পড়শী বিশ্বসংলাপ বোমার নিচে শিশুর ছোট্ট দুটি হাতেই বোনের একমাত্র পৃথিবী

বোমার নিচে শিশুর ছোট্ট দুটি হাতেই বোনের একমাত্র পৃথিবী

Post Views: 14
5 min read

ওর মাথায় নেই কোনো শিরস্ত্রা, নেই নিরাপদ আশ্রয়, নেই আকাশ থেকে নেমে আসা বোমা থামানোর ক্ষমতা। আছে শুধু দুটি ছোট্ট হাত। সেই হাত দিয়েই আরেকটি শিশুকে বুকের কাছে টেনে নিয়েছে সে। যেন তার সমস্ত সান্ত্বনা ওই আলিঙ্গনেই: ভয় পাস না, আমি আছি।

ছবিটি হয়তো গাজার। শুধু ছবি দেখে এর স্থান বা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। তবে শিশু দুটি যদি বড় ভাই ও তার ছোট বোন হয়ে থাকে, তাদের এই আলিঙ্গন এমন এক বন্ধনের কথা বলে, যার জন্য কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। ভাইয়ের হাত বোনের মাথা আগলে রেখেছে। বোন মুখ লুকিয়েছে তার বুকে। দুটি ছোট্ট শরীর পরস্পরের কাছে খুঁজছে একটু স্বস্তি।

এই বয়সে ওদের তো প্রজাপতির পেছনে ছোটার কথা। মিষ্টির ভাগ নিয়ে ঝগড়া করার কথা। ঘুমানোর আগে আরেকটি গল্প শোনার বায়না ধরার কথা। বড় ভাইয়ের দায়িত্ব হওয়ার কথা হোঁচট খেলে বোনকে ধরে ফেলা, কুকুরের ডাক শুনে ভয় পেলে পাশে দাঁড়ানো। মানুষের তৈরি মারণাস্ত্র থেকে বোনকে বাঁচাতে নিজের শরীর ঢাল হতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন তার শৈশবে আসার কথা নয়।

যুদ্ধের কী বোঝে এই ছোট্ট মেয়েটি? সামরিক লক্ষ্য কিংবা রাজনৈতিক বিরোধের অর্থ তার জানা নেই। সে চেনে আপনজনের হাত, পরিচিত কণ্ঠস্বর, ভালোবাসার উষ্ণতা। চারপাশ ভয়ংকর হয়ে উঠলে ভাইয়ের বুকই হয়তো তার কাছে ঘরের সবচেয়ে কাছের অনুভূতি।

আর ভাইটি কীই বা প্রতিশ্রুতি দিতে পারে? হয়তো পাশে থাকা ছাড়া কিছুই নয়। তবু সে বোনকে এমনভাবে আঁকড়ে রেখেছে, যেন ছেড়ে দেওয়াই সবচেয়ে বড় বিপদ। ওদের কথা আমরা শুনতে পাই না, মনের কথাও জানি না। কিন্তু এই আলিঙ্গন যেন বলে- যা-ই ঘটুক, তোকে একা হতে দেব না।

2026.10.09.01 01
বোমার নীচে শিশুর ছোট্র হাতেই বোনের একমাত্র পৃথিবী

এটি গাজার ছবি হলে, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের মধ্যে শিশু দুটির সান্ত্বনা খোঁজার সম্ভাবনা দৃশ্যটিকে আরও বেদনাবিধুর করে তোলে। ওদের আতঙ্ক ও দুর্দশা কারও যুক্তি প্রতিষ্ঠার উপকরণ নয়। ওরা শিশু। ওরা কোন পক্ষের, সেই প্রশ্ন করার পূর্বে ওদের নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা মানবজাতির অপরিহার্য দায়িত্ব।

যুদ্ধ শৈশবে ঢুকে তাদের স্বাভাবিক নিশ্চয়তাগুলো ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কোনো এক সময় মাথার ওপর ছাদ থাকলেও আজ ওরা আশ্রয়হীন। চেনা পথ আর নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা তাদের নেই। মায়ের সকল আশ্বাস চাপা পড়ে গেছে বিরামহীন গোলাগুলি আর বোমাবর্ষণের বিকট শব্দে যা বন্ধ করার তাদের নেই কোনো ক্ষমতা। হত্যাযজ্ঞের বিরতিতে ওরা কেবল ঘুরে ঘুরে মৃত মানুষগুলোর লাশ গুণে বেড়ায়।

ওদের অসমাপ্ত আঁকা ছবি, প্রিয় খেলা, উত্তর না-পাওয়া প্রশ্ন কোথায় লেখা থাকে? বেঁচে থাকা ভাই বা বোন যখন সেই হাতটি খোঁজে, যা আর কোনো দিন ফিরে আসবে না, সেই আতঙ্কের হিসাব কে রাখে?

এই আলিঙ্গনের দিকে আবার তাকিয়ে দেখুন। এখানে রয়েছে নিখাদ ভালোবাসা। কিন্তু ভালোবাসাকে নিরাপত্তার বিকল্প হতে বাধ্য করা চলে না। ছোট্ট ছেলেটির সাহস দেখে মুগ্ধ হয়ে, যে পরিস্থিতি তাকে এমন সাহসী হতে বাধ্য করছে- তা মেনে নেওয়া যায় না।

তাই সমগ্র মানবকুলের অশ্রু দাবিতে পরিণত হোক- শিশু ও বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করুন, মানবিক সাহায্য পৌঁছাতে দিন, শিশুদের বিপন্ন করে এমন হামলা বন্ধ করুন। এই শিশু দুটি আমাদের নিজের হলে যে ব্যাকুলতায় শান্তি চাইতাম, আসুন আমরা একযোগে সেই একই ব্যাকুলতায় সিক্ত হয়ে শান্তির জন্য কাজ করি।

ভাইটি বোনকে জড়িয়ে ধরুক খেলা শেষে, ঝগড়া মিটলে, কিংবা দুঃস্বপ্নে তার ঘুম ভেঙে গেলে। বোনটি বড় হয়ে জানুক- ভাইয়ের দুই হাত মানে আদর।

ওই ছোট্ট হাত দুটি যেন কখনো তার শেষ আশ্রয় হয়ে না যায়।

১১ অক্টোবর, ২০২৬

ঢাকা, বাংলাদেশ

লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:), বীর প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ‘সোর্ড অব অনার’প্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। তিনি সেনাবাহিনী ও এনএসআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে লেখালেখি, টেলিভিশন আলোচনা, সামাজিক ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে সক্রিয়।


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।