ফুটবল এখন কেবল আর ৯০ মিনিট কিংবা অতিরিক্ত সময়ের চক্করে পড়া ১২০ মিনিটের উত্তেজনার কোনো ম্যাচের মধ্যেই সীমিত নয়। বিশ্বকাপ জিততে সেই টুর্নামেন্টের একটা দলের সর্বোচ্চ সাতটি ম্যাচ জিতলেই মিশন কমপ্লিট। বিশ্বকাপ ট্রফি হাতের মুঠোয়। এই সাফল্যের পেছনে সবাই শুধু ফুটবলীয় কৌশল-পরিকল্পনা-প্রতিভাবান খেলোয়াড়, ফুটবলীয় ঐতিহ্য; মূলত আলোচনা এই ব্র্যাকেটেই আটকে থাকে। তবে একটা দল যখন বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে উল্লাসে মেতে ওঠে, তখন এসব অনুষঙ্গ ছাড়া সেই সাফল্যের পেছনে থাকে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক বিশাল চাকা।
বিশ্বকাপ এখন একই সঙ্গে ফুটবল, বিনোদন এবং ব্যবসা। মাঠের ভেতরের গোল-উল্লাস যেমন কোটি মানুষের আবেগ তৈরি করে, মাঠের বাইরের অর্থনীতি তেমনি তৈরি করে মিলিয়ন ছাড়িয়ে বিলিয়ন ডলারের বাজার। একটি দল বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে যেমন শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, তেমনি পুরো টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজনের পেছনেও খরচ হয় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। স্টেডিয়াম নির্মাণ, সম্প্রচার প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, পরিবহন, হসপিটালিটি, ডিজিটাল সম্প্রচার, মার্কেটিং-সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া-ভিত্তিক বাণিজ্যিক আয়োজনগুলোর একটি।
এই বিশাল আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফিফা। মাঠের আবেগ মন্থিত ফুটবলকে একটি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিজ্ঞাপন, সম্প্রচার ও কর্পোরেট বাজারে বিক্রি করেই মূলত বিশ্বকাপ পরিচালনার ব্যয়ভার বহন করে ফিফা।
বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ধনী ক্রীড়া সংস্থা ফিফার সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস টেলিভিশন ও সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি। ২০১৯-২০২২ অর্থচক্রে ফিফার মোট আয় ছিল প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন ডলার এসেছে শুধু সম্প্রচার স্বত্ব থেকে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের জন্য টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে। একটা সম্পুরক তথ্য জানাই, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে বাংলাদেশ টেলিভিশন ব্যয় করেছিল প্রায় একশ’ কোটি টাকা! যদিও অভিযোগ উঠেছে, এই বাণিজ্যের ফাঁকতালে মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে দেশীয় কিছু এজেন্ট বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিল। বিটিভি বিজ্ঞাপনের বাজার থেকে সেই অর্থ তুলতে পারেনি। সরকারের বিপুল অংকের ক্ষতি হয়েছিল।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনকে (বিটিভি) বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে অস্বাভাবিক ব্যয়ে বাধ্য করা হয়েছিল। একই চক্র বর্তমানে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব নিয়েও সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২২ বিশ্বকাপে বিটিভিকে বলা হয় যে ‘টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচারের জন্য আলাদা লাইসেন্স’ প্রয়োজন। এই যুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ে যুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ অতীতের বিশ্বকাপগুলোতে বেসরকারি সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান স্বত্ব কিনলেও বিটিভি আলাদা বড় অঙ্কের অর্থ ছাড়াই সম্প্রচার সুবিধা পেয়েছিল।
সেই একই মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট চক্র এবারো পরিকল্পিতভাবে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির পরিবেশ তৈরি করে। চার বছর আগের বিশ্বকাপে বিটিভির অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বাজারমূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়। এর প্রভাব পড়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের স্বত্ব নির্ধারণেও। এবারের বিশ্বকাপের সম্প্রচারের স্বত্ব বিটিভির কাছে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রির প্রস্তাব দেয়া হয়। পাশাপাশি স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে আরও প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ থেকে কামিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করে ফিফা বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্বের আন্তর্জাতিক অধিকারধারী হিসেবে কাজ পাওয়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি স্পোর্টস এজেন্ট।
বিশ্বকাপ এমন একটি পণ্য, যা একসঙ্গে কয়েক বিলিয়ন দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। তাই চার বছর পরপর আসা বিশ্বকাপ ফুটবল স্পন্সরশীপের জন্য দারুণ উপযোগী।
ফিফার দ্বিতীয় বড় আয়ের উৎস স্পন্সরশিপ ও মার্কেটিং। এডিডাস, কোকা-কোলা, ভিসা, হুয়ানদাই, কাতার এয়ারওয়েজ এর মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপকে ব্যবহার করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য। এই খাত থেকেই সর্বশেষ অর্থচক্রে আয় হয়েছে প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া টিকিট বিক্রি, কর্পোরেট হসপিটালিটি, লাইসেন্সিং, মার্চেন্ডাইজিং এবং ডিজিটাল কনটেন্ট থেকেও আসে বিপুল অর্থ। বিশ্বকাপের জার্সি, অফিসিয়াল বল, ভিডিও গেম, স্টিকার কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট—সবকিছুই এখন বিশাল বাণিজ্যিক ইকোসিস্টেমের অংশ।
তবে ফিফা শুধু আয়ই করে না, সদস্য দেশগুলোর উন্নয়নেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে। ফিফার ফরোয়ার্ড প্রোগাম এর আওতায় প্রতিটি সদস্য ফেডারেশন চার বছরের চক্রে উন্নয়ন অনুদান পায়। ২০১৬ থেকে ২০২২ চক্রে এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার বিশ্বব্যাপী সদস্য দেশ ও আঞ্চলিক কনফেডারেশনগুলোকে বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও নিয়মিত এই তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা পেয়ে থাকে।
ফুটবল এখন শুধু একটি খেলা নয়। এটি একই সঙ্গে আবেগ, বিনোদন, মিডিয়া, প্রযুক্তি এবং বহুজাতিক অর্থনীতির এক বিশাল সম্মিলিত শিল্প। বিশ্বকাপের ট্রফি হয়তো হাতে তোলে একটি দল, কিন্তু সেই ট্রফির চারপাশে ঘুরতে থাকে পুরো বিশ্বের বাণিজ্যিক অর্থনীতি।
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিকীকরণ কবে থেকে?
ফুটবল বিশ্বকাপের শুরু ১৯৩০ সালে। কিন্তু সেই সময় এটি ছিল সীমিত পরিসরের একটি টুর্নামেন্ট। বড় ধরনের বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয় মূলত টেলিভিশনের উত্থানের সঙ্গে। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপকে ধরা হয় আধুনিক বাণিজ্যিক বিশ্বকাপের সূচনা হিসেবে। কারণ এটিই ছিল প্রথম রঙিন টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বিশ্বকাপ।
সেখান থেকেই ফুটবল বুঝতে পারে—বিশ্বকাপ শুধু খেলা নয়, এটি একটি ‘গ্লোবাল মিডিয়া প্রোডাক্ট’। পরবর্তীতে ব্র্যান্ড জায়ান্ট এডিডাস, পুমা, কোকা-কোলা, ভিসা, ম্যাকডোনাল্ডস বিশ্বকাপকে ব্যবহার করতে শুরু করে বৈশ্বিক মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে।
১৯৮০-এর দশকে টেলিভিশন রাইটসের দাম বাড়তে থাকে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কর্পোরেট বাজারে প্রবেশের দরজা। আর ২০০০ সালের পর ডিজিটাল মিডিয়া ও গ্লোবাল স্ট্রিমিং বিশ্বকাপকে পুরোপুরি বহুজাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি আয় কোথা থেকে?
ফিফার আর্থিক রিপোর্ট অনুযায়ী এর আয় মূলত চারটি বড় খাতে বিভক্ত। এগুলো হলো, টেলিভিশন ব্রডকাস্ট রাইটস, মার্কেটিং/স্পন্সরশিপ, লাইসেন্সিং, এবং টিকেট/হসপিটালিটি। আর বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস হলো টেলিভিশন, ডিজিটালের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি।
সম্প্রচার স্বত্ব:
২০১৯-২০২২ চক্রে ফিফার মোট আয় ছিল প্রায় ৭.৫৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু টিভি ও মিডিয়া রাইটস থেকেই এসেছে প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন ডলার—যা মোট আয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ।
বিশ্বকাপ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা ক্রীড়া আসরগুলোর একটি। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, কাতার বিশ্বকাপ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে পাঁচ বিলিয়নের বেশি মানুষ দেখেছে। এ কারণেই সম্প্রচার সংস্থাগুলো বিলিয়ন ডলার খরচ করে রাইটস কিনে।
স্পন্সরশিপ ও মার্কেটিং:
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় বৃহত্তম আয়ের খাত স্পন্সরশিপ। এডিডাস, কোকা-কোলা, ভিসা, হুয়ানদাই, কাতার এয়ারওয়েজ ক্রিপটো ডটকম এমন বহু কোম্পানি বিশ্বকাপকে ব্যবহার করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য। ফিফার রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯-২০২২ চক্রে মার্কেটিং ও স্পন্সরশিপ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বকাপের সময় কোটি কোটি মানুষের আবেগ এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়। সেই আবেগের সঙ্গে নিজেদের ব্র্যান্ড জুড়ে দিতে চায় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। এ কারণেই একটি বিশ্বকাপ বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেইনের বাজেট অনেক দেশের বার্ষিক ক্রীড়া বাজেটের চেয়েও বড় হয়ে যায়।
টিকিট ও হসপিটালিটি:
ভিআইপি বক্স, কর্পোরেট স্যুট, হসপিটালিটি প্যাকেজ এখন বিশ্বকাপ অর্থনীতির বড় অংশ। কাতার বিশ্বকাপে টিকিট ও হসপিটালিটি থেকে ফিফার আয় ছিল প্রায় ৯৪৯ মিলিয়ন ডলার। এখানে শুধু সাধারণ টিকিট নয়—কর্পোরেট ক্লায়েন্টদের জন্য বিশেষ আতিথেয়তা, প্রিমিয়াম লাউঞ্জ, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং ইভেন্টও থাকে। বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি বিশ্বকাপ ব্যবহার করে নিজেদের ক্লায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট ও ব্র্যান্ড সম্পর্ক গড়তে।
এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিটের দাম হঠাৎ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ফিফা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০ লাখ টাকারও বেশি। ফিফার টিকিট বিক্রির ওয়েবসাইটে ‘ফ্রন্ট ক্যাটাগরি-১’ হিসেবে এই টিকিটগুলো বিক্রির জন্য তোলা হয়। এর আগে একই শ্রেণির টিকিটের দাম ছিল ১০ হাজার ৯৯০ ডলার। অর্থাৎ নতুন মূল্য আগের তুলনায় প্রায় তিনগুণ।
একটু পেছনে ফিরে যাই। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডলার। সেই তুলনায় এবারের দাম ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচগুলোর টিকিটের দামও আকাশছোঁয়া। ১৪ জুলাই ডালাসের এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামের সেমিফাইনালের টিকিটের দাম রাখা হয়েছে ১১ হাজার ১৩০ ডলার পর্যন্ত। আর আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ১৫ জুলাইয়ের সেমিফাইনালের টিকিটের সর্বোচ্চ মূল্য ১০ হাজার ৬৩৫ ডলার।
স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় ফুটবল দলের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর টিকিটের দামও সাধারণ দর্শকদের নাগালের বাইরে। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচের কিছু টিকিটের দাম রাখা হয়েছে ২ হাজার ৭৩৫ ডলার পর্যন্ত। অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের বিপক্ষের ম্যাচগুলোতেও কয়েক হাজার ডলারের টিকিট বিক্রি হচ্ছে।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য এই মূল্যবৃদ্ধিকে সমর্থন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বেভারলি হিলসে মিলকেন ইনস্টিটিউট গ্লোবাল কনফারেন্সে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাজারের বাস্তবতা দেখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে বিনোদন শিল্প বিশ্বের সবচেয়ে বড়গুলোর একটি, তাই বাজারদরের ভিত্তিতেই মূল্য নির্ধারণ করতে হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, কম দামে টিকিট বিক্রি করলে সেগুলো পুনরায় অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়ে যায়। তার দাবি, ফিফার নির্ধারিত দামও পুনর্বিক্রয় বাজারে দ্বিগুণের বেশি হয়ে যাচ্ছে। তবে ইনফান্তিনোর বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অনেকেই। যুক্তরাষ্ট্রে এনবিএ প্লে-অফসহ অনেক বড় ক্রীড়া ইভেন্টের টিকিট এখনো ৩০০ ডলারের কমেও পাওয়া যায়।
ফিফার রিসেল মার্কেটপ্লেসে ফাইনালের টিকিটের দাম আরো বিস্ময়কর পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেখানে কিছু টিকিটের মূল্য চাওয়া হয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ ডলারেরও বেশি। যদিও ফিফা জানিয়েছে, এসব মূল্য তারা নির্ধারণ করে না। তবে প্রতিটি পুনর্বিক্রিত টিকিট থেকে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়ের কাছ থেকেই ১৫ শতাংশ করে ফি নেয় সংস্থাটি।
মার্চেন্ডাইজিং ও লাইসেন্সিং:
জার্সি, বল, ভিডিও গেম, স্টিকার, কালেক্টর কার্ড—বিশ্বকাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাল মার্চেন্ডাইজ বাজার। পানিনির স্টিকার অ্যালবাম বিশ্বকাপ সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, লাইসেন্সিং থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৭৬৯ মিলিয়ন ডলার।
ডিজিটাল অর্থনীতি ও সোশ্যাল মিডিয়া:
আগে বিশ্বকাপ মানে ছিল টিভি। এখন বিশ্বকাপ মানে ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, স্ট্রিমিং অ্যাপ, শর্ট ভিডিও ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপন। একটি ভাইরাল গোল বা উদযাপন কয়েক মিনিটে কোটি ভিউ পায়। ফলে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন এখন বিশ্বকাপ অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী অংশ।
বিশ্বকাপ আয়োজন করে লাভ হয় কার?
এই প্রশ্নের উত্তর জটিল। ফিফা বিপুল আয় করলেও আয়োজক দেশ সবসময় সরাসরি লাভবান হয় না। অনেক দেশ বিশ্বকাপ আয়োজন করে দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ডিং, পর্যটন ও অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে।
২০২২ বিশ্বকাপের আগে বিপুল অবকাঠামো নির্মাণ করে। আইএমএফ এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ কাতারের নন-অয়েল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে এবং পর্যটন ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়িয়েছে। তবে সমালোচনাও কম নেই। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, স্টেডিয়াম নির্মাণ ও অবকাঠামো ব্যয়ের তুলনায় সরাসরি আর্থিক লাভ কম হয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্বকাপ এখন এমন এক পণ্য, যেখানে খেলোয়াড়রা শুধু অ্যাথলেট নন—তাঁরা গ্লোবাল ব্র্যান্ড। একটি ম্যাচ শুধু খেলা নয়—এটি বিজ্ঞাপন, কনটেন্ট, স্ট্রিমিং, সোশ্যাল মিডিয়া ও কর্পোরেট মার্কেটিংয়ের সম্মিলিত প্রদর্শনী। বিশ্বকাপ এখন অলিম্পিকের পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বড় কমার্শিয়াল স্পোর্টস ইভেন্টগুলোর একটি।
২০০৬ জার্মানির বিশ্বকাপে মিডিয়া ও স্পন্সরশিপে মিলিয়ে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যেখানে টিভি রাইটস খাতই ছিল আয়ের প্রধান উৎস। ২০১৯-২২ আর্থিক চক্রে মোট আয় ৭.৫৭ বিলিয়ন, যার প্রায় শতকরা ৪৫ এসেছে টিভি রাইটস থেকে, এবং প্রায় শতকরা ২৪ ভাগ পাওয়া যায় স্পন্সর ও মার্কেটিং থেকে।
কাতার বিশ্বকাপে ফিফা তার ইতিহাসে সর্বোচ্চ আয় রেকর্ড করেছে ৬.৩ বিলিয়ন কেবল বিশ্বকাপ সম্পর্কিত আয় থেকে, যেখানে টিভি ও মিডিয়া রাইটস সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ফিফা ২০২৩-২৬ চক্রে ১১ বিলিয়ন আয় লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, যার ৪.২ বিলিয়ন টিভি রাইটস, ২.৭ বিলিয়ন মার্কেটিং/ স্পন্সরশিপ, এবং ৩.১ বিলিয়ন টিকেট ও হসপিটালিটি-তে আসবে বলে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।বিশ্বজুড়ে বিশ্বকাপ ২০২৬ এর টিভি রাইটস বিক্রি ৩.৯ বিলিয়ন-এর কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এতো গেল ফিফার আয়ের হিসেব। যেমন আয় করে ফিফা ঠিক তেমনই ব্যয় করে বেশ। ফিফার ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে পরিচালন-প্রশাসনিক খরচ, ফুটবলের উন্নয়ন কর্মসূচি, টুর্নামেন্ট আয়োজন খরচ, প্রাইজমানি/ক্লাব পেমেন্টস ইত্যাদি। ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য খরচও কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। বিশ্বকাপ শেষে ফিফার অডিট রির্পোটে এই খরচারপাতির নিখুঁত হিসেব মিলবে।
২০২৭-৩০ চক্রে এসব খাত থেকে ফিফার আয় ১৪ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। প্রযুক্তির প্রসারে সেসময়ে সম্প্রচার ও স্পন্সর থেকে আরও বর্ধিত আয়ের আশা করছে ফিফা।
রিসোর্স লিংক:
• FIFA Revenue Report 2019-2022
• FIFA Finance Overview
• Al Jazeera Report on FIFA’s $7.5B Revenue
• IMF Report: Economic Impact of Qatar 2022 World Cup
• IMF Full Publication on Qatar World Cup Economy
• Reuters Report on 2026 World Cup Broadcasting Rights in China
• AP Report on FIFA Broadcast Revenue Strategy
• Economic Times Report on India’s World Cup Broadcasting Market
• YouTube Documentary: The Insane Profits of FIFA World Cup Qatar 2022
• Business Analysis Video on FIFA World Cup Economics
২২ মে, ২০২৬

এম. এম. কায়সার | ঢাকা, বাংলাদেশ
ক্রীড়া সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ।
