পড়শী প্রবাসীর জীবন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের নতুন দিগন্ত: অর্থনীতি, শিক্ষা ও মূলধারায় নেতৃত্ব

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের নতুন দিগন্ত: অর্থনীতি, শিক্ষা ও মূলধারায় নেতৃত্ব

Post Views: 24
6 min read

যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক জনসংখ্যা ও সামাজিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটির আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে মুসলিমদের অবস্থান ক্রমশ সুদৃঢ় হচ্ছে। ম্যাপোনমিক্স (Maponomics) সহ বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক জনসংখ্যা সমীক্ষা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ৩৫ লক্ষাধিক মুসলিম বসবাস করছেন। দেশজুড়ে যে সাতটি অঙ্গরাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি, সেগুলো হলো— নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয়, নিউ জার্সি, টেক্সাস, মিশিগান এবং মেরিল্যান্ড।

এর মধ্যে সবার শীর্ষে রয়েছে নিউ ইয়র্ক রাজ্য, যেখানে প্রায় ৭ লাখ ২৪ হাজার মুসলিমের স্থায়ী বসবাস। তবে এই সংখ্যা কেবলই জনসংখ্যার পরিসংখ্যান নয়; বরং এর পেছনের মূল সাফল্যটি লুকিয়ে আছে মার্কিন মূলধারায় মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান অবদান, নেতৃত্ব ও নতুন ইতিহাস গড়ার মধ্যে।

বহুমাত্রিক পটভূমি ও বৈচিত্র্যময় সমাজ

আমেরিকান মুসলিম সমাজ কোনো একক ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অভিবাসীরা নিজ নিজ মেধা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি নিয়ে এই সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, মিশর, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, মরক্কো ও সিরিয়াসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ যেমন এই সম্প্রদায়ের প্রাণশক্তি, তেমনি যুক্ত হয়েছেন বহু আমেরিকান-বংশোদ্ভূত মুসলিমও। এই অনন্য বৈচিত্র্য আমেরিকান মুসলিম সমাজকে দিয়েছে বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও গতিশীলতা।

অর্থনীতি, শিক্ষা ও পেশাগত উৎকর্ষে বলিষ্ঠ অবদান

আমেরিকান স্বপ্নের (American Dream) পেছনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঘাম ও মেধার অবদান আজ অস্বীকার করার উপায় নেই।

অর্থনীতি ও ব্যবসা: ছোট-বড় গ্রোসারি, ট্যাক্সি ড্রাইভিং, রেস্তোরাঁ ব্যবসা থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি (IT), রিয়েল এস্টেট, ফাইন্যান্স ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক উদ্যোগে মুসলিম উদ্যোক্তারা সফলতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসের মতো অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন তারা।

চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষা: আমেরিকান হেলথকেয়ার সিস্টেমে মুসলিম চিকিৎসকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার মুসলিম চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রতিদিন আমেরিকার হাসপাতালগুলোতে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে সেবা দিচ্ছেন। পাশাপাশি হার্ভার্ড, এমআইটি, কলম্বিয়ার মতো বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শত শত মুসলিম অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করছেন।

সমাজসেবা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সামাজিক সংকটে ‘ইসলামিক রিলিফ USA’ ও ‘আইসিএনএ রিলিফ (ICNA Relief)’-এর মতো সামাজিক সংস্থাগুলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, যা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিকে আরও দৃঢ় করছে।

নিউ ইয়র্কের মূলধারায় ঐতিহাসিক রূপান্তর ও নেতৃত্বের দিগন্ত

যুক্তরাষ্ট্রের মূল রাজধানী যদি হয় ওয়াশিংটন, তবে অর্থনীতির হৃদস্পন্দন অবশ্যই নিউ ইয়র্ক। বহু বছর ধরে নিউ ইয়র্কের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ট্যাক্সিক্যাব, ছোট ব্যবসা ও শ্রমজীবি মানুষের বড় ভূমিকা থাকলেও সিটির নীতি-নির্ধারণী মূলধারায় মুসলিমদের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে।

১. ইতিহাস গড়া শাহানা হানিফের উপস্থিতি

ব্রুকলিনের ডিস্ট্রিক্ট-৩৯ (পার্ক স্লোপ, কেন্সিংটন) থেকে নির্বাচিত হয়ে শাহানা হানিফ নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে প্রথম মুসলিম নারী এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে এক নতুন যুগের সূচনা করেন। সিটি কাউন্সিলের ‘ইমিগ্রেশন কমিটি’র প্রধান হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ভাষাভিত্তিক অধিকার, শ্রমজীবী মানুষ, অভিবাসী ও নারীদের আইনি সুরক্ষায় তাঁর সোচ্চার ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তৃণমূলের আন্দোলন ও দূরদর্শী রাজনীতি থাকলে সিটির আইনসভায় নিজের স্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।

২. মূলধারায় সোচ্চার অন্য প্রগতিশীল নেতৃত্ব

শাহানা হানিফের পাশাপশি নিউ ইয়র্ক স্টেট ও সিটির রাজনীতির চালিকাশক্তিতে যুক্ত হয়েছেন আরও একঝাঁক প্রতিভাবান মুসলিম ও বাংলাদেশী নেতা:

জোহরান মামদানি (Zohran Mamdani): কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়া থেকে নির্বাচিত নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি মেম্বার। প্রগতিশীল এই তরুণ নেতা কর্মজীবী মানুষের আবাসন অধিকার, ট্যাক্সি ড্রাইভারদের ঋণ মওকুফ আন্দোলন এবং দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের সুযোগ-সুবিধা আদায়ে স্টেট আইনসভায় মূল ভূমিকা রাখছেন।

চার্লস ডি. ফল (Charles D. Fall): স্ট্যাটেন আইল্যান্ড থেকে নির্বাচিত নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির প্রথম মুসলিম সদস্য। রাজ্যে প্রতি বছর জানুয়ারি মাসকে ‘মুসলিম আমেরিকান হেরিটেজ মান্থ’ হিসেবে ঘোষণার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

অ্যাটর্নি সোমা সৈয়দ (Soma Syed): নিউ ইয়র্কের প্রথম বাংলাদেশী-আমেরিকান মুসলিম নারী বিচারক (Judge) হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি। পেশাগত সততা ও সামাজিক সেবায় তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয়।
ইউসুফ সালাম (Yusef Salaam): ঐতিহাসিক ‘এক্সোনেরেটেড ফাইভ’-এর সদস্য ও বর্তমানে নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের (হারলেম ডিস্ট্রিক্ট) প্রতিনিধি। ন্যায়বিচার, পুলিশ সংস্কার ও বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ে তিনি আজ সোচ্চার কণ্ঠস্বর।

ড. ডেবি আলমনতাসির (Dr. Debbie Almontaser): প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সিভিল রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট, যিনি পাবলিক স্কুলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং ‘খলিল জিবরান ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।

নতুন প্রজন্ম ও আগামীর ভবিষ্যৎ

আজ নিউ ইয়র্ক সিটিতে ঈদ উদযাপনে সরকারি স্কুলে ছুটি কিংবা সিটির স্কুলে হালাল খাবারের অন্তর্ভুক্তির মতো সাফল্যগুলো রাতারাতি আসেনি; এর পেছনে রয়েছে মূলধারার রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনে মুসলিমদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

এশিয়ার প্রান্তরেখা কিংবা আফ্রিকার উপকূল থেকে আসা প্রথম প্রজন্মের অভিভাবকরা যে স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন, আজ তাঁদের সন্তানরা—আমেরিকায় বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম—কেবল নিজেদের অধিকার রক্ষাই করছে না, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক আমেরিকান সমাজ নির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ধর্মীয় পরিচয় ও নিজস্ব ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করেই তারা প্রমাণ করছেন— আমেরিকান মূলধারা আজ তাদেরও আপন ঠিকানা।

৪ অক্টোবর, ২০২৬

নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

আশির দশকে ডেইলি নিউজ পত্রিকার মাধ্যমে সরাসরি সাংবাদিকতায়। তারপর সাপ্তাহিক বিচিত্রার কুটনৈতিক সংবাদদাতা, বিবিসির ঢাকায় একজন স্ট্রিংগার, নিউ ইয়র্কের সাপ্তাহিক ঠিকানা ও বাংগালির বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ভয়েস অব বাংলাদেশ, লস এন্জেলেস-এর ঢাকা সংবাদদাতা ইত্যাদি কাজ করার পর নিউ ইয়র্ক প্রবাসী। মুলধারার ডুয়েন রিড ও রাইট এইড এর স্টোর ম‍্যানেজার হিসেবে বহু বছর কাজ করেছেন। সাপ্তাহিক বিদেশ বাংলা’র সম্পাদক এর দায়িত্ব পালন করেন। ভয়েস অব আমেরিকার নিউ ইয়র্ক সংবাদদাতা হিসেবে বহু বছর কাজ করেছেন। নিউজ পোর্টাল নিউ ইয়র্ক বাংলা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন সম্পাদক হিসেবে। পাশাপাশি ‘কফি উইথ কিরন’ টিভি শো নিয়মিত সম্প্রচার করেন। তাঁর প্রকাশিত বই এর সংখ্যা ৭!


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।