(১)
আজিজুল হকের কপালটা কিছুটা অদ্ভুত। তার জীবনে শনিগ্রহ বোধহয় স্থায়ীভাবে লিজ নিয়ে বসে আছে। তা না হলে একটা মানুষ পরপর তিনবার বিয়ে করবে এবং তিনবারই ডিভোর্স হবে— এটা পরিসংখ্যানের হিসেবেও অসম্ভব। আজিজুল হকের ধারণা, তার ওপর কোনো শক্তিশালী পরী আছর আছে। যে পরীটি দেখতে হয়তো খুব সুন্দর, কিন্তু স্বভাবটা উগ্র—সে আজিজুলকে কোনো নারীর সাথে বেশিক্ষণ থাকতে দেয় না।
আজিজুল হকের তৃতীয় স্ত্রী কুসুম যেদিন বাপের বাড়ি চলে গেল, সেদিন আজিজুল হক উঠোনে একটা মোড়া পেতে বসে আকাশ দেখছিল। তার হাতে একটা মশা মারার ব্যাট। সে কিছুক্ষণ পর পর বাতাসে ব্যাট নাড়াচ্ছে আর ‘টাস টাস’ শব্দ হচ্ছে।
তার পাশে বসে আছে মতির বাপ। মতির বাপের কাজ হলো আজিজুল হকের প্রতিটি কথায় ‘হুম’ বলা এবং সময়মতো তামাক সাজানো।
আজিজুল হক বলল, “মতির বাপ, ডিভোর্স তো হয়ে গেল।” মতির বাপ বলল, “হুম, ভাইজান।” “এখন নিজেকে কেমন যেন হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে মহাকাশে ভাসছি। নীল আর্মস্ট্রং যখন চাঁদে পা দিয়েছিল, তখন তার নিশ্চয়ই এমন লেগেছিল।” মতির বাপ আকাশপানে তাকিয়ে বলল, “হুম।”
আজিজুল হক মোড়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এক বিচিত্র সংকল্প। সে বলল, “মতির বাপ, বাজারে যাও। গিয়ে চল্লিশ কেজি গরুর দুধ নিয়ে আসো। খাঁটি দুধ হতে হবে। কোনো পানি মেশানো চলবে না।”
মতির বাপ ভুরু কুঁচকে বলল, “দুধ দিয়া কী হইবো বাজান? পায়েস করবেন?”
আজিজুল হক গম্ভীর গলায় বলল, “না, আমি গোসল করব। তিন বিয়ের অভিশাপ আমার গায়ে লেগে আছে। দুধ দিয়ে গোসল করে আমি আজ পবিত্র হবো। তারপর গ্রামের মানুষকে মিষ্টি খাওয়াব।”
মতির বাপ অবাক হয়ে আজিজুল হকের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো আজিজুল হকের মাথার নাটবল্টুগুলো পুরোপুরি ঢিলে হয়ে গেছে। কিন্তু আজিজুল হকের মেজাজ এখন কড়া লিকারের চায়ের মতো—তর্কে গেলে মতির বাপের বিপদ আছে।
(২)
টাঙ্গাইলের সখীপুর নিঝুমতলা গ্রামটা এমনিতেই খুব শান্ত। কিন্তু আজিজুল হকের চল্লিশ কেজি দুধ দিয়ে গোসলের খবর বাতাসের আগে ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামের চায়ের দোকানে তুমুল আলোচনা।
গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি লতিফ সাহেব। তিনি পান চিবোতে চিবোতে বললেন, “আজিজুল তো দেখি শাহজাদা খুররম হয়ে গেল! দুধ দিয়া গোসল? কলিঙ্গ যুদ্ধের পর সম্রাট অশোকও বোধহয় এমন কাণ্ড করেন নাই।”
ঠিক তখনই সেখানে হাজির হলো আরিয়ান। আরিয়ান নিজেকে এ তল্লাটের ‘দার্শনিক’ দাবি করেন। তিনি লতিফ সাহেবের পাশে বসে বললেন, “চাচা, এটাকে বলে ‘সাইকোলজিক্যাল ক্লিনিং’। আজিজুল সাহেব আধুনিক মানুষ। তিনি বুঝেছেন যে সাবান দিয়ে শরীরের ময়লা পরিষ্কার হয়, কিন্তু বিয়ের স্মৃতি পরিষ্কার করতে দুধ লাগে। দুধে ল্যাকটিক এসিড আছে, যা বিরহের স্মৃতিকে ধুয়ে মুছে দেয়।”
লতিফ সাহেব চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। “আরিয়ান, তুমি কি বিসিএস পাস করেছ, নাকি শুধু পরীক্ষা দিয়েই যাচ্ছ?”
আরিয়ান বিগলিত হাসিতে বলল, “না চাচা, তবে পাস করার কাছাকাছি গিয়েছিলাম। ভাইভা বোর্ডে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল— আকবরের নানার নাম কী? আমি বলেছিলাম— ইতিহাস নানাদের মনে রাখে না, শুধু নাতিদের মনে রাখে। ব্যস, ওরা আমাকে বের করে দিল, বড্ড আফসোস রে চাচা, স্যারটা আমার ট্যালেন্ট চিনলো না।”
(৩)
দুপুরবেলা। আজিজুল হকের বাড়ির উঠোনে বিশালাকার একটা পিতলের ডেকচি রাখা। তাতে টলমল করছে ধবধবে সাদা গরুর দুধ। গ্রামের অর্ধেক মানুষ ভিড় করে আছে এই দৃশ্য দেখার জন্য। মহিলারা পর্দার আড়াল থেকে ফিসফিস করছে।
আজিজুল হক একটা গামছা পরে ডেকচির পাশে এসে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এক ধরণের স্বর্গীয় আভা। সে মতির বাপকে ইশারা করল।
মতির বাপ একটা মগ দিয়ে দুধ তুলে আজিজুলের মাথায় ঢালতে শুরু করল। আজিজুল চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করছে। এদিকে দার্শনিক আরিয়ান পাশ থেকে ধারাভাষ্য দিচ্ছে, “দেখুন ভায়েরা, দেখুন! বিচ্ছেদের বিষ নীলকণ্ঠের মতো পান না করে আজিজুল সাহেব আজ সাদা দুধে নিজেকে ধুয়ে নিচ্ছেন। এর নাম মুক্তি! এর নাম ফ্রিডম, হি ওয়ান্টস টু বি এ্যা ফ্রি ম্যান!”
আজিজুল হক যখন পুরোপুরি দুধে ভিজে গেল, তখন তার মনে হলো সে কোনো রাজকীয় রূপকথার ভেতর ঢুকে পড়েছে। তার মনে হলো কুসুম, রহিমা আর জরিনা— এই তিন বউয়ের স্মৃতি এখন দুধের সাথে মিশে নর্দমায় চলে যাচ্ছে।
গোসল শেষে আজিজুল হক ঘোষণা করল, “আজ রাতে বাড়িতে ভোজ হবে। গরু জবাই হবে। আর যারা মিষ্টি পছন্দ করেন, তাদের জন্য এক মন রসগোল্লা।”
গ্রামবাসী হাততালি দিয়ে উঠল। ডিভোর্স যে এত আনন্দের হতে পারে, তা সখীপুরের মানুষ আগে কখনো দেখেনি।
রাতের বেলা। খাওয়া-দাওয়া যথারীতি শেষ। গ্রামের মানুষ তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বিদায় নিয়েছে। বাড়ির বারান্দায় আজিজুল হক একা বসে আছে। তার গায়ে এখন দামী আতরের ঘ্রাণ, কিন্তু নাকে এখনো কেমন একটা কাঁচা দুধের গন্ধ লেগে আছে।
মতির বাপ এসে বলল, “বাজান, সব পরিষ্কার করা শেষ। ডেকচিটা ধুইয়া রাখছি।” আজিজুল হক কোনো উত্তর দিল না। সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। “বাজান, খুশি হইছেন তো?”
আজিজুল হক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ধীর গলায় বলল, “মতির বাপ, একটা সত্য কথা শুনবা?” “জি কন।”
“দুধ দিয়ে গোসল করার সময় খুব ভালো লাগছিল। মনে হচ্ছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। কিন্তু এখন শরীরটা কেমন যেন আঠা আঠা লাগছে। আর বুকের ভেতরটা… কেমন যেন খালি খালি।”
মতির বাপ বুঝল না। সে বলল, “খালি লাগবো কেন? এত মানুষ খাইলো, আনন্দ হইলো!”
আজিজুল বলল, “আনন্দ তো হইলো মতির বাপ, কিন্তু রাতে যখন ঘুমাতে যাব, তখন মশা মারার ব্যাটটা কে চালাবে? কুসুম থাকলে অন্তত ফ্যানটা কমিয়ে দিতে পারতাম। এখন ফ্যান বেশি হলে শীত লাগে, কম হলে মশা কামড়ায়।”
(৪)
পরদিন সকালে গ্রামের রাস্তায় দেখা গেল আরিয়ান সাহেবকে। তার গায়ে লাল টুকটুকে পাঞ্জাবি। সে এক মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে।
লতিফ সাহেব ডাক দিলেন, “কী হে আরিয়ান! আজিজুলের খবরাখবর কী?”
আরিয়ান শব্দহীন হাসলেন। “আজিজুল সাহেব এখন চার নম্বর বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজছেন চাচা। তবে এবার একটা শর্ত দিয়েছেন।”
“কী শর্ত?” “পাত্রীর বাবার অন্তত চার পাঁচটা দুগ্ধবতী গাভী থাকতে হবে। যাতে বিচ্ছেদ হলে তাকে দুধ কিনতে বাজারে দৌড়াতে না হয়। এটাকে বলে ‘রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’।”
লতিফ সাহেব চশমাটা খুলে পরিষ্কার করতে লাগলেন। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “পাগল! এ গ্রামের সব কটা পাগল!”
আজিজুল হকের “রিস্ক ম্যানেজমেন্ট” পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্রুতই এক পাত্রী পাওয়া গেল। পাত্রীর বাবার ছয়টি গরু, যার মধ্যে চারটি দুধ দেয়। আজিজুল হকের খুশির আর সীমা নেই। সে মনে মনে ভাবল, এবার বিচ্ছেদ হলেও অন্তত দুধের অভাবে পবিত্র হতে সমস্যা হবে না।
বিয়ের দিন সকালে আজিজুল হক আবার সেই পিতলের ডেকচি নিয়ে বসল। এবার তার মাথায় নতুন বুদ্ধি খেলেছে— বিয়ের আগেই একবার ‘প্রি-ওয়েডিং’ দুগ্ধ-স্নান করে নেবে যাতে কোনো অশুভ পরী তার কাছে ঘেষতে না পারে।
মতির বাপ যখন আজিজুলের গায়ে দুধ ঢালছে, তখন উঠোনের শ্যাওলা আর কাঁচা দুধ মিলে জায়গাটা চরম পিচ্ছিল হয়ে উঠল। এক মগ দুধ মাথায় পড়তেই আজিজুল হক পা পিছলে সোজা গিয়ে পড়ল সেই বিশালাকার ডেকচির ভেতর। তার দুই পা আকাশের দিকে আর মাথাটা ডেকচির তলায়।
মতির বাপ আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত গলায় বলল, “বাজান, আপনে তো এখন পুরাই রসগোল্লা হয়ে গেছেন। রসের বদলে খালি দুধে ডুব দিছেন!”
ঠিক সেই মুহূর্তে আবার আরিয়ানের অনাকাঙ্খিত আগমন। আজিজুলকে ডেকচির ভেতর ওভাবে আটকে থাকতে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। লতিফ সাহেবও পেছন থেকে হাজির। আরিয়ান চশমাটা ঠিক করে বলল:
“চাচা, এটাকে বলে ‘ফুল বডি ইমার্সন থেরাপি’। আজিজুল সাহেব বুঝতে পেরেছেন যে শুধু মাথায় দুধ ঢাললে ভাগ্য পরিবর্তন হয় না, ভাগ্যের ভেতর পুরোপুরি চুবানি দিতে হয়।”
লতিফ সাহেব রাগে গরগর করে বললেন, “আরে ও তো ডেকচিতে আটকে গেছে! ধর ওকে, তুলে উঠাও!”
আজিজুলকে ডেকচি থেকে টেনে তোলা হলো। সারা শরীর দুধে মাখামাখি। ঠিক তখন পাত্রীপক্ষের লোকজন বাড়িতে এসে হাজির। পাত্রীর বড় ভাই এলাকার নামকরা গোয়ালা। সে আজিজুলকে এই অবস্থায় দেখে চিৎকার করে উঠল, “ওরে সর্বনাশ! এই লোক তো আমাদের খামারের চারটা গরুর সকালের দুধ একাই গায়ে মেখে বসে আছে! আমাদের গরুর দুধের অপচয় আমরা সহ্য করব না!”
পাত্রীপক্ষ বিয়ের প্রস্তাব বাতিল করে দিয়ে গেল। যাওয়ার সময় পাত্রীর বাবা বলে গেলেন, “যে লোক বিয়ের আগে গরুর দুধ দিয়ে গোসল করে, বিয়ের পর সে নিশ্চিত দুধ দিয়ে আরো অনেক অঘটন ঘটাবে। এমন পাগল জামাই আমাদের দরকার নেই।”
(৫)
আজিজুল হক উঠোনে একা বসে রইল। তার গায়ে এখন মাছি ভনভন করছে। সে মতির বাপের দিকে তাকিয়ে করুণ সুরে বলল, “মতির বাপ, ল্যাকটিক এসিড কি কাজ করল না?”
মতির বাপ তামাক সাজাতে সাজাতে বলল, “বাজান, ল্যাকটিক এসিডের কথা জানি না, তবে মাছিগুলা আপনারে এখন মিষ্টির দোকান ভাইবা কামড়ানো শুরু করছে। ব্যাটটা কি দিমু?”
সখীপুরের আকাশে চাঁদ উঠেছে, কিন্তু আজিজুল হকের কপালে শনির দশা কাটেনি। তিনি বারান্দায় বসে মশা মারার ব্যাটটা হাতে নিলেন, কিন্তু এবার আর ‘টাস টাস’ শব্দ হলো না। একঝাঁক মাছি আর মশা তাকে ঘিরে ধরেছে, যেন তারা কোনো রাজকীয় ভোজের নিমন্ত্রণ পেয়েছে।
আজিজুল হক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মতির বাপের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মতির বাপ, আরিয়ান ঠিকই বলেছিলেন— বিচ্ছেদের স্মৃতি ধুয়ে মুছে যায়। কিন্তু স্মৃতি মুছলেও এই আঠা আঠা ভাবটা তো যাচ্ছে না রে! মনে হচ্ছে আমি নিজেই এখন একটা বড়সড় রসগোল্লা।”
মতির বাপ তামাকের ধোঁয়া ছেড়ে নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “হুম, বাজান। তবে লাভ একটা হইছে। আগে পরীরা আছর করতো, আর এখন পুরা গ্রামের মশা আপনার প্রেমে পড়ছে। পবিত্র হওয়ার চক্করে আপনে এখন মশার ডাইনিং টেবিল হইয়া গেছেন!”
আজিজুল হক অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলেন, “পরের বার বিয়ের আগে দুধ দিয়ে গোসল নয়, বরং তিতা করলার রস দিয়ে গোসল করব। অন্তত মশা-মাছি আর অভিশপ্ত পরী— কেউই তিতার ভয়ে কাছে ঘেঁষবে না।”
প্রকৃতি বড্ড নীরব। তারপরও লতিফ সাহেবের সেই কথাটাই যেন বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল— “পাগল! এ গ্রামের সব কটাই পাগল!”
২০ জুলাই, ২০২৬

