পড়শী নিয়মিত কলাম বাংলাদেশে আশার ঘাটতি – লড়াই এখনো বাকি

বাংলাদেশে আশার ঘাটতি – লড়াই এখনো বাকি

Post Views: 25
8 min read

সরকার বদলেছে। ভোটও হয়েছে। কিন্তু বিপদে পড়লে রাষ্ট্র পাশে দাঁড়াবে— এই সহজ বিশ্বাসটুকু কি ফিরেছে?

সম্প্রতি বাংলাদেশে গিয়ে বন্ধু-স্বজন, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। বিপ্লব-পরবর্তী দেশের নাড়ির স্পন্দন বোঝার চেষ্টা ছিল। তাঁদের অনেকের কথায় যে সুরটি বারবার ফিরে এসেছে, তা আনন্দের নয়, হতাশার। পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু জীবন বদলাবে— এই ভরসা আসেনি। মনে হলো, নতুন বাংলাদেশে সবচেয়ে দুর্লভ জিনিসটির নাম আশা।

আমার পরিচিতজনদের অভিজ্ঞতা দিয়ে গোটা দেশের মনোভাব মাপা যায় না। তবু তাঁদের কথাগুলো উড়িয়ে দেওয়ারও উপায় নেই। ছাত্রদের নেতৃত্বে এক ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছে। তারপর নির্বাচিত সরকার এসেছে। এত বড় পরিবর্তনের পরও মানুষ যদি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে না পারে, তাহলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কোথায় আটকে গেল, সে প্রশ্ন করতেই হয়।

গ্যাসের জন্য রাত জাগা, বিদ্যুতের আসা-যাওয়া, সংসারের বাড়তি খরচ— এসব দুর্ভোগ মানুষকে ক্লান্ত করে। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা তার চেয়েও গভীরে আঘাত করে। আগামীকাল নিজের ঘর, কর্মস্থল কিংবা সন্তানের চিকিৎসাকেন্দ্র অক্ষত থাকবে কি না, সেই নিশ্চয়তাটুকু না থাকলে আশাবাদী হওয়ার কারণ মানুষ কোথায় পাবে?

দুটি ঘটনা যে প্রশ্ন এনেছে

গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুরের রাড্ডা মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলা সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। প্রায় দুই শতাধিক হামলাকারী সেখানে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে ওষুধ, টিকা ও যন্ত্রপাতি লুট করেছে। ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে। ১৯৭৪ সাল থেকে নিম্ন আয়ের মা ও শিশুদের সেবা দিয়ে আসা একটি প্রতিষ্ঠান এভাবে আক্রান্ত হলো। পুলিশ খবর পেয়েছিল; পুলিশ উপস্থিত থাকার সময়ও হামলা থামেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুই দিন পর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা হয়। সেই প্রকল্পে থাকা সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতেও ভাঙচুর ও লুটপাট চলে। জমি নিয়ে বিরোধের কথা এসেছে, চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে। কোন অভিযোগ কতটা সত্য, তদন্তে তা নির্ধারিত হবে। কিন্তু বিরোধ থাকলেই দলবল নিয়ে এসে ভাঙচুর করার অধিকার কেউ পেয়ে যায় না।

এরপর সালমানের বক্তব্যে যে তিক্ত পরিহাস শোনা গেল, তার মর্মার্থ: চিন্তার কিছু নেই, বাংলাদেশে এসবই এখন ‘নরমাল’।

এই ‘নরমাল’ কথাটিই সবচেয়ে অস্বস্তিকর। অপরাধ ঘটছে— এ এক বিপদ। অপরাধ ঘটবে, আর প্রতিকার পাওয়া যাবে না— মানুষ এমন ধরে নিচ্ছে, এ আরও বড় বিপদ। প্রথমটি আইনশৃঙ্খলার সংকট। দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রের ওপর আস্থার সংকট।

আমি এ অবস্থাকে বলতে চাই ‘আশার ঘাটতি’। কথাটি দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক সূচক দাবি করছি না। বোঝাতে চাই এমন এক অভিজ্ঞতা, যেখানে মানুষ নিজের অধিকার জানে, কিন্তু সেই অধিকার আদায় করা সম্ভব বলে আর বিশ্বাস করতে পারে না।

গণতন্ত্রের ঘাটতি বনাম আশার ঘাটতি

গণতন্ত্রের ঘাটতি শুধু ভোট না থাকার নাম নয়। ভোট থাকলেও প্রতিনিধিত্ব, স্বাধীনতা ও জবাবদিহি দুর্বল হলে সেই ঘাটতি থেকে যায়। আশার ঘাটতি এর সঙ্গে যুক্ত, তবে তার প্রশ্নটি মানুষের আরও কাছের: আমি অভিযোগ করলে কেউ শুনবে তো? ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে আইন আমার পাশেও থাকবে তো? প্রতিবাদ করলে অবস্থার বদল হবে, নাকি বিপদ আরও বাড়বে?

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিচার করতে গেলে উদ্বেগের সঙ্গে পরিবর্তনের লক্ষণও দেখতে হবে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির ৩ অক্টোবর প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে ৩৫টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৯ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। আগস্টে ৫৩টি ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ২৮ জন। রাজনৈতিক সহিংসতায়ও সেপ্টেম্বরের সংখ্যা আগস্টের তুলনায় কিছুটা কমেছে: ৬৮টি ঘটনায় ৪ জন নিহত ও ৫২৭ জন আহত হয়েছেন।

এই হ্রাস স্বস্তির কারণ। কিন্তু এক মাসের হ্রাস দিয়ে নিরাপত্তা ফিরেছে বলা যায় না। সংখ্যাগুলো সংস্থাটির সংবাদমাধ্যম ও নিজস্ব তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ; সব অপরাধের পূর্ণ হিসাব নয়। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিটি ঘটনার পেছনে এমন মানুষ আছেন, যাঁর জীবনে ক্ষতির হিসাব কোনো মাসিক তুলনায় মেটে না।

রাড্ডা ও স্টুডিওর ঘটনায় জনরোষের পর কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাড্ডায় হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠা বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ১ অক্টোবর পদত্যাগ করেছেন। নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলার মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে ৩০ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। ৫ অক্টোবর আদালত তাঁকে জামিন দিয়েছেন।

নিরাপত্তার অধিকার

এখানে দুটো কথা পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। পদত্যাগ বিচার নয়। আবার জামিন পাওয়া মানেই অভিযোগ থেকে মুক্তি নয়; জামিনের সিদ্ধান্তকে নিজে থেকেই বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রমাণ বলাও ঠিক হবে না। আসল পরীক্ষা সামনে: তদন্ত নিরপেক্ষ হবে কি না, প্রমাণ আদালতে পৌঁছাবে কি না এবং দায় প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের পদমর্যাদা তাঁকে রক্ষা করবে কি না।

জনচাপের পর রাষ্ট্রের এই নড়াচড়া গুরুত্বহীন নয়। সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো যায়। কিন্তু মানুষকে প্রশ্ন করতে হবে, ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রতিবারই এত হইচই লাগবে কেন? যাঁর পরিচিতি নেই, ফেসবুকে অনুসারী নেই, সংবাদমাধ্যমে পৌঁছানোর পথ নেই— তাঁর অভিযোগের কী হবে?

ভাইরাল হওয়ার ক্ষমতা নাগরিকের নিরাপত্তার শর্ত হতে পারে না।

রাড্ডার স্বাস্থ্যকর্মীরা এর মধ্যেও সীমিত পরিসরে সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। ৪ অক্টোবরের সংবাদে দেখা যাচ্ছে, মেরামতের কাজ চলার মধ্যেই শিশুদের টিকা ও নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে; প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কক্ষ পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। এই দৃশ্যটিও মনে রাখা দরকার। যারা ভেঙেছে, তাদের শক্তি আছে। যারা ভাঙার পরও সেবা দিয়ে যাচ্ছে, তাদেরও শক্তি আছে। দ্বিতীয় শক্তিটিই আমাদের আশার ভিত্তি।

তবে সেই সাহসকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত করা চলবে না। নাগরিকেরা প্রতিবাদ করবেন, সাংবাদিকেরা অনুসন্ধান করবেন, স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবা চালাবেন— আর রাষ্ট্র করতালি দেবে, এমন ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে পুনরুদ্ধার, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা, তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য এবং দায়িত্বে অবহেলার জবাবদিহি— এসবও চাই।

আশার ঘাটতি বাড়তে থাকলে বিপদ শুধু মানুষের মন খারাপের মধ্যে আটকে থাকে না। মানুষ গণতান্ত্রিক পথে প্রতিকার পাওয়ার বিশ্বাস হারালে এমন এক নেতার প্রতিশ্রুতিতেও আকৃষ্ট হতে পারে, যিনি বলবেন, আমাকে ক্ষমতা দিন, সব ঠিক করে দেব। স্বৈরশাসন বিদায় করার পর তার জন্য নতুন দরজা খুলে দেওয়ার চেয়ে দুঃখজনক পরিণতি আর কী হতে পারে?

হাল ছেড়ো না বন্ধু

ব্রাজিলের শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে লিখেছিলেন, ন্যূনতম আশা ছাড়া সংগ্রামই শুরু করা যায় না। তাঁর কাছে আশা হাত গুটিয়ে ভালো দিনের অপেক্ষা নয়। আশাকে কাজে পরিণত করতে হয়। বাংলাদেশের মানুষ সে কাজ করতে জানে; গণ-অভ্যুত্থানে তার প্রমাণ দিয়েছে, সাম্প্রতিক প্রতিবাদেও দিচ্ছে।

এখন প্রয়োজন সেই প্রতিবাদকে স্থায়ী জবাবদিহির দাবিতে রূপ দেওয়া। একজন সংসদ সদস্য সরে গেলেন, একজন অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হলেন— এখানেই নাগরিকের কাজ শেষ নয়। আবার প্রতিটি মামলার পেছনে নাগরিককে পাহারা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, সেটিও সুস্থ রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়। আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান চাই, যা জনরোষের অপেক্ষা না করেই দায়িত্ব পালন করবে।

ভোটে সরকার বদলায়। মানুষের আশা ফেরে যখন সে দেখে, আইনও তার জীবনে কাজ করছে।

বাংলাদেশের বিপ্লবকে তাই ভোটের পরের লড়াইটিও জিততে হবে। নিরাপত্তা কোনো অনুগ্রহ নয়, বিচার কোনো সৌভাগ্য নয়। রাষ্ট্রের কাছে এ দুটো পাওয়ার জন্য নাগরিককে বিখ্যাত হতে হবে না— নাগরিক হওয়াই যথেষ্ট।

৬ অক্টোবর, ২০২৬

নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক ও সাংবাদিক। সর্বশেষ প্রকাধিত গ্রন্থ: ভুট্টোর তওবা ও মুক্তিযুদ্ধের নানাদিক (প্রথমা, ঢাকা, ২০২৪)


Previous
Next

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।