। আণবিক জীববিজ্ঞানে তখন রীতিমতো বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু অ্যাভেরির জন্য সময় ফুরিয়ে এসেছিল। ১৯৫৫ সালে তিনি মারা যান। তাঁর ভাগ্যে নোবেল আর আসেনি।

ফ্র্যাঙ্কলিনের ছবি

ডিএনএর ইতিহাসে আরেকটি নাম প্রায় অনিবার্য – রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন। এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন ব্যবহার করে তাঁর গবেষণায় ডিএনএর গঠন সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর গবেষণার অংশ হিসেবে রেমন্ড গসলিংয়ের তোলা বিখ্যাত ‘ফটো ৫১’ ডিএনএর হেলিক্যাল গঠন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়।

১৯৫৩ সালে জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএর ডাবল হেলিক্স মডেল প্রকাশ করেন। ১৯৬২ সালে ওয়াটসন, ক্রিক ও মরিস উইলকিন্স নোবেল পেলেন।

ফ্র্যাঙ্কলিন পেলেন না। তবে তাঁর ঘটনাটি অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা। তিনি ১৯৫৮ সালেই মারা গিয়েছিলেন। বয়স মাত্র ৩৭ বছর। নোবেল পুরস্কার সাধারণভাবে মরণোত্তর দেওয়া হয় না। তাই ১৯৬২ সালের পুরস্কারে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব ছিল না।

কিন্তু তিনি বেঁচে থাকলে নোবেল পেতেন কি না? আমরা জানি না। এ নিয়ে অনুমান করা যায়, ইতিহাস লেখা যায় না।

হাবল ও লেমেত্রের মহাবিশ্ব

আজ আমরা জানি, মহাবিশ্ব স্থির নয়। এটি সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই ধারণা প্রতিষ্ঠার পেছনে দুজন বিজ্ঞানীর নাম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ – এডউইন হাবল ও জর্জ লেমেত্র।

১৯২৭ সালে বেলজিয়ান পদার্থবিদ ও যাজক লেমেত্র আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা থেকে সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা দেন। প্রকাশিত পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করে গ্যালাক্সির দূরত্ব ও সরে যাওয়ার বেগের সম্পর্কও তিনি নির্ণয় করেন।

এর দুই বছর পর হাবল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দূরবর্তী গ্যালাক্সির দূরত্ব ও রেডশিফটের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘদিন এটি ‘হাবলের সূত্র’ নামে পরিচিত থাকলেও এখন একে ‘হাবল-লেমেত্র সূত্র’ বলা হয়। পরবর্তীতে লেমেত্র আরও প্রস্তাব করেন, মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত ঘন এক প্রাথমিক অবস্থা থেকে। তাঁর এই ধারণা পরবর্তীকালের বিগ ব্যাং মহাবিশ্বতত্ত্বের পূর্বসূরি।

হাবল নোবেল পাননি।‌ লেমেত্রও পাননি। সে সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলের আওতায় কীভাবে দেখা হবে, সেটি একটি জটিল বিষয় ছিল। অন্যদিকে লেমেত্রের মহাবিশ্বতাত্ত্বিক ধারণাগুলোর শক্তিশালী পর্যবেক্ষণমূলক সমর্থনের অনেকটাই আসে পরবর্তী সময়ে। হাবল মারা যান ১৯৫৩ সালে। লেমেত্র ১৯৬৬ সালে, মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণের আবিষ্কারের খবর জেনে যাওয়ার অল্প সময় পর।

কিন্তু ইতিহাস তাঁদের ভুলে যায়নি। হাবলের নামে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে বিখ্যাত হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। আর লেমেত্রের নাম স্থায়ী হয়ে আছে ‘হাবল–লেমেত্র সূত্রে’; চাঁদের একটি ক্রেটারের নামও রাখা হয়েছে তাঁর নামে।

আধুনিক মহাবিশ্বতত্ত্বে তাই দুজনের নামই পাশাপাশি। একজনের পর্যবেক্ষণ এবং অন্যজনের তত্ত্ব আমাদের সামনে খুলে দিয়েছিল সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ছবি।

নোবেলজয়ীদের গুরু

আর্নল্ড সমারফেল্ডের গল্পটি একটু অন্য রকম। তিনি এমন কোনো একটি আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত নন, যেটি এক বাক্যে বলে দেওয়া যায়। বরং বিশ শতকের গোড়ার তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বহু জায়গাতেই তাঁর গবেষণার ছাপ রয়েছে।

বোরের পরমাণু মডেলকে উন্নত করা থেকে শুরু করে কোয়ান্টাম ও পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের বিকাশ – বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। আর তাঁর ছাত্রদের নাম শুনলে অবাক হতে হয়। ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ। উলফগ্যাং পাউলি। পিটার ডেবাই। হান্স বেথে। চারজনই পরে নোবেলজয়ী।

আর সমারফেল্ড? তিনি নিজেই ৮০ বারেরও বেশি নোবেলের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। ঐতিহাসিক হিসাবে সংখ্যাটি ৮৪। তবু একবারও পুরস্কার পাননি।

সম্ভবত এখানেই নোবেল পুরস্কারের একটি সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। একজন বিজ্ঞানীর প্রভাব যদি একটি নির্দিষ্ট আবিষ্কারের বদলে বহু তত্ত্ব, বহু গবেষণা এবং একটি পুরো প্রজন্মের বিজ্ঞানীর মধ্যে ছড়িয়ে থাকে, সেটিকে একটি পুরস্কারের ভাষায় ধরা কঠিন। সমারফেল্ড হয়তো তারই একটি অসাধারণ উদাহরণ।

সুদর্শনের আলো

শেষ গল্পটি ভারতীয় বিজ্ঞানী এন্নাকাল চ্যান্ডি জর্জ সুদর্শনের।
কোয়ান্টাম অপটিক্সে আলোর কোয়ান্টাম অবস্থা বর্ণনার জন্য তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। এটি আজ ‘গ্লবার–সুদর্শন পি-রিপ্রেজেন্টেশন’ নামে পরিচিত। ২০০৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলের অর্ধেক দেওয়া হয় রয় গ্লবারকে, কোয়ান্টাম অপটিক্যাল কোহেরেন্সের তত্ত্বে তাঁর অবদানের জন্য। অন্য অর্ধেক যৌথভাবে পান জন হল ও থিওডর হ্যানশ, লেজারভিত্তিক নির্ভুল স্পেকট্রোস্কোপির উন্নয়নের জন্য।

সুদর্শন পুরস্কার পেলেন না। এ নিয়ে পরে যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছে। সুদর্শন নিজেও তাঁর অবদান যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।

এখানে কে ঠিক, কে ভুল, এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। নোবেল মনোনয়ন ও মূল্যায়নের নথি ৫০ বছর গোপন থাকে। ফলে ২০০৫ সালের সিদ্ধান্তের পূর্ণ নথি এখনো জনসমক্ষে আসেনি। অপেক্ষা করতে হবে।

শেষ কথা

এই দশটি গল্প পড়ার পর একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে, বিজ্ঞানের ইতিহাস আর নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস এক জিনিস নয়।

এর কারণও আছে। একটি বড় আবিষ্কার খুব কম ক্ষেত্রেই হঠাৎ একজন মানুষের মাথায় সম্পূর্ণভাবে হাজির হয়। একজন তত্ত্ব দেন। আরেকজন পরীক্ষা করেন। তৃতীয়জন নতুন যন্ত্র বানান। চতুর্থজন এমন তথ্য খুঁজে পান, যেটা ছাড়া পুরো তত্ত্বটিই হয়তো সম্পূর্ণ হতো না।

তারপর আসে সময়ের বিচার। কোন আবিষ্কার সত্যিই পৃথিবী বদলে দেবে, সেটি অনেক সময় আবিষ্কারের বছরেই বোঝা যায় না। দশ বছর লাগে। কখনো পঞ্চাশ বছর। বসুর ক্ষেত্রে প্রায় সাত দশক পরে তাঁর তত্ত্বের এক বিস্ময়কর ভৌত রূপ পরীক্ষাগারে দেখা গেছে।

কিন্তু নোবেলেরও নিয়ম আছে। একটি নোবেল পুরস্কার সর্বোচ্চ তিনজন ব্যক্তির মধ্যে ভাগ করা যায়। মৃত ব্যক্তিকে সাধারণভাবে পুরস্কার দেওয়া হয় না। আর সিদ্ধান্তটি নিতে হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ে দাঁড়িয়ে। ফলে ইতিহাসের বিচার আর পুরস্কার কমিটির বিচার কখনো কখনো এক হয় না।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু নোবেল পাননি। কিন্তু ‘বোসন’ আছে। মেঘনাদ সাহা নোবেল পাননি। কিন্তু নক্ষত্রের ভেতরের অবস্থা বুঝতে আজও ‘সাহা সমীকরণ’ পড়ানো হয়। লিজে মাইটনার নোবেল পাননি। কিন্তু নিউক্লিয়ার ফিশনের ইতিহাস থেকে তাঁর নাম সরিয়ে দেওয়ার উপায় নেই। সমারফেল্ড নোবেল পাননি। তাঁর ছাত্ররা নোবেল নিয়ে ঘরে ফিরেছেন।

তাহলে একজন বিজ্ঞানীর সাফল্যের শেষ মাপকাঠি কী? একটি নোবেল পদক? নাকি এমন একটি ধারণা, যেটা আবিষ্কারকের মৃত্যুর একশ বছর পরেও পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে একজন ছাত্রকে প্রকৃতির রহস্য বুঝতে সাহায্য করছে?

সম্ভবত এখানেই অধরা নোবলের আসল গল্প। নোবেল পুরস্কার একজন বিজ্ঞানীকে ইতিহাসে জায়গা করে দিতে পারে। কিন্তু কখনো কখনো বিজ্ঞানীর কাজই এত বড় হয়ে ওঠে যে ইতিহাসে জায়গা করে নিতে তাঁর আর নোবেলের প্রয়োজন হয় না।

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ক্যানবেরা, অস্ট্রেলিয়া

বিজ্ঞান লেখক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয় বিজ্ঞান নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। সাম্প্রতিককালে তাঁর লেখা বই “শতাব্দীর বিজ্ঞান” ও “বিচিত্র বিজ্ঞান।”


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।