(১ম পর্ব – ৩ পর্বে বিভক্ত)
১.
দূর পশ্চিমের দিকে যাত্রা করলেই মধ্যপ্রাচ্য সামনে পড়ে। আরব রাষ্ট্রসমূহের সেই ট্রানজিট শহরগুলোর নাম ওমান, বাহরাইন, দোহা, কুয়েত, আবুধাবি, জেদ্দা কিম্বা দুবাই। ইতঃপূর্বে ওমান, বাহরাইন, দোহা, কুয়েত, আবুধাবি হয়ে যাতায়াত করেছি। এবার মধ্য বিরতি করলাম দুবাই। বাংলাদেশ টেলিভিশনের কোন এক নাটকে এরকম একটি সংলাপ ছিল ‘টাকা দাও দুবাই যাবো’। সম্ভবত কাজ পেতে বা জীবন-সংগ্রামের প্রবল বাসনায় দুবাই যাওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে। তারপর এই দুবাই নানা প্রসঙ্গে এখন বাঙালিদের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান হয়ে উঠেছে, যা আমার সঙ্গে অনেকেই স্বীকার করবেন। দুবাইসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকরা যাচ্ছে কাজ করতে, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে, ক্রিকেটাররা ক্রিকেট খেলতে কিম্বা রাষ্ট্রীয় কাজে সরকারি কর্মকর্তারা। শোনা যায়, কিছু সন্ত্রাসী পালিয়ে এসে এখানে স্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপন করছে। তারা নাকি এখান থেকে বাংলাদেশে অপকর্ম চালায়। এদের দু’একজন আবার দেশের শীর্ষ স্থানীয় সন্ত্রাসী। এরা এখানে আসার আগে নাম পরিবর্তন করে আসে। পাসপোর্ট পরিবর্তন করে অথবা পাসপোর্টে নতুন নাম রাখে—যেমন ধরুন, রাঙ্গা রাগীব, নাম পরিবর্তন করে রাখল ডন সিরাজ—এরকম আর কি? যাক দুবাইয়ে এসে তারা যদি ভাল থাকে থাকুক, তবে দেশ অশান্ত করতে তারা কিছু না করলেই হয়। এছাড়া আসে ব্যবসায়ীরা, সংযুক্ত আরব আমিরাত নামক দেশটির রাজধানী আবুধাবি ও ঝলমল দুবাইয়ে বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ী নানা ধরনের ব্যবসা করছে। কেউ কেউ নাকি জমি বা বাড়ি কিনে বসবাসও করছে অর্থৎ মালয়েশিয়ার মত সেকেন্ড হোম, বাহ বেশ। রাষ্টীয় কাজে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি যারা আছেন, তারা তো আছেনই কিন্তু অসংখ্য শ্রমিকসহ বাংলাদেশিরা এখানে বাস করে, ভাবতে ভালই লাগে। আরো ভাল লাগে যখন দুবাইয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল খেলতে আসে তখন গ্যালারিজুড়ে লাল-সবুজের পতাকা হাতে টাইগারদের সমর্থনে বাঙালি দর্শকরা উচ্চারণ করে সাকিব, তামিম, মুশফিক কিম্বা মাশরাফি।
দুবাই এখন অনেক উন্নত, বিশাল বিমান বন্দর তাদের। বিশ্বের সেরাদের একটি তাদের এমিরাটস এয়ারলাইন্সটি। উন্নত সার্ভিসের জন্য যাত্রীদের খুবই পছন্দ। আমি এমিরাটসে এই প্রথম যাত্রী হলাম। বহু দিন মনে মনে ক্ষীণ বাসনা ছিল। ভাল সেবা নিয়ে ঢাকা থেকে দুবাইয়ে এলাম। উপর থেকে নামতে নামতে দেখলাম অপূর্ব সব দৃশ্য, দেখলাম প্রতি মিনিটে প্রায় তিনটি করে ছয়টি বিমান উঠা-নামা করতে, দেখলাম আলোক-সজ্জিত বিশাল সুন্দর বিমান-বন্দর। এখানে ট্রানজিট পাঁচ ঘণ্টা। ট্রানজিট টাইম সব সময়ই আমার কাছে বিরক্তিকর। চেয়ারে বসে বসে ঘুমানো অথবা ডিউটি ফ্রি মালামাল দেখা অথবা বিভিন্ন রং ও চেহারার মানুষ পরখ করা। অবশ্য এটি আমাকে বেশ পুলকিত করে। কারণ মানুষের বিচিত্র চেহারা দেখতে আমার ভালই লাগে, তাতে পৃথিবীর রহস্যময়তার স্পর্শ পাই। তবে ট্রানজিটে এখন সময় কেটে যায়। ডিজিটালের এই চরম যুগে হাতের ডিভাইসটি আমাদেরকে এক অর্থে দারুণ সহযোগিতা করছে। ওয়াই-ফাই থাকার কারণে আপনি ইচ্ছে করলে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের যে কোনো মানুষের কাছে তথ্য আদান প্রদান করতে পারছেন, বিনা পয়সায় কথা বলতে পারছেন, খবর দেখতে পারছেন, সিনেমা দেখতে পারছেন, সারা পৃথিবীর যে কোনো বিষয় মিনিটের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন এমন কী গোগোল ম্যাপ দেখে যে কোনো গন্তব্য নির্ধারণ করতে পাচ্ছেন। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনি সহযোগিতা পাবেন, সেটি হলো ভাষার দূরত্ব হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারবেন, সেটি হলো ট্রানস্লেশনে গিয়ে আরবিকে ইংরেজিতে নিয়ে যেতে পারবেন।

খুব আফসোস লাগছে যে, বিমান বন্দরের বাইরে শহর ও শহরের বাইরের মরুভূমির নান্দনিক দৃশ্য দেখার সুযোগ হলো না। তাই বিমান বন্দরের ভিতরেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোনো নাগরিককে, পেয়েও গেলাম একজন ভদ্রমহিলাকে, যিনি পেশায় বিমানবালা। আমার কথা বলার আগ্রহ দেখে তিনি নিজেই এগিয়ে এলেন এবং আমার সঙ্গে মিনিট পাঁচেক কথা বললেন। যদিও তাঁর মূল ভাষা আরবী আর আমার বাংলা। আমি জানতে চাইলাম, তাঁর পেশা ও দুবাই সম্পর্কে। সে যা বলল, তা হলো—‘আমি এই পেশাকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি। আমি এতে অর্থ এবং আনন্দ দুটোই পাচ্ছি। মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রেই ভাল করছে আর দুবাই সম্পর্কে তোমাকে জানাই—দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী ও দেশটির সবচেয়ে বড় এবং জনবহুল শহর। দুবাইয়ের আশেপাশের শহরগুলো হলো—দক্ষিণে আবুধাবি, উত্তর-পূর্বে শারজাহ এবং দক্ষিণ-পূর্বে ওমান। বর্তমানে দুবাইয়ের জনসংখ্যা প্রায় ২,৭৮,৯,০০০ জন।
পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত দুবাই এই অঞ্চলের দ্বিতীয় ব্যয়বহুল এবং বিশ্বের বিশতম ব্যয়বহুল শহর। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান ব্যবসাকেন্দ্রও দুবাই। এই দুবাই যাত্রী ও পণ্যবাহী বিমানের জন্য একটি বড় বৈশ্বিক পরিবহন কেন্দ্র। দুবাইয়ের মূল আয়ের উৎস তেল, পর্যটন, বিমানচালনা, রিয়েলস্টেট ইত্যাদি। দুবাই সারা পৃথিবীকে আকৃষ্ট করেছে বড় বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, অসংখ্য হোটেল এবং বড় বড় নির্মাণ প্রকল্পের মাধ্যমে। এখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিল্ডিং এবং মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় সমুদ্র বন্দর গড়ে তোলা হযেছে। অথচ আমরা জানি, প্রায় আড়াই শ’ বছর আগে এই দুবাইয়ের মানুষেরা মাছ ধরে জীবিকা অর্জন করতো।
এখানে একটু বলে রাখি, এই পেশা ছিল আরবের প্রায় প্রত্যেক দেশেই। আমি নিজে এই পেশার প্রমাণ পেয়েছি এরকম তিনটি দেশের ন্যাশনাল মিউজিয়াম পরিদর্শন করে। যেমন বাহরাইন, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় জাদুঘর দেখে তাদের আদি পেশা অর্থাৎ জেলে জীবনের নিদর্শন দেখেছি। সে আরো বলল, দুবাই যেহেতু আরব মরুভূমির মধ্যস্থলে অবস্থিত, সেকারণে এর বেশিরভাগ বালুময় মরুভূমি। তাই প্রাকৃতিক দৃশ্যে রয়েছে ধূ ধূ বালুচর। গবেষকরা বলেছেন, দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে কঙ্কর মরুভূমি এবং বালি বেশিরভাগই চূর্ণশেল, সূক্ষ্ম প্রবাল নিয়ে গঠিত পরিষ্কার ও সাদা বালি। লবণাক্ত উপকূল রয়েছে শহরের পূর্ব দিকে এবং উত্তর-দক্ষিণে রয়েছে সমভূমি এবং সলখা হিসেবে পরিচিত টিলাগুলো সারি সারি এগিয়ে গেছে।
এক সময় এই দুবাই শাসন করতো ব্রিটিশরা। বাংলাদেশের সাথে একটি মিল আছে, সেটি হলো ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাত ৭টি অঞ্চল সংযুক্ত করে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলো হলো—আবুধাবি, দুবাই, আজমান, শারজাহ, উম্মুল কুয়াইন, ফুজিরা ও রাস-আল-খাইমা। এই সংযুক্ত অঞ্চলগুলোর সাথে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল—বাহরাইন ও কাতারের কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আসেনি। এখানে বহু প্রাচীন আমলের নিদর্শন পাওয়া গেছে। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর দূতের মাধ্যমে এখানে ইসলাম ধর্মের প্রচলন হয় এবং নবী করিমের মৃত্যুর পর অমুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়, যুদ্ধে অমুসলিমরা পরাজিত হলে, সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামের জয় জয়কার হয়।
এই বিমান বন্দরে দেশীয় লোকজনের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ দেখলাম। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নানা পর্যায়ের মানুষ। আমি কয়েকজনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম কিন্তু শ্রমিক ভাইয়েরা মালিক ও সিসি ক্যামেরার কথা বলতে চাইলো না। শুধু তথ্য জানার খাতিরে একজনকে বললাম, কত দিন আছেন এখানে কেমন আছেন? উত্তরে বললেন, বেশ কয়েক বছর ধরে, তবে পরিশ্রম খুব বেশি, পরিশ্রম তো করতেই হবে, দেশে কী করবো? ওয়াশরুমের ক্লিনার হিসেবে কাজ করছে—তাতে ক্ষতি কী? কাজ কী ছোট-বড় আছে? জীবন-যুদ্ধে জয়ী হওয়াই বড় কথা। এরপর ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম পুরো দুবাই এয়ারপোর্টের অন্দর মহল। অন্দর মহল বললাম এই কারণে যে, রাজপ্রাসাদের অন্দর মহলের মতই গড়ে তোলা হয়েছে এটি। রাণী তার সখী-সহযোগীদের নিয়ে অন্দর মহলে বাস করতে যাতে ত্যাক্ত-বিরক্ত না হয়, তেমনি ট্রানজিটের যাত্রীরা যাতে দীর্ঘ সময় এখানে হেঁটে হেঁটে, দেখে দেখে, বসে বসে, খেতে খেতে, কেনা-কাটা করতে করতে পরবর্তী বিমানে উঠতে পারে, তার সুব্যবস্থা করে রেখেছে আরবের এই দেশটির বণিক-রাজরা। অনেক বড়, অনেক খোলামেলা এবং কয়েক তলা মিলিয়ে জ্বল জ্বল করা এই এমন ব্যস্ততম বিমান-বন্দর মধ্যপ্রাচ্যে বাকিগুলো বোধহয় এরকম নয়।
আমাদের ট্রানজিটের সময় শেষ হয়ে আসছে, কিছুক্ষণ পরেই গন্তব্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে পরবর্তী বিমানে উঠবো। এখানে বলে রাখি এই ভ্রমণে আমাদের বলতে, আমরা ছয়জন। ভ্রমণের দলনেতা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, যিনি ভ্রমণ পিয়াসী একজন মানুষ, একইসঙ্গে বাংলা ভাষার একজন বিশিষ্টি কথাসাহিত্যিক বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যিনি অসাধারণ উপন্যাস লিখেছেন, আরো রয়েছেন জাদুঘরের আমার চারজন সহকর্মী কঙ্কনকান্তি বড়ুয়া, দিবাকর সিকদার, সাইদ সামসুল করীম এবং নাছির খান। এঁদের মধ্যে শেষ চারজনের এটিই পশ্চিমের দিকে প্রথম যাত্রা। সেকারণে তাদের মধ্যে কৌতুল ও দেখার আগ্রহ প্রবল। তারা তাই ছুটে বেড়াচ্ছে এপাশ থেকে ওপাশ। আমি কিছুক্ষণ ওদের পিছু পিছু ছিলাম, দেখলাম ওরা ঘুরে ঘুরে দেখছে ঘড়ি, খেজুর, চকলেট, সোনা, মোবাইলসেট আর নানান কসমেটিকস। শুধুই দেখা, কেনাকাটা নয়। আরো একটি বিষয়—সময় কাটানো। কারণ পাঁচ ঘণ্টা ট্রানজিট, অনেক দীর্ঘ সময় তো বটেই। ধীরে ধীরে ট্রানজিট সময় শেষ হয়ে এলো। আমাদের মূল গন্তব্য যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনা। এই উদ্দেশ্যেই প্রিয় শহর ঢাকা থেকে রওনা করেছি ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে।
আবারও ইমিগ্রেশন, আবারও আকাশে উড়াল দেয়া। এই উড়ালে—একটি বিশাল বোয়িং বিমানে উঠলাম, যেটি ডুপ্লেক্স। এমিরাটসে ভ্রমণ সত্যি আরামদায়ক। যথারীতি উইন্ডো সিট। আকাশের মেঘ গুনে গুনে দূর নীলের স্পর্শ দিয়ে ছুটলাম। এরকম আকাশে উঠলেই আমার মন যেন কেমন করে? মনে মনে কবিতা লিখি, গল্প আঁকি, তবে স্বপ্নের সৌধ গড়তে পারি না। যাচ্ছি দ্বিতীয় বারের মতো বিলেতে। ২০০৬ সালের পর, ২০২০।
২.
আপনাকে একটি অনুরোধ জানাই? তিনি বললেন, কী অনুরোধ? বললাম, কানাডা, ইতালি অপশন বাদ দিয়ে যেহেতু আপনি দুবাই পোস্টিং নিয়ে যাচ্ছেন, ওখানে যোগদান করার পর, আপনি একটি বাংলা বইমেলার আয়োজন করবেন, কারণ কলকাতায় উপ-হাইকমিশনে চার বছর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে সেখানে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বইমেলা এবং কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলায় সক্রিয়ভাবে কাজ করে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং একইসঙ্গে আপনি নিজে একজন লেখক, গবেষক ও চিত্রকর, সুতরাং আপনি বইমেলার আয়োজন করতে পারবেন—এটি আমার বিশ্বাস। উত্তরে মননশীল ও সৃজনশীল কবি ও চিত্রশিল্পী, মেধাবি ও পরিশ্রমী সরকারি তুখোড় কর্মকর্তা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের বাংলাদেশ কনস্যুলার জেনারেল বি এম জামাল হোসেন বললেন, শিহাব ভাই আমি পারবো এবং অবশ্যই করবো, যা আমি মনে মনে পোষণ করেছিও বটে। তিনি সেখানে যোগদান করলেন এবং বাংলা বইমেলা আয়োজন করার প্রাণন্তকর চেষ্টা চালালেন।
একদিন ফোন করে বললেন, শিহাব ভাই প্রস্তুতি নেন আগামী মার্চে অর্থাৎ এ বছরেরই মার্চে দুবাই বইমেলা আয়োজন করবো এবং বাংলাদেশ ও বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাঙালি লেখকদের আনার ব্যবস্থা করুন। তিনি আরো বললেন, বাংলাদেশ পার্টের সমন্বয় আপনি করুন। এভাবেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলল। কিন্তু বাংলাদেশের ট্রেড ফেয়ার থাকায় মার্চে বইমেলাটি করা গেল না বলে জানালেন এবং তারিখ ঠিক করলেন নভেম্বরের ৪, ৫ ও ৬। শুরু হলো প্রস্তুতি। আমি বললাম, যেহেতু বইমেলা, সেকারণে কবি কামাল চৌধুরীকে উদ্বোধক এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করুন। তিনি বললেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধান অতিথি থাকবেন। পরে দু’জনের একজনও যেতে পারেননি। কবি জামাল হোসেনের একটা বড় গুণ, তিনি পরামর্শ চান এবং পরামর্শ দিলে গ্রহণ করেন। আমার প্রস্তাব অনুযায়ী কবি কামাল চৌধুরীকেই উদ্বোধক করলেন। সম্মাননীয় অতিথি হিসেবে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, বিশেষ অতিথি হিসেবে যুক্তরাজ্যের উদীচী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি জনাব গোলাম মোস্তফা, কবি শিহাব শাহরিয়ার এবং কবি তারিক সুজাতকে আমন্ত্রণ জানালেন। আমন্ত্রণ জানালেন, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ২৫ জন প্রকাশককে এবং উপস্থাপক হিসেবে শাহাদাৎ হোসেন নিপুকে।
২ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু হলো। আমি আর নিপু গেলাম ২ নভেম্বর। কবি কামাল চৌধুরী, কবি তারিক সুজাত, কথাসাহিত্যিক মাজহারুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক সাহাদাত হোসাইন গেল ৩ নভেম্বর এবং প্রকাশকরাও গেলেন এই দুই দিনেই। আগে ট্রানজিটে আমি দুবাই এয়ারপোর্ট ব্যবহার করেছি এবং আমাদের অনেকেই করেছেন কিন্তু বিশেষ করে যে ক’জন লেখক আমরা গিয়েছি, তারা সবাই দুবাই এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন পার হয়ে প্রথমবারের প্রবেশ করলাম রাতের আলো ঝলমল আরব উপদ্বীপের উন্নত আধুনিক শহর দুবাইয়ে। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি আর মনে হচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকার কথা। পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার এক অপূর্ব শহর দুবাই। মধ্যরাতে হোটেলে ঢুকেই দেখলাম মানুষের সরব আনাগুনা, মনেই হচ্ছে না রাতের কড়া নাড়ছে? যাহোক, আমাদের সবাইকেই একটি তিন তারকা হোটেল দিলেন এবং একই হোটেলে কলকাতা, আসাম, লন্ডন থেকে আগতদেরকেও থাকার ব্যবস্থা করলেন। আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন ৩ নভেম্বর, আমি, লন্ডন থেকে আগত জনাব গোলাম মোস্তফা এবং শাহাদাৎ হোসেন নিপুকে নিয়ে গেলাম কনস্যুলার অফিসে। গিয়ে কবি জামাল হোসেনের সঙ্গে বসে তিনদিনের বইমেলার সমস্ত কর্মসূচি চূড়ান্ত করলাম।
পরদিন ৪ নভেম্বর ২০২২ শুক্রবার। দুবাইয়ে প্রথম বাংলা বইমেলার উদ্বোধনীর দিন। পড়ন্ত বিকেলে আরব উপদ্বীপের চমৎকার পরিবেশ, বাংলাদেশ কনস্যুল জেনারেলের বিশাল এলাকায় বইমেলা প্রাঙ্গণ লেখক-পাঠক, প্রকাশক আর দুবাই প্রবাসী কয়েক হাজার বাঙালি এবং আরবী ভাষার লেখক-প্রকাশ ও গবেষকদের সরব উপস্থিতি দেখে, একজন বাংলা ভাষার লেখক হিসেবে আমার মনটাও নেচে উঠল। যেন একটা ইতিহাসের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করছি, আনন্দ। বাংলাদেশের একুশের বইমেলা, ঢাকা বইমেলা, কলকাতার আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা, নিউ ইয়র্কের বাংলা বইমেলায় অংশগ্রহণ ও অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত হতে যাচ্ছে, প্রাণবন্ত আরো একটি নতুন বইমেলা।
মরুর শহর হলেও, ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের একটি চমৎকার দিনের সুন্দর বিকেলে কনসুল অফিস প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধু কর্নারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত দিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। বইমেলার উদ্বোধক কবি কামাল চৌধুরী বলেন, ‘আরব উপদ্বীপের আজকের এই দিনটি স্বর্ণ পাতায় লেখা থাকবে, কারণ মরুর রৌদ্রাক্রান্ত এই ঝলমল শহর দুবাইয়ে বাংলা ভাষা ও বাংলা বইয়ের জয়যাত্রা এক মাইল ফলক হয়ে থাকবে। এজন্য পুরো কৃতিত্ব দেবো আমাদের এই সময়ের কর্মবীর দুবাইয়ের বাংলাদেশ কনসাল জেনারেল একইসঙ্গে কবি ও চিত্রকর জামাল হোসেনকে—এই আনন্দক্ষেত্র তৈরি করার জন্য তাঁকে বলতে পারি বইমেলার স্বপ্ন-পুরুষ—এই কথা বলে আমি দুবাইয়ে প্রথম বাংলাদেশ বইমেলার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি’। প্রথম উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত ভাষণ দিলেন এই বইমেলার পরিকল্পক ও স্বপ্নদ্রষ্টা কবি জামাল হোসেন। তিনি বললেন, ‘আমরা বাংলা ভাষা ও বাংলা বইকে বিশ্বের মানুষের আরো কাছাকাছি নিয়ে যেতে চাই, সেকারণে আরব উপদ্বীপের এই বইমেলার আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে’। এই বইমেলার প্রধান অতিথি মাননীয় শিক্ষা উপমন্ত্রী জনাব মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এমপি বলেন, আজ বাঙালিদের জন্য একটি মহা আনন্দের দিন কেননা আরব অঞ্চলের উন্নত শহর দুবাইয়ে বাংলা বইমেলা শুরু হলো। বইমেলা সব সময়ই একজন লেখক-প্রকাশক ও পাঠকের মিলনমেলা। তার বড় প্রমাণ আমাদের মাসব্যাপী একুশে বইমেলা। দুবাইমেলাও বাঙালিদের প্রাণের বইমেলা হয়ে উঠবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমি এই বইমেলার দীর্ঘায়ু কামনা করি’। সভাপতির ভাষণে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আবু জাফর বলেন, ‘বাঙালিরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে আর এই লড়াকু বাঙালিরা যে সব কিছু পারে, তার আরেকটি প্রমাণ দুবাইয়ের এই বাংলা বইমেলার যাত্রা। বই ও ভাষা নিয়ে ভবিষ্যতে তারা আরো ছড়িয়ে পরবে’। এই পর্বে সম্মাননীয় আলোচকবৃন্দ ছিলেন—কথাসাহিত্যিক ও অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম, কবি ও জার্নিম্যান’র কর্নধার তারিক সুজাত, কবি ও গবেষক শিহাব শাহরিয়ার, যুক্তরাজ্য সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি জনাব গোলাম মোস্তফা, Fellow of the Royal Geographical Society, London- Mr. Graeme Wilson FRGS, Vice Chancellor, Assam Central University-Professor Rajive Mohan Pant, President, University of Dubai, United Arab Emirates- H. E Dr. Eesa Mohammed Bastaki|
দ্বিতীয় পর্বে ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী: শেখ মুজিবুর রহমান’ গ্রন্থসহ বিভিন্ন লেখকের বেশ কয়েকটি বইয়ের ওপর একটি মনোজ্ঞ আলোচনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত। এরপর সন্ধ্যা-উত্তীর্ণ রাতে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। এতে ছিল দুবাই প্রবাসী বাঙালি শিল্পীদের পরিবেশনায় গান ও নৃত্য। সাংস্কৃতিক পর্বের সঞ্চালনা করেন মোহাম্মদ নাজমুল হক। এরপর র্যাফেল ড্র ও ঐ দিনের বইমেলার আলো নিভে যায়।
২৯ এপ্রিল, ২০২৬
চলবে…

শিহাব শাহরিয়ার | ঢাকা, বাংলাদেশ
কবি, ফোকলোর গবেষক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, কলামিস্ট, উপস্থাপক। সম্পাদনা করছেন লোকনন্দন বিষয়ক পত্রিকা ‘বৈঠা’। তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৩১টি।
