একসময় বাড়ি ছিল একটি ঠিকানা। এখন বাড়ি একটি সময়।
এই কথাটা ছোটবেলায় বুঝতাম না। তখন বাড়ির অর্থ ছিল খুব সহজ, খুব নিরেট। স্কুলের ফর্মে ঠিকানার ঘরে যা লিখতাম, সেটাই ছিল বাড়ি। বাসার নম্বর, গলির নাম, পোস্ট অফিস সব মুখস্থ ছিল। ঘুমের মধ্যেও বলে দিতে পারতাম।
বাড়ি মানে ছিল দেয়ালের সেই ছোট্ট ফাটল, যেটা প্রতি বর্ষায় একটু একটু করে বড় হতো। দরজার কাঠে পেন্সিলের দাগ, প্রতি জন্মদিনে বাবা দাঁড় করিয়ে উচ্চতা মাপতেন, তারপর হাসতে হাসতে বলতেন, গত বছরের চেয়ে বেড়েছে তো? আলমারি খুললেই ন্যাপথলিন আর পুরোনো শাড়ির মিশে যাওয়া যে গন্ধটা নাকে আসত, আজও এ অনুভূতির কোনো নাম খুঁজে পাইনি।
তারপর একটু বড় হলাম। তখন বুঝলাম, ইট-কাঠ আসলে বাড়ি না। ইট-কাঠ শুধু বাড়ির খোলস।
বাড়ি ছিল রান্নাঘর থেকে মায়ের ডাক। দুইবার ডাকতেন। প্রথমবার নরম গলায়, দ্বিতীয়বার একটু ঝাঁঝ মিশিয়ে –“কতবার ডাকব?” আমি জানতাম দ্বিতীয় ডাকের পর আর দেরি করা যাবে না, তাও করতাম, কারণ ওই ঝাঁঝটাও ভালো লাগত।
বাড়ি ছিল বিকেলের আজান, রিকশার ঘণ্টার সাথে মিশে যাওয়া। বাড়ি ছিল সারাদিনের রোদে পোড়া মাটিতে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার গন্ধ, পৃথিবীর কোনো পারফিউম কোম্পানি আজও ওই গন্ধটা বোতলে ভরতে পারেনি। আর বাড়ি ছিল বিদ্যুৎ চলে যাওয়া সন্ধ্যাগুলো। পুরো পরিবার বারান্দায়। বাবার হাতে হাতপাখা, মা কোনো এক পুরোনো আত্মীয়ের গল্প শুরু করেছেন যেটা আমরা সবাই আগে শুনেছি, তবু কেউ থামাচ্ছে না। কারও কোনো তাড়া নেই। কোথাও যাওয়ার নেই। ওই সময়টার কোনো দাম ছিল না তখন, কারণ ওটা অফুরন্ত মনে হতো।
আমি বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। এই একটা বাক্য দিয়ে আমার জীবনের প্রায় সবকিছু ব্যাখ্যা করা যায়। আত্মীয়স্বজন কম শোনায়নি— মেয়ে তো, বিয়ে হয়ে গেলে পরের ঘরে চলে যাবে, তোমাদের কী থাকল? বাবা প্রতিবার একই উত্তর দিতেন, খুব শান্তভাবে, আমার ছেলে-মেয়ে দুইটাই এই একজন, তখন গর্ব লাগত। এখন বুঝি, ওই বাক্যটা আমার কাঁধে চুপচাপ একটা ভার তুলে দিয়েছিল, যেটা আমি সারাজীবন বহন করব— আর অভিযোগও করতে পারব না, কারণ ভারটা ভালোবাসার।
তারপর একদিন বিমানবন্দর—
মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরে বিদেশ যাওয়া কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত না, ওটা একটা সমষ্টিগত বিনিয়োগ। টিকিটের টাকা কোথা থেকে এল, কে ধার দিল, কার জিনিস বিক্রি হলো— এসব হিসাব আমি জানি। পুরো পাড়া জানত আমি যাচ্ছি। কেউ দুয়া দিল, কেউ বলল “ভাগ্য ভালো”, কেউ চোখ সরিয়ে নিল।
বিদায়ের সময় আমি একবার পেছনে তাকিয়েছিলাম। শুধু একবার। বাবা দাঁড়িয়ে আছেন, হাতটা আধা তোলা— নাড়ছেন না, শুধু তুলে রেখেছেন, যেন নামাতে ভুলে গেছেন। মা আঁচল মুখে চেপে ধরে আছেন, কারণ আমার সামনে কাঁদবেন না বলে ঠিক করেছিলেন। ওই দৃশ্যটা আমি কোনো ছবিতে রাখিনি। রাখার দরকার হয়নি। ওটা এখনো, আট বছর পরেও, আমার চোখের ভেতরে জ্বলজ্বল করে।
সেদিন লাইনে দাঁড়িয়ে আমি একটা কথা বুঝিনি, যেটা পরে ধীরে ধীরে বুঝেছি— ভালোবাসার হিসাবের একক কীভাবে বদলে যায়। এরপর থেকে ভালোবাসা মাপা হতে লাগল- মাস শেষে পাঠানো টাকায়। বাবার ওষুধের বিলে। কে কার বিয়ে দিচ্ছে, কার ভর্তির টাকা লাগবে, কার ঘরের চাল বদলাতে হবে— এইসব হিসাবে। কেউ আমাকে সরাসরি কিছু বলে না, বলতে হয় না— আমি নিজেই বুঝে যাই।
প্রবাসে এসে একটা জিনিস শিখেছি— স্মৃতি সব সময় চোখ দিয়ে আসে না, কখনো কখনো সে নাক দিয়ে ঢুকে পড়ে। একদিন এখানে রান্না করছিলাম। শুকনো মরিচ গরম তেলে পড়ল, আর ধোঁয়াটা নাকে ঢুকতেই আমি হঠাৎ চৌদ্দ বছরের হয়ে গেলাম। স্কুল থেকে ফিরেছি, ব্যাগ মেঝেতে ফেলে সোজা রান্নাঘরে, মা কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ছেন, আমাকে না তাকিয়েই বলছেন, “হাত ধুয়ে আয়”। পুরো দৃশ্যটা এক সেকেন্ডের জন্য এত সত্যি হয়ে গেল যে আমি চুলার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদলাম। কেন কাঁদছি নিজেও জানি না। রান্না শেষ করে খেলাম, বাসন ধুলাম, ঘুমাতে গেলাম। কাউকে বললাম না। প্রবাসের কষ্টগুলো এমনই বিশাল কিছু না, তুচ্ছ একটা গন্ধ এসে বুকে ধাক্কা মেরে চলে যায়, আর তুমি স্বাভাবিক মুখ করে বাসন ধুতে থাকো।
আট বছরে দেশে গিয়েছি একবার—
মানুষ শুনে অবাক হয়। “একবার মাত্র?” আমি হাসি। ব্যাখ্যা করি না। কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে বলতে হয়— একটা টিকিটের দাম মানে দেশে একটা পরিবারের কয়েক মাসের খরচ। ছুটি মানে শুধু ছুটি না, ছুটি মানে ঝুঁকি। চাইলেই সব করা যায় না। এই কথাটা আমি মুখে বলি না— প্রতিদিন বেঁচে থাকি।
আর যেবার গেলাম, সেবার একটা অদ্ভুত জিনিস হলো—
গলিটা যেন ছোট হয়ে গেছে। যে দোকান থেকে চিপস কিনতাম, সেটা এখন মোবাইল রিচার্জের দোকান। যে ছেলেটা আমার পিছু পিছু ঘুরত, তার এখন দাড়ি, কোলে বাচ্চা, আমাকে “আপা” ডেকে সালাম দিল। মায়ের চুল আমি ভিডিও কলে যতটা সাদা দেখতাম, সামনে দেখলাম তার চেয়ে বেশি। বাবা সিঁড়ি ভাঙার সময় এখন হাত রাখেন দেয়ালে। এইটা আমাকে সবচেয়ে বেশি লেগেছিল— বাবা দেয়ালে হাত রাখছেন, আর আমি এতদিন জানতামই না।
সবাই খুব খুশি হয়েছিল। রান্না হয়েছিল, লোক আসছিল, আমার নাম ধরে ডাকছিল অনেক মানুষ। আর তৃতীয় দিন সকালে চায়ের কাপ হাতে কেউ একজন খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, “তো, কবে আবার চলে যাবা?”
কেউ খারাপ ভেবে বলে না। এটা নিছক একটা প্রশ্ন, ফ্লাইটের তারিখ জানার প্রশ্ন। কিন্তু ওই প্রশ্নটা একটা কাজ করে— নিমেষে তোমাকে ‘আমাদের একজন’ থেকে ‘অতিথি’ বানিয়ে দেয়। তুমি নিজের ঘরে বসে আছ, নিজের মায়ের রান্না খাচ্ছ, আর তোমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে তোমার একটা ফিরতি টিকিট আছে।
তারপর ফিরে এলাম। আবার বিমানবন্দর, আবার লাইন। ইমিগ্রেশনের অফিসার পাসপোর্টে সিল মেরে বলল, “Welcome back.” অফিসে ফিরলে সহকর্মী বলল, “Welcome back! How was the trip?” এরা কেউ ভান করছে না, এদের আন্তরিকতা সত্যি। আমি হাসি, ধন্যবাদ বলি, ছবি দেখাই দুয়েকটা। আর মনের ভেতরে খুব চুপিচুপি একটা প্রশ্ন ঘোরে— ফিরে এলাম, কিন্তু কোথায়? ঈদের সকালটা সবচেয়ে কঠিন। এখানে ঈদ মানে অনেক সময় একটা কর্মদিবস। আমার ছোট্ট রুটিনটা প্রতি বছর একই থাকে- একটা ভিডিও কল। ছোট একটা স্ক্রিনে দেখি উঠান, দেখি মানুষের ভিড়, শুনি হইচই। মা ক্যামেরাটা এদিক-ওদিক ঘোরান, “দেখ, দেখ, কে আসছে দেখ।” আমি দেখি। আমি হাসি। কল কেটে যাওয়ার পর ঘরটা এত নিঃশব্দ হয়ে যায় যে কানে লাগে। বছরের সবচেয়ে জোরে বাজে নীরবতা ওইটা।
আজও কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, “বাড়ি কোথায়?”— আমি কোনো শহরের নাম বলতে পারি না। কারণ আমার বাড়ি এখন কোনো মানচিত্রে নেই। সেটা রয়ে গেছে এমন এক বিকেলে, যেখানে বিদ্যুৎ নেই, বারান্দায় বসে আছি, বাবার হাতপাখার আওয়াজ, মায়ের গল্প, দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে, আর আমি তখনও জানি না, একদিন এই সাধারণ মুহূর্তগুলোর নামই হবে “বাড়ি”।
প্রবাস জীবনের দাম নিয়ে মানুষ যা বলে— দূরত্ব, একাকীত্ব, শীত, ভাষা – সেসব সত্যি, কিন্তু ওগুলো আসল দাম না। আসল দাম হলো সময়। দূরত্ব টাকা দিয়ে কেনা যায়, একটা টিকিট কাটলেই কয়েক ঘণ্টায় দূরত্ব মুছে যায়। কিন্তু হারানো সময় কেনা যায় না। যে দিনটা আমি মিস করেছি, ওটা আর পুষিয়ে দেওয়ার কোনো উপায় নেই।
আমরা যেন দুই জায়গার মাঝখানে ঝুলে থাকা মানুষ। দেশে গেলে সবাই জিজ্ঞেস করে, “কবে আবার চলে যাবা?” এখানে ফিরলে সবাই বলে, “Welcome back”— দুটোই আদরের কথা। তবু আমার মনে হয়, দুটোই আমাদের একটু করে বাইরের মানুষ বানিয়ে দেয়।
হয়তো প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় পরিচয় এই নয় যে তারা দেশ ছেড়েছে। বরং তাদের কাছে ‘বাড়ি’ আর কোনো স্থান নয়; বাড়ি হয়ে ওঠে একটি অনুভূতি, একটি সময়, একটি গন্ধ, কিছু কণ্ঠস্বর, আর এমন কিছু মুহূর্তের সমষ্টি, যেখানে ফিরে যাওয়ার জন্য পৃথিবীর কোনো বিমানবন্দরে আর কোনো ফ্লাইট ছাড়ে না।

