শতবর্ষে পুডভকিনের ‘মাদার’

শৈবাল চৌধুরী
May 17, 2026
14 views
24 mins read

চলচ্চিত্রের প্রথম তিন দশকে এমন কিছু কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল, যেগুলো সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের মর্যাদা পেয়ে গেছে। আইজেনস্টাইনের ব্যাটলশিপ পটেমকিন, গ্রিফিথের লুইজিয়ানা স্টোরি, ফ্ল্যাহার্টির নানুক ট্রিলজি, চ্যাপলিনের দি কিড, দি গোল্ড রাশ, দভঝেঙ্কোর দি আর্থ এবং পুডভকিনের মাদার — এসব ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

চলচ্চিত্র চর্চা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে উপরিউক্ত চলচ্চিত্রগুলো পাঠ্য চলচ্চিত্র রূপে অপরিহার্য হয়ে রয়েছে আজও। এবং এসব ছবির প্রাসঙ্গিকতাও এতটুকু হ্রাস পায়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ছবিগুলোর সবকয়টিই নির্বাক। ছবিগুলির বেশ কয়েকটি শতবর্ষ অতিক্রম করেছে সগৌরবে।

চলতি বছর, ২০২৬ সালে শতবর্ষে পদার্পণ করলো কিংবদন্তী চলচ্চিত্র— মাদার। মাদার তৈরি হয়েছিল ১৯২৬ সালে। মহান লেখক ম্যাক্সিম গোর্কির কালজয়ী উপন্যাসের শাশ্বত চিত্ররূপ দিয়েছিলেন মহান চলচ্চিত্রকার ভসেভোলোদ পুদভকিন। অসাধারণ দুই প্রতিভাধরের অনন্য সৃজনশীলতার গুণে ১৯২৬ সালে নির্মিত হয়েছিল সর্বকালের স্মরণীয় এই চলচ্চিত্র।

চলচ্চিত্রের জন্ম মার্কিন দেশে হলেও তার ভাষা, ব্যাকরণ ও প্রকাশভঙ্গি রচিত হয়েছে তৎকালীন সোভিয়েত দেশে। মূল কারিগরেরা ছিলেন  কুলেশভ, পুদভকিন, আইজেনস্টাইন, ভের্তভ, দভঝেঙ্কো। এরা একের পর এক ধ্রুপদী চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের ভাষা বিনির্মাণ করে গেছেন। মাদার এসব ছবির মধ্যে অন্যতম।


বিশ্বের প্রায় সবকটি ভাষাতে অনুদিত ম্যাক্সিম গোর্কির অমর উপন্যাস – মাদার দেশে দেশে নিপীড়িত জনতার অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে সাহস ও বিশ্বাস জুগিয়ে গেছে অবিচল। বিপুলা পৃথিবীর নানা প্রান্তে এই মাদারকে অবলম্বন করে রচিত হয়েছে প্রচুর নাটক, গাথা, গান ও চলচ্চিত্র। নানান ভাষায়,নানান আঙ্গিকে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মাদার। দেশকাল জাতি ভাষা সব কিছুর উর্ধ্বে আজ প্রতিষ্ঠিত কালজয়ী মাদার। সেই মাদারকে অবলম্বন করে পুডভকিন নির্মাণ করেছিলেন বিশ্বচলচ্চিত্রের এক অসামান্য সৃষ্টি।

মাদার পুডভকিনের প্রথম কাহিনীচিত্র। নির্বাক এই ছবিটি সম্পর্কে চলচ্চিত্রবিদ রজত রায় বলেছেন, ‘১৯০৫-এর পটভূমিকায় রচিত গোর্কির শিথিল গঠন উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্যকার নাথান জার্খি যেভাবে একটি ঋজু ও ক্লাসিক গঠনের চিত্রনাট্য দাঁড় করিয়েছিলেন তা চলচ্চিত্রের দিক থেকে ছিল সম্পূর্ণভাবেই উপযুক্ত। মাদার ছবির মূল থিম ছিল নিপীড়িত শ্রমজীবী শ্রেণির একজন দরিদ্র নিরক্ষর মায়ের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ। নিজের সন্তানের বিপ্লবী ক্রিয়াকলাপের  প্রভাবে এই মা হয়ে  ওঠেন একজন সক্রিয় বিপ্লবী কর্মী। ছবির থিমটিকে গড়ে তোলা হয়েছিল অত্যন্ত সরল রীতিতে এবং এর প্রধান আবেদন দর্শকের বুদ্ধির কাছে না রেখে রাখা হয়েছিল তার হৃদয়ের কাছে। ছবিটির মানবিক আবেদন আবেগ ও কাব্যসুষমা পুদভকিনকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে বিপুল খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা এনে দেয়।’

নাথান জার্খি রচিত মাদারের অসাধারণ চিত্রনাট্যের মূল বিষয় – একজন মায়ের বিপ্লবে অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট। মায়ের মানসিক পরিবর্তন আর বিক্ষোভ মিছিলে মৃত্যুর হাতে তাঁর ইচ্ছাবিরুদ্ধ আত্মসমর্পণকে কেন্দ্র করে গল্লের এবং চরিত্র সমূহের আবহ আপন গতিতে এগিয়ে গেছে  মোট সাতটি পর্বে মাদার ছবির চিত্রনাট্যটি বিভাজিত। মূল উপন্যাসের সঙ্গে ছবির চিত্রনাট্যের কিছু পার্থক্য রয়েছে। ঐতিহাসিক ও সত্য কিছু ঘটনার ভিত্তিতে উপন্যাসের সঙ্গে চিত্রনাট্যের কিছু পার্থক্য ঘটানো হয়েছে। ১৯০৫ থেকে ১৯০৬ সালে তভেরা অঞ্চলে এসব ঘটনা ঘটে।

এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ছবির দ্বিতীয় পর্বে হরতাল সংগঠনের অসফল প্রচেষ্টা, একজন আন্দোলনকারীর হত্যাকাণ্ড এবং কারাগার বিরোধী বিক্ষোভের সম্পূর্ণ গল্পাংশটি রচনা করা হয়েছে। যেহেতু ছবিটি ছিল নির্বাক, সংলাপ ও প্রয়োজনীয় ধ্বনি ব্যবহারের মাধ্যমে ছবির বক্তব্য এগিয়ে নেবার সুযোগ এতে নেই। দৃশ্যজ বৈশিষ্ঠ্য ও উপকরণ সমূহ প্রয়োগের (Visual Details, Motives, Symbols, Effects) মাধ্যমে নির্বাক চিত্রনাট্যটি পরতে পরতে এগিয়ে গেছে চুড়ান্ত পরিসমাপ্তির দিকে। নাথান জার্খির দৃশ্যকাব্যিক ও মর্মস্পর্শী চিত্রনাট্যের প্রতিটি দৃশ্যকে অপরূপ কম্পোজিশনে চিত্রমূর্ত করে তুলেছেন আনাতোলি গেলোভনিয়া তাঁর ক্যামেরা যাদুতে। এবং চলচ্চিত্রের ভাষা ও ব্যাকরণের অসাধারণ প্রকাশ ঘটিয়েছেন পরিচালক পুদভকিন – জার্খির চিত্রনাট্যের সহায়তায়। মন্তাজ, মিজ অঁ সিন ও সম্পাদনার অনবদ্য নিদর্শন পুডভকিন রেখে গেছেন তাঁর এই কালজয়ী চিত্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্যে।

আখ্যান ও চরিত্রের মানবিক অনুভূতির বর্ণনা ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ডিটেইলসের চিত্রণ পুডভকিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রথম কাহিনীচিত্র মাদারে তাঁর এই বৈশিষ্ট্যের অনুপম সাক্ষ্য মেলে।

ভি. আই.পুদভকিন (১৮৯৩-১৯৫৩) সের্গেই মিখাইলোভিচ আইজেনস্টাইনের সমসাময়িক হয়েও তাঁর নির্মাণ শৈলীতে আইজেনস্টাইনের প্রভাব সচেতনতার সঙ্গে এড়িয়ে স্বতন্ত্র রীতি আবিষ্কার ও প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন আপন প্রতিভার জোরে। প্রাথমিক পর্যায়ে পুদভকিন চলচ্চিত্রের আরেক কালপুরুষ লেভ কুলেশভের কিছু কিছু পদ্ধতি, বিশেষ করে তাঁর সম্পাদনা রীতিকে কিছুটা অনুসরণ করতেন। তবে তাঁর নিজস্ব রীতি সম্পর্কে তিনি ছিলেন সজাগ। চলচ্চিত্রের ভাষা ও ব্যাকরণের প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি বুদ্ধির চাইতে আবেগকে স্থান দিতেন বেশি। তাঁর সৃষ্ট মন্তাজগুলো এর চরম দৃষ্টান্ত। যার অনেক উদাহরণ পাওয়া যায় মাদার ছবিতে। ফলে রাজনৈতিক ও সমাজসচেতক একটি চলচ্চিত্র হয়েও মাদার এক স্নেহময়ী জননী ও তাঁর স্নেহার্দ্র পুত্রের মানবিক এক কাহিনীচিত্র।


পুদভকিন ছিলেন রসায়ন শাস্ত্রে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। অধ্যয়ন শেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তিনি সেনাবাহিনীর রসায়নাগারে কাজ করতেন। ১৯২০ সালের ১ মে তিনি মস্কোর স্টেট ফিল্ম স্কুলে নিউজরিল ক্যামেরাম্যান ও অভিনেতা হিসেবে যোগ দেন। কিছুদিন পরে তিনি যোগ দেন লেভ কুলেশভের স্টেট স্কুল অব সিনেমাটোগ্রাফিতে। সেখানে কুলেশভের হাতে তাঁর হাতেখড়ি হয়। এরপর কিছু ছবির চিত্রনাট্য রচনা, কিছু ছবিতে শিল্পনির্দেশনা, কিছু ছবিতে অভিনয়, কিছু ছবিতে সম্পাদনার কাজের শেষে ১৯২৫ সালে স্বাধীনভাবে নির্মাণ করেন প্রথম চলচ্চিত্র – ‘মেকানিক্স অব দ্য ব্রেন ‘। এটি ছিল বিজ্ঞান ভিত্তিক একটি তথ্যচিত্র। এরপর দাবা খেলা নিয়ে ‘চেস ফেভার’ নামে কৌতুকধর্মী আরেকটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন তিনি। তারপর ১৯২৬ সালে প্রথম কাহিনীচিত্র  ‘মাদার’।


পুদভকিন বিশ্বাস করতেন, যেহেতু চলচ্চিত্র  মূলত একটি কারিগরি নির্ভর মাধ্যম, তাই কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োগ একে যান্ত্রিক করে তুলতে পারে। কাজেই বুদ্ধিবৃত্তির পাশাপাশি হৃদয়বৃত্তির ওপর জোর দিতেন বেশি। এ কারণে তাঁকে চলচ্চিত্রের কবি বলে অভিহিত করেছেন সমালোচক মহল। সহজ সরল রীতি ও অকপটে বলার ঢঙ ছিল পুদভকিনের রচনারীতি। প্রথম ছবি ‘মাদার’ থেকে শেষ ‘রিটার্ন অব দি ভাসিলি বরৃতানিকভ’ পর্যন্ত প্রতিটি ছবিতে তিনি অবলম্বন করে গেছেন তাঁর এই নির্মাণ আঙ্গিক। ছবির নির্মাণে  তিনি বেশি জোর দিতেন সম্পাদনার ওপর। জোর দিতেন নান্দনিক সৌষ্ঠবের ক্ষেত্রেও।


মানবিক আবেদনে ও অপরূপ কাব্যসুষমায় ঋদ্ধ ‘মাদার’ – পুদভকিনের সামগ্রিক সৃষ্টিকর্মের শীর্ষবিন্দু। এই কালজয়ী চলচ্চিত্র একাধারে যেমন একটি সুসংহত চিত্রকাব্য, যেমন চলচ্চিত্রের চর্চায় অবশ্যপাঠ্য একটি ধ্রুপদী চলচ্চিত্র, তেমনই দেশে দেশে নিপীড়িত জনতার আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে উজ্জীবনী শক্তিদায়ী এক চলচ্চিত্রদলিল যা দেশ-কাল-ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বের পরম মমতার এক সাংস্কৃতিক সম্পদ, বিশ্বচলচ্চিত্রের এক সম্ভ্রমময় গৌরবের ধন।

শতবর্ষ (১৯২৬-২০২৬) অতিক্রম করেও তাই গোর্কি-জার্খি-পুদভকিনের ‘মাদার’ তার শাশ্বত অধিষ্ঠান অক্ষুন্ন রাখতে পেরেছে সৎ শিল্পসৃষ্টির অভীষ্ট অর্জনের মধ্য দিয়ে।


মাদার – প্রাসঙ্গিক তথ্যাদি

নির্বাক চলচ্চিত্র, ১৯২৬, দৈর্ঘ্য ১০২ মিনিট, সাদা-কালো।

কাহিনী- ম্যাক্সিম গোর্কি, চিত্রনাট্য- নাথান জার্খি, সিনেমাটোগ্রাফি- আানাতোলি গোলোভনিয়া, শিল্পনির্দেশনা- সের্গেই কোজলেভস্কি, সঙ্গীত- (১৯৩৫ সালে সংযোজিত) এস.ব্লক, অভিনয়-ভেরা বারানোভস্কায়া (মা), এ.তসিস্তয়াকভ (বাবা), নিকলাই বাতালোভ (পাভেল), আলেকজান্ডার সেভিটস্কি (ফোরম্যান গার্ভোব), আন্না জেমৎসোভা (আন্না) এবং ভি.আই. পুদভকিন (পুলিশ অফিসার), প্রযোজনা- মেঝরাপোম স্টুডিও,মস্কো, পরিচালনা- ভসেভোলোদ ইলারিয়ানোভিচ পুদভকিন।


শৈবাল চৌধুরী | চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

চলচ্চিত্র নির্মাতা, সভাপতি- চট্টগ্রাম ফিল্ম ইনস্টিটিউট, অতিথি শিক্ষক (ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিস)- নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। নির্মিত চলচ্চিত্র ৬টি। প্রকাশিত গ্রন্থ ১১টি। একুশে সম্মাননা, শিল্পকলা একাডেমি পদক, চলচ্চিত্র সংসদ সুবর্ন জয়ন্তী পদক প্রাপ্ত।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

উচিৎ সাজা

Next Story

প্রেক্ষাগৃহের রুপালী সময় : একে একে নিভে যাওয়া আলো

Latest from রূপালি ফিতার গল্প

চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল-এর সাথে পড়শীর একান্ত সাক্ষাৎকার

তানভীর মোকাম্মেল কাহিনী ও প্রামাণ্যচিত্র মিলিয়ে মোট চব্বিশটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তানভীর ... সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ড. জাকিয়া আফরিন।

রূপালী পর্দার বিবর্তন

লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় প্যারিসে বাণিজ্যিকভাবে বায়োস্কোপ প্রদর্শনী শুরু করেন ১৮৯৫ সালের ২৮শে ডিসেম্বর। ... লিখেছেন কুবলেশ্বর ত্রিপুরা।

উচিৎ সাজা

এই শহরে এক সিনেমা হল ছিলো প্রায় ২০টির মতো। ভাঙাভাঙির পর আজ এসে দাঁড়িয়েছে একটিতে। ... লিখেছেন অনোয়ার হোসেন পিন্টু।