এখন বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায় একটা ফিসফাস, ‘সময়টা খারাপ। খুব খারাপ’। গুঞ্জনটা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। ছাপিয়ে উঠছে নবীন-প্রবীণ, গ্রাম-নগর ও রাষ্ট্রের সীমানা। ‘কেন খারাপ?’ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা অসহায় আর্তনাদ ভেসে আসে, ‘ভবিষ্যতের মুখ তো দেখতে পাচ্ছি না! কোথায় যাচ্ছি আমরা?’ এ অনিশ্চয়তা সর্বজনীন হলেও তরুণদের মধ্যেই উদ্বেগটা বেশি। কারণ সময়ের মানচিত্রে ভবিষ্যৎ নামে যে-ভূখণ্ডটি চিহ্নিত হয়ে আছে সেখানে তো তারাই থাকবে। কিন্তু গন্তব্য শুধু নয়, তাদের যাত্রাপথটিও ক্রমে ঢেকে যাচ্ছে নানা শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার ঘন মেঘে। কে দেখাবে পথ? পথ যাদের দেখাবার কথা তারা ব্যস্ত নিত্যনতুন ঘৃণার চাষাবাদে ও অত্যাধুনিক রণসজ্জায়। নাগরিকদের সুশিক্ষার নিশ্চয়তা দূরে থাক, যার দুবেলা নিজ দেশের জনগণের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার মুরোদ নেই- সেও সাড়ম্বরে যুদ্ধবিমান কিনছে! গড়ে তুলছে অস্ত্রভাণ্ডার। ফলে ফুলেফেঁপে উঠছে যুদ্ধবাণিজ্য। ভারী হচ্ছে যুদ্ধবণিকদের পকেট। মজবুত হচ্ছে ঘৃণার কারবারিদের ক্ষমতার মসনদ।
তরুণরা কী চায়? যুদ্ধ, হানাহানি, ক্রমাগত ঘৃণার চাষাবাদ- কখনো জাতির নামে, কখনো ধর্মের নামে, আবার কখনো বর্ণ বা অন্য অজুহাতে? না, তারা এর কোনোটাই চায় না। যদি বিশ্বাস না হয়- রাশিয়া, ইউক্রেন, ইসরাইল ও ইরানের তরুণদের জিজ্ঞেস করুন। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দেয়ালের ভাষা পড়ুন। তারা জাতপাতের ধার ধারে না। তরুণ-হৃদয় চিরায়তভাবে ভালোবাসা দিয়ে গড়া; জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সর্বমানবের জন্য ভালোবাসা। তারা কোনো ভেদাভেদ চায় না। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহুর মতো কাউকে মুছে ফেলতে চায় না পৃথিবীর বুক থেকে। কিন্তু যুদ্ধবণিক ও ঘৃণার কারবারিরা পরিকল্পিতভাবে তাদের ক্রমাগত ঘৃণা-বিদ্বেষ, যুদ্ধ ও হানাহানির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিভাজিত করছে নানাভাবে। অর্থ দিয়ে অস্ত্র দিয়ে রক্তের নেশায় উন্মত্ত করে তুলছে তাদের। অথচ তরুণদের চাওয়া খুব বেশি নয়। তারা কাজ চায়, সচ্ছলতা চায়, চায় মর্যাদাপূর্ণ নিরাপদ একটি ভবিষ্যৎ।
সেই বাস্তবতা বোঝার জন্য খুব বেশি দূর যেতে হবে না। ঢাকার সংবাদপত্রে সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনেই তার পিলে চমকানো পূর্বাভাস রয়েছে। তার মধ্য থেকে মাত্র দুটি শিরোনাম উদ্ধৃত করছি। প্রথম শিরোনামটি হলো, ‘অফিস সহায়ক পদে প্রকৌশলী, স্নাতক-স্নাতকোত্তর পাস প্রার্থী’। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ‘পদের নাম অফিস সহায়ক। শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয় এসএসসি পাস। কিন্তু চাকরিপ্রার্থীদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত। কেউ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, কেউবা এমবিএ কিংবা অন্যান্য বিষয়ে স্নাতক পাস। ১৮টি পদে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ১৭ জনই উচ্চশিক্ষিত। পাবনা জেলা প্রশাসনের একটি নিয়োগ পরীক্ষায় এ ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৫ অক্টোবর অফিস সহায়কের ১৮টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। জাতীয় বেতন স্কেলে এই পদ ২০তম গ্রেডের। আগে পদটির নাম ছিল এমএলএসএস এবং যোগ্যতা ছিল অষ্টম শ্রেণি পাস, পদটি পিয়ন পদ হিসেবে পরিচিত।’ (প্রথম আলো, ২৮ জুন ২০২৬)। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলো, ১৮টি পদের জন্য আবেদন করেছিলেন প্রায় আট হাজার চাকরিপ্রার্থী।
মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে প্রকাশিত দ্বিতীয় খবরটির শিরোনাম হলো, ‘৩৬% শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছেন না’। এতে বলা হয়েছে, ‘এবার উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এইচএসসি ও সমমান) নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই অংশ নিচ্ছেন না। প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেন না। তবে এ বছর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার এই হার অস্বাভাবিক বেশি বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।’ (প্রথম আলো, ২ জুলাই ২০২৬) ভাবা যায়, একটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নিয়মিত শিক্ষার্থী অংশ নেননি! দুটি খবরের মধ্যে যে একটি নিবিড় যোগসূত্র আছে তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কার এত সময় আছে এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার!
প্রথম খবরটি নিশ্চিত করছে যে শিক্ষিত তরুণদের জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ নেই। থাকলে সামান্য একটি পিয়ন পদের জন্য হাজার হাজার তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়তেন না কিংবা ভিটেবাড়ি বিক্রি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে পাড়ি জমাতেন না বিদেশে। তবে এটি বিশাল এক ডুবোপাহাড়ের চূড়া মাত্র। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মোট বেকারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী তরুণ। দেশের ভেতরে বা বাইরে কোথাও তাদের জন্য কোনো সুসংবাদ নেই। বরং ক্রমেই ভারী হচ্ছে দুঃসংবাদের পাল্লা। শুধু যে বিদেশে অভিবাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে তাই নয়, দেশের ভেতরেও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক কারখানা। চালু প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চলছে ছাঁটাই। এক্ষেত্রে যুদ্ধবণিকদের বিভাজনমূলক নিষ্ঠুর নীতির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অবদানও কম নয়। কাজের জন্য মরিয়া তরুণরা ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুল্লিতে গিয়ে পড়ছেন হরহামেশাই। রাশিয়ার রণাঙ্গনে তোপের মুখে পড়া বাংলাদেশি তরুণরাই তার একমাত্র উদাহরণ নয়। প্রশ্ন হলো, কোথাও কোনো আশার আলোই যদি না থাকে, তাহলে নবীনরা কেন শিক্ষামুখী হবে? দুর্মূল্যের বাজারে কোনোমতে টিকে থাকা তাদের দিশেহারা মা-বাবাই-বা কোন্ ভরসায় শিক্ষার পেছনে মূল্যবান অর্থ ও সময় ব্যয় করবে?
মুদ্রার অপর পিঠে যা আছে তা আরও উদ্বেগজনক।সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। তার মধ্যে ১৫-২৯ বছর বয়সি তরুণের সংখ্যাই হলো ৫ কোটি- যা আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ। এ সংখ্যাটি বাংলাদেশের চেয়ে আয়তনে ও সম্পদে এগিয়ে থাকা বহু উন্নত দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ৫ কোটি তরুণের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই (আনুমানিক এক কোটি ৫০ লাখ) কোনো প্রকার কাজ, শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নয়। এ সংখ্যাটিও সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড কিংবা সুইডেনের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। সীমিত সম্পদ ও অসীম দুর্নীতি, দুর্বল ও জবরদস্তিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান বিভাজন ও ঘৃণার রাজনীতি পরিস্থিতিকে ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে। এই যে ভয়াবহ বাস্তবতা তার সঙ্গে তুলনা চলে ঘুমন্ত এক আগ্নেয়গিরির। ভাবতে শিহরিত হই যে তার ওপর ময়ূর সিংহাসন সাজিয়ে আমাদের এত বাগাড়ম্বর, এত লম্ফঝম্ফ! সেই সিংহাসনের সুতোও আবার আমাদের হাতে নেই! সুবিদিত যে এ চিত্র বাংলাদেশের একার নয়।
রাজা যায় রাজা আসে। কিন্তু কারোই বোধোদয় হয় না। গদিনশিন হওয়া মাত্রই সবাই ভাবেন, তিনিই শেষ রাজা এ ধরিত্রীর! তাঁর আগেও কেউ ছিল না, তাঁর পরেও কেউ আসবেন না! তিনি যা বলছেন- যা করছেন সেটাই ঠিক। সেটাই শেষ কথা। পারিষদরাও তাতে সায় দেন সমস্বরে। যুদ্ধবণিকরা সশব্দে চাপড়ে দেন পিঠ। তাদের অনুগ্রহপুষ্ট স্বনামধন্য ‘সাধু-সন্ত’রাও বলতে থাকেন-‘সাধু! সাধু!’ রাজার পাখা গজায়! বেজে ওঠে রণবাদ্য। লক্ষ্য কখনো প্রজা, কখনো প্রতিবেশী! কখনো গাজা, কখনো তেহরান! রমরমা হয়ে ওঠে যুদ্ধবাণিজ্য। আর শত সহস্র টন বোমার নিচে চাপা পড়ে যায় ভবিষ্যতের মুখ। আবার যুদ্ধবণিকদের অবাধ্য হলে আরও বিপদ। আপনাকে তারা সব দিক থেকে অবরুদ্ধ করেই ক্ষান্ত হবে না, মুছে ফেলতে চাইবে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে। যেমনটি ঘটছে ইরান ও ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে। অতএব, পুতুল নাচ চলতে থাকে। পুতুল যায় পুতুল আসে! এ বাস্তবতা কি কেবল বাংলাদেশের মতো হাজারো দুর্দশাপীড়িত দেশগুলোর? পৃথিবীর স্বঘোষিত ‘বস’ বিপুল ক্ষমতাধর মহামতি ট্রাম্পকে আপনি আলাদা করবেন কীভাবে?
সেদিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ অ্যালেক্স আর বাংলাদেশের আলাউদ্দিনের ভবিতব্য একসূত্রে গাঁথা। মোটা দাগে পৃথিবীর ৮শ ৩০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশই হলো তরুণ-যুবক, যাদের বয়স ৪০ বছরের নিচে। কী অপেক্ষা করছে তাঁদের জন্য? ট্রাম্প-নেতানিয়াহু কিংবা জেলেনস্কির সুতো যাদের হাতে তারা কি কারো পরোয়া করেন? এই যে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার তারা মারণাস্ত্রের পেছনে ঢালছেন- ঘৃতাহুতি করছেন একের পর এক যুদ্ধের আগুনে- সেটা কি তরুণদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে? বিন্দুমাত্র সংশয় ছাড়াই বলা যায়, না। তাঁরা কেবল নিজেদের ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও মসনদের কথাই ভাবেন। যুদ্ধবাণিজ্যের বখরাটুকু হলো উপরি পাওনা!
তরুণদের নিজের পথ নিজেদেরই খুঁজতে হবে। নিশ্চিতভাবে সেটা পেছনের দিকে নয়। নিঃসন্দেহে এও এক ‘ওডিসিয়ান জার্নি’ (Odyssean journey)! সব পথ রুদ্ধ করে নানারকম উত্তেজক পসরা সাজিয়ে বসে আছে ঘৃণার কারবারিরা। আছে যুদ্ধবণিকদের অনুগ্রহপুষ্ট পদক-পদবীর ভারে ন্যুব্জ হ্যামিলনের বিচিত্র বংশীবাদকের দল। ভবিষ্যতের লুণ্ঠিত মুখটিকে নিজের করে নিতে হলে সব ফাঁদ সব প্ররোচনা অগ্রাহ্য করেই তরুণদের এগিয়ে যেতে হবে গ্রিক পুরাণের বীর ওডেসিয়ুসের মতো।
২৬ জুন, ২০২৬


3 Comments
অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রিয় এম এম আকাশ ভাই।
খুব ভালো লাগলো। প্রশ্ন হলো এ থেকে উত্তরণের পথ কে দেখাবে। সবাই ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। এদেশের পাঠাগারগুলোর সম্ভাবনা ছিলো মানুষকে, রাষ্ট্রকে একটা দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য সামনে এসে কাজ করার। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম কি বিশাল সম্ভাবনাময় শক্তি ব্যস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ নিয়ে। এখানে সমাজ নিয়ে গবেষণা হতে পারতো, রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা হতে পারতো। আপনারাও তাদের পথ দেখালেন না। সাজানো গ্রন্থপাঠ অথবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আপনারা দেখলেন পাঠক তৈরি হচ্ছে আর আমি আমার প্রান্ত থেকে দেখলাম পাঠাগারগুলো কিছু ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনুষ্ঠানকে সফল করে তুলতে কি করছে। বেলা শেষে শূন্য। পাঠাগারের না তৈরি হয়েছে পাঠক না বই পড়ুয়া। স্রেফ প্রতিযোগিতা আর আত্মতৃপ্তি। ভালো থাকবেন।
আন্তরিক ভাল একটি লেখার জন্য লেখককে ধন্যবাদ।