পড়শী মূল রচনাবলী ৯/১১ — যে দিনটি আমি দেখিনি

৯/১১ — যে দিনটি আমি দেখিনি

Post Views: 189
9 min read

JFK বিমানবন্দরে নেমে দেখলাম মানুষের লম্বা লাইন। দুই ঘণ্টা, নাকি তিন—এখন আর মনে নেই। শুধু মনে আছে পা ব্যথা করছিল, না ঘুমিয়ে চোখ জ্বালা করছিল। পুরো পথে কিছু খেতে পারিনি। চারপাশে অচেনা মুখ। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। সবাই নিজের পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিন মনে হয়েছিল, বড় শহরের বিমানবন্দর বুঝি এমনই হয়।

আমি ৯/১১ দেখিনি। ২০০১ সালের সেই সকালে আমি আমেরিকায় ছিলাম না। টেলিভিশনের সামনে বসে টাওয়ার ভেঙে পড়তে দেখার কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি আমার নেই। সেদিন কে কোথায় ছিল, কে কাকে ফোন করেছিল—এমন কোনো গল্প আমার মনে পড়ে না।

আমার এই বদলে যাওয়া সময়কে চেনার ইতিহাস শুরু হয় সতেরো বছর পরে, ঠিক ২০১৮ তে। আসার আগে আমেরিকা সম্পর্কে যা জানতাম, তার প্রায় পুরোটাই সিনেমা থেকে। ঝলমলে শহর, চওড়া রাস্তা, ঘুরে বেড়ানোর মতো অসংখ্য জায়গা। মানুষ বলত, জীবনটা রোমাঞ্চকর হবে। ভয়ের কোনো তালিকা নিয়ে আমি প্লেনে উঠিনি।

সেই লাইনে আমার পালা এল। অফিসার কাগজপত্র দেখলেন। কোনো অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন না। নাম নিয়ে হোঁচট খেলেন না, বানান জিজ্ঞেস করলেন না, দ্বিতীয়বার তাকালেন না। কয়েক মিনিট, তারপর সিল।

আমি তখন কোনো পরিবর্তন টের পাইনি। অনেক পরে জেনেছি, এই দেশের প্রবেশপথেরও আরেকটা ইতিহাস আছে।

৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিশেষ নিবন্ধনব্যবস্থা চালু হয়েছিল। নির্দিষ্ট কিছু দেশের অস্থায়ী বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য ছিল অতিরিক্ত নিবন্ধন ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা। সেই দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশও ছিল। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নির্দিষ্ট শ্রেণির ষোলো বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশি পুরুষদের বিশেষভাবে নিবন্ধন করতে হয়েছিল।

আমার অভিজ্ঞতাকে অবশ্য এসব কঠোর ব্যবস্থা ছুঁতে পারেনি। ততদিনে সেই ব্যবস্থা কার্যত শেষ হয়ে গেছে। আমার কাছে বিমানবন্দর মানেই পাসপোর্ট, পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তার লাইন, ব্যাগ পরীক্ষা— যেমন হওয়ার কথা, তেমনই। আগের পৃথিবীটা আমি দেখিনি। তবে পরে জেনেছি, আমি যে দরজাটা এত স্বাভাবিকভাবে পেরিয়ে এসেছিলাম, সেই দরজাটা সব সময় সবার জন্য এতটা সহজ ছিল না।

অথচ এই স্বাভাবিকতারও একটা ইতিহাস আছে। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নিরাপত্তাব্যবস্থা আমূল বদলে যায়। যাত্রী পরীক্ষা ফেডারেল ব্যবস্থার অধীনে চলে আসে। পরে আরও কিছু ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় যোগ হয় জুতা খুলে পরীক্ষা, তরল বহনের সীমার মতো নিয়ম।

বছরের পর বছর যাত্রীরা জুতা খুলে নিরাপত্তা পরীক্ষা করিয়েছেন। ২০২৫ সালে সেই নিয়ম আবার বদলে গেছে—জুতা এখন পায়েই থাকে। কিন্তু তরল বহনের সীমা এখনও আছে।

নিয়ম আসে, নিয়ম বদলায়। একটা প্রজন্ম যে নিয়মের জন্ম দেখেছে, পরের প্রজন্ম সেটাকেই স্বাভাবিক জীবন হিসেবে পায়। ইতিহাসের গভীর পরিবর্তনগুলো সম্ভবত এভাবেই কাজ করে। কেউ আর জিজ্ঞেস করে না, দরজাটা একসময় অন্যরকম ছিল কেন। তালাটাই যেন স্বাভাবিক।

এত পরিবর্তনের গল্পের ভেতরে আমারও একটা ছোট্ট স্মৃতি আছে, যেটা ঘটেছিল JFK-তে নামার প্রথম দিন।

সেই লম্বা লাইনের শেষ মাথায় ছিল একটা এসকেলেটর। লাগেজ নিয়ে উঠতে গিয়ে হঠাৎ মাথাটা ঘুরে গেল। সেই মুহূর্তের কথা মনে করলে এখনো অস্বস্তি হয়। নতুন একটা দেশ, চারপাশে কেউ পরিচিত না, শরীরটাও আর টানছে না।

একজন মানুষ হাত বাড়িয়ে দিলেন। মাঝবয়সী, কৃষ্ণাঙ্গ। কোনো প্রশ্ন করলেন না। এসকেলেটর দিয়ে ওঠার পুরো সময়টা আমার হাত ধরে রইলেন। শুধু একবার জিজ্ঞেস করলেন, “You ok?” আমি শুধু বলেছিলাম, “Thank you।”

এইটুকুই। তাঁর নাম জানি না। মুখটাও আজ আর ঠিক করে মনে করতে পারি না। তাঁর কাছে ঘটনাটা হয়তো এতই সামান্য ছিল যে পরের দিন আর মনেও ছিল না। অথচ আমার মনে থাকার কারণটা ভিন্ন— একাকিত্ব, ক্লান্তি আর দীর্ঘ পথের ধকলের সেই মুহূর্তে অচেনা একজন মানুষের বাড়িয়ে দেওয়া হাত।

আমি এমন এক দেশে নেমেছিলাম, যেখানে আগের সতেরো বছরে নিরাপত্তার ভাষা অনেকটাই বদলে গেছে। বিমানবন্দরে তার দৃশ্যমান রূপ— কাগজ, পরিচয়, পরীক্ষা, নিয়ম। আর সেই দেশেই আমার প্রথম অসহায় মুহূর্তে একজন অচেনা মানুষ আমার পরিচয় না জেনেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ব্যবস্থাটা কাগজ দেখতে চায়। মানুষটা চায় না।

বাইরে বেরিয়ে দেখলাম নিকষ রাত। কোনো ঝলমলে শহর না, কোনো চওড়া আলোর রাস্তা না। শুধু অন্ধকার, আর একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাগ তোলা হলো। সেখান থেকেই আমার প্রথম সাবলেটের পথে যাত্রা।

সিনেমার আমেরিকা আর নেমে দেখা আমেরিকা— দুটোর মাঝখানে ওই রাতটুকু। তারপর কেটে গেল পাঁচ বছর। ২০২৩ সালে দেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে নিরাপত্তা পরীক্ষার একপর্যায়ে আমাকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হলো। হিজাবও সরাতে হয়েছিল।

সেদিনও একটা হাত আমাকে ছুঁয়েছিল। কিন্তু এবার সেটা সাহায্যের হাত নয়, যাচাইয়ের হাত। প্রথম মুহূর্তে মনে হয়েছিল, এটা বুঝি আমাকে দেখেই। তারপর পাশে তাকিয়ে দেখলাম, আরেকজন নারীর সঙ্গেও একই প্রক্রিয়া চলছে। তিনি মুসলিম নন; তাঁর মাথার স্কার্ফও সরাতে হলো।

তখন নিজের প্রথম ধারণাটাই সংশোধন করলাম। ব্যাপারটা আমাকে ঘিরে নয়। নিরাপত্তা পরীক্ষার একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই যাচ্ছি আমি।

ঘটনাটা খুব বড় কিছু ছিল না। কিন্তু প্রথমবার নিজের শরীর দিয়ে বুঝলাম— দূর থেকে যে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আমরা শুধু “নিয়ম” হিসেবে দেখি, কোনো একদিন সেই নিয়ম আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যায়।

অবশ্য ৯/১১-এর পরের পৃথিবী শুধু বিমানবন্দরের লাইনে বদলায়নি। এরপর যুদ্ধ এসেছে, নজরদারি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক তৈরি হয়েছে, বদলেছে সীমান্ত ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রের ভাবনা। সেই ইতিহাস অনেক বড়। একটি লেখায় তার সবটা ধরা সম্ভব নয়। আমি তার সবটার সাক্ষীও নই।

আমার কাছে সেই বিশাল ইতিহাসের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপটা বিমানবন্দর। কারণ ইতিহাসের বড় সিদ্ধান্তগুলো সেখানে খুব সাধারণ কিছু নিয়ম হয়ে মানুষের জীবনে নেমে আসে— একটা লাইন, একটা পরিচয়পত্র, একটা ব্যাগ পরীক্ষা।

এসব লিখতে গিয়ে বারবার ফিরে যেতে হয় ২০০১ সালের সেই সকালে। সেদিন প্রায় তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁদের পরিবারের ক্ষতি সত্যি। সেই আঘাতও সত্যি। একটি রাষ্ট্র তার মানুষকে রক্ষা করতে চাইবে— এটাও স্বাভাবিক। ৯/১১-এর পর যে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেটা কোনো শূন্যতা থেকে জন্মায়নি। তার পেছনে ছিল বাস্তব এবং ভয়াবহ একটি ক্ষত।

কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্নগুলো বোধহয় এখানেই শেষ হয় না। নিরাপত্তার জন্য তৈরি একটা ব্যবস্থা কত দূর পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবন বদলে দিতে পারে? একটা জরুরি সময়ে তৈরি নিয়ম কত বছর বেঁচে থাকে? আর কখন একটা প্রজন্ম ভুলেই যায় যে তাদের কাছে যা স্বাভাবিক, সেটা আগের প্রজন্মের কাছে স্বাভাবিক ছিল না?

আজ এমন একটা প্রজন্ম বড় হয়ে গেছে যারা টুইন টাওয়ার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেনি। তাদের কাছে ৯/১১ একটা তারিখ, কিছু ভিডিও ফুটেজ, ইতিহাসের একটা অধ্যায়। কিন্তু তারা যে পৃথিবীতে বড় হয়েছে, সেই পৃথিবীর অনেক নিয়মের ভেতরে ওই দিনটা এখনো বেঁচে আছে।

আমিও তাদেরই একজন। আমি ঘটনাটা দেখিনি। কিন্তু ঘটনাটার পরে তৈরি হওয়া পৃথিবীর অনেক কিছুই তৈরি অবস্থায় পেয়েছি।

তাই ৯/১১ আমার স্মৃতি নয়। ওটা আমার উত্তরাধিকার। প্রতি বছর ১১ সেপ্টেম্বর এলে সরকারি ভবনগুলোতে পতাকা অর্ধনমিত থাকে। দিনটা আমার কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি ফিরিয়ে আনে না— ফিরিয়ে আনার মতো স্মৃতিই আমার নেই। তবু এখন জানি, যে পৃথিবীকে আমি স্বাভাবিক বলে চিনেছি, তার কিছু নিয়মের পেছনে এই দিনটির ছায়া আছে।

সেই উত্তরাধিকারের ভেতরে আমার কাছে দুটো ছবি পাশাপাশি থেকে গেছে। একটা লম্বা লাইন— যেখানে কাগজ দিয়ে প্রমাণ করতে হয় তুমি কে। আর একটা বাড়িয়ে দেওয়া হাত— যেখানে কোনো প্রমাণের প্রয়োজন হয়নি।

সিনেমায় দেখা আমেরিকাটা আমি কোনোদিন ঠিক খুঁজে পাইনি। হয়তো সেই আমেরিকাও কোথাও আছে। কিন্তু আমার আমেরিকা শুরু হয়েছিল একটা অন্ধকার রাতে, একটা লম্বা লাইনে, আর একজন অচেনা মানুষের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে।

আট বছর পরে, যখন এই দেশটা নিয়ে ভাবি, সবার আগে মনে পড়ে সেই এসকেলেটরটাই।

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শার্লট, নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। স্মৃতি, মানুষ ও জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।