‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’: যন্ত্রের থাবায় রক্তাক্ত পুরাণ

দিব্যেন্দু ঘোষ
May 23, 2026
7 views
19 mins read

আগেকার দিনে কাহাররা লাঠিয়াল ছিল। সে বাবা ঠাকুরের অনেক অলৌকিক গল্প বলে। সুচাঁদ পুরনো সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তার গল্পের মাধ্যমেই আমরা হাঁসুলী বাঁকের আদিম রূপটি দেখতে পাই। সে যেন বাঁশবাঁদি গ্রামের এক জীবন্ত ইতিহাস।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে নারী চরিত্রগুলোকে সযত্নে তৈরি করেছেন। কাহার সমাজের নারীদের জীবন খুব কষ্টের। কিন্তু তাদেরও নিজস্ব ইচ্ছা এবং স্বপ্ন আছে। কপিলা চরিত্রটি খুব বুদ্ধিমতী এবং চতুর। সে জানে কীভাবে নিজের জায়গা করে নিতে হয়। তার মধ্যে এক ধরনের স্বাধীন সত্তা আছে। সে বনওয়ারীকে ভালবাসে, আবার নিজের ভালটাও বোঝে। অন্যদিকে আছে পাখি। পাখি করালীর প্রেমিকা। পাখি খুব সহজ-সরল একটি মেয়ে। সে করালীকে অন্ধের মতো ভালবাসে। করালী যখন আধুনিক জীবনের দিকে এগিয়ে যায়, পাখিও তার সঙ্গী হয়। পাখি আর কপিলার চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক গ্রামীণ নারীদের মনের নানা দিক তুলে ধরেছেন।

‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ শুধু একটি গ্রামের গল্প নয়। এটি সমসাময়িক ইতিহাসেরও একটি দলিল। উপন্যাসের সময়কাল হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। যুদ্ধের প্রভাব এই ছোট গ্রামেও এসে পড়েছিল। যুদ্ধের কারণে দেশে জিনিসের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। চাল, ডাল, কাপড়ের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। কাহারদের জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। মাঠে কৃষিকাজ করে তারা আর পেট চালাতে পারে না। অভাব তাদের গ্রাস করে। এই অর্থনৈতিক সঙ্কট উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহকে অনেক বদলে দেয়।

এই চরম অভাবের সময়ে চন্দনপুরে রেলের কারখানা তৈরি হয়। এই কারখানাই হল যন্ত্রসভ্যতার প্রতীক। কারখানার বাঁশির শব্দ বাঁশবাঁদি গ্রামের শান্ত পরিবেশকে নষ্ট করে দেয়। কারখানায় কাজ করলে নগদ টাকা পাওয়া যায়। যুদ্ধের বাজারে যখন কৃষিকাজ করে পেট ভরছে না, তখন এই কারখানা কাহারদের কাছে ত্রাতা হয়ে আসে। অনেক কাহার যুবক জমি ছেড়ে কারখানায় কাজ করতে যায়। তারা মজুর থেকে শ্রমিকে পরিণত হয়। টাকার মুখ দেখে কাহারদের স্বভাবও বদলাতে থাকে। তাদের সহজ-সরল জীবনে লোভ ঢুকে পড়ে। তারা আর আগের মতো মিলেমিশে থাকে না। তাদের মধ্যে স্বার্থপরতা দেখা দেয়। যন্ত্রসভ্যতা এভাবেই প্রাচীন কৃষিসমাজকে ভেতর থেকে শেষ করে দিতে শুরু করে।

উপন্যাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে যখন করালী কর্তাবাবা অর্থাৎ বিশাল সাপটিকে পুড়িয়ে মারে। একদিন করালী একটি গাছের ওপর উঠে সাপটিকে দেখে ফেলে। সে একটুও ভয় পায় না। সে সাহসের সঙ্গে সাপটিকে মারে। এই ঘটনায় পুরো গ্রামে শোরগোল পড়ে যায়। বনওয়ারী তো ভয়ে কাঁটা হয়ে যায়। সে ভাবে, এবার বাবা ঠাকুর পুরো গ্রাম ধ্বংস করে দেবেন। আকাশ ভেঙে পড়বে। মহামারী আসবে। সবাই ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু দিন যায়, রাত যায়, কিছুই হয় না। আকাশও ভাঙে না, কেউ মারাও যায় না। তখন কাহারদের চোখ খোলে। তাদের মন থেকে যুগ যুগ ধরে জমে থাকা ভয় দূর হতে শুরু করে। তারা বুঝতে পারে যে ওই সাপটি কোনও দেবতা ছিল না। ওটা শুধুই একটা সাধারণ জীব ছিল। এই ঘটনা কাহার সমাজের কাছে এক বিশাল বাঁক বদল। এখান থেকেই তাদের কুসংস্কারের অন্ধকার দূর হতে শুরু করে। তারা যুক্তির আলো দেখতে পায়।

সাপটি মারা যাওয়ার পর বনওয়ারীর ক্ষমতা আর আগের মতো থাকে না। মানুষ আর তাকে আগের মতো ভয় পায় না বা ভক্তি করে না। করালী সবার কাছে হিরো হয়ে ওঠে। এরপর বাঁশবাঁদি গ্রামে ভাঙন ধরে। চন্দনপুর কারখানার আকর্ষণে গ্রামের মানুষ গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে শুরু করে। বনওয়ারী তাদের আটকানোর অনেক চেষ্টা করে। সে বোঝানোর চেষ্টা করে যে মাটিই হল মানুষের আসল মা। কিন্তু কেউ তার কথা শোনে না। পেটের দায়ে এবং নতুন জীবনের লোভে তারা গ্রাম ছাড়ে। বনওয়ারী একা হয়ে পড়ে। সে তার চোখের সামনে নিজের সাজানো সমাজকে ভেঙে যেতে দেখে। সে বুঝতে পারে যে নতুন যুগের সঙ্গে সে লড়াই করে পারবে না। তার পুরনো বিশ্বাস আর নিয়মগুলো এখন মূল্যহীন।

উপন্যাসের শেষে আমরা এক করুণ দৃশ্য দেখতে পাই। বনওয়ারীর মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়। এটি একটি গোটা যুগের মৃত্যু। প্রাচীন কৃষিসমাজ এবং লৌকিক বিশ্বাসের পতন ঘটে বনওয়ারীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। বনওয়ারী মারা যাওয়ার পর হাঁসুলী বাঁকের উপকথার যুগ শেষ হয়ে যায়। করালী সমাজকে নতুন পথে নিয়ে যায়। সে কাহারদের নতুন পরিচয় দেয়। তারা আর আগের সেই সহজ-সরল মানুষ থাকে না। তারা আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার অংশ হয়ে যায়। বাঁশবাঁদি গ্রামটি তার পুরনো রূপ হারিয়ে ফেলে। সেখানে শুরু হয় এক নতুন বাস্তবতার গল্প।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসে অত্যন্ত নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। তিনি পুরনো সমাজকে যেমন সম্মান করেছেন, তেমনি নতুন সমাজকেও মেনে নিয়েছেন। তিনি বনওয়ারীর প্রতি গভীর সহানুভূতি দেখিয়েছেন। বনওয়ারীর পরাজয়ে আমরা কষ্ট পাই। আবার করালীর সাহসিকতা এবং আধুনিক চিন্তাকেও লেখক সাধুবাদ জানিয়েছেন। লেখক এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে পরিবর্তনই হল পৃথিবীর একমাত্র নিয়ম। সময় বদলালে সমাজকেও বদলাতে হয়। পুরনোকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকলে চলে না। পুরনো যুগের কিছু ভাল দিক ছিল— যেমন মানুষের মধ্যে ভালবাসা, মিলেমিশে থাকা। যন্ত্রসভ্যতা সেই ভালবাসা কেড়ে নিয়েছে। মানুষ স্বার্থপর হয়েছে। লেখক এই নিষ্ঠুর সত্যটিকেও আড়াল করেননি। তিনি যন্ত্রসভ্যতার ভাল এবং খারাপ দুটি দিকই সমান দক্ষতায় তুলে ধরেছেন।

উপন্যাসের ভাষা অত্যন্ত সাবলীল। লেখক কাহারদের মুখের আঞ্চলিক ভাষা খুব সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন। তাদের কথা বলার ধরন, তাদের গালিগালাজ, তাদের গান, সবকিছু উপন্যাসে একেবারে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির বর্ণনাতেও তারাশঙ্কর অসামান্য। কোপাই নদীর বয়ে চলা, বাঁশবাগানের অন্ধকার, বাবা ঠাকুরের তলার রহস্যময় পরিবেশ, সবকিছু লেখক এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে পড়লে মনে হয় যেন চোখের সামনে সিনেমা দেখছি। ছোট ছোট বাক্যে, সহজ গদ্যে তিনি এক বিশাল ইতিহাস রচনা করেছেন।

‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। এটি শুধু বাঁশবাঁদি গ্রামের কাহারদের গল্প নয়। এটি হল সমগ্র মানবসভ্যতার পরিবর্তনের গল্প। কীভাবে মানুষ প্রকৃতিকে ভয় পেত, কীভাবে তারা কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে ছিল এবং কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার আলো ও আধুনিকতা তাদের জীবনকে বদলে দিল, তারই এক নিখুঁত ছবি এই উপন্যাস। কৃষিনির্ভর সমাজ ভেঙে কীভাবে শিল্পনির্ভর সমাজ গড়ে উঠল, তার এক জ্বলন্ত দলিল হল এই উপন্যাস। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর তুলির আঁচড়ে হাঁসুলী বাঁকের প্রতিটি মানুষকে অমর করে গেছেন। বনওয়ারী, করালী, সুচাঁদ পিসিরা শুধু গল্পের চরিত্র নয়। এরা আমাদের সমাজেরই এক একটি রূপ। বাংলার মাটির গন্ধ, নদীর কলতান এবং খেটে খাওয়া মানুষের ঘামের গন্ধ এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় মিশে আছে। তাই যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে, ততদিন ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে। এটি সত্যিই এক কালজয়ী সৃষ্টি।


দিব্যেন্দু ঘোষ | সাঁকরাইল (হাওড়া), পশ্চিম বাংলা, ভারত

সাংবাদিক, লেখক, প্রাবন্ধিক ও বাচিক শিল্পী।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

যে কোথাও ফেরে না – পাঠ অনুভব

Next Story

শেকড়ের কাছে ফেরা

Latest from বই আলোচনা

যে কোথাও ফেরে না – পাঠ অনুভব

কবি তৃষ্ণা বসাকের 'যে কোথাও ফেরে না' কবির নিজস্ব স্বর্গের সিঁড়ি। এক একটি ধাপে দাঁড়িয়ে আছে দুঃখ, শোক, প্রেম, অপ্রেম, ... কবিতার বইটি নিয়ে

দি ইলাভেন্থ আওয়ার

The Eleventh Hour: A Curious Mystery by Greame Rowland Base - ইংরেজীতে লেখা এই বইটি নিয়ে আলোচনা করেছেন ড. আশরাফ আহমেদ।