যে মানুষটি আর ফিরে আসেনি

কাজী আহমেদ শামীম
May 22, 2026
2 views
13 mins read

(১)
সকালটা অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল। এতটাই শান্ত যে নীরা বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছিল— কোনো শব্দ কি আসবে? কাকের ডাক, রিকশার বেল, দূরের ট্রাকের গর্জন— কিছুই না। ঘরের ভেতর শুধু কেতলির সিসি শব্দ। নীরা চা ঢালছিল। কাপটা একটু কাঁপছিল তার হাতে। সে নিজেই অবাক হলো— কেন কাঁপছে?

পেছন থেকে রায়ান বলল, “চিনি দিও না। আজ মাথা খুব ভারী।” নীরা ঘুরে তাকাল। রায়ান তখনও আগের মতোই— চোখে রাত জাগার ক্লান্তি, মুখে অদ্ভুত এক তাড়া।

“আজ বের হবে?” নীরা জিজ্ঞেস করল। রায়ান চুপ করে চায়ের কাপটা নিল। এক চুমুক দিল। তারপর বলল, “একটু।” এই “একটু” শব্দটা রায়ানের প্রিয় ছিল।

একটু মানে—অনেক কিছু। একটু মানে— পুরো দিন। একটু মানে—ফিরেও আসা, আবার নাও আসা। নীরা জানত, এই মানুষটার জীবনে “স্পষ্ট” বলে কিছু নেই। সবকিছুই অসম্পূর্ণ, চলমান।

রায়ান কোনো দিন শুধু একজন স্বামী ছিল না। সে সব সময়ই কিছু না কিছুর ভেতর ছিল—
একটা গল্প,
একটা ক্যামেরা,
একটা আন্দোলন,
একটা অসমাপ্ত পরিকল্পনা।

নীরা প্রথমে তাকে চিনেছিল কাজের জায়গায়। সে অভিনেত্রী। রায়ান তখন নতুন পরিচালক। কথা কম বলত, কিন্তু চোখে আগুন ছিল। সে একদিন নীরাকে বলেছিল,“আমি সিনেমা বানাতে চাই না। আমি সময় ধরে রাখতে চাই।” নীরা হেসেছিল। “সময় ধরা যায় নাকি?” রায়ান খুব সিরিয়াসভাবে বলেছিল, “না ধরলে, সময় আমাদেরকেই ধরবে।”

এই মানুষটার সঙ্গে সংসার মানে ছিল— অপেক্ষা। আরও অপেক্ষা। আরও একটু বেশি অপেক্ষা। তবু নীরা কখনো অভিযোগ করেনি। কারণ সে জানত— রায়ানের অনুপস্থিতির ভেতরেও একটা দায়বদ্ধতা আছে। সে শুধু নিজের জন্য কাজ করত না। সে কাজ করত যেন কেউ একদিন প্রশ্ন করে, “এই সময়টা কেমন ছিল?”

(২)
সময়টা তখন অস্থির। নীরা রেডিও চালালে খবর আসত— নিখোঁজ। সংঘর্ষ। অজ্ঞাত। রায়ান গভীর মনোযোগে শুনত। “তুমি যাবা না,” নীরা একদিন বলেছিল। রায়ান হালকা হেসেছিল। “আমি না গেলে, আমার কাজটাই বা কী?”

নীরা বুঝত—এই মানুষটাকে আটকে রাখা যায় না। যাকে আটকে রাখতে হয়, সে কখনো সত্যিকারের নিজের থাকে না। তারা গোপনে বিয়ে করেছিল। কোনো আয়োজন না। কোনো ঢাকঢোল না।

নীরা বলেছিল, “এভাবে?” রায়ান বলেছিল, “আমাদের তো সময় কম।” নীরা তখন বুঝতে পারেনি—এই কথার মানে কতটা গভীর।

সেদিন রায়ান বের হলো খুব সাধারণভাবে। কোনো নাটকীয় বিদায় না। দরজার আড়ালে কোনো দীর্ঘ আলিঙ্গন না কিংবা হালকাভাবে ঠোঁট যুগলের স্পর্শ না। শুধু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, “দুপুরে ফিরতে পারি।” নীরা বলেছিল, “চেষ্টা কোরো।”

এই “চেষ্টা কোরো” কথাটা এখনো তার কানে বাজে। দুপুর গড়িয়ে গেল। বিকেল নামল। নীরা বারবার দরজার দিকে তাকাল। কিন্তু কেউ আর দরজায় নক করলো না।

রাতে ফোন এলো। অসম্পূর্ণ কথা। ভাঙা শব্দ। “ওখানে গোলাগুলি……”, এরপর আর কোনো স্পষ্ট খবর পাওয়া গেল না। শহর তখন কেবল শব্দে ভরা। কিন্তু অর্থহীন।

নীরা পরের দিন বের হলো। কাগজ, অফিস, হাসপাতাল, পরিচিত মুখ। “এই নামে কেউ এসেছে?” সব জায়গায় একই উত্তর— “না।”

এই “না” শব্দটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। নীরা একদিন এক অফিসে দাঁড়িয়ে শুনেছিল,“আপনার স্বামী খুব সাহসী মানুষ ছিলেন।”

“ছিলেন”- এই অতীত কালটা নীরাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। “ছিলেন কেন?” সে জিজ্ঞেস করেছিল। লোকটা চুপ করে গিয়েছিল।

(৩)
সময় এগোয়। খোঁজ থামে না, কিন্তু আশা ক্ষীণ হয়। নীরা শিখে নেয়— অনুপস্থিত মানুষকে কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে রাখা যায়।

সে সকালে উঠে রায়ানের কাপটা ধোয়। তার বইগুলো মুছে রাখে। কখনো কখনো তার সঙ্গে মনে মনে কথা বলে। কল্পনায় রায়ানকে ছুঁয়ে দেয়, তার শরীরের ঘ্রাণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
“আজ একটা নতুন খবর পেয়েছি,”
“আজ কিছু পাইনি।”

মানুষ তাকে বলে,“ভুলে যাও।” নীরা জানে— ভুলে যাওয়া আর বাঁচা এক জিনিস না। বছর কেটে যায়। নীরা কাজ করে। সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়। কেউ প্রশ্ন করলে বলে, “আমি অপেক্ষা করছি।” কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না। কিন্তু নীরা জানে— এই অপেক্ষা মানে স্থির থাকা না। এই অপেক্ষা মানে স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা।

একদিন এক তরুণ সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করে,“আপনি রাগ করেননি কখনো?” নীরা হাসে। “রাগ করার মানুষটা তো ফিরল না।”

সে জানালার দিকে তাকায়। বাইরে আলো। অনেক আলো, যেন কোটি লুমেনের নিয়ন বাতি।

“ও কাজের মানুষ ছিল। আমাদের জীবনটা কাজ দিয়েই তৈরি হয়েছিল।” নীরা আজো বিশ্বাস করে— কিছু মানুষ ফিরে আসে না, কিন্তু আবার চলে যায়ও না। তারা থেকে যায়— কাজে, স্মৃতিতে, আর অসমাপ্ত প্রশ্নে।
নীরা শেষবারের মতো বলে, “ও শুধু আমার স্বামী ছিল না। ও একটা সময়ের সাক্ষী ছিল।”

ঘরের ভেতর তখন খুব শান্ত। চায়ের কেতলি আবার সিসি শব্দ করে। নীরা চা ঢালে। একটা কাপ নিজের জন্য। একটা কাপ কারও জন্য না। কেউ সেই তপ্ত কাপে ঠোঁট লাগাবে না।

কিন্তু সে কাপটা ধুয়ে মুছে আবার সযতনে রেখে দেয়। কারণ কিছু অনুপস্থিতি— কখনো ফাঁকা হয়ে যায় না। অসম্পূর্ণাতেও যেন এক ধরনের পূর্ণতা দেয়।

নীরা সেই পূর্ণতার মাঝে বেঁচে থাকার দীপ্ত শপথ নেয়।


কাজী আহমেদ শামীম | ঢাকা, বাংলাদেশ

সরকারি চাকুরীজীবি, পাশাপাশি লেখালেখি ও গবেষণা কাজে লিপ্ত। ছোটগল্প, ছোট উপন্যাস ও রম্য রচনা প্রধানত লেখার মুলধারা।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

গাজার শিশুরা

Next Story

স্ক্যান্দিনাভিয়ান নরকে

Latest from সাহিত্য ও সংস্কৃতি

মায়াবিনীর হেঁশেল

আকাশটা আজ উনুনের পাশে বসে থাকা বিমর্ষ এক নারী— ধোঁয়াটে শাড়ির আঁচল সামান্য সরিয়ে, ... লীনা ফেরদৌস-এর নাতিদীর্ঘ কবিতায় এক নারীর দীর্ঘ দৈনন্দিন।

প্লেট

অনেক চিন্তা ভাবনার পর সিদ্ধান্তে এলাম, না আর নয় হাড় কাঁপানো শীতে, আর আকাশ থেকে ঝড়া শুভ্র কণার স্নো পড়ার... গল্পটা লিখেছেন ফাহিম রেজা

স্ক্যান্দিনাভিয়ান নরকে

কিছু একটা ভুল হচ্ছে। একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তার মনে পড়ছে না। কিন্তু কেন গুরুত্বপূর্ণ তা ... দুই পর্বে গল্পটা লিখেছেন তালহা মুনতাসির নাফি।

গাজার শিশুরা

এই মুহূর্তে আমি যখন কাতারের পথে ভাসমান আটলান্টিকের আকাশে উড়ছি ... ড. দলিলুর রহমান-এর কবিতায় গাজার বিভীষিকা।

দু’টি কবিতা

"এক বাউলের গল্প" ও "শেষ গন্তব্য" - এই দু’টি কবিতা রচনা করেছেন নিঘাত কারিম।