বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অগাস্ট মাস বারবার ফিরে এসেছে। কখনও রক্তাক্ত অভ্যুত্থান, কখনও গ্রেনেড হামলা, কখনও গণঅভ্যুত্থান। অনেকেই এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখেন। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, এগুলো যেন একই ধারাবাহিকতার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়। একটি ঘটনার বীজ থেকে জন্ম নিয়েছে আরেকটি ঘটনা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট— এই তিনটি তারিখ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির একটি দীর্ঘ চক্রকে প্রতিনিধিত্ব করে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। রাষ্ট্রের ভিত্তি দাঁড়ায় চারটি মূলনীতির ওপর—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই অর্থনৈতিক বিপর্যয়, প্রশাসনিক দুর্বলতা, যুদ্ধোত্তর বিশৃঙ্খলা, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতির অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক বিরোধিতা সরকারের জনপ্রিয়তাকে ক্ষয় করতে শুরু করে। রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সমর্থকদের কাছে এটি ছিল সংকট মোকাবিলার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, কিন্তু সমালোচকদের কাছে এটি ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুতি। ফলে রাজনৈতিক অসন্তোষ আরও গভীর হয়।
এই অস্থিরতার মধ্যেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। শুধু একটি সরকার নয়, রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তিও বদলে যেতে শুরু করে। সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র পরিবর্তিত হতে থাকে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী হিসেবে পরিচিত অনেক ব্যক্তি পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসেন।
পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটিতে বহু মুক্তিযোদ্ধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শক্তিগুলোর পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হয়। একই সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন ঘটছিল। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও সৌদি আরব ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে সমর্থন করে। এই আন্তর্জাতিক প্রবণতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ও মৌলবাদী সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পরিচিত একটি রাজনৈতিক শক্তি প্রথমবারের মতো সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়। এই সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার বহু অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের সংগঠিত উত্থান প্রত্যক্ষ করে। ২০০৫ সালের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা প্রমাণ করে যে উগ্রবাদ কেবল সামাজিক বাস্তবতা নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা সংঘটিত হয়। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো এই হামলায় আইভি রহমানসহ বহু মানুষ নিহত হন। পরবর্তী তদন্ত ও বিচারে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে আসে এবং আদালতের রায়ে কয়েকজন দণ্ডিত হন। এই হামলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবিশ্বাস, প্রতিশোধ এবং অস্তিত্বের লড়াইকে আরও তীব্র করে তোলে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ২১ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে একটি স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ের ক্ষমতার রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে নতুন সংকট শুরু হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ এবং দুই প্রধান দলের নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথেই ফিরে আসতে হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসে। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্নও ওঠে। কিন্তু আরও বড় পরিবর্তন ঘটে রাজনৈতিক ব্যবস্থায়। ধীরে ধীরে বিরোধী রাজনীতির ক্ষেত্র সংকুচিত হতে থাকে। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে যে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষমতা ধরে রাখা হচ্ছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বাড়তে থাকে, আর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দুর্বল হতে থাকে।
ইতিহাসের একটি নির্মম বাস্তবতা হলো—যে শক্তি নিপীড়নের শিকার হয়, ক্ষমতায় গিয়ে সেই শক্তিও অনেক সময় একই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, “যেই যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ।” বাংলাদেশের রাজনীতিও যেন বারবার সেই বাস্তবতার সাক্ষী হয়েছে। যে দল একসময় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছে, ক্ষমতায় গিয়ে সেই দলও বিরোধী মতকে দমন করেছে। আবার যারা একসময় সামরিক শাসনের সমালোচনা করেছে, তারাও প্রয়োজনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। ব্যক্তি বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার সংস্কৃতি খুব বেশি বদলায়নি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন সেই জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। প্রথমে এটি ছিল একটি শিক্ষার্থী আন্দোলন। কিন্তু কঠোর দমন-পীড়ন, প্রাণহানি এবং রাষ্ট্রের অনমনীয় অবস্থান আন্দোলনকে বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ দেয়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ২০২৪ দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটে। এটি ছিল কেবল একটি সরকারের পতন নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও গণঅসন্তোষের বিস্ফোরণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে যদি একটি দীর্ঘ নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ ছিল তার গতিপথ পরিবর্তনের প্রথম বড় বাঁক। সেই বাঁকের ধারাবাহিকতায় আসে ২১ আগস্ট ২০০৪— যেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন মাত্রা পায়। ২১ আগস্টের স্মৃতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রতিশোধের রাজনীতি পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে। আর সেই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিণতিই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।
অতএব, এই তিনটি অগাস্টকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। ১৫ আগস্টের রক্তপাত, ২১ আগস্টের গ্রেনেড এবং ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান— এগুলো একই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একটি ঘটনার ভেতরেই পরবর্তী ঘটনার বীজ লুকিয়ে ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাস তাই আমাদের শেখায়—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি এবং ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী ভাবার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই স্থায়ী বিজয় বয়ে আনে না। ইতিহাস ঘুরে দাঁড়ায়, এবং একসময় ক্ষমতাবানকেও তার সামনে জবাব দিতে হয়।

