দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই সময়েই “মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স” ধারণাটির উত্থান ঘটে—যেখানে সামরিক বাহিনী, অস্ত্র উৎপাদনকারী কর্পোরেশন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীল সম্পর্কে আবদ্ধ। মূলত সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে এই কমপ্লেক্স শক্তিশালী হয়। যুদ্ধের সম্ভাবনা যত বাড়ে, অস্ত্র শিল্প তত লাভবান হয়—এমন একটি চক্র তৈরি হয়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির ভিত্তিমূল।
গত তিন দশকে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক যুদ্ধে জড়িয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ। ২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তানে অভিযান শুরু হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল আল-কায়েদাকে ধ্বংস করা এবং তালেবান সরকারকে অপসারণ করা। প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। হাজার হাজার মার্কিন সেনা নিহত হয় এবং লক্ষাধিক আফগান নাগরিক প্রাণ হারায়। অবকাঠামো ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা আফগান সমাজে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণ হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত তালিবান আবারও ক্ষমতা পেয়েছে।
২০০৩ সালে ইরাকে আক্রমণ ছিল আরও বিতর্কিত। গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ পরে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ও কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। লক্ষাধিক ইরাকি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়, এবং দেশটি দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। আইএসআইএস-এর মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থানও এই অস্থিতিশীলতার একটি ফলাফল হিসেবে দেখা হয়।
মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের “রেজিম চেঞ্জ” বা সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টাও লক্ষ্যনীয়। ইরান (১৯৫৩), চিলি (১৯৭৩), লিবিয়া (২০১১) ইত্যাদি উদাহরণে দেখা যায়, এসব হস্তক্ষেপের ফলে অনেক সময় স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা, গৃহযুদ্ধ এবং মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। এসব অঞ্চলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা এবং সহিংসতা বেড়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও এই সামরিক ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে প্রশ্নের মুখে পড়ে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম ধনী হলেও স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার খরচ সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অনেক নাগরিক স্বাস্থ্যবিমা ছাড়া থাকে, এবং উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে বিপুল ঋণের বোঝা বহন করতে হয়। একই সঙ্গে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। সামরিক খাতে বিপুল ব্যয়ের একটি অংশ যদি সামাজিক খাতে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হতে পারত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ মিলিয়ন মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বাস করে, যেটা প্রায় ইরাকের জনসংখ্যার সমান। এই সংখ্যা কমছে না বরং ধীরে ধীরে বাড়ছে।
এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিন ইজরায়েল আর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়। হামলার প্রথম দিনই দেড়শ শিশু নিহত হয় বোমার আঘাতে। ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। কিন্তু এই হুমকি কতটা তাৎক্ষণিক এবং যুদ্ধ কি একমাত্র সমাধান এই প্রশ্ন থেকেই যায়। অতীত অভিজ্ঞতা দেখায়, সামরিক হস্তক্ষেপ প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি করে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়। তাই ইরানের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সমাধান এবং সংলাপঅনেক বেশি কার্যকর হতে পারতো। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক বিষয়। একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখার যুক্তি রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে মানবিক ক্ষয়ক্ষতি, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সম্ভবনা। “মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স”-এর প্রভাব এই নীতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশ্বকে নিরাপদ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য এই নীতি পাল্টানো ছাড়া উপায় নেই। যেই বাস্তবতাতে এই নীতি নেওয়া হয়েছিল সেটা এখন আর নেই। যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ সমাজ এখন মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার (যেটা অনেক ক্ষেত্রেই খুবই বায়াসড) বদলে সোশাল মিডিয়া থেকে খবর সংগ্রহ করছে, যেটার কারণে যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয় তারা উপলব্ধি করছে অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি। ধীরে ধীরে মনোজগতে পরিবর্তন আসছে, সেই সঙ্গে বার্নি স্যান্ডার্স আর তাঁর সমমনা রাজনৈতিক নেতারা স্বাস্থ্যসেবা আর শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসাবে চিহ্নিত করে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ বছর আগেও এইসব প্রচারণাকে “কমিউনিজম” বলে প্রত্যাখ্যান করা হতো। কিন্তু বর্তমানে এগুলো মূলধারা রাজনীতির অংশ হয়ে গেছে এবং জনপ্রিয় হচ্ছে।
আমেরিকার তরুণ সমাজ আর বাদবাকি বিশ্ব অপেক্ষা করে আছে একটি মানবিক আমেরিকার জন্য।
২৫ এপ্রিল, ২০২৬

তাসনীম হোসেন | অস্টিন, টেক্সাস
কম্পিউটার প্রকৌশলী, কাজ করছেন আইবিএম কর্পোরেশনে। লেখালেখি মূলত বাংলা ব্লগ সচলায়তনে।
