পড়শী ভ্রমণ ও রোমন্থন দ্য নর্থ ক্যারোলাইনা আরবোরেটাম – প্রকৃতির আঁকা, মানুষের সাজানো

দ্য নর্থ ক্যারোলাইনা আরবোরেটাম – প্রকৃতির আঁকা, মানুষের সাজানো

Post Views: 8
11 min read

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের অ্যাশভিল শহর। এই শহরটির দক্ষিণাঞ্চলে আ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার কোলে বনাঞ্চালের ভেতরে স্থাপিত আরবোরেটামে গিয়েছিলাম ৯ আগস্ট ২০২৬।

আরবোরেটাম মানে বৃক্ষের বাগান। এক কথায় বৃক্ষোদ্যান বা উদ্ভিদ উদ্যানও বলা যায়। তবে আরবোরেটাম সাধারণ কোনো বাগান নয়। এখানে মূলত নানা প্রজাতির গাছপালা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিচর্যা ও প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়।

৪৩৪ একর জায়গা নিয়ে গঠিত এই বৃক্ষোদ্যানে রয়েছে প্রায় ৬৫ একর জুড়ে পরিকল্পিত বাগান, ১০ মাইলেরও বেশি হাঁটা ও সাইকেল চালানোর ট্রেইল। অর্থাৎ এটি শুধু বাগান নয়— একসঙ্গে বন, বাগান, পাহাড়ি ভূদৃশ্য, হাঁটার পথ, উদ্ভিদ সংগ্রহ ও মানুষের সৃজনশীলতার এক বিশাল মিলনক্ষেত্র।

এখানে আসার আগের দিন ব্লু রিজ মাউন্টেনে মেঘের ভেতর হারিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে মনে হয়েছিল— প্রকৃতি নিজেই একজন শিল্পী। পাহাড়, বন, মেঘ, উপত্যকা— এসবের কোনো স্থপতি নেই। প্রকৃতি নিজের অদৃশ্য তুলিতে কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীকে এঁকে চলেছে। কিন্তু আরবোরেটামে এসে মনে হলো— মানুষের হাতের ছোঁয়ায় প্রকৃতির সৃষ্টিকে আরেক অনন্য শিল্প করে তুলতে পারে।

2026.10.13.01 img 1
আ্যাশভিলের ভাস্কর নেল ব্যানিস্টার স্ক্রাগসের তৈরি ১২.৫ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যের একটি বিশাল প্রতিলিপি স্থাপন করা হয়েছে।
2026.10.13.01 img 2
ফুলের রং আর সৌরভে মুগ্ধ পর্যটক।

প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই প্রথমেই চোখে পড়ল প্রশস্ত আঙিনায় সবুজের ভেতর একটি বিশাল ব্রোঞ্জের মূর্তি। একজন প্রার্থনারত মানুষ দুই হাত ও মুখ উপরের দিকে তুলে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে পাহাড়, বন, গাছপালা, আকাশ— প্রকৃতির এমন বিপুল আয়োজনের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানুষটির দুই হাত যেন কৃতজ্ঞতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। পরে জানলাম— মূর্তিটির নাম ‘ওহ গ্রেট স্পিরিট’। আ্যাশভিলের ভাস্কর নেল ব্যানিস্টার স্ক্রাগসের তৈরি ১২.৫ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জের এই ভাস্কর্যটি ২০০৯ সালে স্থাপন করা হয়। এটি মূল ভাস্কর্যের একটি বৃহৎ প্রতিলিপি। এই অসাধারণ শিল্পকর্মটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো মানুষটি বলছে— হে সৃষ্টিকর্তা- এই পাহাড়, এই বন, এই প্রকৃতি, এই গাছ, এই ফুল, এই বাতাস, এই আলো— সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ। ভাস্কর্যের অপূর্ব শিল্পশৈলী দেখে মুগ্ধ আমরা ভেতরে প্রবেশ করে হাঁটতে শুরু করলাম।

বনের ভেতর হারিয়ে যাওয়া

আগেকার দিনের গ্রাম বাংলার কাঁচা রাস্তার মতো একটি পথ। এখানে সেটিকে বলে ট্রেইল। সেই পথ ধীরে ধীরে আমাদের নিয়ে যেতে লাগল লোকালয় থেকে দূরে যেন কোনো অচিনপুরে। পথের দুপাশে গাছ, লতাগুল্ম, ঝোপঝাড়। কোথাও ঘন ছায়া, কোথাও পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে মাটিতে ছোট ছোট আলোর দ্বীপ তৈরি করেছে। কিছুদূর যাওয়ার পর মনে হলো, আমরা কোনো উদ্যানের মধ্যে হাঁটছি না। যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছি গহন কোনো অরণ্যের গভীরে। গা ছমছম করা অনুভূতি। পাশাপাশি অদ্ভুত এক আনন্দ। শহরের মানুষ প্রতিদিন যে প্রকৃতি থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যায়, সেই প্রকৃতি যেন এখানে এসে আমাকে আবার নিজের কাছে টেনে নিচ্ছে। এভাবেই ট্রেইলগুলোতে পর্যটকেরা ঘন বনভূমির ভেতর দিয়ে, কখনো ঝরনা বা জলধারার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ১০ মাইলেরও বেশি পথে হাঁটার বা সাইকেল চালানো অভিজ্ঞতা পায়। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, মানুষের তৈরি রাস্তা যতই শেষ হয়ে আসছে, প্রকৃতির পৃথিবী ততই শুরু হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে একসময় বৃক্ষোদ্যানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গায় এসে পড়লাম। এখানেই অপেক্ষা করছিল সবচেয়ে বড় চমকটি।

ছোট করে রাখা বন : বনসাই

আরবোরেটামের এই অংশটির নাম বনসাই এক্সিবিশন গার্ডেন। এটি যেন একটি অরণ্যকে মন্ত্রবলে ছোট করে হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে আসার মতো একটা ব্যাপার। প্রকৃতির বিশালতাকে একটা ছোট অবয়বের মধ্যে নিয়ে আসার এই শিল্প সত্যিই মনোমুগ্ধকর। এখানে দেখলাম জাপানি ম্যাপল, চীনা এলমের মতো এশীয় প্রজাতি, উইলো-লিফ ফিগ ও বুগেনভিলিয়ার মতো উষ্ণমণ্ডলীয় উদ্ভিদ, আবার আমেরিকান প্রজাতির মধ্যে আছে বাল্ড সাইপ্রেস ও লিম্বার পাইন সহ অনেক বনসাই গাছ। ব্লু রিজ অঞ্চলের স্থানীয় উদ্ভিদ আমেরিকান হর্নবিম এবং ইস্টার্ন হোয়াইট পাইনকেও বনসাই বানানো হয়েছে।

2026.10.13.01 img 3
দুর্লভ বনসাঁইয়ে সৌন্দর্যে বিমোহিত দর্শণার্থী।
2026.10.13.01 img 4
অতিকায় মহীরূহ ছোট হয়ে মানুষের ছোঁয়ায় এখন যেন এক নান্দনিক শিল্পকর্ম।

বনসাইয়ের ইতিহাস বড় দীর্ঘ। প্রাচীন কালে চীনে গাছগুলোকে ক্ষুদ্রাকৃতির করে প্রাকৃতিক দৃশ্য নির্মাণের ঐতিহ্য রয়েছে, জাপানেও এটি একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসাবে বিকশিত হয়েছে। হাজার হাজার বছর আগে থেকে মানুষ গাছকে ক্ষুদ্র পরিসরে লালন করে তার মধ্যে প্রকৃতির একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছে। নর্থ ক্যারোলাইনার আরবোরেটামও এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের একটি অংশ হিসেবে বনসাই কর্মসূচি শুরু করে ১৯৯২ সালে। এই বনসাইয়ের কিউরেটর আর্থার জুরা শুরু থেকেই এই সংগ্রহ গড়ে তুলেছেন। আর বনসাই এক্সিবিশন গার্ডেন প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে। এটি দক্ষিনাঞ্চলীয় অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার প্রকৃতিকে ধরে রেখেছে।

একটি মহীরূহের সামনে দাঁড়ালে তার উচ্চতা আমাদের অভিভূত করে। তার শিকড় মাটির গভীরে, ডালপালা আকাশের দিকে। কিন্তু বনসাইয়ের সামনে দাঁড়ালে অভিজ্ঞতাটা অন্যরকম। গাছটি ছোট। কিন্তু তার শরীরে বড় গাছের সমস্ত স্মৃতি রয়ে যায়। বাকলের রেখা আছে। ডালের বাঁক আছে। শিকড়ের বিস্তার আছে। আছে বয়সের চিহ্ন। শুধু তার আকারটি ক্ষুদ্র।

একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ আর তার বনসাই রূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে অনেক পুরোনো উক্তি মনে পড়ে গেল— গাছকে ছোট করা আর গাছকে ছোট করে দেখা এক কথা নয়। বরং বনসাই মানুষকে শেখায়, আকার আর মহত্ত্ব এক জিনিস নয়। একটি ক্ষুদ্র গাছের মধ্যেও একটি অরণ্যের সম্ভাবনা থাকতে পারে।

মানুষ কখনো পাহাড়ের কাছে যায়। কখনো পাহাড়ের ছবি আঁকে। কখনো কবিতা লেখে। কখনো গাছ লাগায়। আর কখনো একটি বিশাল বৃক্ষের জীবনকে একটি ছোট পাত্রের মধ্যে ধরে রেখে তার দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকে।

মানুষের হাতে সাজানো বাগান

আরবোরেটামে বনসাইয়ের বাগান ছাড়াও রয়েছে ন্যাশনাল নেটিভ আজালিয়া কালেকশন, ফরেস্ট মিডো, হেরিটেজ গার্ডেন, স্ট্রিম গার্ডেন, কুইল্ট গার্ডেন সহ নানা ধরনের বাগান ও উদ্ভিদ সংগ্রহ। আমরা বনসাইয়ের জগত থেকে বেরিয়ে বাগানের দিকে আসার পর মনে হলো এবার প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আরেক ধরনের কথোপকথন শুরু হলো।

প্রকৃতি নিজে নিজেকে সাজিয়েছে পাহাড়ে, বনে, নদীতে। কিন্তু এখানে মানুষ প্রকৃতিকে নিজের মতো, নিজের ভাষায় সাজিয়েছে। এর মধ্যে কুইল্ট গার্ডেনটি এমনভাবে সাজানো যে ওপর থেকে তাকালে মনে হয় মাটির ওপর একটি বিশাল রঙিন নকশিকাঁথা বিছিয়ে রাখা হয়েছে। ফুল, পাতা, ঘাস ও নকশার বিন্যাসে তৈরি হয়েছে জ্যামিতিক সৌন্দর্য।
এখানে ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় রং। বসন্তে এক ধরনের ফুল, গ্রীষ্মে আরেক রকম, শরতে আবার সম্পূর্ণ অন্য দৃশ্য। নানা দেশি-বিদেশি উদ্ভিদের পাশাপাশি আছে আ্যাপালাচিয়ান অঞ্চলের স্থানীয় উদ্ভিদ ও বুনোফুল। নাম না জানা কত ফুল ফুটে আছে। আমার মেয়ে অনন্যার মোবাইলে একটা অ্যাপ আছে ক্যামেরায় ফুল তুলে ধরলে নাম চলে আসে। এভাবেই জানলাম কিছু নাম যেমন জুয়েল উইড, জোয়ে পিয়ে উইড এবং নানা রকমের আসটার। এগুলো এই আগস্টের লেইট সামারের ফুল। গরমের সময় নাকি এখানে কসমস আর জিনিয়া ফুটে বাগানকে মাতিয়ে রাখে। তবে সেদিন আমার কাছে ফুলের নামের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল তাদের বিন্যাস।

একটি ফুল নিজে সুন্দর। কিন্তু অনেকগুলো ফুল যখন পাশাপাশি বসে, তাদের উচ্চতা, রং, আকৃতি, আলো আর ছায়াকে হিসাব করে সাজানো হয়, তখন সৌন্দর্য আর শুধু ফুলের মধ্যে সীমিত থাকে না— সেটি হয়ে ওঠে একটি শিল্পকর্ম। কোথাও সবুজের ওপর হলুদ। কোথাও লালের পাশে বেগুনি। কোথাও সাদা ফুলের শান্তি। কোথাও গাঢ় পাতার মধ্যে হঠাৎ একটি উজ্জ্বল ফুল যেন ছবির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি রং দিয়েছে, আর মানুষ হাতে তুলে নিয়েছে তুলি। মনে হচ্ছে একটি বিশাল জলরঙের ছবির মধ্যে দিয়ে আমরা হাঁটছি। ক্যানভাসের এক প্রান্তে পাহাড়ি বন, অন্য প্রান্তে ফুলের বাগান। কোথাও পাথরের দেয়াল, কোথাও জল, কোথাও ঘাসের মাঠ। কোথাও মানুষের পরিকল্পনার নিখুঁত রেখা, আবার তার পাশেই প্রকৃতির অনিয়ন্ত্রিত বেড়ে ওঠা।

প্রকৃতি ও মানুষের বন্ধুত্ব

বৃক্ষোদ্যানের আসল সৌন্দর্য শুধু তার গাছপালা বা ফুলে নয়। সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে প্রকৃতি আর মানুষের সম্পর্কের মধ্যে।

পাহাড়, বন, ঝরনা— এসব প্রকৃতির নিজের সৃষ্টি। সেখানে মানুষের কোনো নকশা নেই। কিন্তু এখানে এসে মানুষ প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে তাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেনি বরং তার সৌন্দর্যকে বুঝতে, সংরক্ষণ করতে এবং নতুনভাবে প্রকাশ করতে চেয়েছে। এই ৪৩৪ একরের জায়গাটিতে তাই একই সঙ্গে দুটি পৃথিবী আছে। একটি পৃথিবী প্রকৃতির। আরেকটি পৃথিবী মানুষের সৃজনশীলতার।

একদিকে ঘন বন, যেখানে গাছ নিজের মতো বেড়ে উঠছে। অন্যদিকে পরিচর্যা করা বাগান, যেখানে একটি ফুলও যেন জানে তাকে কোথায় ফুটতে হবে। একদিকে অরণ্যের অনিয়ন্ত্রিত সৌন্দর্য, অন্যদিকে মানুষের হাতে তৈরি নকশা।
আরবোরেটামে দেখলাম মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের একটি ছোট্ট পৃথিবী তৈরি করেছে। ট্রেইলে হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে গেলাম বনের মধ্যে। বনসাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম, একটি বিশাল বৃক্ষের জীবন কীভাবে একটি ক্ষুদ্র শরীরে আশ্রয় নিতে পারে। বাগানে এসে দেখলাম, ফুলকে শুধু ফুটতে দেওয়া হয়নি, তাদের দিয়ে মানুষ একটি ছবি এঁকেছে। আর প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্য; ‘ওহ গ্রেট স্পিরিট’-এর দিকে তাকিয়ে মনে হলো, মূর্তিটি আকাশের দিকে তাকিয়ে সকল সৃষ্টির জন্য নিরন্তর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির প্রতি।

১০ অক্টোবর, ২০২৬

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

কবি ও সাংবাদিক।


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।