পড়শী সম্পাদকীয় মন্তব্য সম্পাদকীয়: আশ্বিন ১৪৩৩/সেপ্টেম্বর ২০২৬

সম্পাদকীয়: আশ্বিন ১৪৩৩/সেপ্টেম্বর ২০২৬

Post Views: 206
4 min read

আমরা সবাই এক পৃথিবীর মানুষ

২০০১ সালের ৯/১১, মঙ্গলবার, একটা সাধারণ দিন হিসাবেই শুরু হয়েছিল ২৫ বছর আগে। অথচ সেই দিনটাই আমাদের এখনকার ইতিহাসে এমন একটা জায়গা দখল করে আছে যে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই আমেরিকা তো বটেই পুরা পৃথিবীর ইতিহাসকেই দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছি – ৯/১১ এর আগের পৃথিবী এবং তার পরের পৃথিবী। আমেরিকা অনেকদিন ধরেই পৃথিবীর মোড়ল বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে বারবার। কিন্তু এই দিনটিই আমেরিকাকে অন্তহীন যুদ্ধের মধ্যে ফেলে দিল। সেই যে শুরু, সেই যুদ্ধের ঘানি টানতে টানতে আমেরিকা তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রায় হারিয়ে ফেলছে বলা যায় যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে না পেরে।

আমেরিকা প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লো আফগানিস্তানে, “গণবিধ্বংসী অস্ত্র” আছে মিথ্যে এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ইরাক যুদ্ধ শুরু করলো। মধ্য প্রাচ্যে শান্তি রাখার নামে সৈন্য বাড়াতে থাকলো। আজ অবধি আমেরিকার সেই যুদ্ধ আর শেষ হচ্ছে না। এরমধ্যে যুদ্ধ অসমাপ্ত রেখে চলে আসতে হলো আফগানিস্তান, ইরাক থেকে। আফগানিস্তানে ক্ষমতা ছেড়ে আসতে হলো সেই তালেবানদের কাছেই যারা ৯/১১ এর ঘটনার সাথে জড়িত বলেই এতদিন বলে আসলো। আমেরিকা যেন কিছুতেই কিছু শিখলো না। ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে, আফগানিস্তান, ইরাক তারপর আবার এখন ইরান। এইভাবেই যুদ্ধের পর যুদ্ধ, আমেরিকায় মানুষের বাড়ছে মাথাপিছু ঋণের বোঝা। ট্যাক্স দিতে দিতে নাভিশ্বাস উঠছে জনগণের।

৯/১১ এর পর আমেরিকার জীবন যাপন অনেক বদলে গেলো। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি গঠিত হলো মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়তে গঠন করা হয় নতুন মন্ত্রণালয় ‘ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি’। পেট্রিয়ট অ্যাক্ট (Patriot Act) আইন হলো যার ফলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারি, ফোন কল ও ইমেইল ট্র্যাক করার ব্যাপক ক্ষমতা লাভ করে।

বিমানবন্দরগুলোতে কড়াকড়ি ও তল্লাশি ব্যবস্থার ভুক্তভোগী আমাদের মতো ইমিগ্র্যান্ট সবাই কম বেশি হয়েছি। একদল আরেক দলকে অস্বস্তিকরভাবে অবিশ্বাস করা শুরু করলো মোটামুটি রাখঢাক ছাড়াই। সত্যি ভাবতে অবাক লাগে পৃথিবীটা কি করে বদলে গেলো চোখের সামনেই।

আমেরিকার মাটিতে আমেরিকাকে আঘাত করে তিন হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য মানুষই দায়ী। আবার যারা আক্রমণ করলো, তারাও মানুষ। সেদিন থেকে যতগুলো যুদ্ধে আমেরিকা জড়িয়ে পড়লো সেখানেও মানুষই মারা গেল। আবার তাদের হত্যার নকশাও আঁকলো মানুষেরা। অথচ মানুষ মানুষকে মারছে মানুষেরই নিরাপদ থাকার অজুহাত দিয়ে। কি অদ্ভুত তাইনা? আমরা কোনোদিন কি এই অসহনীয় অবিশ্বাস থেকে মুক্তি পাবো?

আমরাও স্বপ্ন দেখি একদিন গোঁয়ার রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ থামাবে, অস্ত্র বানাবেনা আর কিনবেওনা। সবাই মিলে অর্থহীন মিটিং না করে, ভাববে কিভাবে এই পৃথিবীকে করা যায় দারিদ্র মুক্ত, ক্ষুধা মুক্ত। ধর্মের নামে, বর্ণের নামে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। সবাই যার যার মতো করে মাথা উঁচু করে বলবে “আমরা সবাই এক পৃথিবীর মানুষ”। আর এসবই হতে পারে যদি মানুষ চায়–

তুমি চাইলেই নিমেষেতে পারো আকাশ জুড়ে রংধনু রঙ আঁকতে
জাতিসংঘের দেয়াল টপকে যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে।
তুমি চাইলেই সীমান্ত জুড়ে ফসলের চাষ, আর কোনো নেই হত্যা
মিলন মেলায় গলা ছেড়ে গান, রাখীবন্ধনে চুকে যাবে সব হিস্যা।
তুমি চাইলেই পূবের আলোতে মানুষ জানবে মানুষের ইতিহাস
ধর্ম বর্ণের বিভাজন তবু এক পৃথিবীর জমিন জুড়ে একটাই আকাশ।

২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬


পোর্টল্যান্ড, ওরেগান, যুক্তরাষ্ট্র

প্রকৌশলী, কবি, লেখক এবং সংগঠক। দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠিত “সৃজন পাঠশালা”র কাজে তার অবসর কাটে।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।