পড়শী উত্তর আমেরিকা I’mPossible Girl: কিশোরীর বিষ্ময়-ডানায় দুই মহাদেশে ভালোবাসার যোগ

I’mPossible Girl: কিশোরীর বিষ্ময়-ডানায় দুই মহাদেশে ভালোবাসার যোগ

Post Views: 194
7 min read

পোর্টল্যান্ড থেকে চট্টগ্রামের পটিয়ার মধ্যে সরলরেখা টানলে দূরত্ব প্রায় সাত হাজার তিনশ কিলোমিটার। পায়ে ভর করে দুই মহাদেশের এই মহা-দূরত্ব অতিক্রমকে অসম্ভবপ্রায় করে তুলে মাঝের সাতসমুদ্দুর আর তের নদীর বাধা। কিন্তু এই পা যদি হৃদয়ের পাখনায় ভর করে, তখন এই দূরত্ব যেতে লাগে নিমেষ মাত্র। আর সত্যিই তেমনটাই ঘটেছিল গত ২৩ আগস্ট, ২০২৬, রোববারের উজ্জ্বল সকালে। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ড শহরে অবস্থিত রক ক্রিক ট্রেইলে অনেকগুলো ছোঠ পায়ের ছাপ যে গল্প এঁকেছিল, তা যেন হয়ে উঠলো চট্টগ্রামের অতি-প্রান্তিক এক স্কুল-কাহিনীরই ভালোবাসাময় অধ্যায়। আর সবাইকে একসাথে জুড়ে দুই গোলার্ধের শিশুদের ভালোবাসার গল্পটাকে এক ক্যানভাসে যে বুনেছে, সে নিজেও ষোলো বছরের আশ্চর্য এক গল্প। নাম তার আরিয়া; আরিয়া তাবাসসুম রহমান।

যদিও জীবন লেখা শুরু হয়েছিল ‘অসম্ভব’ দিয়ে

আরিয়ার নিজের গল্পটা শুরু হয়েছিল একরাশ অনিশ্চয়তায়। জন্মের পরপরই সেরিব্রাল পালসিতে (Cerebral Palsy) আক্রান্ত হলে ভবিষ্যতে স্বাভাবিক হাঁটাচলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার বিষয়টা নিশ্চিত হয়ে যায়। জন্মের মাত্র দশ দিনের মাথায়, যখন সে NICU-এর বিছানায়, একজন অভিজ্ঞ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ আরিয়ার মস্তিষ্কের এমআরআই (MRI) দেখে বাবা-মাকে জানিয়েছিলেন, তাঁর দুই দশকের কর্মজীবনে এত ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ মস্তিষ্ক তিনি আগে দেখেননি — মেয়ে হয়তো সারাজীবন বিছানাতেই কাটিয়ে দেবে। তার বয়স যখন বছর সাতেক, ফিজিওথেরাপিস্ট তার থেরাপি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান। কারণ ছিল একই — চিকিৎসাবিদ্যার চোখে আরিয়ার শারীরিক উন্নতি ‘impossible’। তাই তিনি অসম্ভবের পেছনে আর সময় ব্যয় করতে চান না।

কিন্তু, চিকিৎসাবিদ্যা যেখানে থেমে গেল, মা-বাবার অদম্য ভালোবাসার রঙে সেখান থেকেই আঁকা শুরু হলো ভিন্ন এক হার না মানা গল্প। আরিয়াকে জীবনের গতিতে আনতেই হবে। নানান খোঁজখবর, চেষ্টার একপর্যায়ে আরিয়ার জন্য বিশেষভাবে তৈরি হলো একটি ট্রাইক (trike)। উড়তে চাওয়া আরিয়া তা ডানা হিসেবে জুড়ে নিলো নিজের সাথে। বাবার হাত ধরে প্রথমে এক মাইল, তারপর দুই মাইল — এভাবে ধীরে ধীরে নিয়তির অচলায়তনকে ঠেলে সরিয়ে নিজের পৃথিবীকে প্রসারিত করতে থাকলো। Hood to Coast-এর মতো প্রতিষ্ঠিত রেসগুলোতে অংশ নিল আরিয়া। হয়ে উঠল বহু দৌঁড় প্রতিযোগিতার দূত (ambassador)। এভাবেই ডানার ঝাপটে ঝাপটে আরিয়া নিজের ভাগ্যলিপি ‘অসম্ভব’ থেকে ঝেরে ফেললো অচলতার ‘অ’-কে। নিজের বুকে আকাশ দেখলো বিষ্ময়কর এক উড্ডয়ন – ‘আমিই সম্ভব’। প্রতিটা মাইল পেরিয়ে আরিয়া নিজের নামটাই বদলে দিল — ‘impossible’ থেকে হয়ে উঠল ‘I’mPossible’।

দৌঁড় যখন হয়ে ওঠে ভালোবাসা বিলানোর মাধ্যম

শুরুটা ছিল ছোট্ট বোন আর বাবা-মায়ের সঙ্গে পারিবারিক দৌঁড় দিয়ে। কিন্তু আরিয়া শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিজয় উদযাপনে নিজেকে সীমিত রাখতে চায়নি। নিজের প্রতিটা পদক্ষেপকে সে জুড়ে দিয়েছে অন্যের স্বপ্নের সঙ্গে। ২০২৫ সালে আরিয়া স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতনের জন্য প্রথমবারের মতো আয়োজন করে একটি ফান্ড রেইজিং ইভেন্ট, যার অর্থে গড়ে উঠছে স্কুলের কিছু অবকাঠামো। এ বছর, গত ২৩ আগস্ট, আরিয়া আবার নেমে পড়ল একই উদ্যোগে — ‘Run with the I’mPossible Girl and Make a Difference’ শিরোনামে দ্বিতীয় ফান্ড রেইজিং ইভেন্ট নিয়ে, এবার লক্ষ্য স্বপ্ননগরের জন্য নতুন শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা। দৌঁড় শুরুর আগে, সকাল ৯টায়, খুদে দৌঁড়বিদদের নিয়ম-কানুন বুঝিয়ে দেওয়া হয় সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে। শুরু হয় ওদের দৌঁড়- শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসপূর্ণ ও উপভোগ্য এক দৃশ্য। বয়সভেদে এক থেকে তিন মাইলের ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘ্যের রুটে দৌঁড়ায় শিশুরা। প্রায় পঞ্চাশজন শিশু আর তাদের অভিভাবকদের কলরবে রক ক্রিক ট্রেইল হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত এক উৎসবের ময়দান। এই আয়োজনের পাশে দাঁড়ায় সংযোগ, সৃজন পাঠশালা, অর্কসহ আরও বেশ কিছু সামাজিক সংগঠন। প্রমাণ করে দেয়, একটা ভালো উদ্দেশ্য, একটা মানবিক আহ্বান কীভাবে চেনা-অচেনা মানুষদেরও এক কাতারে নিয়ে আসতে পারে। আর সুদূর বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত গ্রামে ঢ়ড়ংংরনষব করে তোলে স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতন-এর শিক্ষা উদ্যোগকে।

joyermala
দৌড় শেষে সবার গলায় জয়ের মালা, সাথে সবার প্রিয় I’mPossible Girl

সুদূর পাহাড়ের কোলে যে স্বপ্ন বেড়ে ওঠে

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের পাহাড়ের কোলে ২০০৯ সালে জন্ম নেয় আরিয়ারই প্রায় সমবয়সী এক স্কুল- স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতন। শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় চলা এই প্রতিষ্ঠান প্রায় শুরু থেকেই গতানুগতিকতার বাইরে এসে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠচর্চায় স্কুল পরিচালনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বহিরাঙ্গণ শিখন (outdoor learning), অনুসন্ধান ও প্রকল্প-ভিত্তিক শিখন, গান, কবিতা, অভিনয়, খেলাধূলা পাঠাগার ও সাহিত্যচর্চার মতো সৃজনশীল কার্যক্রম দিয়ে এখানে শিক্ষাকে নির্ভয় আনন্দের নির্ভার এক উৎসবে পরিণত করা হয়েছে। ২০২৫ সালে সংযোগ ও ওঝঋ-এর যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ডিজিটাল ক্লাসরুম স্বপ্ননগরের শিশুদের যুক্ত করে দিয়েছে বৃহত্তর জগতের সঙ্গে। এবার আরিয়ার আয়োজিত শিশুদের এই দৌঁড়ে উঠে আসা অর্থ তাদের এনে দেবে আরেকটি নতুন সুপরিসর ক্লাসরুম । ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত সীমিত থাকা স্বপ্ননগর আসছে বছরগুলোতে এভাবেই হয়তো যুক্ত করতে পারবে শিক্ষার্থীদের বহুকাঙ্ক্ষিত নবম শ্রেণি ও দশম শ্রেণিকে। আরো অধিক সংখ্যাক শিক্ষার্থী পড়তে পারবে। দূরবর্তী স্কুলে যেতে না পারা, কিংবা অনিরাপত্তা ও দারিদ্র্যজনিত কারণে ঝরে পড়বে না এখানকার শিশুরা। নতুন এই কক্ষ হবে ওদের স্বপ্ন বোনার আরেকটা জায়গা।

যে গল্প আমাদের এগিয়ে যেতে শেখায়

আরিয়ার গল্প আসলে কেবল একটি মেয়ের সংগ্রামের গল্প নয়। এটা বিশ্বাসের গল্প — চিকিৎসকের পূর্বাভাসের চেয়েও বড় কিছু বিশ্বাস করার সাহসের গল্প। এটা এমন এক জীবনদর্শনের গল্প, যেখানে নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করাটাই শেষ কথা নয়; বরং সেই জয়টুকু দিয়ে আরও অনেকের জন্য পথ তৈরি করে দেওয়াটাই আসল অর্জন। সাত হাজার মাইল দূরের এক স্কুলের অচেনা শিশুদের জন্য নিজের প্রতিটা পদক্ষেপ উৎসর্গ করে আরিয়ারা প্রমাণ করে দিয়েছে — অদম্য সংকল্প, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর অবিচল বিশ্বাস মিলে একটা জীবনের গল্পকে নতুন করে লিখে দিতে পারে, এবং সেই গল্প ছড়িয়ে দিতে পারে সীমানার ওপারে; অন্য এক গোলার্ধে।
আরিয়া আর তার সহযোদ্ধা বন্ধুদের প্রতি রইল অফুরন্ত ভালোবাসা।

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

সমন্বয়ক, স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতন।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।