পড়শী: পড়শীর পক্ষ থেকে জনাব ইকবাল বাহার চৌধুরীকে স্বাগত আজকের এই সাক্ষাৎকারে। জনাব চৌধুরী, আপনার জন্ম কোথায় ও কবে? ছেলে-বেলা কোথায় কাটিয়েছেন অর্থাৎ বেড়ে উঠেছেন কোথায়?
ইকবাল বাহার চৌধুরী: আমার জন্ম ১৯শে নভেম্বর, ১৯৪০ তারিখে কোলকাতায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পরিবারের সাথে ঢাকায় আসি।
পড়শী: শিক্ষা জীবন কোথায়?
ইকবাল বাহার চৌধুরী: শিক্ষা জীবন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরীজ হাই স্কুল, তারপর ঢাকা কলেজ। ১৯৬০ দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বি.এ. অনার্স ও এম.এ. ডিগ্রী শেষ করেছি।
পড়শী: আপনার পরিবার, বাবা-মা, ভাই-বোন সম্পর্কে জানতে চাই।
ইকবাল বাহার চৌধুরী: বাবা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। ছোট বোন শামসুন নাহার মাহমুদের সাথে যৌথভাবে বিখ্যাত “বুলবুল” পত্রিকার সম্পাদনা করেন দেশ বিভাগের আগে। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে জেনেভা ও রোমে বিশ্বস্বাস্থ্য সম্মেলনের একাধিক অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কবি নজরুলের স্নেহভাজন ছিলেন এবং তাকে নিয়ে একাধিকবার চট্টগ্রামে যান এবং নিজেদের বাড়িতে থাকেন।
মা আনোয়ারা বাহার চৌধুরী। শিক্ষাবিদ, লেখিকা, রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ছাত্রী এবং পরে কোলকাতার ঐ স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। দেশ বিভাগের পরে ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী স্কুল, ঢাকার কামরুন্নেসা স্কুল ও বাংলা বাজার স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের Special Officer for women education হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। Soviet Union-এ Pakistan Cultural Delegation-এর Deputy Leader ছিলেন। ইরান ও ইরাকে পাকিস্তান সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের Deputy Leader ছিলেন।
বোন সেলিনা বাহার জামান লেখিকা, আবৃত্তিকার সংস্কৃতি অঙ্গনে সুপরিচিত, ইডেন কলেজে ও জগন্নাথ কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। Mathematics-এর প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। ঢাকা বেতার ও ঢাকা টেলিভিশনে দীর্ঘদিন বিভিন্ন অনুষ্ঠান করেছেন।
বোন শাহীন ওয়েস্টকম BUET-এর Architecture বিভাগের ১ম ব্যাচের ৩ জন ছাত্রীর একজন ছিলেন। পরে একই বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। জাপানে Kyoto University থেকে Architecture-এ M.A degree লাভ করেন। লন্ডনে Community Relations নিয়ে কাজ করায় রানী এলিজাবেথ তাকে Order of the British Empire (MBE) প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত করেন।
বোন নাসরিন শামস প্রায় চার দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে Physics-এর অধ্যাপক ছিলেন। বুলবুল একাডেমি থেকে প্রথম ব্যাচের রবীন্দ্র সঙ্গীতে সার্টিফিকেট লাভ করেন। ঢাকায় টিভি চালু হলে গোড়া থেকেই সেখানে সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন দেশে পাকিস্তান সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সদস্য। ঢাকা বেতার থেকে গান গেয়েছেন দীর্ঘকাল।
বোন তাজীন চৌধুরী ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। টিভি আর বেতারে বহু বছর সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ইরান ও ইরাকে পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। বুলবুল একাডেমিতে গান শেখেন ও সার্টিফিকেট লাভ করেন।
পড়শী: আপনি কি প্রথমেই সাংবাদিকতা বা রেডিওতে আসেন না কি তার পূর্বে অন্য কোন পেশায় ছিলেন?
ইকবাল বাহার চৌধুরী: আমি রেডিওতে প্রথম যোগ দেই ১৯৪৯ সালে। স্কুলের নীচু ক্লাসে থাকাকালীন সময়ে বাচ্চাদের নাটক, কবিতা আবৃত্তি, সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি। পরে ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র থাকার সময় নিয়মিত বেতার নাটকে বড়দের অনুষ্ঠানে অংশ নেই। ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র থাকার সময় থেকেই রেডিওতে বাংলা খবর পড়া শুরু করি। সেই সময় ঢাকায় ইংরেজি থেকে বাংলায় খবর তরজমা করে পড়া হত। এটা ছিল বেশ কঠিন কাজ।
আরও পরে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে ঢাকায় পাকিস্তান টেলিভিশনের পাইলট স্টেশন চালু হয়। তিন মাসের জন্য। তখন সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করি। তিন মাস পর টেলিভিশন স্থায়ীভাবে চালু করে পাকিস্তান সরকার ঢাকা ও লাহোরে। সেই থেকে সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে নিয়মিত কাজ করি।
টেলিভিশনের কাজ ছিল সন্ধ্যেবেলা থেকে রাত পর্যন্ত। সংবাদ উপস্থাপন শেষ হওয়া পর্যন্ত। আমি দিনের বেলা ফুলটাইম সারাদিন business executive হিসেবে কাজ করেছি Adamjee Group of Company-তে। আমার অফিস ছিল Adamjee Court-এ।
পড়শী: আপনি কিভাবে ও কত সালে VOA তে যোগদান করেন ও কত বৎসর ছিলেন?
ইকবাল বাহার চৌধুরী: আমি ওয়াশিংটনে VOA বাংলা বিভাগে যোগ দেই ১৯৭৩ সালের গোড়ার দিকে। অবসর গ্রহণ করি ২০১০ সালে। এই দীর্ঘ প্রায় চার দশক আমি ওয়াশিংটন ও নিউইয়র্ক সহ এ দেশের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি আমেরিকান ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। নানা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান কভার করেছি।
পড়শী: VOA তে থাকাকালীন আপনি নিশ্চয় অনেক বিশ্ববরণ্যে ব্যক্তিত্বদের সাক্ষাতকার নিয়েছেন। তন্মধ্যে কার সাক্ষাতকার আপনার নিকট আকর্ষনীয় ও স্মরনীয় হয়ে আছে? এবং কেন?
ইকবাল বাহার চৌধুরী: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানকারী নেতৃবৃন্দের সাক্ষাতকার নিয়েছি। এদের মধ্যে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জেনারেল জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া, এরশাদ, শেখ হাসিনা, ফখরুদ্দিন আহমেদ সহ বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ। বিভিন্ন সময়ে ওয়াশিংটন ও বাংলাদেশের এইসব সাক্ষাৎকার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগে ঢাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশ ও বাংলাদেশ আন্দোলনের নানান ঘটনার ওপর টিভি রিপোর্ট উপস্থাপন করেছি।
পড়শী: এখন কিভাবে আপনি সময় কাটাচ্ছেন?
ইকবাল বাহার চৌধুরী: দীর্ঘকাল বাংলা বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন শেষে VOA থেকে অবসর নেয়ার পর আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় আয়োজিত বাংলাদেশ সম্মেলনে অংশ নিয়েছি। Bangladesh Association of America Inc.-এর প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। তিনটি পুস্তক রচনা করেছি। বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সভা, সমিতি ও সম্মেলন আয়োজনে যুক্ত থেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি।
পড়শী: বাংলাদেশের বতর্মান রাজনৈতিক অবস্হা সম্পর্কে আপনার কি বক্তব্য বা অভিমত?
ইকবাল বাহার চৌধুরী: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পরিবর্তন ও নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, সংসদ অধিবেশন হয়েছে, বাজেট পাস হয়েছে। সমস্যা অনেক, তারমধ্যেই নতুন করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা সফল হবে – এটাই সকলের কামনা।
পড়শী: জনাব চৌধুরী আপনাকে আবারো ধন্যবাদ পড়শীকে সময় দেওয়ার জন্য। ভবিষ্যতে আশা করছি একইভাবে পড়শীদের সাথে ও পাশে থাকবেন।
৫ জুলাই, ২০২৬
পড়শীর পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ...

হিউস্টন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র
বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত বই – ‘গোধূলির ছোঁয়া’ ও ‘প্রতিবিম্বের কাছাকাছি’। প্রকাশিত ছোট গল্পের ই-বুক – “যা কিছু গল্প হয়ে রয়”।


