পড়শী প্রবাসীর জীবন শূন্যতা কিংবা পূর্ণতার হিসাব-নিকাশ

শূন্যতা কিংবা পূর্ণতার হিসাব-নিকাশ

Post Views: 175
7 min read

ইদানিং বাংলাদেশে কারো সাথে কথা হলে মনে হয় যেন দেশের মানুষ ভালো নেই। অর্থনৈতিকভাবে অনেকেই স্বাবলম্বী হলেও দুর্নীতি, নিরাপত্তা সংকট এবং আস্থাহীনতা যেন প্রতিনিয়ত সকলকে তাড়া করে চলছে। দেশ ছাড়তে পারলেই যেন রক্ষা পাওয়া যাবে এমনটাই চায় সবাই। একটা সময় ছিল মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত মানুষ বিদেশ যাবার ইচ্ছে পোষন করতো জীবিকা নির্বাহ করার জন্য। উচ্চবিত্তরা বিদেশ ভ্রমন করার জন্য যেত। কেউ কেউ আবার উন্নত দেশে স্থায়ীভাবেব বসবাসের ইচ্ছেতেও এসেছেন। তবে দেশে থাকাটা কারও জীবনে এতটা বিষিয়ে উঠেনি। বর্তমানে দেখা যায় সবাই যেন বিষিয়ে উঠেছেন। দেশ অর্থনৈতিকভাবে আগের চাইতে অনেক বেশী স্বচ্ছল। তারপরও কেন এই বিষিয়ে উঠা। সবাই কেন দেশ ছাড়ার জন্য পথ খুঁজছেন? সেটি কি কেবল দুর্নীতি, নিরাপত্তা সংকট এবং আস্থাহীনতা! নাকি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ফলে উচ্চাকাঙ্খার কারনে দেশ ছাড়ার সুযোগ খুঁজছেন?

নতুন প্রজন্মের মাঝে এমন মনোভাব দেখা যাচ্ছে, যেন কাড়ি কাড়ি টাকা হলেই সব সুখ কিনে নেয়া যাবে। ফলে সে টাকা যেভাবেই আসুক না কেন। ইন্টারনেট কিংবা ফেসবুকের কল্যানে বিদেশে চাকচিক্য সহজেই দেখা যায়। দেশ থেকে যারা বিদেশে এসেছেন, তারাও তাদের হাস্যোজ্জ্বল ছবিই শেয়ার করেন ফেসবুকে। এর মাঝে কেউ কেউ যদি কান্নাজড়িত কন্ঠে নিজেদের সত্য জীবন তুলেও ধরেন, দেশে থাকা মানুষগুলোর টাকার নেশা এতটাই প্রবল যে সেই কান্নাগুলোকে নাটক মনে হয়।

সম্প্রতি দেশে যাবার সময় সৌদি আরবে এক দিনের যাত্রা বিরতি নিয়েছিলাম। জেদ্দা এয়াপোর্ট থেকে বের হতেই ট্যাক্সী চালকরা সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ এয়ারপোর্টেও এতটা হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখা যায় না ট্যাক্সী চালকদের। এই রকম পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায় বিদেশে আসা মানুষগুলো কাজের জন্য মরিয়া হয়ে আছেন। আসলেই কাজ পাওয়া যাবে সেই সুযোগটুকু নেই। আমার এক বন্ধুও সম্প্রতি সৌদিতে গিয়েছিলেন। তিনি আরো কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা মানুষের চিত্র দেখে এসেছেন। মক্কা শরীফ-এর কাছে দেশ থেকে নতুন আসা একজনের সাথে দেখা হয়েছে তার। যিনি বিভিন্ন কোম্পানীর তরফ থেকে হাজীদের মাঝে বিনমূল্যে খাবার বিতরন করা খাবার খেয়ে বেচে আছেন ৩ মাস ধরে। সেদিন খাবার মিলেনি তাই সকাল থেকে না খেয়ে আছেন।

এ না হয় গেল কাজ পাওয়া না-পাওয়ার বিষয়। জেদ্দা এয়ারপোর্ট থেকে মক্কায় যাওয়ার ট্যাক্সী ভাড়া, সেখানকার খাবার খরচগুলো অনেকটা আমেরিকার মতই ব্যয়বহুল। আমেরিকা থেকে গিয়েছি বলে এতটা সমস্যা না হলেও বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষগুলোর কথাই বার বার মনে পড়েছে। তারা কিভাবে সেখানে তাদের দিনাতিপত করাছেন এবং দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশে যাবার জন্য জেদ্দা এয়ারপোর্টে বেশ কিছু সময় থাকতে হয়েছে। দুষ্টুমির ছলে আমি আমার ছেলেকে বলেছিলাম দুপুরে তো খাওয়া হয়েছেই, আর তো খেতে হবে না তাহলে। আমার ছেলে আমাকে জবাব দিয়েছিল, এত এত রেস্টুরেন্ট সামনে থাকতে না খেয়ে থাকা যাবে কি!

কথাটি আসলেই সত্য। সামনে এত খাবারে দোকান, নিজেকে কিভাবে সামলে রাখা যায়। এরপরই দৃষ্টি গেল- এয়ারপোর্টের বাথরুম পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য স্থায়ী কর্মচারী রাখা আছে। তারা এসেছেন বাংলাদেশ কিংবা ইন্ডিয়া অথবা পাকিস্থান থেকে। সেখানে কথা হলো একজন বাঙ্গালী ভাইয়ের সাথে। কাজ কেমন, উপার্জন কত হয়- জানতে চাইলে যে বেতনের কথা জানলাম তা দিয়ে নিজেদের চোখ বন্ধ করে চলা ছাড়া সৌদিতে থাকার মত উপায় থাকবে না। মানুষগুলো তাদের কাজের জায়গা থেকে একটুও বের হচ্ছেননা। কাজ না থাকলেও ঠাই বসে থাকেন সেখানেই। বের হলেই তো সামনে নানা ধরনের খাবার কিংবা আকর্ষনীয় জিনিসপত্রের বাহার। কতক্ষণই বা নিজেকে সামলে রাখবেন!

এ না হয় গেল মধ্যপ্রাচ্যের নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের গল্প। উন্নত বিশ্বে যারা আসতে পেড়েছেন, নানাভাবে দেশের মানুষের সামনে সবসময় তুলে ধরার চেষ্টা করেন তারা কতটা লাকি। উন্নত জীবন-যাপন করছেন। তারা কি সত্যিই ভাল আছেন? এই তো সেদিন আমার আরেক বন্ধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন- “প্রবাসজীবন আমার জন্য ছিল এক ভয়াবহ অভিশাপ – নি:সঙ্গতা, বিচ্ছেদ আর অদৃশ্য এক শূন্যতার দীর্ঘ অধ্যায়”। তিনি আমেরিকায় থাকেন, পরিবার পরিজন নিয়ে বেশ ভালই আছেন। তারপরও যেন এক অজনা শূন্যতা ঘিরে আছে সারাক্ষণ।

খাবারের সংকট নেই, গাড়ি-বাড়ি সবকিছুই থাকা সত্ত্বেও দেশ ছেড়ে আসার বেদনা। এই বেদনা যে কেবল বিদেশে আসা মানুষগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ তা নয়। গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা মানুষগুলোর মাঝেও একই রকম হাহাকার শোনা যায়। তারা হয়তো নিজ জন্মভূমিতে প্রায় সময় যাবার সুযোগ পান, কিন্তু যে গ্রামে আমরা সবাই বেড়ে উঠেছি, সেই গ্রাম তো আর আগের মত নেই।

তাই তো কবি নুরুদ্দিন জাহাঙ্গীর লিখেছেন – “আমার কোনও গ্রাম নেই”। কবিতায় তিনি লিখেছেন –

“যে গায়ে আমার জন্ম হয়েছিল,
সে গ্রামটি আমি হারিয়ে ফেলেছি
কোথায় কখন হারিয়েছি, জানতেও পারিনি
যে গাঁয়ের কথা আমার মনে আছে,
সেই গাঁ আর কোনও খানেই খুঁজে পাই না!

কেউ কেউ বলতে চায়, গ্রাম হারিয়ে যায়নি,
আসলে তুমিই হারিয়ে গেছ!
যারা গাঁও ছাইড়া চইলা যায়
তারা হারাইয়া যায়।
আর কোনও দিন গাঁয়ে ফিরে আয় না।

আমি গ্রামে ফিরে এসেছিলাম।
কিন্তু ফিরে এসে আর আমার গ্রাম ফিরে পাইনি।…”

এই কবিতাটি মন ছুয়ে যায়। এর কারন আমরা যারা নিজ জন্মভূমি ছেড়ে অনেক দূরে পাড়ি জমিয়েছি; প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি অনেক কিছু থাকা সত্ত্বেও এই হাহাকার আমাদের সবার মাঝেই শূণ্যতা কিংবা পূর্ণতার হিসাব-নিকাশ বার বার নাড়া দিয়ে যায়। দেশে থাকা মানুষের মানোভাব এবং প্রবাসে থাকা মানুষের হাহাকার যেন “নদীর এপার বলে ছাড়িয়া নি:শ্বাস, ওপারেতে সর্ব সুখ আমার বিশ্বাস” প্রবাদ বাক্যটির বাস্তব রূপ বলেই মনে হয়।

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জার্মানটাউন, ম্যারীল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র

সফটওয়্যার অটোমেশন আর্কিটেক্ট, সমাজকর্মী ও সংগঠক। প্রেসিডেন্ট, আগামী।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।