পড়শী পড়শীর আরশি ভিন্ন প্রজন্ম, ভিন্ন পথ : বিচার নয়, বোঝাপড়ার সময়

ভিন্ন প্রজন্ম, ভিন্ন পথ : বিচার নয়, বোঝাপড়ার সময়

Post Views: 178

প্রতিটি প্রজন্মই তাদের সময়ের প্রতিচ্ছবি। তাই এক প্রজন্মকে আরেক প্রজন্মের মানদণ্ডে বিচার করা কখনোই ন্যায্য নয়। সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, আর তার সঙ্গে বদলে যায় মানুষের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা ও স্বপ্ন দেখার ধরন। সেই পরিবর্তনেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি আজকের প্রজন্ম।

আমার চোখে এখনকার জেনারেশনকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা যায় না। তারা যেমন আত্মবিশ্বাসী, সাহসী, প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং নতুন কিছু করার মানসিকতা রাখে, তেমনি তারা মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করার লড়াইয়ের মধ্য দিয়েও এগিয়ে চলেছে। তাদের সাফল্য যেমন আমাদের গর্বিত করে, তেমনি তাদের নীরব সংগ্রামও আমাদের বোঝা উচিত।

আজকের তরুণ-তরুণীদের হাতে রয়েছে প্রযুক্তির অসীম শক্তি। একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে তারা গোটা পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত। তারা শিখছে, জানছে, নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করছে, চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নও দেখছে। এই সাহস নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

কিন্তু প্রযুক্তির এই আশীর্বাদের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে পৃথিবীতে অনেক সময় বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জীবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যের সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে করা, সবসময় নিখুঁত দেখানোর চেষ্টা, কিংবা “লাইক” ও “ফলোয়ার”-এর সংখ্যার সঙ্গে নিজের মূল্যকে মেলানো— এসবই অনেক তরুণ-তরুণীকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে।

এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে গিয়েই আমার নিজের জীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে।

আমার একমাত্র মেয়ের নাম দিশা। অনেক আদর, ভালোবাসা আর স্বপ্ন নিয়ে ওর দাদু— আমার শ্বশুরমশাই, স্বর্গীয় ঈশ্বর নলিনী রঞ্জন বিশ্বাস— ওর নাম রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক মনস্ক, বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী মানুষ। আজ যখন সময়ের এত পরিবর্তন দেখি, তখন মনে হয়, হয়তো তিনি তাঁর নাতনিকে সত্যিই নতুন যুগের এক “দিশা” হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন।

আজ দিশা কলকাতার একটি স্বনামধন্য কলেজে ইংরেজি অনার্স নিয়ে পড়াশোনা করছে। ওকে নিয়ে আমার গর্বের শেষ নেই। জীবনের কঠিন সময়ে অনেকবার দেখেছি, আমি যখন দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েছি, তখন উল্টে আমার মেয়েই আমাকে সাহস দিয়েছে, বিশ্বাস জুগিয়েছে। অনেক সময় মনে হয়েছে, আমি যেন ওর মা নই, বরং ও-ই আমার অভিভাবক।

তবুও একজন মা হিসেবে কিছু উদ্বেগ থেকে যায়। ওর জীবনযাপনের ধরন আমার থেকে একেবারেই আলাদা। অনেক কাজ শেষ মুহূর্তের জন্য ফেলে রাখে। সবকিছু যেন একটু অগোছালো। আমি ভাবি, আগে থেকে পরিকল্পনা করে কাজ করলে কত সহজ হতো! ভয় পাই— যদি কোনোদিন এই অভ্যাস ওর ক্ষতির কারণ হয়।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যতবারই আমি উদ্বিগ্ন হয়েছি, ততবারই দেখেছি শেষ মুহূর্তে হলেও ও কাজটা সুন্দরভাবেই সম্পন্ন করেছে। তখন নিজের মনেই প্রশ্ন জাগে— আমি কি ওকে আমার মতো করে গুছিয়ে চলতে শেখাব, নাকি ওর নিজের ছন্দে চলার স্বাধীনতাকে সম্মান জানাব?

হয়তো এটাই আমাদের প্রজন্ম আর আজকের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় পার্থক্য। আমরা বিশ্বাস করি—পরিকল্পনা, নিয়ম আর শৃঙ্খলাই সাফল্যের একমাত্র পথ। আর তারা বিশ্বাস করে— নিজের মতো করেও সফল হওয়া যায়। আমার মেয়ে বিচার হতে চায় না। সে শুধু চায় তাকে বোঝা হোক। আর হয়তো এই চাওয়াটাই আজকের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় দাবি— “আমাকে বদলানোর আগে, আমাকে বোঝার চেষ্টা করুন।”

আমরা প্রায়ই বলি, “এখনকার ছেলেমেয়েদের ধৈর্য নেই”, “তারা শুধু মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত।” কিন্তু খুব কমই ভাবি, তারা এমন এক সময়ে বড় হচ্ছে, যেখানে প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করার চাপ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক প্রত্যাশার ভার তাদের কাঁধে এসে পড়েছে।

তারপরও আমি এই প্রজন্মকে নিয়ে আশাবাদী। কারণ আমি দেখেছি, তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে জানে, সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানে, পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হতে জানে। তাদের মধ্যে পরিবর্তন আনার সাহস আছে, নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন আছে।

একজন মা হিসেবে আমি আজও শিখছি— সন্তানকে শুধু পথ দেখানোই যথেষ্ট নয়; কখনও কখনও তার নিজের পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাকেও সম্মান করতে হয়। কারণ প্রতিটি প্রজন্ম তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলে।

সবশেষে আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই—এখনকার জেনারেশন খারাপ নয়, তারা শুধু ভিন্ন। তাদের হাতে প্রযুক্তির শক্তি, নতুন ভাবনার সাহস এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অসীম সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের দায়িত্ব তাদের স্বপ্নকে ভেঙে দেওয়া নয়, বরং সেই স্বপ্নকে সঠিক মূল্যবোধ, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের আলোয় আলোকিত করে তোলা।

কারণ আজ যাদের আমরা “এখনকার জেনারেশন” বলে বিচার করছি, আগামীকাল তারাই আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ এবং আমাদের ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেবে। তাই সমালোচনার আগে তাদের বোঝার চেষ্টা করাই হোক আমাদের প্রথম দায়িত্ব।

২৭ জুন, ২০২৬


উত্তর কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

পেশায় আক্সিস ম্যাক্স লাইফ ইন্স্যুরেন্সে এডভাইজার এবং এজেন্সি অ্যাসোসিয়েট পার্টনার হিসেবে কর্মরত। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজসেবা ও পরিবেশ সংরক্ষণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।


Previous
Next

9 Comments

  • Bratati Ghatak

    খুব সময়োপযোগী লেখনী, সব Gen Z দের অভিভাবকদের মনের কথা। আরও পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।

  • Sudeshna

    I just read your story—it was absolutely beautiful and truly touched my heart. We may have become mothers, but we also need to understand the generation gap, and you have highlighted it so thoughtfully. Please keep writing like this. It’s truly well appreciated. Wishing you all the very best—keep going!

  • Rini

    Excellent thought..khub valo laglo..
    I am also feeling the same about our next generation..
    Our Children can do better than ourselves.. we need to keep believing on them and they need freedom..
    They’re confident and sometimes we can learn from them too..
    Our moral support they need..besh valo laglo tomar lekha ta

  • ANWESHA BISWAS

    কঠিন এক বাস্তব। খুব সুন্দর উপলব্ধি । লেখাটা মন ছুঁয়ে গেল।

  • Sruti Bhattacharya

    Very good writing ❤️❤️❤️

  • chandreyi Dutta

    It’s a nice story n good thoughts of writer also beautiful meaning inside the story i have enlighted Thanks Di
    God bless u

  • অর্ণব মজুমদার

    আপনার লেখাটি অত্যন্ত সুন্দর, সাবলীল এবং হৃদয়গ্রাহী। ভাষার ব্যবহার সহজ, স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল, যা পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আকৃষ্ট রাখে। বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা সুচিন্তিত এবং ভাব প্রকাশ অত্যন্ত প্রাণবন্ত। আপনার লেখনী দক্ষতা সত্যিই প্রশংসনীয়। ভবিষ্যতেও এমন চমৎকার ও অনুপ্রেরণাদায়ক লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম। আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

  • Akash

    Khub sundor bhalo tule dhorecho aunty.

  • Akansha Biswas

    Very nice. Awesome concept and fabulous writing

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।