স্ক্যান্দিনাভিয়ান নরকে

তালহা মুনতাসির নাফি
May 22, 2026
2 views
46 mins read

কিছু একটা ভুল হচ্ছে। একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তার মনে পড়ছে না। কিন্তু কেন গুরুত্বপূর্ণ তা সে কিছুতেই ভেবে উঠতে পারে না। আচ্ছা! একটা ব্যাপার কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়? অথবা গুরুত্ব শব্দটা ভারীই বা কেন? ‘গুরুত্ব’- উচ্চারণ করতে গেলেও গলায় একটা দলা বাঁধে। দলাটা মিহি। লোমশ একটা হাতের লাখো লোমের একটি লোমের মতো ক্ষুদ্র। সেই ক্ষুদ্রতার ভার বা গুরুত্ব ঠিক তখন বোঝা যায় যখন সেই ক্ষুদ্র লোমটাকে টেনে ধরা যায়। সে তার অবস্থান জানান দেয়। অর্থাৎ তার গুরুত্ব নিশ্চয়ই কিছু আছে। তবে এইভাবে ভাবলেও হচ্ছে না। খটকা আছে। অবস্থান থাকলেই বা সেটা গুরুত্বপূর্ণ হতে যাবে কেন? জানান দিলেও তো হবে না। প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিদিন কেউ না কেউ অনশন করছে। অনশন করে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে। কারা এই অনশন করছে, কীসেরই বা জন্যে তাও রীতিমতো কেউই জানে না। অন্তত সে তো জানেই না। জানতে ইচ্ছা করলো। ঢু দিলাম। আবার ভুলে গেলাম। এইভাবেই হয়ে আসছে। এটাকে গুরুত্ব বলে না। তাহলে যেটা গুরুত্ব রাখে সেইটা তার মনে পড়ছে না কেন?

সে মনে করবার চেষ্টা করে। আজিজ মার্কেটের সামনে এক বৃদ্ধ লোকের চেহারা তার মাথায় ভেসে আসছে। বৃদ্ধ ভদ্রলোকের নামও ধরা যাক আজিজ। যেহেতু আজিজ মার্কেটের সামনে বসে ভিক্ষা করেন। সেহেতু তাকে আজিজ ডাকতে কোনো বাধা নাই। আজিজ লোকটা তাকে কিছু একটা বললো কিংবা বললো না। প্রথমে কথাটা স্পষ্ট শোনা গেল না। গলা খাকাড়ি দিতেই আশেপাশের নিস্তব্ধতার পর্দা কেটে গিয়ে ব্যস্ত রাস্তার শব্দ, মানুষের শব্দ, হর্নের শব্দ সব মিলে একাকার হয়ে তার কানে এসে বাজতে লাগলো। আজিজকে বলতে শোনা গেল, “চ্যাটের জীবন। চ্যাটের ঠ্যাং। ঠ্যাং এর মা রে চুদি।”

তার একটা পা ছোট। জিজ্ঞেস করে জানা গেল এই ছোট পা কোনো কাজের না। কিন্তু অকাজেরও না। তার বাম পা, অর্থাৎ ভালো পা কাজের এবং তার আপাতত দুঃখের কারণ।

“কেন?” সে জিজ্ঞাসা করে। বৃদ্ধ আবারো উত্তর দেন, “ঠ্যাং এর মা রে চুদি।”

এতক্ষণে ঘটনা অনেকটাই পরিষ্কার হলো- সে পাশে কাউকে বলতে শোনে। অথচ পাশে কেউ নেই। ডানে, বামে, পেছনেও। কিন্তু ঘটনা তার কাছেও পরিষ্কার হলো একই সময়ে। সে বোঝে আজিজের ভালো পা- বাম পায়ের উরুতে ব্যথা এবং একই সাথে তালুতে ব্যথা। এই ব্যথার কারণে তিনি আগে ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে পারলেও এখন তাও পারেন না। একটা ছেলে আছে। নাম বাচ্চু। বাচ্চু তাকে সকালে একবার বসিয়ে রেখে যায়। আবার সন্ধ্যায় উঠিয়ে বাড়িতে দিয়ে আসে। বাচ্চুর এটা রোজকার ধান্ধা৷ এলাকার সকল অক্ষম ভিখারিকে এইভাবেই সে দিয়ে-নিয়ে আসে। দিনের কামাই এর এক সিকি তার পকেটে যায়।

এতসব তথ্য বৃদ্ধ তাকে দেননি। কিন্তু তার কাছে এই তথ্য আছে। কেন আছে তার চেয়ে জরুরি বিষয় আপাতত যেইটা তা হলো একটা বস্তু কখন গুরুত্বপূর্ণ হয়? কেন “গুরুত্ব” সেই গুরুত্বের এসেন্সটা বহন করে? এই প্রশ্নের উত্তরে বৃদ্ধ আজিজ জানান, “ঠ্যাং এর মা রে চুদি”।

অর্থাৎ ইন্দ্রিয় বরাবর কনস্ট্যান্ট আঘাতের নামই গুরুত্ব। ইন্দ্রিয়ের অভাব থাকলে যেমন- অন্ধের চোখে রঙ গুরুত্বহীন। কিন্তু এতেও গুরুত্ব ব্যাপারটা কেবল ইনডিভিজুয়াল এস্পেক্টে চিন্তা করা হচ্ছে। ইউনিভার্সাল গুরুত্বের সংজ্ঞা কি? ইউনিভার্সাল ইন্দ্রিয়ে আঘাতই বা কীভাবে করা হচ্ছে? এই কথা ভাবতে ভাবতে তার মাথায় আচমকাই সাইনুসাইটিসের ব্যথার মতোন সেই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা মনে পড়লো।

তার প্রচণ্ড শীত করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হচ্ছে প্রচণ্ড সাদা বরফে ঢাকা, বৃক্ষহীন একটা প্রান্তরের ঠিক মাঝামাঝি সে শুয়ে আছে। আকাশ থেকে তুলোর মতো বরফ ছিটিয়ে সর্বত্র ছড়াচ্ছে অঝোরে। তার গায়ে পাতলা জামা। তার বাবা মোসাদ্দেক বলেন, “অতি ঠান্ডা এবং অতি গরমে কোনো পার্থক্য নাই।”

বলেন না বলতেন। সে নিজেকে শুধরে নেয়। তার বাবা এই অদ্ভুত কথা প্রায়ই বলতেন। তার মা প্রতিবারই দারুণ বিরক্ত হয়ে জবাব দিতেন, “কীসব আজেবাজে কথা।”

“তুমি বুঝবে না।”

“বুঝিয়ে বলো। খুলে না বললে তো বুঝতে পারব না।”

“দেখো, অতি ঠান্ডা কিংবা গরম একসময় এর তীব্রতা কাটিয়ে ওঠে। রিয়েলিটি তে এমন হয় না তবে আমাদের মস্তিষ্কের কাছে রিয়েলিটির একটা লিমিটেশন আছে। লিমিটেশন কাটিয়ে উঠলে সেই তীব্রতা কেবল মাত্র তীব্রতার জন্যই পরিচয় পায়। তখন আলাদা করে গরম কিংবা ঠান্ডার পরিচয় প্রয়োজন পড়ে না।”

“এখনো বুঝতে পারছি না।”

“আমি অবাকও হচ্ছি না।”

“কী বোঝাতে চাচ্ছো তুমি?”

“সেইটা বোঝার ক্ষমতা না থাকলে তো কিছু করার নেই। তবে শোনো, একটা উদাহরণ দেই- নর্স বা স্ক্যান্দিনাভিয়ান মিথোলজি চেনো নিশ্চয়ই বা আরবদের? ইসলামের কথাই ধরো। স্ক্যান্দিনাভিয়ানরা ঠান্ডা দেশের মানুষ। ওদের নরক তাই ঠান্ডা। আরবেরা উষ্ণ দেশের মানুষ। তাই ওদের নরকও আগুনের। মূল কথাটা এইটা না। মূল কথা হচ্ছে এই যে গরম বা ঠান্ডা নরকের মুখ্য ব্যাপার ঠান্ডা বা গরম কিছুই না বরং এর তীব্রতা। সাফারিং এর সবচেয়ে উঁচু পর্যায়ে….,” কিন্তু বাবা কথাটা শেষ করতে পারলেন না। মা বাধা দিলেন। তিনি অতি রাগান্বিত স্বরে কিছু একটা বলছেন কিন্তু তা শোনা যাচ্ছে না। সবকিছু ঘোলাটে হয়ে আসছে। অর্থাৎ এই স্মৃতির লিমিট ক্রস করে ফেলেছে সে।

বাবা-মায়ের সম্পর্কটা কেমন ছিল তা নিয়ে আর ভাবতে ইচ্ছে করে না তার। কিন্তু দুই পক্ষ যখন তাদের পুরো জীবন একে অন্যের উপর জয় হাসিল করবার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে ফেলে তখন আশেপাশের কারো দিকে তাকাবার সময়জ্ঞান আর গড়ে ওঠে না।

সে মারা যাচ্ছে। তার হঠাৎ করেই কথাটা মাথায় এলো। এক চিমটি আলো যখন অন্ধকার কোনো টানেলের ভেতর দিয়ে যায় ঠিক তেমন। অর্থাৎ আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আগের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটাকে ওভারল্যাপ করেছে। অনেকটা আমাদের জীবনের মতোন। এখানে জীবন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সমাবেশ। এবং কম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাদের নিচে পিষে যাচ্ছে।

এবং গুরুত্বপূর্ণ কেবল ঘটনাই না। সাবজেক্টওয়াইজ গুরুত্বও এখানে গুরুত্ব রাখছে। কম গুরুত্বের সাবজেক্টরা জীবনে কম এফেক্ট রাখছে। সমাজে কম প্রভাব রাখছে।

“Dissipate”

তার ইংরেজি শিক্ষক শমসের খান উচ্চারণ করেছিলেন। বহুবছর কিংবা বহু শতাব্দী আগে সে যখন ছিল ক্ষুদ্র এবং গুরুত্বের সংজ্ঞা ছিল তার অজানা। শমসের খান বলেছিলেন “Overweigh” এর সিনোনিম “Dissipate”। তার এখন মনে পড়ছে এবং তার আরও মনে পড়ছে সেদিন পড়া করে না আসায় শমসের খান তার হাতে বেতের দু’ঘা বসিয়ে ছিলেন। সেদিন সে গুরুত্বের সংজ্ঞা বুঝতে পারেনি। যেহেতু গুরুত্ব ওভারল্যাপ করে নাকি তা তার কাছে কেবলই অগুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তাহলে এখন কেন সে বুঝতে পারছে? যেহেতু সে মারা যাচ্ছে? নাকি সে মারা গেছে ইতোমধ্যে? এখন সে আছে নর্স মিথলজির কোনো নরকে? যেখানে অনন্তকাল তাকে ঠান্ডা বইতে হবে। তার শরীর নাড়াবারও ক্ষমতা থাকবে না।

অথবা ইয়াকুটিয়ার কোনো উপত্যকায়?

সাধারণত পুরাণে কিংবা পৃথিবীর অধিকাংশ গল্পে মানুষকে মৃত্যুর আগে আগে তার জীবনের স্মৃতিসমূহ রিপ্লে করানো হয়। তার পাপ-পূণ্য নিয়ে চিন্তা করবার সময় দেওয়া হয়। তার সাথে কি এমন কিছুই হচ্ছে? তাহলে কেন? সে কীভাবে মারা গেছে? কেন মারা গেছে? এইসব কথা তার কিছুই মনে পড়ছে না।

অথচ তার মাথায় একজনের কথা ভেসে আসছে। তার হৃদয় বলছে সেই মানুষটার কথা তাকে জানাতেই হবে। নিজের কাছেই তার মস্তিষ্কের বদ্ধ জায়গাটা খুলে দিতে হবে। সে কে?

কিন্তু সে কথা মনে পড়বার আগে তার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে পড়ে। সেদিন তার সঙ্গে ছিল ছোট একটা মেয়ে। বছর নয়ের কেউ। তার হাত ধরে আছে। খানিকক্ষণ বাদে বাদেই মেয়েটা কিছু একটা বলছে এবং এই বলবার পরিপ্রেক্ষিতে সে হাসছে। তারা কোথায় যাচ্ছে? জায়গাটা পরিচিত মনে হচ্ছে। আরামবাগ না? তারা আরামবাগের পুলিশবক্সটাও পার হয়ে গেল। মেয়েটার হাঁটতে ক্লান্তি লাগছে কিন্তু সে এই ব্যাপারটার কোনোরকম ধার না ধেরে প্রচণ্ড গতিতে হাঁটতে লাগলো। প্রতি সেকন্ডে যেন তার গতি বাড়ছিল জোয়ারের মতোন। আরামবাগ পার হয়ে তারা প্রবেশ করলো কমলাপুরে। কমলাপুরের একটা নার্সারি ছিল না? অন্য একটা স্মৃতি যেন জোর করে প্রবেশ করতে চায়। নার্সারির কথা এখন কেন আসছে? তারা তো নার্সারি যাচ্ছে না। কিন্তু নার্সারির স্মৃতিতে থাকা মানুষটার সঙ্গে এই ছোট মেয়েটার একটা গাঢ় সম্পর্ক আছে। সে মানুষটা কে? যার কথা বারবার আসছে কিন্তু কিছুতেই মনে করানো যাচ্ছে না?

সেখানে একটা কমবয়সী ছেলে যে বোধহয় ওই হবার কথা এবং সাথে সে মানুষটার একটা ঘোলা প্রতিচ্ছবি নার্সারির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। সে উবু হয়ে বসে একটা ফুলের গাছের দিকে সামান্য বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। সে বলে, “এটা তো কমন ফুল। স্কুল থেকে আসবার সময় রোজ দেখি। গুলিস্তানের অলিম্পিক বিল্ডিংটা আছে না? ওইটার সামনেও বুটি বুটি ফুটে আছে। সেখান থেকে ছিড়ে নিয়ে আসলেই তো চলে?”

“কমন হলেই কি সুন্দর হতে নেই? আমিও তো দেখতে কমন। তাই আমার ফুলও কমনই লাগবে।”

“যা! তুই কমন কোথায়? ধুরু তোর সাথে কথা বলাই যায় না। নে। এই ফুলটাই নে”।

সে দেখে দু’টো স্মৃতি সমান্তরালে চলছে। একটায় দেখছে ছোট মেয়েটা তার হাত ধরে কেবল হেঁটেই যাচ্ছে এবং অন্যটায় এইটুকু দেখিয়েই স্ক্রিনের মতোন সমান্তরাল স্মৃতি অন্ধকার হয়ে আসছে। সে আবারো ছোট মেয়েটার দিকে মনোযোগ দেয়। মেয়েটা কথা বলবার মধ্যেই আছে। তার ঠোট নড়ছে অনবরত। তারা এসে কমলাপুরের একটা তেহারির দোকানে ঢুকলো। দুইজন নিলেও দেখা যাচ্ছে সে কিছুই খাচ্ছে না। বাচ্চা মেয়েটার বোধহয় খিদে পেয়েছিল। তাই সে খাবার খাচ্ছিল বেশ গোগ্রাসেই। গলায় আটকালেই এদিকে সে পানি এগিয়ে দিচ্ছিল। তবে দেখা গেল নাড়াচাড়া করলেও খাবারটা সে শেষ করতে পারেনি।

তারপর তারা সোজা ঢুকে যায় কমলাপুর। সেখান থেকে রেল স্টেশন ছাড়িয়ে তারা হাঁটতে থাকে রেল লাইন ধরে। সেই পথটা নীরব। মাঝেমধ্যে গুটিকয়েক ট্রেন যায় আসে। একটা ট্রেন তাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। তুফানের মতোন। ঝম ঝম শব্দ করে। বাচ্চা মেয়েটার সে কী হাসি। সে হাতের আঙ্গুল দিয়ে দেখায় এদিক সেদিক। তাহলে কি সে মেয়েটাকে ট্রেন দেখাতে নিয়ে এসেছে?

এর উত্তর সে পায় না কিন্তু সে দেখে তার হাতের ঘড়ির উপর সে বারবার নজর দিচ্ছিল এবং একটা সময় সে মেয়েটিকে একটা রেল লাইনের উপর দাঁড়া করায়। পকেট থেকে ফোন বের করে মেয়েটার ছবি তোলে। কিন্তু সে এত ঘামছে কেন? বারবার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে এমন করে?

একটা ট্রেন আসতেই সামনে থেকে মেয়েটা আগে আগে সরে আসে। পাশাপাশি সে নেমে আসে। তবে এক সেকেন্ড যেতে না যেতেই তার মনে হয় সময় যেন থেমে গেছে। কিছু কি ঘটতে চলেছে? তাহলে তা কী?

এবং এক সেকেন্ডের মাঝপথেই দেখা যায়, সে বাচ্চা মেয়েটাকে ধাক্কা দেয় ট্রেনের নিচে এবং এরই মাঝে সব শব্দ কিংবা তার ইন্দ্রিয় সমূহ সচল হয়ে ওঠে। সে আগের মতো শুনতে পায় সবকিছু। সে শুনে মেয়েটার চিৎকার, “মামা!”

মামা? তার বুকে শুরু হয় ভীষণ বেদনা। সেই বেদনা ধীরে ধীরে ডানা খুলে অনেকগুলো বাদুড় হয়ে যায়। তার বুকের ভেতর থেকে ছিড়ে ছিড়ে খেতে থাকে মাংসপিণ্ড এবং পান করে রক্ত স্রোত। তার অনেককিছু মনে পড়তে থাকে। বইয়ের পাতার মতো অনেকগুলো পৃষ্ঠা উল্টোতে থাকে অদৃশ্য বাতাসে। তার মনে পড়ে কমলাপুর নার্সারির সেই মেয়েটার কথা। যার সঙ্গে এই মেয়েটার খুব গাঢ় সম্পর্ক রয়েছে। কিসের গাঢ় সম্পর্ক সে ভাবে? ভাবতে ভাবতে এবং সেই বইয়ের পাতা উল্টোতে উল্টোতে অল্প অল্প করে ভাসতে থাকে তার মুখচ্ছবি। প্রথমে তার ঠোঁট। তারপর নাক। তারপর চোখ। চোখের উপর তৈরি হয় মোটা একজোড়া ভ্রু। মাটির মতোন গায়ের রঙ। অদ্ভুত মায়াবী একটা মুখ। সে জানতে পারে মেয়েটা তার খুব কাছের কেউ। বইয়ের পাতা উল্টে যাওয়ার মতো তার কাছে উন্মোচিত হয় মেয়েটা তার বোন। তার বড় বোন।

সে তার বোনের সন্তানকে হত্যা করেছে। কিন্তু কেন? এর উত্তর সে জানে না। জানার চেষ্টা করতেই কোথা হতে যেন শব্দ আসে, “সবুর করো।”

গলার স্বর তার। সে নিজেকেই বলছে ‘সবুর’ করতে। সবকিছু উন্মোচিত হবে। নিশ্চয়ই হবে।

অনেকটা গল্প বলার ঢঙে তার স্মৃতি কথা বলতে শুরু করে। সিনেমা হলের পর্দার মতো সেই কথা তখন ছবি-শব্দ-ঘ্রাণ হয়ে তাকে হানা করে। তার মস্তিষ্কে বসিয়ে দেয় গভীর নখর।

তার বোনের নাম ছিল মোহনা। ছিল বলাটা ঠিক হচ্ছে না। মৃত্যু যদি কারো হয়ে থাকে তাহলে তার হয়েছে। না, আবার এক হিসেবে ঠিকই আছে। মৃত্যুর পর তো সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এখন সে নিশ্চয়ই তার কেউ না?

সে বলতে থাকে। নিজেকেই নিজে অথবা উন্মোচিত হয়। যেহেতু কিছু গল্প বলতে কিংবা শুনতে বক্তা এবং শ্রোতা কিছুরই প্রয়োজন হয় না। গল্প তখন আপন গতিতে প্রকাশ পায় এবং আপন বাহু লগ্নে ধ্বংস হয়। মোহনা ছিল তার বড় বোন। তাদের বাবা-মায়ের অমনোযোগী সংসারে সে এবং তার বোন অনেকটা চুপিচাপি বড় হতে থাকে। বাবা কাজের বাহানায় হরহামেশাই বাইরে থাকতেন। মাও যে খুব বেশি ঘরে থাকতেন তা না। এর বাসায় ওর বাসায়। এই বান্ধবীর সঙ্গে কিংবা মায়ের বাড়ি। আসলে মা খুব আদুরে ঘরের মেয়ে ছিলেন। অপ্রেমের বিয়ে কিংবা এরেঞ্জ ম্যারেজ নামক দুর্দশা যে তার হবে তা তিনি কল্পনা করতে পারেননি। কিন্তু মায়ের পিতা অর্থাৎ তার নানা হঠাৎ করেই এই ব্যাপারে কঠোর হস্তক্ষেপ করেন। আদুরে কন্যার কোনো আবদার আর মেনে নেওয়া হয়নি। মায়ের কি কোনো প্রেমিক ছিল? তা অবশ্য ওর মনে পড়ে না।

তারা ভাই-বোন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। মোহনা অনেকটা আকাশে উড়ে চলা ঘুড়ির মতো। সদা প্রাণবন্ত। আর ও? অতি ধূসর শ্রেণির মানুষ। বিষণ্ণতার একটা কালো স্রোত যেন ওর জন্মদাগ হয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছিল। বড় হওয়ার বেলাটায় ওর বন্ধু ছিল না। কেন যেন মানুষকে অসহ্য লাগতো তার। অন্যদিকে মোহনা সদা বন্ধুবৎসল। তাকে পাড়া থেকে স্কুলের সবাই চিনতো। কলেজে উঠে সেই পরিচিতির গন্ডি আরো বাড়লো। ওর দিকে তাকিয়ে মাঝেমধ্যেই বলতো, “তুই এত একা কেন রে? এমন বিষন্ন। তোকে আমার ভালো লাগে না।”

এর উত্তর সে কোনোদিন দিতে পারেনি। মোহনার কৈশোর যখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল এবং কৈশোরের শেষপ্রান্তে একটা অঘোষিত কামনার রঙ তার যৌবনের শিশি হতে ছটাকয়েক তার গালে ছিটিয়ে দিল। তার প্রেম এবং অপ্রেমের দিন শুরু হলো তখন। অদ্ভুত এক আনন্দ এবং বিষণ্ণতা তার সারা মুখে ছড়িয়ে গেল। কী এক প্রাপ্তি কিংবা কীসের এক ক্লান্তিহীন অপেক্ষা। কোনোদিন তার হাতে দেখা যেতো ফুল এবং কোনোদিন নতুন একটা হাতঘড়ি। একদিন তো তাকে রাতে এসে দেখালো-

“এই নে, দেখেছিস। সুন্দর না?”

“হ্যাঁ, কিন্তু স্বর্ণের নাকি?”

“হ্যাঁ।”

“কই থেকে পেয়েছিস?”

“সেইটা জেনে কী করবি?”

“এটা আবার কী কথা। এত দামী জিনিস।”

“শোন, খবরদার বাবা-মায়ের কানে যেন না যায়।”

“না। তোর জিনিস। আমি বলে কী করব। কিন্তু যা করছিস বুঝেশুনে করিস”।

এই কথা শুনে তার বোন তাকে অবাক করে দিয়ে খিলখিল করে হাসলো এবং খানিকক্ষণ বাদেই আবারো চুপ হয়ে গেল।

“তুই সত্যিই খুব বিষণ্ণ মানুষ। তোকে আমার ভালো লাগে না রে।”

এভাবেই দিন যায়। মাস যায়। হঠাৎ একদিন তার বোনটা বাইরে থেকে ফিরে এসেই চলে এলো তার কাছে। ওর চোখ মুখ দিয়ে আনন্দের স্ফটিক ঝরছে এবং অনেকটা বেদনার আবহও সেইসাথে অল্প অল্প করে উজাড় হচ্ছে।

সে বরাবরের মতো কিছুই জিজ্ঞেস করেনি কিন্তু মোহনা নিজ থেকেই বলতে শুরু করে, “আজ খুব ভালো লেগেছে জানিস।”

“কেন?”

“যা। সেইসব কী তোকে বলা যাবে নাকি।”

সে আবারও পাল্টা কিছু জিজ্ঞেস করে না।

তবে সেদিনই কিছুক্ষণ বাদে মোহনা তাকে ডেকে নিয়ে বললো, “একটা প্যারাসিটামল নিয়ে আসতে পারবি?”

“কেন? কী হয়েছে?”

“কিছু হয়নি। যা। নিয়ে আয়।”

সে নিচে সেদিন ফার্মেসিতে কিনতে গেছে। পাড়ারই কিছু লোক তার দলবল নিয়ে ফার্মেসির পাশের টঙের বেঞ্চে বসে আলাপ ঝারছে। সবার মধ্যমণি হয়ে যে কথা বলছে তাকে সে চেনে। নাম রবিন। লোকটার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো এবং ভুড়িটা থলথল করছে মেদে। কাজকর্ম তেমন কিছু করে না। তবে শোনা যায় মিটিং মিছিলে লোক ভাড়া দেয়। রাজনৈতিক প্রতিপত্তি রয়েছে সামান্য। এ ছাড়া তার বাপের ডিশের ব্যবসা আছে। রবিন যে কেবল কথা বলছে তাই নয়। তাকে নিয়েই কথা বলছে।

“এই যে পোলাডা দেখতেছস না? এর বোনরেই তো লাগাইলাম। আমি তো ভাবছি মিছা কথা কয়। ঝানু মাল। কিন্তু আইলা। মাইয়া সত্যিই কচি। কচি মাইয়া শুনতে মজা হইলেও খাইতে মজা নাই।”

আরেক লোক বলে, “বিয়া করি নাও ওস্তাদ।”

“হেহে! না! ওরে বিয়া করমু কোন দুঃখে? কিছুদিন খাইয়া ছাইড়া দিমু।”

এই শুনে সবাই খিকখিক করে হাসে।

এদিকে সে আশেপাশে না তাকিয়েই দ্রুত বাড়ির দিকে হেঁটে যায়।

“কি রে, এমন করে তাকিয়ে আছিস কেন? প্যারাসিটামল এনেছিস?” মোহনা জিজ্ঞেস করে তাকে দেখে।

ও তারপরও কথা বলে না।

“এই। কিরে!”

সে হাত বাড়িয়ে ওষুধটা দিয়ে চলে যায় আর কোনো শব্দ উচ্চারণ না করে।

সামনে অসংখ্য ভবন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হরেক রঙ। কোনোটির গায়ে কেবল নীল রঙের কাঁচ। কিছু ভবনে আলাদা করে কোনো রং করা নেই। ধূসর এবং রুক্ষতা ধারণ করে সটান হয়ে থাকে। ভয় হয় এই বুঝি ফাটল ধরে ভেতরে থাকা মানুষগুলোকে গিলে ফেললো। জোয়ান-বুড়ো, স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া বাচ্চাটাও রেহাই পাবে না। সন্ধ্যার আকাশের রক্তিম সূর্যদয় দেখতে দেখতে তার মনে পড়ে দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়েছে। তাদের পাঁচ তলা ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে শব্দ শোনে। ঘরের ভেতরে তার বোন শব্দ করে কাঁদে।

ঘর থেকে রবিন হেলতে দুলতে এবং অনেকটা বিরক্ত ভঙ্গিতে বের হয়ে যায়। যাওয়ার আগে এক পলক তার দিকেও তাকায় এবং সে বিপরীতে তাকিয়ে চুপ করে থাকে। ঘরের ভেতর সে অনেকটা ধীরে প্রবেশ করে। মোহনা বসে আছে একপাশে। পা দিয়ে খুটছে বিছানার চাদর। শান্ত অথচ কাঁদবার কারণে সামান্য কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, “বস।”

চলবে…


তালহা মুনতাসির নাফি | ব্রেমেন, জার্মানি

লেখক, প্রচ্ছদশিল্পী এবং আলোকচিত্রী। বর্তমানে জার্মানিতে শিক্ষার্থী। একুশে বইমেলায় তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় যখন তিনি সদ্য তরুণ।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

যে মানুষটি আর ফিরে আসেনি

Next Story

প্লেট

Latest from সাহিত্য ও সংস্কৃতি

মায়াবিনীর হেঁশেল

আকাশটা আজ উনুনের পাশে বসে থাকা বিমর্ষ এক নারী— ধোঁয়াটে শাড়ির আঁচল সামান্য সরিয়ে, ... লীনা ফেরদৌস-এর নাতিদীর্ঘ কবিতায় এক নারীর দীর্ঘ দৈনন্দিন।

প্লেট

অনেক চিন্তা ভাবনার পর সিদ্ধান্তে এলাম, না আর নয় হাড় কাঁপানো শীতে, আর আকাশ থেকে ঝড়া শুভ্র কণার স্নো পড়ার... গল্পটা লিখেছেন ফাহিম রেজা

যে মানুষটি আর ফিরে আসেনি

সকালটা অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল। এতটাই শান্ত যে নীরা বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছিল— কোনো শব্দ কি আসবে? ... কাজী আহমেদ শামীম লিখেছেন অসম্পূর্ণাতে পূর্ণতার গল্প।

গাজার শিশুরা

এই মুহূর্তে আমি যখন কাতারের পথে ভাসমান আটলান্টিকের আকাশে উড়ছি ... ড. দলিলুর রহমান-এর কবিতায় গাজার বিভীষিকা।

দু’টি কবিতা

"এক বাউলের গল্প" ও "শেষ গন্তব্য" - এই দু’টি কবিতা রচনা করেছেন নিঘাত কারিম।