পড়শী মূল রচনাবলী অস্ত্র দিয়ে আদতে কোনো মতবাদ বদলানো যায় না

অস্ত্র দিয়ে আদতে কোনো মতবাদ বদলানো যায় না

Post Views: 47
10 min read

৯/১১ ঘটনায় কোন পক্ষ বা কোন দেশ লাভবান হয়েছে সে প্রশ্ন করলে খুব সাধারণ মানুষ চটজলদি বলবে, লাভের কথা জানি না তবে ক্ষতি হয়েছে আমেরিকার। কিন্তু বিচক্ষণ যাঁরা তাঁরা অন্য কথা বলবেন। কথাটা কী?

মাইকেল মুর নামে আমেরিকান চলচ্চিত্রকারের একটি ছবি ফারেনহাইট ৯/১১। ছবি শুরু হয় ২০০০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিতর্কিত দৃশ্য দিয়ে। দেখানো হয় কীভাবে ফ্লোরিডার বিতর্কিত ভোট গণনা এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে আল গোরকে হারিয়ে জর্জ ডব্লিউ বুশ (২য়) ক্ষমতায় আসেন।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার সেই ভয়াবহ মুহূর্তটি ছবিতে দেখানো হয় কোনো দৃশ্য ছাড়া, কেবল অন্ধকারের মধ্যে বিকট শব্দ ও কান্না দিয়ে। এরপর যখন পুরো আমেরিকা স্তব্ধ এবং দেশের সব বিমান উড্ডয়ন বন্ধ, তখন বুশ প্রশাসনের বিশেষ সহায়তায় ওসামা বিন লাদেনের আত্মীয়সহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সৌদি নাগরিককে বিমান উড়িয়ে নিরাপদে আমেরিকা থেকে বের করে দেওয়া হয়। মুর এখানে বুশ পরিবার এবং সৌদি রাজপরিবারের দীর্ঘদিনের ব্যবসা ও ব্যক্তিগত আর্থিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সে হামলার পর বুশ প্রশাসন কীভাবে আমেরিকার জনগণের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করে তা-ও দেখানো হয়। নাইন-ইলেভেনের সাথে ইরাক বা সাদ্দাম হোসেনের কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও, ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’-এর অজুহাতে ইরাক আক্রমণের পরিবেশ তৈরি করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ থেকে বড় বড় মার্কিন করপোরেট কোম্পানিগুলোর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মুনাফা লুটে নেওয়া। এটা মুরের ধারণা যা তিনি তাঁর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করেছেন। এর পাশাপাশি বাস্তবে কী ঘটেছিল?

৯/১১- এর ঘটনা বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব ব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়েছিল। জাতিপুঞ্জ যা পরে জাতিসংঘ হয়েছিল তা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা, ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার অবসান, নতুন নতুন দেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। তখন বিশ্ব দুই শিবিরে বিভক্ত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বিশ্ব অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। এদের সামরিক জোটও ছিল, একটি ন্যাটো, যা এখনও আছে। অন্য পক্ষের ছিল ওয়ারশ জোট, যা এখন নেই। এর মাঝখানে স্বতন্ত্র ধারার জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন নামে তৃতীয় একটি ধারার জন্ম হয়েছিল।

গত শতকের নব্বই দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। প্রতিষ্ঠিত হয়, আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্য। এই আধিপত্যকে সুসংহত করতে মার্কিনীদের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। বিশ্বের নানা দেশের বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন ৯/১১ ছিল তেমন একটি পরিকল্পনারই অংশ। যদিও এর পক্ষে দালিলিক কোনো প্রমাণ নেই। তবে ৯/১১ পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত কিছু পদক্ষেপের কারণে অনেকে মনে করেন, সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের নামে আমেরিকা কিছু রাষ্ট্রকে ধ্বংস করেছে, কিছুকে হুমকির মুখে রেখেছে। ১১ সেপ্টেম্বর সেই ঘটনার ২৫ বছর পূর্ণ হবে এ বছর। এক প্রজন্মের কাছে ৯/১১ প্রত্যক্ষ স্মৃতি; নতুন প্রজন্মের কাছে এটি ইতিহাস। কিন্তু ২৫ বছর পরও ৯/১১-এর রাজনৈতিক অভিঘাত শেষ হয়নি। বরং প্রশ্নটি এখন আরও বড়।

আমরা জানি, ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ ঘোষণা করে। প্রথম লক্ষ্য হয় আফগানিস্তান, যেখানে আল-কায়েদার নেতৃত্ব অবস্থান করছিল এবং তালেবান সরকার তাদের আশ্রয় দিচ্ছিল। সঙ্গত কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তখন যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়। ১২ সেপ্টেম্বর ২০০১ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতভাবে ১৩৬৮ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে ৯/১১-এর হামলাকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে নিন্দা করে এবং হামলার অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানায়।

অর্থাৎ ৯/১১-এর পরের প্রাথমিক আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ছিল মূলত একটি অভিন্ন অবস্থান, ‘সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সন্ত্রাস মোকাবিলা করতে হবে।’ কিন্তু এটা করতে গিয়ে পক্ষান্তরে আমেরিকাকে এ ধরনের ইনডেমনিটি দেওয়া হল, এরপর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অজুহাত তুলে বিশ্বের যেকোনো দেশে হামলা চালানো একপ্রকার বৈধ হয়ে গেল।

আমরা স্মরণ করতে পারি এরপর আফগানিস্তানে শুরু হওয়া যুদ্ধ প্রায় দুই দশক স্থায়ী হয়েছিল। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করলে তালেবান আবার কাবুলের ক্ষমতা দখল করে। এখানে দেখা যাচ্ছে, দুই দশক যুদ্ধ চালিয়েও আমেরিকা কার্যত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

এরপর আমেরিকা ২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে। যদিও ৯/১১ কমিশনের তদন্তে ইরাক ও আল-কায়েদার মধ্যে কিছু যোগাযোগের উল্লেখ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলায় দুই পক্ষের সহযোগিতার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কমিশনের এক শুনানিতে বলা হয়, দুই পক্ষের যোগাযোগ থাকলেও তা কোনো সহযোগিতামূলক সম্পর্কের পর্যায়ে পৌঁছেছিল— এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

৯/১১ কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের আরেক অংশে বলা হয়, ৯/১১ হামলায় ইরাকের পরিকল্পনা বা সম্পৃক্ততার কোনো ‘কমপেলিং কেস’ পাওয়া যায়নি। সন্ত্রাস নির্মূলের কথা বলে ইরাক আক্রমণ করা হলেও দেখা যায়, পরবর্তী সময়ে আইএসসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের উত্থানের পেছনে ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী অস্থিতিশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে আলোচিত হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলতে চান, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে শুরু হওয়া একটি যুদ্ধ কীভাবে নতুন সন্ত্রাসী শক্তির বিকাশের পরিবেশ তৈরি করতে পারে- ইরাক তার উদাহরণ।

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কোস্ট অফ ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, সিরিয়া ও ইয়েমেনসহ পোস্ট-৯/১১ যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি সহিংসতায় ৯ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৩২ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ। যুদ্ধের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অবকাঠামো ধ্বংসের মতো পরোক্ষ কারণে আরও আনুমানিক ৩৬ থেকে ৩৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে গবেষণাটির হিসাব।

এই হিসাব নিয়ে পদ্ধতিগত বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু সংখ্যা যতই ওঠানামা করুক, একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না—৯/১১-এর পরের যুদ্ধের মানবিক মূল্য ছিল বিপুল। শুধু কি তাই? এই ঘটনার পর বদলে গেছে বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তা কাঠামোও। বিমানবন্দরে কঠোর নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনে নজরদারি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়- সবকিছুই নতুন মাত্রা পায়। যুক্তরাষ্ট্রে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পেট্রিয়ট অ্যক্টের মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি ক্ষমতাও সম্প্রসারিত হয়। একটি রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিককে নিরাপদ রাখা। কিন্তু নিরাপত্তার নামে যদি নাগরিকের গোপনীয়তা, আইনি সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার অতিরিক্ত সংকুচিত হয়, তাহলে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

৯/১১-এর অভিঘাত দক্ষিণ এশিয়াতেও এসে লাগে। আগেই বলেছি আফগানিস্তান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয় আর পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি নিজেও দীর্ঘ সময় ধরে সন্ত্রাসী সহিংসতার শিকার হয়। গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা রাজনীতি বদলে যায়। ৯/১১-এর সময় আল-কায়েদা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত সন্ত্রাসী সংগঠন। ২৫ বছর পরে সন্ত্রাসবাদের চেহারা পাল্টে গেছে।

বড় সংগঠনের পাশাপাশি ছোট নেটওয়ার্ক, অনলাইন উগ্রবাদী প্রচারণা এবং একক ব্যক্তির সহিংসতা এখন নিরাপত্তা বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, একটি সংগঠনকে সামরিকভাবে দুর্বল করা সম্ভব হলেও উগ্র মতাদর্শকে শুধু সামরিক পদ্ধতিতে নির্মূল করা যায় না। ৯/১১-এর বড় শিক্ষা হল এটা।

প্রথমত, সন্ত্রাসবাদ কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। নিরীহ মানুষ হত্যা কোনো আদর্শকে মহৎ করে না।

দ্বিতীয়ত, সন্ত্রাসের জবাবও হতে হবে আইনের শাসনের ভিতরে।

তৃতীয়ত, একটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে পরাজিত করা আর সন্ত্রাসবাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক উৎস দূর করা এক জিনিস নয়।

চতুর্থত, যুদ্ধ শুরু করা সহজ; শেষ করা কঠিন।

আর যুদ্ধ শেষ হলেও তার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক ক্ষত বহু বছর থেকে যায়। ২৫ বছর আগে ৯/১১ আমাদের দেখিয়েছিল সন্ত্রাস কত ভয়াবহ হতে পারে। পরবর্তী ২৫ বছর আমাদের আরও একটি শিক্ষা দিয়েছে— সন্ত্রাসের প্রতিক্রিয়াও ইতিহাস তৈরি করে।

তাই ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ টুইন টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপের দিকে ফিরে তাকানোর পাশাপাশি আমাদের তাকাতে হবে কাবুল ও বাগদাদের দিকেও; দেখতে হবে যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া কীভাবে রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে।
কারণ ৯/১১ শুধু ২,৯৭৭ মানুষের মৃত্যুর ইতিহাস নয়। এটি এমন একটি ইতিহাস, যার একটি সকাল পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল এবং যার প্রতিক্রিয়ার হিসাব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।

৯/১১ আগে থেকে যারা আমেরিকায় বসবাস করে আসছেন তারা ভালো করে জানেন, সেই ঘটনাটি আমেরিকা প্রবাসী মুসলমানদের মধ্যে কী প্রভাব রেখে গিয়েছিল। তাদের জীবনযাত্রা ও মনোজগত কেমন পাল্টে দিয়েছিল। বলাবাহুল্য, আমেরিকান মুসলমানেরা এখন আগের চেয়ে আরও বেশি কট্টরপন্থী হয়ে উঠেছে। যে কথাটি আগেও বলেছি তা দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই, অস্ত্র দিয়ে আদতে কোনো মতবাদ বা বিশ্বাস বদলানো যায় না। যে পথ দিয়ে যাওয়া যেত (মুসলিম দেশসমূহে) আমেরিকা সে পথে হাঁটেনি।

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ এবং কলাম লেখক, কবি, ছড়াকার, গল্পকার, টেলিভিশন উপস্থাপক ও গ্রন্থনাকারী, সাংস্কৃতিক সংগঠক।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।