পড়শী নিয়মিত কলাম আগস্ট তবুও অগাস্ট নয়

আগস্ট তবুও অগাস্ট নয়

Post Views: 15
10 min read

বাংলায় আগস্ট লিখলেও, ইংরেজি বানান অনুযায়ী এটি আসলে অগাস্ট (August)। এটি কেবল ইংরেজি পঞ্জিকার অষ্টম মাসের নাম নয়, বিশেষণ হিসেবে এই অগাস্ট শব্দের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে মহান বা সম্মানিত। রোমান সম্রাট অগাস্টাস সিজারের নাম অনুসারে এই মাসটির নামকরণ করা হয় আর এই অগাস্টাসের অর্থও হচ্ছে বিপুল ভাবে সম্মানিত, শ্রদ্ধেয় বা ভক্তিভাজন। কিন্তু বাঙালির কাছে মাস হিসেবে আগস্টকে নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। কালক্রমে আগস্ট যেন আমাদের কাছে একটি অভিশপ্ত মাস হয়ে উঠছে। সে কেবল এই কারণে নয় যে ১৯৪১ সালের এই মাসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে আমরা হারিয়েছি এবং ১৯৪৫ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকেও আমরা হারাই এই আগস্ট মাসেই।

সকল মৃত্যুই বেদনাদায়ক অবশ্য কবিগুরুর মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক, বয়সজনিত ব্যাধিতে তিনি মৃত্যু বরণ করেন তবে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী; ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ় এবং নিরাপস তাই তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্টে জাপান-শাসিত তাইওয়ানে একটি বিমান দুর্ঘটনায় আগুনে দাহ হয়ে সুভাষচন্দ্রের মৃত্যু হয়েছিল বলে মনে করা হয়। সেটিও এই আগস্ট মাসের আরেকটি বেদনা যখন জাতি এই স্বাধীনতা সংগ্রামীকে হারায়। নেতাজির এই মৃত্যুকে নিয়ে রহস্য আছে অনেক, বিতর্কও রয়েছে কিন্তু সাধারণ ভাবে এই দিনটিকেই তাঁর নিহত হবার দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। আগস্টের বেদনার সূত্রপাত সেই তখন থেকেই। কিন্তু বাঙালির ভাগ্যে আগস্টের বেদনা কিংবা বিভ্রান্তির এখানেই শেষ নয়।

বাঙালির জন্য আগস্ট মাস একটি বড় রকমের বিভ্রান্তির মাসও। যদিও বাহ্যত ভারত এই আগস্ট মাসে স্বাধীনতা অর্জন করে কিন্তু তথা-কথিত দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতের এই বিভাজন জাতি সম্পর্কে একটি নতুন ও ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দেয়। হিন্দু ও মুসলমান পৃথক জাতি নয়, পৃথক ধর্মাবলম্বী। ধর্মের পার্থক্যের কারণে জাতি কিংবা জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্টি হতে পারে না। জাতির সংজ্ঞা ধর্মীয় আবর্তে আবদ্ধ নয় কখনই। অথচ পাকিস্তানের স্রষ্টা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, যিনি ব্যক্তিক জীবনে ধার্মিক ছিলেন না আদৌ, তিনি তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থ অর্জনের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে বহু আগের দেয়া দ্বিজাতিতত্ত্বকে পূনর্জিীবিত করেন।

এই ভ্রান্ত ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী দ্বিজাতিতত্ত্বের সঙ্গে সহমত পোষণ করেনি তদানীন্তন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কিন্তু সমর্থন দিয়েছিল আরেকটি মৌলবাদী দল, রাষ্ট্রীয় সেবক সংস্থা বা আর এস এস কারণ তারা চাইছিল ভারতকে একটি পূর্ণাঙ্গ হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে এবং সেই লক্ষ্য মাথায় রেখে তারা ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীকে হত্য করে। তবে তাদেরই অনুগামী দল বিজেপি এখন ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারেনি এখনও, সম্ভবত পারবে না কোন দিনও কারণ ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো ৭৯ বছরের পুরোনো এবং ভারত কোন দিনও সেই কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসেনি।

সে জন্যই সম্ভবত ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার মহাত্মা গান্ধীকে কখনই খাটো করেনি কিংবা তাঁকে কেবল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পার্টির নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেনি। বাংলাদেশে ঘটনাটি সম্পূর্ণ বিপরীত। যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারিয়েছে, তখনই বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা চলেছে। ১৯৪৭ সালের আগস্টের সেই কথিত দ্বিজাতিতত্ব এখনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-বিরোধীদের মূল মন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভ্রান্তি বিলাসে পাকিস্তান পন্থিরা এখনও মনে করে যে হিন্দু ও মুসলমান ভিন্ন ভিন্ন জাতি। জাতি তত্ব সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা এই আগস্টকে আরও কলুসিত করে।


আগস্টের সব চেয়ে করুণ এবং বেদনাদায়ক ঘটনা হচ্ছে ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির জনকের হত্যা বাঙালী জাতির জন্য লজ্জাজনক বিষয়। আজও গোটা ঘটনাকে কল্পনাতীত বলে মনে হয়। তবে ওই ঘটনা যে তাৎক্ষণিক কোন বিষয় ছিল না, ছিল পূর্ব পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত ঘটনা সে কথা এখন বলাই বাহুল্য। এ যে কেবল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার বিষয় ছিল তাই-ই নয়, বিষয়টি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ থেকে বাঙালিকে বিচ্ছিন্ন করে পাকিস্তানি চিন্তা ধারা পুণঃপ্রতিষ্ঠিত করা। ১৫ই আগস্টেরই অনেকখানি পূণরাবৃত্তি ঘটানো হয় ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ।

এবার সেনাবাহিনীকে দিয়ে নয়, কিছু শিক্ষার্থীকে অপতথ্য দিয়ে একটি কথিত আন্দোলনের সূচনা করা হয়। আন্দোলনের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছিল কোটা পদ্ধতি বাতিল করা এবং সেই কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছিল ২০১৮ সালেই তবে এর বিরুদ্ধে মামলা চলছিল উচ্চ আদালতে । সেখানেও সরকার কোটা পদ্ধতি বাতিলের পক্ষেই আবেদন জানিয়েছিল কিন্তু তারপরও এই আন্দোলন অব্যাহত রাখা হয় কারণ কোটা পদ্ধতি বিলুপ্ত করার দাবিটি ছিল সাধারণ মানুষের চোখে ধূলো দেয়ার একটি কৌশল।

শেষ অবধি আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানো হয়। আন্দোলনের মাধ্যমে যে কোন সরকারের পতন ঘটানোর দৃষ্টান্তও খুব একটা ব্যতিক্রমী নয় কিন্তু ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোর পেছনের উদ্দেশ্য ছিল ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার মতোই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিকে পুণঃস্থাপন করা। ৫ই আগস্ট পর তাইতো দেখতে পাচ্ছি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী নানান ন্যারেটিভ চলছে। প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ ভাবে তখন থেকে মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তান ভাঙ্গার ভারতীয় ষড়যন্ত্র বলে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় তখন বস্তুত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অবমূল্যায়ন করা হয়।

আগস্টের রয়েছে আরও কষ্টকথা। সারা দেশে জঙ্গি হামলার প্রতিবাদে ২১শে আগস্ট ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ যে জনসভার আয়োজন করে তাতে ২৪ জন নিহত হন এবং তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ লোক আহত হয়। এই হামলায় নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নারী নেত্রী মিসেস আইভি রহমান অন্যতম ব্যক্তি। আগস্টের এই ঘটনা সেই অভিন্ন উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়েছিল। আর সেই উদ্দেশ্য হচ্ছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত দল ও ব্যক্তিকে একেবারে প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যাতে বাংলাদেশেরই কতিপয় লোক ও গোষ্ঠী দ্বারা পাকিস্তানের ইচ্ছের বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।

বার বার সেই ১৯৪৭ সালের কথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষয়টি সুকৌশলে এবং সুক্ষ ভাবে উঠে আসছে যেখানে জাতিকে ধর্মীয় লেবাসে তুলে ধরা হচ্ছে। ভারত-বিরোধীতা ও হিন্দু-বিরোধীতার মধ্যে একটি অযৌক্তিক সমীকরণ সাধন করা হচ্ছে যেখানে দ্বিজাতিতত্ত্বের সেই ভুল ব্যাখ্যাকে কাজ লাগানোর প্রয়াস লক্ষ্য করছি। জনগণকে এই ভুল তত্ত্বটি বোঝানো সম্ভব হলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতাকে বিনাশ করা সম্ভব হবে। এখনও দেখি ফেইসবুকে কেউ কেউ লেখেন ১৯৭১ সালে ভারত পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলার লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ করেছিল। এই ন্যারেটিভের অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রধান নয়, প্রধান বিষয় হচ্ছে পাকিস্তান ভাঙা। তবে যারা এ সব কথা বলেন তাঁরা কি এই সহজ সত্যটা বোঝেন না যে পাকিস্তান না ভাঙলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো কি ভাবে!

ভারতের নিজস্ব একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনেতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট লক্ষ্য ছিল নিশ্চয়ই কিন্তু ভারত আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ করতে যায়নি। বাংলাদেশের মানুষের উপর তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ায় ভারত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং সেই সহায়তায় সামরিক বিষয়টি থাকলেও, প্রধান বিষয়টি ছিল মানবিক সাহায্য। স্মরণ করা যেতে পারে যে ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান নিজেই যখন ভারত আক্রমণ করে কেবল তখনই তা ভারত- পাকিস্তান প্রত্যক্ষ যুদ্ধের রূপ নেয়। তবে বাংলাদেশ প্রান্তে ভারত এসেছিল জোট বাহিনী হিসেবে।

পাকিস্তান এটিকে বার বার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে অভিহিত করার চেষ্টা করেছে এবং বলেছে যে ১৯৭১ সালে ভারত পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলকে দখল করে নেয়। কিন্তু অচিরেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশের নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং ভারতীয় সৈন্যও ১৯৭২ সালের মার্চ মাসেই বাংলাদেশ ত্যাগ করে। এই সব সত্যকে আড়াল করতেই ৫ই আগস্টের পরিবর্তনের মাধ্যমে যে সংস্কারের কথা বলানো হচ্ছে, সংবিধান পরিবর্তনের যে দাবি উঠছে তার প্রধান কারণ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সেই স্বাধীনতার যে সব আদর্শ বাংলাদেশের সংবিধানে লিপিবদ্ধ রয়েছে সেগুলোকে মুছে ফেলা।

আসলে পাঁচ কিংবা পনেরো, অথবা একুশে আগস্ট যাই বলুন না কেন, আগস্ট মাস কোন বাঙালীর জন্য অগাস্ট নয় মোটেই, নয় কোন বিশেষ ভাবে মহান কোন মাস। এই মাসের আদি নামকরণের সকল গৌরবকে ধূলিস্মাৎ করেছে আগস্টের অগণিত বিয়োগান্তক ঘটনা।

১০ আগস্ট, ২০২৬

ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র

গবেষক, লেখক এবং বিবিসি ও ভয়েস অফ আমেরিকার প্রাক্তন বেতার সাংবাদিক। স্বনামে ও ছদ্ম নামে দেশ বিদেশের পত্রপত্রিকায় অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।