পড়শী সমসাময়িক বিষয় প্রবাসে বাঙালির শিকড় ও ফোবানার চল্লিশ বছরের অভিযাত্রা

প্রবাসে বাঙালির শিকড় ও ফোবানার চল্লিশ বছরের অভিযাত্রা

Post Views: 118
8 min read

উত্তর আমেরিকার লস এঞ্জেলেস শহরের প্রাণকেন্দ্রে হলিউড হিল্টন হোটেলে সেপ্টেম্বর ৪-৬, ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল প্রবাসী বাঙালির সর্ব বৃহৎ মিলনমেলা – ফোবানা সম্মেনলন। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের অভিযাত্রার, গর্বিত পথচলার এ এক আনন্দঘন মুহূর্ত! নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে, নানা অর্জন-বিসর্জনের পথ ধরে নিরবচ্ছিন্ন পথচলার এ মাইলফলক উদযাপনের মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁদের প্রতি জানাচ্ছি অন্তরের শ্রদ্ধাঞ্জলি যাদের নেতৃত্ব ও উদ্যোগে শুরু হয়েছিল ফোবানার বলিষ্ঠ পথচলা।

ভাগ্যের অন্বেষণে কিংবা উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় কোটি কোটি বাঙালি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে তুলেছেন তাঁদের আপন ভূবন। প্রবাসের মাটিতে জীবনের স্বাধীনতা ও সম্ভাবনা থাকলেও নেই স্বদেশের মায়া, নেই মা-মাটি-মানুষের নিবিড় স্পর্শ। তবু জীবনের প্রয়োজনে, একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে আমাদের এগিয়ে চলা, আর সেই স্বপ্নই হয়ে ওঠে আমাদের অগ্রযাত্রার চালিকাশক্তি ও পথচলার পাথেয়।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবন, সামাজিক জীবন, পেশাগত অগ্রযাত্রা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যয়ের গভীরে নিরন্তর প্রবাহিত হয় স্বদেশপ্রেম ও শিকড়ের টান। এই শিকড়ের টানেই বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বাঙালি-অধ্যুষিত অঞ্চলে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন। এসব সংগঠনের মাধ্যমে প্রবাসে অব্যাহত রয়েছে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চর্চা। উত্তর আমেরিকাও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গড়ে উঠেছে অসংখ্য প্রবাসী বাংলাদেশী সংগঠন। এসব সংগঠনের সম্মিলিত প্রয়াসকে একটি বৃহত্তর ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করার প্রত্যয়ে চার দশক আগে ওয়াশিংটনের মাটিতে যাত্রা শুরু করেছিল ফোবানা। ফোবানা উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশী সংগঠনগুলোর অন্যতম বৃহৎ সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম— অর্থাৎ এটি মূলত সংগঠনগুলোর সংগঠন। চার দশক আগে শুরু হওয়া এই অভিযাত্রা উত্তর আমেরিকার কর্মব্যস্ত প্রবাসজীবনের মধ্যেও আজ অবধি অব্যাহত রয়েছে। এটি আমাদের সবার জন্য গর্ব, আনন্দ ও অনুপ্রেরণার বিষয়। বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণে ফোবানার এই পথচলা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকুক— এটাই আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা।

ফোবানাকে ঘিরে প্রবাসী সমাজে নানা আলোচনা, সমালোচনা, গুঞ্জন ও বিভ্রান্তি রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয় না। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন সামাজিক পরিসরে ফোবানা সম্পর্কে ভুল ধারণা ও নেতিবাচক মনোভাব বিরাজ করে। কোনো সংগঠন বা উদ্যোগ সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে সত্যতা যাচাই করা এবং এর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যথাযথভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি। তথ্য না জেনে কিংবা বাস্তবতা অনুধাবন না করে মন্তব্য করা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সামগ্রিকভাবে সমাজের ঐক্য, আস্থা ও অগ্রযাত্রাকেও বাধাগ্রস্ত করে।

সমাজের কল্যাণে সক্রিয় অংশগ্রহণ না করে দূর থেকে সমালোচনা করা আমাদের সমাজের প্রচলিত অভ্যাস। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, দীর্ঘদিন ধরে তাকে সচল রাখা এবং নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অনেক কঠিন। তাই নেতিবাচক সমালোচনার পরিবর্তে ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়া এবং সংশোধনের কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই অধিক দায়িত্বশীলতার পরিচয়, সমাজের জন্য তা অধিক কল্যাণকর। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই— যে কোনো বৃহৎ সংগঠন, আয়োজন কিংবা উদ্যোগে প্রতিকূলতা, চ্যালেঞ্জ ও ভুলত্রুটি থাকতেই পারে, ফোবানাও তার ব্যতিক্রম নয়। অতীতে নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব, মতপার্থক্য ও বিভক্তির কারণে ফোবানার নাম ও লোগো ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগে সম্মেলন আয়োজন হচ্ছে বিভিন্ন শহরে। এসব বিভক্তির দৃষ্টান্ত সামনে এনে অনেকেই সামগ্রিকভাবে ফোবানা সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে— যখন ব্যক্তিস্বার্থ বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তখন নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও বিভাজন সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। সেই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

অনেকে ঢালাওভাবে মন্তব্য করেন— ফোবানা কেবল সম্মেলন, আড্ডা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কেউ কেউ প্রশ্ন করেন— “ফোবানা সমাজের জন্য কী করেছে?” এমন প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফোবানার কর্মকাণ্ডকে কাছ থেকে দেখা, জানা ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ফোবানা সম্মেলন শুধু মিলনমেলা নয়, শুধু বিভিন্ন সংগঠনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও নয়— ফোবানা এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। যে লক্ষ্য ও আদর্শ সামনে রেখে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার মূলেই রয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চর্চা এবং প্রবাসীদের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার সেতুবন্ধন গড়ে তোলা। সময়ের পরিক্রমায় এই মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, শিক্ষামূলক ও মানবিক কার্যক্রম।

ফোবানার সম্মেলনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয় নিয়ে সেমিনার ও আলোচনা, নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক সেমিনার, নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার জন্য যুব ফোরাম, সাহিত্যচর্চার জন্য কাব্য জলসা ও সাহিত্য আলোচনা, স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক সেমিনার, অভিবাসন বিষয়ক তথ্য ও সহায়তা, ব্যবসা ও পেশাগত নেটওয়ার্কিং, শিক্ষা ও মেধার বিকাশে স্কলারশিপ প্রদান এবং উৎসাহমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ এবং মানবিক কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। দেশে ও প্রবাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মানবিক সংকটের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশ ও প্রবাসের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তোলায়ও ফোবানা ভূমিকা রাখার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার আন্তরিক আগ্রহ থাকলে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন নয়।

বিরোধিতার পরিবর্তে এগিয়ে এসে সহযোগিতা করা, ভুলত্রুটি সংশোধনে ভূমিকা রাখা এবং ঐক্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করাই শ্রেয়। নেতিবাচক মন্তব্য বা অযৌক্তিক বিরুদ্ধাচরণ কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না; বরং গঠনমূলক সমালোচনা ও সম্মিলিত সহযোগিতাই একটি সংগঠনকে পরিশুদ্ধ, শক্তিশালী এবং সমাজকল্যানকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে।

প্রবাসী সমাজে বিভক্তি, দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের কোন্দল, ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা ও আত্মপ্রচারের যে প্রবণতা রয়েছে, সমাজের সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, জবাবদিহিতা ও সম্মিলিত নেতৃত্বের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে উত্তরণের পথে।

একটি ভালো উদ্যোগে আপনার সামান্য সহযোগিতা শুধু সংশ্লিষ্ট সংগঠনের পথচলাকে শক্তিশালী করে না, বরং সমগ্র সমাজকে গড়ে তোলার এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো অবদানই ক্ষুদ্র নয়। অসংখ্য ছোট কাজ, অংশগ্রহণ, সামান্য ত্যাগস্বীকার ও আন্তরিক প্রচেষ্টার সমন্বয়েই গড়ে ওঠে বৃহৎ অর্জনের সোপান। সমাজের কল্যাণে নিজের সময়, শ্রম ও মেধা উৎসর্গ করার যে আত্মতৃপ্তি ও আনন্দ, তা অনেক প্রাপ্তির চেয়ে শ্রেয়।

সমালোচনা ও বিভেদ-বিভক্তির ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিত প্রয়াসে ফোবানাকে আগামী দিনের আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রজন্মবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য সবার প্রতি আহবান রইল। আমাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের মেধা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের সমন্বয়ে গড়ে উঠুক একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ— ফোবানা হয়ে উঠুক প্রবাসের মাটিতে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান— আর তরুণ প্রজন্মের মাঝে গড়ে উঠুক শিকড়, পরিচয় ও সম্প্রীতির এক চিরন্তন সেতুবন্ধন।

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

উডব্রিজ, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক, সম্পাদক, সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মী। লেখালেখি এবং সম্পাদনার সাথে সম্পৃক্ত দীর্ঘ চার দশকেরও বেশী সময় ধরে। প্রকাশিত গ্রন্থ দু’টি।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।