পেশায় আমি রসায়নবিদ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন পড়েছি, কাজ শুরু করেছিলাম পণ্য উন্নয়ন আর মান ব্যবস্থাপনা নিয়ে। জীবনের পথ ঘুরে একসময় হাসপাতাল গড়ার কাজে এসে পড়ি। রসায়ন আমাকে শিখিয়েছে সংখ্যা মেপে দেখতে, আর হাসপাতাল শিখিয়েছে প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ থাকেন।
গত দুই দশকে ঢাকার মহাখালীতে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল পরিচালনা করতে গিয়ে একটি সত্য বারবার চোখে পড়েছে। মানুষের রোগ বদলে গেছে, কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও পুরোনো রোগের জন্যই সাজানো। এই লেখায় সহজ ভাষায় সেই বাস্তবতা আর সামনের সম্ভাবনার কথা বলতে চাই।
এক নজরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত
| সূচক | সংখ্যা |
|---|---|
| অসংক্রামক রোগে (NCD) মৃত্যু | মোট মৃত্যুর ৭১% |
| স্বাস্থ্য ব্যয়ের যে অংশ রোগীর নিজ পকেট থেকে | ৭৩% |
| স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে এক বছরে দরিদ্র হয়েছেন | ৬১ লাখ মানুষ |
| প্রতি হাজার মানুষের জন্য হাসপাতাল শয্যা | ০.৯৬টি (WHO রেফারেন্স ৩.৫টি) |
| প্রতি ১০,০০০ মানুষে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ | ১২.৭ জন (WHO ন্যূনতম ৪৪.৫) |
| প্রতি বছর বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয় | US$ ৪–৫ বিলিয়ন |
তথ্যসূত্র: BBS, BDHS 2022, WHO SDG Health Profile 2025, Bangladesh National Health Accounts / BIDS ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন।
যা আমরা পেরেছি, আর যেখানে পিছিয়ে পড়ছি
শুরুতেই স্বীকার করি, বাংলাদেশের অর্জন সম্মান করার মতো। কম খরচে মা ও শিশুর জীবন রক্ষায় আমরা অনেক ধনী দেশকেও ছাড়িয়ে গেছি। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু প্রতি হাজারে ৪৩ থেকে নেমেছে ৩১-এ। মাতৃমৃত্যু প্রতি লাখ জন্মে ১৫৩ থেকে কমে হয়েছে ১৩৬। টিকাদানে আমরা ৯২ শতাংশ শিশুর কাছে পৌঁছেছি। এখন দুই-তৃতীয়াংশ মা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সন্তান জন্ম দেন। এই চাহিদাই দেশে বেসরকারি হাসপাতালের বাজার গড়ে তুলেছে।
কিন্তু গত দু-এক বছরের তথ্য আমাকে ভাবিয়েছে। এক প্রজন্মে প্রথমবারের মতো কয়েকটি মূল সূচক উল্টো পথে হাঁটছে। নবজাতক মৃত্যুহার এক বছরে প্রতি হাজারে ১৬ থেকে বেড়ে ২০ হয়েছে। প্রত্যাশিত গড় আয়ু প্রথমবারের মতো কমেছে, ৭২.৪ থেকে ৭২.৩ বছরে। সিজারিয়ান জন্ম এখন ৪৫ শতাংশ, অথচ WHO-র মতে প্রয়োজন ১০–১৫ শতাংশ। পুষ্টিতেও একই চিত্র। ৬–২৩ মাস বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মাত্র ২৯ জন ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাবার পায়। শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৫ থেকে মাত্র চার বছরে নেমেছে ৫৫ শতাংশে।
এখন একই পরিবারে থাকতে পারে একটি খর্বকায় শিশু, রক্তস্বল্পতায় ভোগা একজন মা আর ডায়াবেটিক দাদা-দাদি। এক সমস্যার জন্য গড়া ব্যবস্থাকে এখন একসঙ্গে তিনটি সামলাতে হচ্ছে।
রোগের নতুন মানচিত্র, পকেটের পুরোনো চাপ
একসময় আমাদের বড় শত্রু ছিল ডায়রিয়া, যক্ষ্মা আর প্রসবকালীন জটিলতা। এখন দেশে প্রতি ১০টি মৃত্যুর প্রায় ৭টিই হয় অসংক্রামক রোগে: হৃদ্রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস আর দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট। এর প্রায় অর্ধেক মৃত্যু হয় ৭০ বছর বয়সের আগে, যখন মানুষটি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী।
ক্যানসারের ছবিটা আরও কঠিন। ২০২৪ সালে নতুন রোগী ছিলেন প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার, মারা গেছেন প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার জন। অর্থাৎ প্রায় প্রতি চার মিনিটে একটি মৃত্যু। অবাক লাগে, দেশীয় ওষুধশিল্প কয়েকটি ক্যানসারের ওষুধের দাম ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে। ওষুধ আছে, অভাব চিকিৎসা অবকাঠামোর। অনকোলজি, কিডনি ও হৃদ্রোগের ভালো চিকিৎসা এখনও প্রায় পুরোটাই ঢাকাকেন্দ্রিক।
সবচেয়ে বড় চাপটা পড়ছে সাধারণ পরিবারের কাঁধে। স্বাস্থ্যে খরচ হওয়া প্রতি ১০০ টাকার ৭৩ টাকাই অসুস্থতার মুহূর্তে রোগীর নিজ পকেট থেকে যায়। এর অর্ধেকের বেশি যায় ওষুধে, এক-চতুর্থাংশের বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। দীর্ঘমেয়াদি রোগ মানে আজীবন ওষুধ আর বারবার পরীক্ষা। তাই এক বছরেই প্রায় ৬১ লাখ মানুষ শুধু চিকিৎসার খরচে দরিদ্র হয়ে পড়েছেন।
রাষ্ট্র সাড়া দিচ্ছে, এটি আশার কথা। FY2026–27 বাজেটে স্বাস্থ্য বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা হয়েছে। এই প্রথম তা GDP-র ১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তবু সম্পূর্ণ ঘাটতি পূরণে এটি এখনও অনেক কম।
ঘাটতি ভবনের নয়, দক্ষ মানুষের
অনেকে মনে করেন, আরও হাসপাতাল বানালেই সমস্যার সমাধান। আমার অভিজ্ঞতা বলে ভিন্ন কথা। হাসপাতালের লাইসেন্স পাওয়া তুলনামূলক সহজ, কিন্তু প্রশিক্ষিত নার্স আর টেকনিশিয়ান পাওয়া কঠিন। WHO বলছে, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য অন্তত ৪৪.৫ জন চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ দরকার। আমাদের আছে মাত্র ১২.৭ জন। একজন চিকিৎসকের পাশে তিনজন নার্স থাকার কথা, আছেন একজনেরও কম। অথচ প্রায় ৭২ হাজার অনুমোদিত পদ খালি পড়ে আছে।
শয্যার হিসাবও একই কথা বলে। প্রতি হাজার মানুষের জন্য একটিরও কম শয্যা, যার দুই-তৃতীয়াংশ ইতিমধ্যে বেসরকারি খাতে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালের মাত্র ১৫ শতাংশে বেসিক লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার সক্ষমতা আছে। আমাদের আসল ঘাটতি হাসপাতালের নয়, এখনকার রোগগুলোর চিকিৎসা দিতে পারে এমন হাসপাতালের।
এই শূন্যতার দাম দিচ্ছে দেশ। প্রতি বছর প্রায় ৪৫ থেকে ৮০ লাখ রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। তাঁরা খরচ করেন ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার, যা আমাদের পুরো সরকারি স্বাস্থ্য বাজেটের সমান। হৃদ্রোগ, ক্যানসার, কিডনি আর অঙ্গ প্রতিস্থাপনেই এর বড় অংশ যায়। ভারতের ভিসা সীমিত হওয়ায় এখন এই রোগীদের দেশেই ভালো সেবা দেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরেকটি সুযোগ আমরা হারাচ্ছি। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ১.১ কোটি স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি হবে। ফিলিপাইনের প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার নার্স বিদেশে কাজ করেন। ২০২৪ সালে সরকারি চ্যানেলে বাংলাদেশ পাঠিয়েছে মাত্র ৮৯২ জন। উপসাগরীয় দেশে একজন নার্স মাসে ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকা আয় করেন। দরকার শুধু আন্তর্জাতিক মানের পাঠ্যক্রম, ভাষা প্রশিক্ষণ আর দেশে লাইসেন্সিং পরীক্ষার ব্যবস্থা।
আমার অভিজ্ঞতা ও সামনের পথ
ইউনিভার্সালে আমরা শুরু থেকেই একটি বিষয় বুঝেছিলাম। নিজের মানুষ নিজেকেই তৈরি করতে হবে। তাই হাসপাতালের পাশাপাশি গড়েছি মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ, টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আর একটি অলাভজনক গবেষণা কেন্দ্র। এর ফল সবচেয়ে ভালো বুঝেছি কোভিডের সময়। প্রথম দিকের বেসরকারি হাসপাতাল হিসেবে আমরা পৃথক ইউনিট চালু করি। ৪,৫০০-এর বেশি রোগীর চিকিৎসা দিয়েছি, ৯৫ হাজার RT-PCR পরীক্ষা করেছি। নিজেদের প্রশিক্ষিত নার্স আর টেকনিশিয়ান না থাকলে সেটি সম্ভব হতো না।
আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে মানুষের আর্থিক সামর্থ্য। আমাদের হাসপাতালে মোট শয্যার ১০ শতাংশ দুস্থ রোগীদের জন্য বিনামূল্যে রাখা হয়। আমরা এখন মহাখালীতে ৫০০ শয্যার ইউনিভার্সাল মেডিসিটি গড়ছি। লক্ষ্য হলো হৃদ্রোগ, ক্যানসার, কিডনি আর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো জটিল চিকিৎসা দেশেই সাশ্রয়ী দামে দেওয়া। যে রোগী আজ বিদেশে যান, তিনি যেন কাল নিজের শহরেই ভরসা পান।
তবে একটি প্রতিষ্ঠান একা পারবে না। আমার বিবেচনায় কয়েকটি কাজ এখনই শুরু করা দরকার:
- দক্ষ জনবল তৈরি: নার্স ও টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণকে জাতীয় অগ্রাধিকার করা, দেশে আন্তর্জাতিক লাইসেন্সিং পরীক্ষাকেন্দ্র আনা।
- দীর্ঘমেয়াদি রোগের সেবা: প্রাথমিক স্তরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগের নিয়মিত ফলো-আপ ব্যবস্থা গড়া।
- তথ্য ও গবেষণা: জাতীয় ক্যানসার রেজিস্ট্রি চালু করা, আর দেশের রোগীদের নিয়ে দেশেই ক্লিনিক্যাল গবেষণা করা।
- পুষ্টিতে মাঠপর্যায়ের উদ্যোগ: শিশুখাদ্যের অভ্যাস আসলে কীভাবে বদলায়, তা পরিবারে গিয়ে যাচাই করা।
- সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব: বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি আর দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতাকে এক জায়গায় আনা।
এর কোনোটির জন্যই নতুন প্রতিষ্ঠান লাগবে না। দরকার বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তরিকতা আর একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা। বাংলাদেশের আছে চাহিদা, তরুণ জনশক্তি আর মেধাবী চিকিৎসক। নেই শুধু সক্ষমতা, তথ্য আর দক্ষ জনবল তৈরির পথ। এই ঘাটতিগুলো নিজে থেকে পূরণ হবে না। রোগ বদলেছে; এখন স্বাস্থ্যব্যবস্থা বদলানোর দায়িত্ব আমাদের সবার।


সময়ের চাহিদা অনুযায়ী তথ্যভিত্তিক একটি লেখা হয়েছে। ধন্যবাদ ম্যাডাম কে, ধন্যবাদ পড়শী কে।