এই শহরে এক সিনেমা হল ছিলো প্রায় ২০টির মতো। ভাঙাভাঙির পর আজ এসে দাঁড়িয়েছে একটিতে। ভেঙে ফেলা সে সব হলগুলোর জায়গায় কোনোটাতে গড়ে উঠেছে শপিং মল, কোনোটাতে আবার আবাসিক হোটেল। হলগুলোকে নিয়ে মালিকদের এমন আচরণের মূল কারণ, আগের মতো মানুষ বা দর্শক হল-এ গিয়ে সিনেমা দেখে না। সিনেমা এখন ঢুকে পড়েছে ঘরের ড্রইংরুমের টিভি পর্দায়। ডি.ভি.ডি, ইন্টারনেট কি ইউটিউবের সুবাদে সিনেমা তো এখন হাতের নাগালে। কে যায় আর লাইনে দাঁড়িয়ে ঘামে ভিজে টিকিট কেটে সিনেমা দেখতে হল-এ। আরও দু’টি কারণে হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দর্শক। একটা হলো হলের পরিবেশ, অন্যটি হলো অরুচিকর ছবি। বর্তমানে সিনেমার কাহিনী বা তার ঘটনার দৃশ্যায়ন যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে কোনো অভিভাবকের সাহস হবে না ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সেইসব ছবি দেখার। তার ওপর হলগুলোর পরিবেশ হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। ছারপোকার কামড় অতিষ্ঠ করে তোলে ছবি দেখার স্বাদ! ফলে, দিনে দিনে কমে গেছে দর্শকের সংখ্যা। এমনই নানাবিধ কারণে সেই ব্যবসা গুটিয়ে হলের মালিকেরা গড়ে তুলেছে এখন সেখানে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
ঠিক সেই রকম বিলুপ্ত একটি হল। এটি ছিলো স্টেশন রোডে। নাম ছিলো ‘উজালা’। কত ছবি দেখার স্মৃতি যে এ হলে মিশে আছে আমার! সে সব কথা বা স্মৃতি ভুলবার নয়। একবার হয়েছে কি, আমি ও আমার স্কুলজীবনের অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু হায়দারসহ দেখতে গেছি রাজ্জাক-কবরী অভিনীত ও নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘নীল আকাশের নিচে’ নামের একটি ছবি। আমরা কাটবো দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিট, এক টাকা দশ আনায়। সেই টিকিট কাটার লাইনে এত ভিড় ছিলো যে, সামনে আর পিছনের ঠেলাঠেলিতে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম। তারপরও লাইন ছেড়ে বেরিয়ে আসার কোন ইচ্ছাই আমার নেই। ভাবখানা যেমন এমন, মরি-বাঁচি টিকিট পেতেই হবে। ঠেলাঠেলি আর ধাক্কাধাক্কির মধ্যে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে লাইন। আর, মাত্র দু’জনের পর কাউন্টারে হাত ঢোকাতে যাবো আমি। হঠাৎ পেছন থেকে তুমুল এক ধাক্কায় কোথায় যে ছিটকে পড়লাম আমি আর হায়দার! দু’জন দু’জনকে খুঁজে পেয়েছিলাম অনেকক্ষণ ধরে। সেদিন আর সিনেমা দেখা হলো না দুই বন্ধুর, ‘নীল আকাশের নিচে’। দেখেছিলাম সপ্তাহ খানেক পরে— সেদিন অনেক আগে থেকে টিকিট কাউন্টারে লাইন দিয়ে।
সেই উজালা হলের জায়গায় প্রায় বছর বারো আগে গড়ে উঠেছে ‘এশিয়ান এস আর’ নামে একটি আবাসিক হোটেল। এই বারো বছরে স্টেশন রোড দিয়ে যতবারই আসা-যাওয়া করেছি, চোখ একবার-না-একবার ফিরেছে সেদিকে।
অপলক চোখে হোটেলটির দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের পর্দায় হোটেলটি মিলিয়ে গিয়ে ভেসে উঠতো ‘উজালা’ সিনেমা হলের স্মৃতিময় রূপ। এখনো উঠে। ভুলবো কী করে? মানসজগতে স্থায়ীভাবে আঁকা, প্রাণ-ভোমরার হলটিকে। এবার আসি মূল কথায়, যা শোনাতে চাই । প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘এতক্ষণ ধরে এই বকবকির কোনো প্রয়োজন ছিলো কি? ছিলো! সবকিছুর বেলায় দরকার হয় একটা আয়োজনের। না হয় মূল কথাটি হয়ে যায় ফ্যাকাসে বা পানসে। কিছুতেই টানে না সেই ঘটনা মনকে। তাই এত ভূমিকার আড়ম্বর। তাই এত কথার ফুলঝুরি।
আসল কথাতেই আসি— ‘নাগিনীর প্রেম’ নামে একটা সাপের ছবি নির্মাণ করেছিলেন ইবনে মিজান। সম্ভবত ১৯৬৯ সালে। যতটা মনে পড়ে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে তিনিই প্রথম সাপকে বিষয় করে ছবি নির্মাণ করেছিলেন। চলচ্চিত্র জগতে পরিচালকের টিকে থাকা কিংবা প্রযোজকের ঘরে ছবির পিছনে খরচের টাকা দ্বিগুণ বা তিন গুণ লাভে ফিরে আসার দু’চারটি সহজ পথের মধ্যে এটিও ছিলো একটি। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, হিংস্র পশু-পাখির মধ্যে সাপের প্রতি মানুষের রয়েছে একটা সহজাত ভয় কিংবা আতঙ্ক। সেই সাথে রয়েছে তার প্রতি একটা দুর্বার কৌতূহল মেশানো অনুভূতি বা আগ্রহ। এই উপাদানকে পুঁজি করে সাপ নিয়ে ছবি নির্মাণ ছিলো পাক-ভারত উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের প্রতি দর্শক আকর্ষণ করানোর একটি চরম ও সত্য লক্ষণ। একটা পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাপ-কেন্দ্রিক সিংহভাগ ছবিই সুপারহিটের তালিকায় স্থান লাভ করেছে। সুতরাং বলা যেতে পারে দর্শকের মান টানতে ‘সাপের ছবি’, এক কথায় জুড়ি মেলা ভার! আর সেই দর্শক যদি হয় দশ বারো বছরের তবে তো কথাই নেই।
উজালায় প্রদর্শিত ‘নাগিনীর প্রেম’ প্রথম দেখি ১৯৭২-এ, স্বাধীনতার পরের বছর। ছবির কয়েকটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন— আনোয়ার হোসেন, আজিম ও সুজাতা। রূপকথাকেন্দ্রিক এই ছবিতে দেখা যায় সুজাতা আসলে সাপরূপী এক নারী। মানুষের বা সংস্পর্শে এলে যে হয়ে উঠে মানুষ। রাজপুত্র আজিমের সাথে এক ঘটনার সূত্র ধরে ওদের মধ্যে গড়ে উঠে বন্ধুত্ব। কিন্তু বাধ সাধে সাপুড়ে আনোয়ার হোসেন। সাপুড়ের স্বপ্ন— এই নাগিনীকে একবার যদি ধরে ঝাঁপিতে ঢোকানো যায় তবে কেল্লা ফতে। সে হয়ে উঠবে অনেক ধন-দৌলতের মালিক। বাণিজ্য প্রধান ছবি হলেও একটা দৃশ্যের কথা সত্যি মনে রাখার মতো। আর, সত্যি বলতে কী, ঐ দৃশ্যটির আকর্ষণেই ছবিটি দেখেছি প্রায় আটবার। প্রায় বলছি এ কারণে- আটবারের মাথায় দৃশ্যটি দেখে আমি হল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম একদিন। না, ঠিক বলিনি, হল থেকে নয় প্রজেকটার রুম থেকে।
সেই মজার কথাটার পাশাপাশি মন খারাপের কথাও বলার জন্যই আসলে এত কথার অবতারণা। তার আগে বলি সেই চমৎকার দৃশ্যটির কথা।
সাপকে বিষয় করে নির্মিত ছবিতে ব্যবহৃত সাপগুলি সাধারণত হয়ে থাকে পোষ মানানো। তার উপর যদি হয় সেই দৃশ্যে মৃত্যুঝুঁকি, তাহলে সাপের বিষ দাঁত আগে থেকেই তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু ‘নাগিনীর প্রেম’ ছবিতে সেই রকম কোনো দৃশ্যের কথা এখন ঠিক মনে না থাকলেও একটা দৃশ্য ছিলো বড় অদ্ভুত ও আশ্চর্যের! দৃশ্যটি এরকম, সাপিনীরূপী সুজাতা মানুষের রূপ ধরে বন্ধু ও রাজপুত্র আজিমের সাথে সময় কাটিয়ে ফিরে আসের নিজের ঘরে। আজিমের কাছ থেকে আড়ালে চলে আসার পর সে মানুষের রূপ থেকে হয়ে উঠে আবার সাপিনী। এঁকেবেঁকে পাহাড়ের ঝোপঝাড় ও নানা জঙ্গল পেরিয়ে অবশেষে এসে দাঁড়ায় একটি জায়গায়। সাথে সাথে অন্তরাল থেকে ভেসে আসে সমস্বরে কিছু কথা : ‘এসো না তুমি আমাদের মাঝে। একটা পথ বেছে নিতে হবে তোমায়। হয় রাজপুত্রকে বিয়ে করে মনুষ্যসমাজে ফিরে যাও, না হয় তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফিরে আসো আমাদের সর্পরাজ্যে।’ সাপিনী সুজাতা যেখানে এসে দাঁড়ায়, তার খানিকটা দূরে লং শটে দেখা যায় একটা পত্রশূন্য বৃক্ষ। বৃক্ষের সারা গায়ে কিলবিল করতে থাকে তখন শত শত সাপ।
অদৃশ্য জগৎ থেকে ভেসে আসা কথাগুলো আসলে তাদেরই কণ্ঠস্বর, তাদেরই বলা কথা। সাপিনী সুজাতা পড়ে উভয় সংকটে। ছবির শেষে দেখা যায় মানুষে রূপান্তরিত হয়ে রাজপুত্র আজিমকে বর বা স্বামীরূপে গ্রহণ করেছে সুজাতা।
খানিক আগে বলেছি ছবিটি দেখেছি প্রায় আটবার। শেষবারে অর্থাৎ আটবারের মাথায় ছবিটির টিকিট কাটতে গিয়ে বিফল হয়েছিলাম। পকেটে ছিলো একটা এক টাকার নোট ও কিছু খুচরো পয়সা। থার্ডক্লাস টিকিটের তখন মূল্য ছিলো ন’আনা। লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট না পেয়ে ভাবছিলাম বাসায় ফিরে যাবো, নাকি অন্য কোনো কৌশলের আশ্রয় নেব। যেই ভাবা সেই কাজ। তর তর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম হলের তিন তলায় প্রজেকটার রুমে। অর্থাৎ যেখান থেকে একটি মেশিন মারফৎ ছবি দেখানো হয়। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি এক লোক সিগারেট ফুঁকছে— অন্যজন প্রজেকটারের মাধ্যমে পর্দায় স্লাইডে আঁকা নানা সামগ্রীর বিজ্ঞাপন দেখাতে ব্যস্ত। বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের পর শুরু হবে মূল ছবি। এখানে বলে রাখা দরকার, প্রজেকটার ঘরের দেয়ালে থাকে দশ বাই বারো ইঞ্চি আকারের কিছু ফাঁকা জায়গা। যার ভেতর দিয়ে একরকম বিশেষ ধরনের ম্যাগনিফাইং গ্লাস। প্রজেকটার রুমের সামনে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সিগারেট ফোঁকা লোকটি ধমকের সুরে জানতে চাইলেন— ‘কী চাস এখানে? যা ভাগ।‘
উত্তরে সব খুলে বলার পর জানতে চাইলাম— ‘এখান থেকে কি সিনেমা দেখা যাবে?’ মনে আছে, আমার কথা শুনে লোকটির চোখ কপালে উঠবার যোগাড়! মনে হয় লোকটি ভাবছিলেন, এই পিচ্চির সাহস তো কম নয়। প্রজেকটার ঘরে এসে সিনেমা দেখতে চায়! বার কয়েক তার ‘হবে না, হবে না’ শুনে যখন দেখলেন আমি নাছোড়বান্দা, পরে রাজি হলেন। বলেন- ‘এক টাকা লাগবে। পারবি দিতে?’ সাথে সাথে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে এই টাকার নোটটি তুলে দিলাম তার হাতে। তারপর, ‘এই দিকে আয়’— বলে আমায় নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন দেয়ালের একটি ফাঁকা জায়গার সামনে। কিন্তু জায়গাটি যে, আমার উচ্চতার আরো এক হাত উপরে, ছবি দেখব কী করে? একটু পর লোকটি একটি মরচেধরা খালি কেরোসিনের টিনের উপর আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন— ‘পারবি তো এটার উপর দাঁড়িয়ে দেখতে?’ আমি সম্মতি জানাবার আগে শুরু হয়ে গেলো ‘নাগিনীর প্রেম’।
লেখপড়ায় ছিলাম গো-মুর্খ। কিছুতেই মুখস্থ করতে পারতাম না পাঠ্যপুস্তকের পড়া। কিন্তু আটবার দেখা সিনেমার শটের পর শট আমার প্রায় তখন মুখস্থ। প্রায় আড়াই ঘন্টার ছবিটি সেদিন দেখতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। কারণ কেরোসিনের টিনের উপর দাঁড়িযে ছবিটি সেদিন দেখতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। টিনের মুখে এক সাথে দু’পা রাখতে কিছুতেই পারছিলাম না। ফলে, একবার ডান পা, খানিক পর বাম পায়ের উপর ভর করে ছবি দেখতে হচ্ছিলো আমার। এক সময় ভারাক্রান্ত হয়ে এলো আমার দু’পা। কিন্তু আমার ভালো লাগার দৃশ্যটি আসামাত্র আমি কেমন জানি চাঙ্গা হয়ে উঠলাম আবার। এবার দু’পা একসাথে রাখতে ছিটকে পড়লাম টিনের উপর থেকে প্রজেকটারের গায়ে।
সাথে সাথে প্রজেকটার চালানো লোকটি আমার পাছায় লাথি মেরে বার করে দিলেন প্রজেকটার রুম থেকে। অপমান আর লাথির ব্যথায় কেঁদে ফেললাম আমি। চোখ মুছতে মুছতে আর সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে হলো— সিনেমা-পাগল এক ছাগলের এই হলো উচিৎ সাজা।
এপ্রিল ১০, ২০২৬

অনোয়ার হোসেন পিন্টু | চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
পেশাদার সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা। ২০১৯ সালে তাঁর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘তৃতীয় বিশ্বের ম্যাজিক’ রাজস্থান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার লাভ করে। ১৯৭৮ সাল থেকে যুক্ত হন নাট্য দল “থিয়েটার ৭৩”-এ।
