পড়শী নিয়মিত কলাম স্বাধীনতা: আমেরিকায় চিরন্তন; বাংলাদেশে চ্যালেঞ্জ

স্বাধীনতা: আমেরিকায় চিরন্তন; বাংলাদেশে চ্যালেঞ্জ

Post Views: 90

এ বছর জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে যখন উদযাপিত হচ্ছে স্বাধীনতা ঘোষণার আড়াইশ’তম বার্ষিকী তখন মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের এই স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে দৃষ্টিপাত করি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসটিও একটু পর্যালোচনা করে দেখি। বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের দিকে যখন নজর দিই তখন কোথায় যেন একটা সুক্ষ মিল খুঁজে পাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সুদীর্ঘ সংগ্রামের সময়ের সঙ্গে। যদিও ১৭৭৬ সালের ৪ঠা জুলাই আনুষ্ঠানিক ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি অঙ্গরাজ্য স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে, এই আমেরিকান রিভোলিউশানের সূচনা ১৭৬৫ সালে এবং এর চূড়ান্ত সমাপ্তি ১৭৮৩ সালে। এই সময়ে উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ ব্রিটিশ শাসনকে প্রত্যাখ্যান করে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তাদের কোন রকম প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার না দিয়েই তাদের উপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর তারই বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তারা ফ্রান্স ও স্পেনের সঙ্গে জোট বেঁধে শেষ পর্যন্ত তাদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

এই লড়াই কয়েকটি পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পর্যায়টি ছিল ১৭৬৫ থেকে ১৭৭৩ পর্যন্ত যখন তারা ব্রিটিশ সংসদের কিছু একতরফা আইন ও খাজনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। এই প্রতিবাদের প্রথম ধাপটি ছিল ১৭৭৩ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বস্টনে অনুষ্ঠিত বস্টন টি পার্টি। নামটি চা চক্র হলেও প্রকৃত পক্ষে এটি ছিল সক্রিয় প্রতিবাদ সভা। ১৭৭৫ সাল নাগাদ লেক্সিংটন ও কঙ্কর্ডে আক্ষরিক অর্থেই গোলাগুলি শুরু হয় এবং সেই থেকে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়। ১৭৭৬ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে উত্তর আমেরিকার ১৩টি ব্রিটিশ উপনিবেশ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার পরও ১৭৭৫ সালে ব্রিটেন ও সেই উপনিবেশগুলির উত্তেজনা আমেরিকান বিপ্লবে পরিণত হয়। প্রথমে যেটিকে গৃহযুদ্ধ বলে মনে করা হতো তাতে ফ্রান্স ১৭৭৮ সালে ফ্রান্স উপনিবেশগুলোর পক্ষে যোগ দিলে তা আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত হয়। ফ্রান্স সেই ১৭৭৮ সালে ট্রিটি অফ অ্যালায়ান্স বা জোটবদ্ধতার চুক্তি অনুযায়ী ১২০০ সৈন্য এবং ৬০টি যুদ্ধজাহাজ প্রদান করে। তবে এর আগে থেকেই ফ্রান্স পরোক্ষ ভাবে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা করে আসছিল। ১৭৮১ সালে ভার্জিনিয়ার ইয়র্কটাউনে ব্রিটিশ সৈন্যরা কন্টিনেন্ট সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে আমেরিকানরা কার্যত স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভ করে, যদিও ১৭৮৩ সালে এই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে।

আমেরিকার এই সুদীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মিল আছে। বাহ্যত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নয় মাসের যুদ্ধ বলে অভিহিত করা হয় কিন্তু প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের লড়াই আরও অনেক দিন আগে শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ বছরের লড়াইয়ের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসও দীর্ঘ, ২৩ বছরের সংগ্রাম। দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে যে পাকিস্তান বানানো হয়, সেই পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালেই বাঙালির ভাষিক স্বাধীনতা হরণের সোচ্চার ঘোষণা দেন। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন “নো, নো” বলে এর প্রতিবাদ জানান তখনই বাঙালির অধিকারের বিরুদ্ধে জিন্নাহর সামনেই সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয়।

পরের দিন জিন্নাহ কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেন কিন্তু বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা কোন ছাড় দেন নাই। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয় বটে কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার উপর বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বাঙালি ঘুরে দাঁড়ায়। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী পালনের ব্যাপারে বড় রকম বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা। তারই প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি মুর্শেদের নেতৃত্বে রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন করা হয়। ছায়ানট বলধা গার্ডেনে সুরে ও সঙ্গীতে বাংলা নববর্ষ পালন শুরু করে।

এর সব কিছুই ছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামেরই পরোক্ষ অংশ। তারপর আসে সেই ঐতিহাসিক ৬-দফা প্রস্তাব যা বাঙালির আর্থ-রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার চাবিকাঠি। ঠিক যেমন করে প্রতিনিধিত্ববিহীনভাবে ব্রিটিশরা আমেরিকান উপনিবেশগুলিকে করের আওতায় এনেছিল, তেমনি ভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের কর দিতে হতো নিজেদের কোন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান প্রণীত সেই ৬-দফা প্রস্তাবে সেই অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বেরও দাবি জানানো হয়। তার পরের ইতিহাস সকলেরই জানা। জেল-জুলুম করে বাংলাদেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা চালানো হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে কথিত আগরতলা মামলায় ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর ষড়যন্ত্রও পাকাপোক্ত করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের সম্মিলিত সংগ্রামের মুখে পাকিস্তান সরকার প্রকারান্তরে আত্মসমর্ফণ করে এবং শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। আর সেই থেকে “মুজিব ভাই” হলেন সকলের “বঙ্গবন্ধু”।

তার পরে প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসতো সকলেরই জানা। আমেরিকার স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামের মতো বাংলাদেশেও প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় এবং এ ক্ষেত্রেও ফ্রান্সের মতো ভারত হয়ে ওঠে আমাদের মিত্র বাহিনী। অবশেষে নয় মাসের প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বর আসে চূড়ান্ত বিজয়। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে এই বিজয়টা কি ছিল চূড়ান্ত বিজয়! ভেবেছিলাম আমরা সকলেই তাই। তিরিশ লক্ষ লোকের জীবনের এবং দু লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা যে দেশটিকে বিজয়ী করলাম, সে বিজয়তো চূড়ান্ত এবং চিরকালীন হবার কথা ছিল। আড়াই শ’ বছর পরও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ তাদের স্বাধীনতাকে সশ্রদ্ধ ভাবে সানন্দে সম্মান জানায়। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় হত্যা করা হলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে যাঁর স্বপ্ন ও প্রজ্ঞার আনুপাতিক ভারসাম্যে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশকে পেলাম। বাংলাদেশের এই কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে বার বার অবমূল্যায়ন করা হয়েছে সেটি বাহ্যত হতবাক হবার মতোই কথা।

কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা-প্রিয় মানুষ বুঝতেই পারেনি যে ছদ্মবেশে স্বাধীনতা বিরোধীরাও সক্রিয় থেকেছে বার বার। তেমনটি ঘটেনি যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে, বাদ-প্রতিবাদ হয়েছে; বিশেষত নির্বাচনী বিতর্কে তুমূল উত্তেজনাও আমরা দেখেছি কিন্তু কেউ কখনই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। বস্তুত জর্জ ওয়াশিংটন কোন রাজনৈতিক দলই করেননি তিনি বরঞ্চ রাজনৈতিক দল গঠনের বিরোধীতা করতেন কারণ তিনি মনে করতেন রাজনৈতিক দল বিভাজন বাড়িয়ে তোলে। জর্জ ওয়াশিংটনের এই বিচক্ষণতাই সেদিনের আমেরিকাকে বিভেদ ও বিভ্রান্তির মধ্যে একতাবদ্ধ করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস ফেডারেলিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন এবং তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফার্সন ১৭৯২ সালে ডেমক্রেটিক-রিপাবলিকান পার্টি গঠন করেন। অনেক পরে আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন। তিনি রিপাবলিকান পার্টি করতেন। তিনি গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেন ১৮৬৩ সালের ১৯শে নভেম্বর পেনসিলভেনিয়ার গেটিসবার্গে দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে যখন তিনি বলেন গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের সরকার ব্যবস্থা। গণতন্ত্রের এই সংজ্ঞা আাজও বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিতে অনুসরণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে দূর্ভাগ্যবশত গণতন্ত্র বার বার ভূ-লুন্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম তিন বছর কথিত বামপন্থিদের বিশৃঙ্খলার কারণে বঙ্গবন্ধু বহু দলীয় শাসন ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু হয়ত ভেবেছিলেন যে এই সাময়িক ব্যবস্থা দেশে একটি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে কিন্ত বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অজুহাতে যারা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মম ভাবে হত্যা করলো, তারা গণতন্ত্রকে দীর্ঘ দিনের জন্য নস্যাৎ করে দিল। মাঝে মাঝে বাংলাদেশ গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করেছে কিন্তু আবার গণতন্ত্র বিরোধীরা জোর করে ক্ষমতায় গিয়েছে।

বাংলাদেশে যে কেবল গণতন্ত্রকে বার বার নষ্ট করা হয়েছে তাই-ই নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল আদর্শকে লংঘন করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই, মানে কোটা আন্দোলনের নামে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের সূচনা হয়, তা যে কোন দাবি পূরণের আন্দোলন ছিল না, ছিল না স্বাভাবিক অর্থে কোন সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন – সেটি স্পষ্ট হয়ে যায় যখন এই আন্দোলনের পেছনে থাকা স্বাধীনতা বিরোধীরা স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে। যে দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সে দেশের অনুগত হওয়ার জন্য এখন সেই একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধীরা ব্যাকুল হয়ে উঠছে। দল-মত নির্বিশেষে স্বীকার করতেই হবে বাংলাদেশ এখন এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা চেয়ে আছি – সেই সংকট উত্তরণের দিকে।

৬ জুলাই, ২০২৬


ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র

গবেষক, লেখক এবং বিবিসি ও ভয়েস অফ আমেরিকার প্রাক্তন বেতার সাংবাদিক। স্বনামে ও ছদ্ম নামে দেশ বিদেশের পত্রপত্রিকায় অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।