তানভীর মোকাম্মেল কাহিনী ও প্রামাণ্যচিত্র মিলিয়ে মোট চব্বিশটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তানভীর মোকাম্মেল দশবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন এবং ২০১৭ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা “একুশে পদক” লাভ করেন। তানভীর মোকাম্মেল বর্তমানে “বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট”-য়ের পরিচালক।
পড়শী: “লালসালু”, “লালন” – আমাদের দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক নিদর্শন। ভন্ডপীরের মুখোশ উন্মোচনের সেই গল্প, বাউলদের মানব প্রেমের বিরুদ্ধে বিরোধিতা, এত বছর পর বিভীষিকার মত আমাদের মাঝে ফিরে এল। ২০২৪-২০২৫ এ আমরা দেখলাম পীর, মাজার, বাউল, সাধক এদের উপর সহিংসতা। এই বিষয়ে আপনার ডায়েরিতে কি লিখবেন? আপনার ডায়েরি প্রকাশিত হয়েছে কয়েক বছরের, সেই সুবাদে জানতে চাচ্ছি।
তানভীর মোকাম্মেল: উনিশ শতকের বেঙ্গল রেনেঁসার ফলে বাঙ্গালী সমাজে চেতনার যে বিকাশ ঘটেছিল তা বাঙ্গালী মুসলমান সমাজের উপর তেমন অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারেনি। বিশেষ করে গ্রামীণ মুসলমানদের মধ্যে। তাদের মনোজগত আচ্ছন্ন করে ছিল পীর, ফকির, ধর্মের নামে নানা কুসংস্কার ও ধর্মব্যবসায়ীরা। আর এখন তো ওয়াজ মাহফিল ছাড়া বাংলাদেশের গ্রামে কোনো সাংস্কৃতিক তৎপরতাই তেমন নেই।
আর বাউল-ফকিরদের কথা যদি বলেন তো বলব যে বাউলদের যে মানবপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িকতা তার উৎস ছিল মূলত: তিনটে- বৌদ্ধ দেহতত্ত্ববাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া মানবতাবাদ ও ইসলামী সুফীবাদ। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ও মধ্যপ্রাচ্যের অর্থপুষ্ট হয়ে বাংলাদেশে ওয়াহাবী ইসলামের যে ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে তার ফলে সমাজে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবাদের চর্চা ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এদেশে ইসলাম হয়ে উঠেছে অনেকটাই “পলিটিক্যাল ইসলাম”। আর তার পেছনে রয়েছে মার্কিন অর্থ, পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নানা গোয়েন্দা বাহিনীর তৎপরতা, এনজিওদের ক্ষমতা-লিপ্সা ও একশ্রেণীর সুশীলদের ডলারের কাছে নিজেদের বিকিয়ে দেওয়া। এ সব কিছুর যোগফল আমরা দেখেছি ২০২৪-২০২৫ সালের ঘটনাবলীর মধ্যে। আমার ডায়েরীতে আমি এসব লিখেছি। এখনও লিখছি।
পড়শী: আপনার কাজে আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব কি কোনো পরিবর্তন এনেছে? মানুষের মনোযোগ কমে এসেছে, বেশীর ভাগ মানুষই এখন গভীর ভাবনায় সময় দিতে অপারগ। আপনি এই নতুন সময়ের সঙ্গে কেমন করে খাপ খাওয়াচ্ছেন?
তানভীর মোকাম্মেল: সিনেমা চিরকালই ছিল প্রযুক্তিগত মাধ্যম। প্রত্যেক যুগের ফিল্ম-মেকাররাই সে যুগের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন। আমরাও করছি। চীনা ভাষায় “সঙ্কট” ও “সম্ভাবনা” একই শব্দ। যা “সঙ্কট”, সেটাই আবার “সম্ভাবনা”-ও। সিনেমার ক্ষেত্রে নতুন যে প্রযুক্তি এসেছে, ডিজিটাল সিনেমা ও ছবি এডিটিংয়ের ক্ষেত্রে নানা রকম আধুনিক সফটওয়ার, সেগুলো আমরা ব্যবহার করছি। আমাদের টেকনিশিয়ানরা ক্রমশ: এসব আধুনিক প্রযক্তি ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে উঠছে। ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জন্যে কোনো সমস্যা নয়। বরং সহায়ক।
আর দ্বিতীয় যে বিষয়টা আপনি বললেন সেই মানুষের মন:সংযোগ কমে যাওয়া, ADS বা Attention Deficiency Syndrome, আজ দুনিয়াজুড়েই এক সমস্যা। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। তারা স্বল্পদৈর্ঘ্যরে রীল ও টিকটক দেখতে অভ্যস্থ হয়ে পড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে কিছু দেখার ধৈর্য্য তাদের তেমন থাকে না। আর কর্পোরেট পুঁজি মানুষকে ওরকমই বানিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু আমি মানুষের উপর আস্থা রাখি। মানুষ কেবলই পণ্যভোগী একটা জীব নয়। তার ভেতরে একটা গভীর চিন্তাশক্তির সত্ত্বাও রয়েছে। অন্যথায় মানব-সভ্যতা এতটা পথ এগোতে পারত না। আমার শিল্পকর্মে আমি মানুষের ওই গভীরতর বোধের কাছে আবেদন রাখতে চাই। এবং কিছুটা বোধহয় সফলও হয়েছি। আপনি খোঁজ নিলে দেখবেন আমার “নদীর নাম মধুমতী”, “চিত্রা নদীর পারে”, “লালসালু”, “লালন”, প্রামাণ্যচিত্র “সীমান্তরেখা”, এসব বড় বড় দৈর্ঘ্যরে ছবিগুলোও এখনও লক্ষ লক্ষ দর্শক নিয়মিত দেখে থাকেন। আর তাদের মধ্যে প্রচুর তরুণ-তরুণীও রয়েছে। ফলে আমি অতটা উদ্বিগ্ন নই।
পড়শী: প্রযুক্তির প্লাবনে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক সিনেমার ভবিষ্যৎ কি বলে মনে করেন?
তানভীর মোকাম্মেল: সিনেমা যখন ৩৫ মি:মি: থেকে ডিজিটাল হোল তখন বিকল্পধারার নির্মাতারা, যারা অপেক্ষাকৃত বেশী শিক্ষিত ও techno savvy, তারা দ্রুতই ডিজিটাল ফর্মাটে ছবি নির্মাণের দক্ষতাটা অর্জন করে ফেললেন। কিন্তু মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের নির্মাতারা নিজেদের প্রযুক্তির জ্ঞানকে upgrade করতে ব্যর্থ হলেন। ফলে তারা ডাইনোসরের মতো হারিয়ে যেতে থাকলেন। তাছাড়া কেবল সিনেপ্লেক্সগুলো ছাড়া বাংলাদেশের সাধারণ সিনেমাহলগুলো তো ডিজিটাল মাধ্যমে চলচ্চিত্র দেখানোর উপযুক্ত নয়। ফলে বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির প্লাবনে বাংলাদেশের পুরনো ধারার বাণিজ্যিক সিনেমার তেমন কোনো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আমি দেখি না।

পড়শী: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সৃজনশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি?
তানভীর মোকাম্মেল: হয়তো কিছুটা। তবে এ ব্যাপারে শেষ কথা বলার সময় এখনও আসেনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের অনেক সৃজনশীল কাজকে সহজ করে দিচ্ছে বটে, তবে বুঝতে হবে এই কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা আবার মানুষই সৃষ্টি করেছে। এবং মানুষের বৃদ্ধিমত্তা এবং emotional intelligence, যা সৃজনশীলতার অপরিহার্য্য অংশ, সে ব্যাপারে যে কোনো প্রযুক্তির চেয়ে মানুষের মস্তিষ্ক সব সময়ই এগিয়ে রইবে।
পড়শী: বাংলাদেশে সংস্কৃতি চর্চা কি কেবল ঢাকামুখী? নতুন প্রজন্মের যে বিপুল সংখ্যক মাদ্রাসা শিক্ষায় বেড়ে উঠছে, তাদেরকে আমরা ধর্ম শিক্ষার পাশাপাশি কি করে বাঙালি সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত করব?
তানভীর মোকাম্মেল: আমি মনে করি না বাংলাদেশে সংস্কৃতি চর্চা কেবল ঢাকামুখী। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা ও মফস্বল শহরে অসংখ্য সঙ্গীত স্কুল, গায়ক-গায়িকা, নাট্যকর্মী এরা রয়েছেন। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের ঢাকাসহ অন্যান্য জায়গার সব ধরণের সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংস্কৃতি কর্মীরাই এক সঙ্কটের মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪-২০২৫-য়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে।
আর দেশের যে প্রায় তিরিশ ভাগ ছাত্রছাত্রী মাদ্রাসায় লেখাপড়া করছে তাদেরকে আবার বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে ফিরিয়ে আনা খুবই, খুবই কঠিন এক কাজ। আমার বিবেচনায় আগামীতে এটাই হবে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে সবচে বড় চ্যালেঞ্জ। এক মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে।
পড়শী: বাংলাদেশের চলচিত্রে সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের কথা কি যথাযথভাবে উঠে এসেছে বলে মনে করেন? যদি অভাব হয়ে থাকে, আমাদের করণীয় কি?
তানভীর মোকাম্মেল: বাংলাদেশে তিন ধরণের সংখ্যালঘু রয়েছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু- বাঙ্গালী হিন্দু। নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু- চাকমা, মার্মা। ভাষিক সংখ্যালঘু- অবাঙ্গালী বা বিহারী মুসলমান। আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন যে এই তিন ধরণের সংখ্যালঘুদের নিয়েই আমার সিনেমা রয়েছে। বাঙ্গালী হিন্দুদের দু:খ-কষ্ট নিয়ে- “চিত্রা নদীর পারে” বা “সীমান্তরেখা”, পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের নিয়ে- “কর্ণফুলীর কান্না” এবং বিহারী মুসলমানদের নিয়ে- “স্বপ্নভূমি”। তবে সামগ্রিকভাবে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলো নিয়ে চলচ্চিত্রের সংখ্যা বাংলাদেশে বেশ কম। এ ব্যাপারে নির্মাতাদের আরো বেশী সংবেদনশীল হওয়া কাম্য। কাম্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও।

পড়শী: বাংলাদেশ সেন্সর বোর্ড আগের চেয়ে সাহসী হয়ে উঠেছে (যদিও রাজনৈতিক বিষয় মোটামুটি অনুপস্থিত) নারী পুরুষের সম্পর্ক, যৌনতা, সহিংসতা এইসব বিষয়ে। একি শুধু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দর্শক আকর্ষণ করতে?
তানভীর মোকাম্মেল: বাণিজ্যিক সিনেমার একটা চাপ থাকে সেন্সর বোর্ডের উপর যেন তাদের অপেক্ষাকৃত অশ্লীল ও যৌনাত্মক দৃশ্যগুলো কম সেন্সর করা হয়। অনেক সময়ই সেন্সর বোর্ড তাদের সে চাপের কাছে নতি স্বীকার করে থাকে। এ ব্যাপারে দুর্নীতিরও কিছু অভিযোগ রয়েছে। তবে আমরা যেহেতু এ ধরণের ছবি তৈরী করি না ফলে আমাদের কাছে ওগুলো কোনো ইস্যু নয়। আমরা বিকল্পধারার নির্মাতারা মূলত: ভুগি রাজনৈতিক কারণে সেন্সরের দ্বারা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য ছবি সেন্সর বোর্ডের দ্বারা বাঁধাগ্রস্থ হয়েছে। আমার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক “নদীর নাম মধুমতী” ছবিটা সেন্সর বোর্ড দশ জায়গায় কাটতে বলেছিল। আমি আমার ছবির একটা ফ্রেমও কাটতে রাজী ছিলাম না। ফলে আমি হাইকোর্টে রীট করি এবং হাইকোর্টের আদেশে ছবিটা মুক্তি পায়। ইতিমধ্যে আমার জীবন থেকে দু’টো বছর নষ্ট হয়ে যায়! একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাগাড়ী-বাঙ্গালী সমস্যা নিয়ে আমার তৈরী “কর্ণফুলীর কান্না” প্রামাণ্যচিত্রটাও সরকার নিষিদ্ধ করে। এ ছবিটাও আমাকে হাইকোর্টে রীট করে ছাড়াতে হয়েছিল। ফলে রাজনৈতিক সেন্সরের ক্ষেত্রে সেন্সর বোর্ডের সঙ্গে আমাদের একটা দীর্ঘ সংগ্রাম রয়েছে এবং আমার ধারণা সে লড়াই চলতেই থাকবে।
পড়শী: বিশ্বব্যাপী বাংলা সিনেমার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কি করণীয় বলে মনে করেন?
তানভীর মোকাম্মেল: বাংলাদেশের অধিকাংশ সিনেমারই মান এতটা ভালো নয় যে তা বিশ্বে দেখানোর মতো। কারিগরী ও শৈল্পিক উভয় দিক থেকেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মান বেশ দুর্বল। আসলে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রগুলো অধিকাংশই হচ্ছে ভারতের বলিউড বা তামিল ছবির গরিবী সংস্করণ। বিদেশীরা সেসব সিনেমা কেন দেখতে যাবে যখন তারা মূল চলচ্চিত্রগুলোই দেখতে পাচ্ছে? বরং বাংলাদেশে বিকল্পধারায় যে মাঝে মাঝে হাতে গোণা কিছু জীবনঘনিষ্ঠ ছবি তৈরী হয়, যে সব ছবিতে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কতিক দিকগুলো অনেকটাই ফুটে ওঠে, বাংলাদেশটাকে খুঁজে পাওয়া যায়, এ ধরণের কিছু ছবির হয়তো বিদেশে কিছু চাহিদা থাকলেও থাকতে পারে। তবে সে ধরণের সিনেমার সংখ্যা আবার বেশ কম। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের এক ব্যাপক সংখ্যক মানুষ বিদেশে বাস করেন। লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, ডালাস, টরেন্টো, সিডনী এসব শহরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংখ্যা প্রচুর। তাঁরা উদ্যোগ নিলে কিছু বাংলাদেশী ছবি হয়তো বিদেশে দেখানো যেত। এতে তাঁদের পরিবারের দর্শকেরা উপকৃত হতেন এবং বিদেশীরাও বাঙ্গালী সংস্কৃতির কিছুটা স্বাদ পেত।
৭ মে, ২০২৬



বাংলাদেশের আধুনিক চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র তানভীর মোকাম্মেল-এর সাথে এই সাক্ষাৎকারটি পড়শী’র পক্ষ থেকে নিয়েছেন ড. জাকিয়া আফরিন। সহায়তা করেছেন নর্থ ক্যারোলিনা থেকে আমজাদ আলমামুন এবং ওরেগান থেকে এহসান নাজিম।
