সংগঠন সৃষ্টির পটভুমি
গত শতাব্দীর শেষের দিকে বাংলাদেশের পরিবেশগত সমস্যা এক অভাবনীয় রূপ ধারণ করে। ঘন ঘন বন্যা, অল্প বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের দূষন, দুই-স্ট্রোক বিশিষ্ট বেবী ট্যাক্সীর কালো ধুয়াতে বড় বড় নগরী গ্যাস চেম্বারে পরিণত হওয়া, সমূদ্র-পৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি, এবং পানি-বাহিত রোগের ব্যাপকতায় জনজীবন অতিষ্ট হয়ে পড়ে। ভৌতিক পরিবেশের অগ্রহনযোগ্য অবক্ষয় সত্বেও এইসব বিষয়ে গণপরিসরে জাতীয় সংলাপের অনুপস্থিতি সচেতন মহলকে চিন্তিত করে ফেলে। এমনই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এমোরী ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ থেকে ১৯৯৮ সনে ঘুরে এসে পরিবেশ অবক্ষয় রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং উপযুক্ত সরকারী নীতিমালা প্রনয়নে চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন গভীরভাবে অনুভব করেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকজন বন্ধুকে পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরকে একতাবদ্ধ করে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব দেন। সবাই এই বিষটির সময়োপযোগিতা এবং গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং একটি সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে একমত হন। ড. নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন) নামটি প্রস্তাব করেন। বেন ১৯৯৮ সনের জুলাই মাসের ১০ তারিখে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাতে এই সংগঠনের নাম বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) প্রবাসী বাংলাদেশী এবং বিদেশি বন্ধুভাবাপন্ন জনগণের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বতন্ত্র, স্ব-অর্থায়িত, অরাজনৈতিক, এবং অলাভজনক পরিবেশবাদী বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। বাংলাদেশের জন্মের অর্ধেক সময় ধরে বেন স্বমহিমায় বিদ্যমান। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলি অঙ্গরাজ্যসহ কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, এবং জার্মানীতে বেনের চ্যাপ্টার রয়েছে। বাংলাদেশের ভৌতিক পরিবেশের অবক্ষয়রোধ, উন্নয়ন ও সংরক্ষনের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক নীতিমালা প্রনয়নের জন্য নীতিনির্ধারণী মহলে চাপ সৃষ্টি করা বেনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বেন নিম্নোক্ত ছয়টি মূল নীতিমালার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়ঃ
(১) স্ববাসী-প্রবাসী যোগসূত্র তৈরি করে পরিবেশ সংরক্ষন বিষয়ে কাজ করা,
(২) পরিবেশ-বিষয়ক বুদ্ধি-ভিত্তিক চর্চার সাথে বৃহত্তর জনগোষ্ঠির সম্পৃত্তিকরণ,
(৩) প্রচলিত রাজনীতি-নিরপেক্ষ অবস্থান,
(৪) অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন এবং পরনির্ভরতা ত্যাগ,
(৫) নূণ্যতম সাংগঠনিক কাঠামো,
(৬) ঐক্যমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহন।
স্ববাসী-প্রবাসী যোগসূত্র তৈরি করে পরিবেশ সংরক্ষন বিষয়ে কাজ করাঃ
বেনের ছয়টি মূল নীতি এই সংগঠনটিকে বিদ্যমান অন্যান্য সংগঠনের চেয়ে স্বাতন্ত্র বৈশিষ্টে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই মূল নীতি গুলির অনন্যতা ব্যাখ্যার দাবী রাখে। বেন প্রতিষ্ঠা লগ্নেই অনুধাবন করে যে বাংলাদেশের ভৌতিক পরিবেশ সংরক্ষন এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হলে দেশের অভ্যন্তরে আমাদের চিন্তার সাথে মিল রয়েছে এমনসব ব্যাক্তিবর্গ এবং সংগঠনসমূহকে একটি প্ল্যাটফর্মে জড়ো করতে হবে। সেই লক্ষ্যে পরিকল্পনা করার জন্য বেন ১৯৯৯ সনের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় অবস্থিত দক্ষিনের হার্ভার্ডখ্যাত এমোরী ইউনিভার্সিটিতে ড. নজরুল ইসলাম একটি সভার আয়োজন করে। এই সভাটি বেনের প্রথম সভা।
সেই সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ড. নজরুল ইসলাম বাংলাদেশে অবস্থিত পরিবেশ-সপক্ষ সব সংগঠন এবং ব্যক্তিবর্গের সাথে সাক্ষাত করেন এবং ২০০০ সালের জানুয়ারী মাসে ঢাকায় পরিবেশ বিষয়ক প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। সে সম্মেলনে ততকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যথাক্রমে উদবোধনী এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সেই সম্মেলনের সুপারিশমালা অনুযায়ী একই বছরের জুলাই মাসে বুয়েটের এটিএন সভাকক্ষে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) গঠিত হয়। ড. নজরুল ইসলাম বাপার গঠনতন্ত্র প্রনয়ন করেন। জনাব আবুল মাল আবুল মুহিত বাপার প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। বাপা বর্তমানে বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত সুপরিচিত নাম।
পরিবেশ-বিষয়ক বুদ্ধি-ভিত্তিক চর্চার সাথে বৃহত্তর জনগোষ্ঠির সম্পৃত্তিকরণ
বেনের জড়িত রয়েছে পৃথিবীর অনেক স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গবেষনা প্রতিষ্ঠানের প্রবাসী বাংলাদেশীগণ। বাংলাদেশের ভৌতিক পরিবেশের বিভিন্ন দিক নিয়ে তাঁরা প্রতিনিয়ত কাজ করছেন। পরিবেশ বিষয়ে কোন ইস্যুতে সচেতনতা গড়ে তোলার আগে সেই বিষয়ে বিজ্ঞান-ভিত্তিক গবেষনালব্ধ ফলাফল যাচাইবাছাই করে বেন একটি নিজস্ব মতামত তৈরি করে এবং তার ভিত্তিতেই প্রবাসে এবং বাংলাদেশে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠিকে সম্পৃক্ত করে সভা, সমাবেশ, প্রেস কনফারেন্স, সম্মেলন, নীতিনির্ধারনী মহলের সাথে মত বিনিময়, এবং প্রয়োজনে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে বেনের উদ্যোগে বাপা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশের কোন সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে অথবা সার্বিক পরিবেশ বিষয়ক ইস্যুতে সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে। এযাবতকালে বাপা-বেন যৌথভাবে পরিবেশের বিভিন্ন দিক নিয়ে ২০টির অধিক সম্মেলনের আয়োজন করে। বাপা-বেন সম্মেলনের মধ্যে পরিবেশের সার্বিক বিষয় নিয়ে ৮টি এবং উপমহাদেশের যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ২টি সম্মেলন ছাড়াও নদী ও পানি সম্পদ, জলবায়ূ পরিবর্তন, বায়ূ দূষন, জ্বালানী, আদিবাসী ও পরিবেশ, বন্যা, উপকূলীয় ও সামূদ্রিক পরিবেশ, পরিবেশ আন্দোলনে রাজনৈতিক দলসমূহের প্রভাব, এবং পরিবেশ বিষয়ক সংস্কার নিয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে বাপা-বেন এবং অন্যান্য পরিবেশবাদী সংগঠনের যৌথ প্রচেষ্টায় পরিবেশ বিষয়ক আইন এবং নীতিমালায় কিছু সাফল্য অর্জিত হয়েছে। শিষামুক্ত পেট্রোল, পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করণ, নদী রক্ষা কমিশন গঠন, এবং নদীকে জীবন্ত স্বত্তা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান অন্যতম সাফল্য। তাছাড়াও, বাপা-বেনের সুপারীশক্রমে ২০২৩ সালে ততকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান হাওরে নতুন করে আর মহাসড়ক নির্মাণ না করার প্রত্যয় ঘোষনা করেন।
শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরের পরিবেশ বিষয়ক ইস্যুতেই নয় বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও বেন বিভিন্ন কর্মকান্ডের আয়োজন করেছে। জলবায়ূ পরিবর্তন বিষয়ক একাধিক সমাবেশ এবং র্যালিতে বেন অংশগ্রহন করেছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো ২০০৯ সালে নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনের জন্য বিশ্বের উন্নত দেশসমূহকে চাপ দেওয়ার আহবান জানিয়ে র্যালির আয়োজন করে এবং র্যালি শেষে জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রতিনিধির কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। ২০১৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয় পিপলস ক্লাইমেট মার্চ যেখানে সারা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০,০০০ মানুষ অংশগ্রহন করে। বেনের প্রতিনিধি দলও সেই ঐতিহাসিক ক্লাইমেট মার্চে অংশগ্রহন করে।
বাংলাদেশের বড়পুকুরিয়াতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খননের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার সরকার প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার জন্য ২০০৯ সালের জুন মাসে একটি গোল টেবিল বৈঠকের আয়োজন করে, যেখানে বেনের দুইজন প্রতিনিধিকেও নিমন্ত্রন করা হয়। পরবর্তীতে বেনের প্রতিনিধিগন বাপার সাথে যৌথভাবে একটি আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খননের বিরোধিতা করে। জনগণের আন্দোলনের মুখে বড়পুকুরিয়ার কৃষিজমি বিনষ্ট করে এবং ভূগর্ভস্থ্য পানির আধার ধংস করে কয়লা উত্তোলন থেকে সরকার সরে আসতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলনে বাপা-বেনের অংশগ্রহন এক ঐতিহাসিক মাইলস্টোন হিসাবে বিবেচিত হয়।
পরিবেশ বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অংশ হিসাবে বেনের ১২টি বিশেষজ্ঞ প্যানেল রয়েছে, যার মধ্যে নদী-জলাভূমি, জ্বালানী ও পরিবেশ, উপকূলীয় ও সামূদ্রিক পরিবেশ, বায়ূ দূষন, পানীয় জল-সেনিটেশন-হাইজিন, জলবায়ূ পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দূর্যোগ, পরিবেশ ও আদিবাসী, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও লিঙ্গীয় বৈষম্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিপ্রতিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জনসংখ্যা ও নগর পরিকল্পনা, জীব বৈচিত্র ও বনভূমি ইত্যাদি বিষয় উল্লেখযোগ্য। এইসব বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে গত তিন বছরে ২০টি ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়। এইসব ওয়েবিনারে নিজ নিজ ক্ষেত্রে পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানী এবং গবেষকেরা অংশগ্রহন করে থাকে। বেনের ওয়েবিনারগুলি পরিবেশ বিষয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সর্বশেষ প্রাপ্ত জ্ঞান এবং গবেষনার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। বেনের প্রত্যেকটি ওয়েবিনারের উপস্থাপনাগুলির রেকর্ড করা হয়েছে এবং বেনের ওয়েবসাইটে (https://ben-global.net/ben-webinars/ ) সংরক্ষন করা হয়েছে।
বাপা হচ্ছে বেনের ভাতৃপ্রতিম (অথবা ভগ্নীপ্রতিম) সংগঠন। পরিবেশের বিভিন্ন ইস্যুতে বেনের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ছাড়াও বেনের নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মাঠ পর্যায়ের বাপা এবং অন্যান্য পরিবেশ-স্বপক্ষ সংগঠনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। সার্বিকভাবে সারা দেশের পরিবেশ আন্দোলনের নেতা-কর্মী এবং অন্যান্য সংগঠনের সামনে বাপা-বেনের দাবীনামা তুলে ধরে ২০২৩ সালে ফেব্রুয়ারী মাসের ১৩ তারিখে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পরিবেশ সমাবেশের আয়োজন করে।
দেশের আভ্যন্তরীণ পরিবেশ বিষয়ক ইস্যুর বাইরেও বাপা-বেন আঞ্চলিক ইস্যুতেও অনেক কাজ করেছে। ভারত সরকার ২০০৩ সালে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ঘোষনা করে, যার লক্ষ্য হচ্ছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর “বাড়তি” পানি কয়েক হাজার কিলোমিটার সংযোগ খালের মাধ্যমে ভারতের “পানি সল্পতায়” থাকা দক্ষিন এবং পশ্চিম অঞ্চলে সরিয়ে নিবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশের উপর এক চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিরুদ্ধে ভারতের বেশ কয়েকটি প্রদেশেও বিরোধীতা গড়ে ওঠে। বাপা-বেন এবং অন্যান্য কয়েকটি পরিবেশ স্বপক্ষ সংগঠন ২০০৪ সালের জানুয়ারী মাসে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। এই সম্মেলনে ভারতের উচ্চ পর্যায়ের একটি দল যোগদান করে যার মধ্যে মেধা পাটকার, রামস্বামী আয়ার, সুধীরিন্দির শর্মা, সুধীর ভম্বেটকেরে অন্যতম। এছাড়াও বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার বীণা সিক্রিও যোগ দেন। আন্তঃনদী সংযোগের উপর এত বড় সম্মেলন আমাদের উপমহাদেশে আর একটিও সংগঠিত হয়নি। উক্ত সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রবন্ধ নিয়ে যে প্রসেডিংস প্রকাশিত হয় তা এই বিষয়ে সবচেয়ে গ্রুত্বপূর্ণ দলিল।
প্রচলিত রাজনীতি-নিরপেক্ষ অবস্থান
বেন রাজনীতি বিষয়ে অজ্ঞ নয়, তবে পরিবেশ সংরক্ষন যেহেতু সকল রাজনৈতিক দলেরই অঙ্গীকার, তাই প্রচলিত সব রাজনৈতিক দলের সদস্যই বেনের সদস্য হতে পারবেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে অবশ্যই বেনের সাংগঠনিক কাঠামো, মূল নীতিমালা এবং পরিবেশের বিভিন্ন ইস্যুতে গৃহীত বেনের অবস্থানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থান গ্রহন করতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, যেহেতু পরিবেশ রক্ষার সমস্ত উদ্যোগই বেন এবং বাপা যৌথভাবে কাজ করে তাই বাপার মূল নেতৃত্বে যেন কোন রাজনৈতিক দলের পদবীধারী কেউ না থাকেন সেই বিষয়ে বিশেষ নজর রাখা হয়। বেনের সঙ্গে জড়িত এবং পদবীধারী কেউ কোন বাংলাদেশী রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত আছে বলে আমাদের জানা নেই। আমাদের এই অবস্থান বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মহলেও জানা আছে বলেই বাপা-বেনের সব সম্মেলনে সরকারী এবং বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ যোগদান করতে সাচ্ছন্দ বোধ করেন।
অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন এবং পরনির্ভরতা ত্যাগ
পরিবেশ বিষয়ে অসংখ্য বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কাজ করে, কিন্তু তাদের কাজের ধরণ এবং ব্যাপ্তি নির্ভর করে দাতা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছার উপর। সেই দিক থেকে বেন একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। জন্মলগ্ন থেকেই বেন অন্যতম নীতিমালা হিসাবে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন এবং পরনির্ভরতা ত্যাগ করাকে গ্রহন করেছে। বেন সম্পূর্ণ স্ব-অর্থায়িত একটি প্রতিষ্ঠান যার সমস্ত অর্থই সদস্যদের অনুদানের ভিত্তিতে সংগৃহীত। বেনের প্রতিটি সদস্য শুধুই দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জিবিত হয়ে দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে এই সংগঠনে জড়িত রয়েছে। বেন যেহেতু সরকারী কিংবা দাতা গোষ্ঠীর কোন অর্থানুকুল্য গ্রহন করেনা তাই বিভিন্ন পরিবেশ বিষয়ক সরকারী নীতিমালা কিংবা প্রকল্পের নিরপেক্ষ, নির্মোহ, এবং বিজ্ঞান-ভিত্তিক মতামত প্রকাশ করতে পারে। বেন যেহেতু নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক সংগঠন তাই সংগঠন পরিচালনার কোন খরচ নেই। বেন সদস্যদের কাছ থেকে প্রতি বছর যে অনুদান গ্রহন করে তার প্রত্যেকটি টাকা বাংলাদেশে বাপার কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য ব্যয় করা হয়। বেনের সাংগঠনিক চরিত্রটি নীচের রেখাচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো। বেনের বার্ষিক ফান্ডরেইজিং এর হিসাব সর্বসাধারনের জন্য বেনের অয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়। বেন যুক্তরাষ্ট্রে রেজিস্ট্রিকৃত একটি অলাভজনক (501(1)(C) ক্যাটাগরীর প্রতিষ্ঠান। বাংলা প্রবাদ “নিজের খেয়ে বনে মোষ তাড়ানো”র প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বেন।
নূণ্যতম সাংগঠনিক কাঠামো
বেন পরিচালনার জন্য নূণ্যতম সাংগঠনিক কাঠামো মেনে চলে। বেনের সদস্যদের ধরণ তিনভাগে বিভক্তঃ
(১) বেন – প্রবর্তক গ্রুপ
(২) বেন – নির্বাহী গ্রুপ
(৩) বেন – সাধারণ সদস্য
প্রথম গ্রুপের সদস্যেরা বেন গঠনে উদ্যোক্তার ভুমিকায় ছিলেন এবং এই গ্রুপটি উপদেষ্টা মন্ডলীর দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় গ্রুপটি বেনের লীডারশিপ গ্রুপ যারা দৈনন্দিন কার্যকলাপের সাথে জড়িত। সর্বশেষ গ্রুপে বেনের গঠনতন্ত্র এবং আদর্শে বিশ্বাসী যে কেউ সদস্য হতে পারেন। এর বাইরে বেন – বিশেষজ্ঞ প্যানেল, বেন – ওয়েবিনার পরিচালনা পর্ষদ, এবং বেন – ওয়েবসাইট ও নিউজ লেটার পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে। বেনের সমস্ত কর্মকান্ড পরিচালনা করার জন্য একজন বৈশ্বিক সমন্বয়ক এবং অর্থ বিষয়ক কর্মকান্ড পরিচালনা করার জন্য একজন বৈশ্বিক ট্রেজারার রয়েছেন। বেনের স্থানীয় এবং অন্যান্য দেশে অবস্থিত চাপ্টার পরিচালনা করার জন্য সমন্বয়ক এবং সহ-সমন্বয়ক রয়েছে। উল্লেখ্য যে বেন প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রথম বিশ বছর ড. ইসলাম বৈশ্বিক সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন, পরবর্তী চার বছর ড. সালেহ তানভীর, এবং শেষের চার বছর ড. মোঃ খালেকুজ্জামান এই দায়িওে নিয়োজিত আছেন।
ঐক্যমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহন
বেন সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে ঐক্যমতের ভিত্তিতে নিয়ে থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহনের বেলায় যদি কোন দ্বিমত উত্থাপিত হয় তাহলে সংখ্যাগরিষ্টের মতকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি চালু রয়েছে। যেহেতু বেনের কোন কাজ কিংবা সিদ্ধান্তের সাথে কোন সদস্যের ব্যক্তিগত লাভ-লোকশান জড়িত নয় তাই সংখ্যাধিক্যের মতই যে উত্তম পথ সেটি প্রত্যাক সদস্যই অনুধাবন করেন।
উপরোক্ত ছয়টি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে বেন ২৮ বছর ধরে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এই কাজের সাথে যারা প্রত্যক্য বা পরোক্ষভাবে জড়িত আছে তাদের সবার প্রতি আমাদের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও ভালবাসা। আসুন দেশের সার্বিক কল্যাণে, পরিবেশ-বান্ধব এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশপ্রেমে উজ্জিবিত হয়ে একসঙ্গে কাজ করি।
৩০ জুন, ২০২৬

