পড়শী সাহিত্য ও শিল্প মিছিলের অনুরণন – যখন গান হয়ে ওঠে ইতিহাসের ভাষা

মিছিলের অনুরণন – যখন গান হয়ে ওঠে ইতিহাসের ভাষা

Post Views: 11

গভীর রাতে শহরের একটি দেয়ালে কেউ স্প্রে ক্যান দিয়ে লিখছে কয়েকটি শব্দ। একটু দূরে আরেকজন মোবাইল ফোনের আলোয় রেকর্ড করছে নতুন একটি র‍্যাপ। কোথাও একজন গিটার হাতে বসে সুর খুঁজছে, কোথাও কেউ কবিতার খাতায় লিখে রাখছে আগামী দিনের স্লোগান। তাদের কেউ একে অপরকে চেনে না। অথচ অদ্ভুতভাবে তারা সবাই একই কাজ করছে, একটি সময়কে বাঁচিয়ে রাখছে! ইতিহাসের বইয়ে এসব মানুষের নাম সব সময় লেখা থাকে না। কিন্তু ইতিহাসের শব্দভান্ডার তাদের ছাড়া পূর্ণও হয় না।

যদি প্রতিবাদের একটি মুখ থাকত, তবে তার ঠোঁটে হয়তো কোনো স্লোগান নয়, একটি গানই বাজত। ভিন্ন মানুষের ভিন্ন মতামত, অথবা একই মতামতই বিভিন্ন ভাষা কিংবা ভিন্ন আঙ্গিকে বলা যায়। অথচ সবার কথা একসাথে শোনার একটা স্পষ্ট ভাষা হলো সঙ্গীত, যা কোনো কাঁটা তারের বেড়া মানে না। যেমন ফিরে যাওয়া যায় ১৯৭১ সালে। হাজার মাইল দূরে লন্ডনে কিংবা নিউইয়র্কে তখনও অনেকেই ‘বাংলাদেশ’ নামটি ঠিকমতো উচ্চারণ করতে জানতেন না। কিন্তু একদিন ভারতীয় সেতারের ওস্তাদ রবিশঙ্কর তাঁর বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের কাছে বললেন—’আমার দেশের মানুষ মরছে, শরণার্থী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ সেই কথোপকথন থেকেই জন্ম নিল ইতিহাস। মঞ্চে উঠল ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। সেদিন গান শুধু বিনোদন ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পক্ষে বিশ্বের বিবেককে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। বাংলাদেশের জন্য পৃথিবীর অন্যতম বড় সংগীত-সংহতির গল্পটি আজও মনে করিয়ে দেয় কখনও কখনও একটি গান সীমান্তের চেয়েও অনেক দূর যেতে পারে।

বাংলার ইতিহাসে এই গল্প নতুন নয়। এক শতাব্দী আগে কাজী নজরুল ইসলাম কলম হাতে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিবাদ শুধু রাগ নয়, তারও একটি সুর আছে। তাই “চল্ চল্ চল্ “কেবল গান হয়ে থাকেনি, মানুষের বুকের ভেতর সাহসের স্পন্দন হয়ে বেঁচে থেকেছে। তাই যুদ্ধের ধোঁয়ায় ঢেকে থাকা আকাশকে সাক্ষী রেখেই সীমান্তের ওপারে শরণার্থী শিবিরে, মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্পে কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তরঙ্গে ভেসে এসেছে গান। সেই সুর বন্দুক চালায়নি, কিন্তু বন্দুকধারীর মনোবলকে শক্ত করেছে। একটি জাতির স্বপ্নকে এক সুতোয় গেঁথেছে। ইতিহাস তাই আজও বলে—মুক্তিযুদ্ধ শুধু রণাঙ্গনে জেতা হয়নি; জেতা হয়েছিল কণ্ঠেও।

এরপর সময় পাল্টেছে, গল্প পাল্টেছে কিন্তু জীবনের মঞ্চ পাল্টায়নি। ক্যাসেটের জায়গায় আসে ইউটিউব। মাইক্রোফোন বদলে যায়, বিট বদলে যায়, কিন্তু প্রতিবাদের প্রয়োজন বদলায় না। নতুন প্রজন্ম তাদের ভাষা খুঁজে পায় র‍্যাপে, হিপ-হপে, স্ট্রিট আর্টে। যে কথাগুলো দীর্ঘ বক্তৃতায় পৌঁছাতে সময় লাগত, সেগুলো কয়েক মিনিটের একটি গানে হাজারো মানুষের কানে পৌঁছে যায়। জুলাইয়ের আন্দোলনের দিনগুলোতে এই দৃশ্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। রাজপথে যেমন স্লোগান ছিল, তেমনি ছিল র‍্যাপ; দেয়ালে যেমন লেখা ছিল প্রতিবাদের ভাষা, তেমনি ছিল গ্রাফিতির রঙ। “আওয়াজ উডা”, “কথা ক”—এমন কিছু গান অনেক তরুণের কাছে কেবল সংগীত ছিল না; ছিল সময়ের অনুভূতি, সাহসের প্রতিধ্বনি। শহরের দেয়ালগুলোও যেন কথা বলতে শিখেছিল শিল্পীদের তুলিতে।

তবু গল্পের একটি অধ্যায় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।

কোনো আন্দোলনের স্মরণসভা, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা ইতিহাসচর্চায় আমরা পরিচিত মুখগুলোকে মনে রাখি, কিন্তু যাঁরা প্রথমে শব্দ, সুর কিংবা রঙ দিয়ে মানুষের অনুভূতিকে ভাষা দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আলোচনার বাইরে থেকে যান। অথচ ইতিহাস একক নায়কের নয়। এটি অসংখ্য অচেনা মানুষের সম্মিলিত সৃষ্টি। একজন কবি, একজন গণসংগীতশিল্পী, একজন র‍্যাপার, একজন গ্রাফিতি শিল্পী— সবাই মিলে একটি সময়ের প্রতিকৃতি আঁকেন।
হয়তো এ কারণেই একটি সাধারণ মাসও একসময় ইতিহাস হয়ে ওঠে। কারণ ক্যালেন্ডার কোনো মাসকে স্মরণীয় করে না; মানুষের কণ্ঠ, শিল্প আর আত্মত্যাগই তাকে স্মৃতির ভেতর স্থায়ী করে।

প্রতিবাদের ভাষা বদলাবে। আগামী দিনে হয়তো নতুন কোনো সুর, নতুন কোনো শিল্পমাধ্যম জন্ম নেবে। কিন্তু যখনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ একসঙ্গে দাঁড়াবে, কোথাও না কোথাও আবার একটি গান জন্ম নেবে। কেউ সেটি লিখবে, কেউ গাইবে, কেউ দেয়ালে আঁকবে, কেউ নিঃশব্দে শুনবে। আর বহু বছর পরে, ইতিহাস হয়তো শুধু ঘটনাগুলো মনে রাখবে না; মনে রাখবে সেই রাগিণীকেও, যা একদিন মিছিলের ভেতর জন্ম নিয়েছিল। মনে পড়ে যাবে-

“তোদের বন্ধ কারায় আসা মোদের বন্দী হতে নয়,
ওরে ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন–ভয়।
এই বাঁধন প’রেই বাঁধন–ভয়কে কর্‌ব মোরা জয়,
এই শিকল– বাঁধা পা নয় এ শিকল ভাঙা কল।”

৩ জুলাই, ২০২৬


আইডাহো, যুক্তরাষ্ট্র

মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে অধ্যয়নরত। সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাচ, বিতর্কের পাশাপাশি লেখালেখির চর্চাও ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠায় বিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলায় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।