রূপালী পর্দার বিবর্তন

কুবলেশ্বর ত্রিপুরা
May 17, 2026
12 views
35 mins read

লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় প্যারিসে বাণিজ্যিকভাবে বায়োস্কোপ প্রদর্শনী শুরু করেন ১৮৯৫ সালের ২৮শে ডিসেম্বর। ঠিক এর পরের বছরেই ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, একটি কলকাতায় এবং অন্যটি ঢাকার ক্রাউন থিয়েটারে। কলকাতার ব্র্যাডফোর্ড বায়োস্কোপ কোম্পানির এই প্রদর্শনীতে ছিল সংবাদ, ছোট ছোট ফিচার, রানী ভিক্টোরিয়ার ফুটেজ, গ্রীক ও তুর্কি বাহিনীর যুদ্ধ। তখনকার দিনের তুলনায় টিকেটের দাম ছিল চড়া – আট আনা থেকে তিন টাকা। পরে ভোলা, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, রাজবাড়ী এবং ফরিদপুরে এই বায়োস্কোপ প্রদর্শনী চলেছিলো । এটাই ছিল বাংলাদেশে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম চলচ্চিত্র। 

যে সময়ে কলকাতা-ভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থাগুলো ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল, সেই সময়ে পূর্ববঙ্গের সিনেমা হলগুলোতে কলকাতা, বোম্বে, মাদ্রাজ, হলিউড এবং প্যারিসে নির্মিত চলচ্চিত্র দেখানো হচ্ছিল। ১৯১৩-১৪ সালে ঢাকার একটি পাটের গুদামে ধারাবাহিক বায়োস্কোপ প্রদর্শনী শুরু হয়, এর নাম ছিল ‘পিকচার হাউস’, বর্তমান বাংলাদেশে নির্মিত প্রথম প্রেক্ষাগৃহ।

কোনো স্টুডিওর সাহায্য ছাড়াই নিজেদের অভিনেতাদের দিয়ে ১৯২৭-২৮ সালে ঢাকার নবাব পরিবার ‘সুকুমারী’ নামে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। প্রযোজকদের মধ্যে ছিলেন খাজা আদিল, খাজা আকমোল, খাজা নাসিরুল্লাহ, খাজা আজমোল, খাজা জহির, খাজা আজাদ, সয়োদ সাহেব আলম এবং অধ্যাপক আন্দালিব শাদিনী। প্রধান পুরুষ এবং নারী চরিত্রে চরিত্রে অভিনয় করেন খাজা নসরুল্লাহ ও সৈয়দ আবদুস সোবহান। নসরুল্লাহ পরবর্তীতে একজন রাজনীতিবিদ এবং সোবহান পাকিস্তান কেন্দ্রীয় বেসামরিক পরিসেবার  প্রথম বাঙালি সচিব হন। এই  চলচ্চিত্রের একটি স্থিরচিত্র বাংলাদেশ চলচ্চিত্র আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। ১৯৩১ সালে নবাব পরিবার তাদের বাগানে একটি অস্থায়ী স্টুডিও তৈরি করে ‘দ্য লাস্ট কিস’ নামে পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে।  প্রধান চরিত্রে  ছিলেন খাজা আজমোল। ছবিটি পরিচালনা, বাংলা ও ইংরেজি সাবটাইটেল তৈরি করেন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষক অম্বুজগুপ্ত, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্দালিব শাদানী করেন উর্দু সাবটাইটেল। ঐতিহাসিক ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার সিনেমাটির প্রিমিয়ার শো শুরু করেন ঢাকার মুকুল হলে। এর প্রিন্ট কলকাতার অরোরা কোম্পানিতেও নিয়ে যাওয়া হয়। সবাই মিলে এই প্রযোজনা সংস্থার নাম দেন “ঢাকা ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ সোসাইটি” যা বাংলাদেশের প্রথম প্রযোজনা সংস্থা।

১৯৪৭ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রায় ৮০টি সিনেমা হল ছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তান সফরের সময় বেতার ও চলচ্চিত্র ব্যাক্তিত্ব নাজির আহমেদ বাংলাদেশের প্রথম তথ্যমূলক চলচ্চিত্র ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ তৈরি করেন। ভাষা আন্দোলনের দুই বছর পর- শহিদুল আলম, আব্দুল জব্বার খান এবং কাজী নূরুজ্জামান ঢাকায় কো-অপারেটিভ ফিল্ম মেকার্স লিমিটেড নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থা গঠন করেন, সেখান থেকে নাজির আহমেদ ‘সালামত’ (১৯৫৪) নামে বাণিজ্যিকভাবে সফল চলচ্চিত্র তৈরি করেন।

আব্দুল জব্বার খান পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ফেস অ্যান্ড দ্য মাস্ক’ নির্মাণ করেন, মুক্তি পায় ১৯৫৬ সালের ৩ অগাস্ট। আব্দুল জব্বার ছাড়াও  এতে অভিনয় করেন ইনাম আহমেদ, পূর্ণিমা সেন এবং নাজমা। পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আসিয়া’ পরিচালনা করেন ফতেহ লোহানী, প্রযোজনায়  ছিলেন নাজির আহমেদ। ‘আসিয়া’ ১৯৬১ সালে শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার লাভ করে। পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন কর্তৃক আরেকটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা ১৯৫৯ সালে ফতেহ লোহানী পরিচালিত ‘আকাশের মাটি’। ১৯৫৯ সালে এ. জে. করদার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অবলম্বনে বাংলা-উর্দু চলচ্চিত্র ‘দ্য ডে শ্যাল ডন’’ পরিচালনা করেন, জহির রায়হান ছিলেন সহকারী পরিচালক। এটি ১ম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপদক জিতেছিল। ইতিমধ্যে পপুলার স্টুডিও, বারি স্টুডিও এবং বেঙ্গল স্টুডিও নামে তিনটি স্টুডিওর জন্ম হয়। বিশিষ্ট পরিচালক আব্দুল জব্বার খান, ফতেহ লোহানী, এহতেশাম এবং মহিউদ্দিন এই স্টুডিওগুলির সাথে কাজ করেছেন। তাদের উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে মহিউদ্দিনের ‘মাটির পাহাড়’ (১৯৫৯) এবং এহতেশামের ‘এ দেশ তোমার আমার’ (১৯৫৯)।

১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে প্রতি বছর ২০ থেকে ৩৫টি চলচ্চিত্র নির্মিত হতো। সে সময় পরিচালনার পাশাপাশি ফতেহ লোহানী বাংলা চলচ্চিত্র ‘তানহা’ (১৯৬৪), ‘আগুন নিয়ে খেলা’ (১৯৬৭) এবং ‘জুলেখা’ (১৯৬৭) তে অভিনয় করেছিলেন। ৬০-এর দশকের পরিচালকদের মধ্যে সালাহউদ্দিন ‘যে নদী মরুপথে’ (১৯৬১), খান আতাউর রহমান  ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ (১৯৬৭) নির্মাণ করেন। ১৯৬০-এর দশকে বাংলা চলচ্চিত্র পায় জহির রায়হানকে, তিনি নির্মাণ করেন  ‘কখনো আসেনি’ (১৯৬১), ‘সঙ্গম’ (১৯৬৪) (প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র), ‘জীবন থেকে নেওয়া’। ‘জীবন থেকে নেওয়া’ তৎকালীন সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপর নির্মিত রাজনৈতিক ছবি যা পূর্ব বাংলায় দারুন আলোড়ন তুলে।

সেসময়ের অভিনেতা-অভিনেত্রীর মধ্যে রয়েছেন রহমান, সুমিতা দেবী, খান আতাউর রহমান, রওশন জামিল, আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা বেগম, গোলাম মুস্তফা, আবদুর রাজ্জাক, কবরী সরওয়ার, শাবানা, ফরিদা আক্তার ববিতা, ফারুক, শবনম, শওকত আকবর, রোজি সামাদ, বেবি জামান এবং কোহিনূর আক্তার সুচন্দা। আবদুর রাজ্জাককে ভক্তরা ‘নায়করাজ রাজ্জাক’ বলে অভিহিত করতেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত আবদুর রাজ্জাক ও কবরী সরওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি ছিল।

১৯৭০ সালে ৪১টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। নজরুল ইসলামের ‘স্বরলিপি’, ‘টাকা আনা পাই’ কারিগরের ‘মিশর কুমারী’, রফিকুল বারীর ‘তানসেন’, রেবেকার ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’, সুভাষ দত্তের ‘বিনিময়’, নিজামুল হকের ‘কোথায় যেন দেখেছি’ উল্লেখ্য। স্বাধীনতার পর পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন রাখা হয়।

চাষি নজরুল ইসলামের পরিচালনায় ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র “ওরা এগারো জন” মুক্তি পায়। এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মান করেন আলমগীর কবির, চাষী নজরুল ইসলাম এবং সুভাষ দত্ত।  কবিরের তিনটি সিনেমা ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সমালোচকদের পছন্দের “শীর্ষ ১০টি বাংলাদেশী চলচ্চিত্র” তালিকায় স্থান পায়। তার পরিচালিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩), ‘সূর্য কন্যা’ (১৯৭৬), ‘সীমানা পেরিয়ে’ (১৯৭৭), ‘রূপালী সায়াহ্নে’ (১৯৭৯), ‘মোহনা’ (১৯৮২), ‘পরিণীতা’ (১৯৮৪) এবং ‘মহানায়ক’ (১৯৮৫)। ১৯৭০-এর দশকের গুণী পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণ ঘোষ মিতা, আবদুল্লাহ আল মামুন, জহিরুল হক এবং আমজাদ হোসেন। জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক অ্যাকশন চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে- সোহানুর রহমান সোহানের ‘অনন্ত ভালোবাসা’ (১৯৯৯) বাংলাদেশী সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দেয়, সেখান থেকেই সুপারস্টার শাকিব খানের সৃষ্টি।

ক্রমে ২০০০-এর দশকে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের দর্শকসংখ্যা হ্রাস পায় রুচিহীন কাহিনী এবং মানহীন নির্মাণশৈলীর জন্যে। ২০০৬-০৭ সালের পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় এবং বড় প্রযোজনা সংস্থাগুলোর আবির্ভাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। এ সময়ের সফল সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘আম্মাজান’, ‘প্রেমের তাজমহল’,  ‘ভুল নম্বর’,  ‘শাস্তি’, ’শ্যামল ছায়া’, ‘হৃদয়ের কথা’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘মনপুরা’, ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’, ‘কোটি টাকার কাবিন’, ‘চাচ্চু’, ‘স্বপ্ন তুমি সাধনা’ এবং ‘মনে প্রাণে তোমার’। ‘কিত্তনখোলা’, ‘লালসালু’, ‘হাসন রাজা’, ‘মাটির ময়না’, ‘ব্যাচেলর’, ‘জয়যাত্রা’, ‘ঘানি’ এবং ‘চন্দ্রগ্রহের’ মতো সমালোচকদের প্রশংসিত চলচ্চিত্রও  নির্মিত হয়েছিল। এই সময়ের সময়ের সফল নায়ক ছিলেন মান্না (২০০৮ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত), শাকিব খান, রিয়াজ ও ফেরদৌস আহমেদ আর নায়িকাদের মধ্যে ছিলেন মৌসুমী, শাবনূর, পপি ও চম্পা। ২০১২ সাল থেকে মনসুন ফিল্মস, জাজ মাল্টিমিডিয়া এবং টাইগার মিডিয়া লিমিটেডের মতো বড় প্রযোজনা ও পরিবেশনা সংস্থাগুলো বড় বাজেটে ব্যবসা সফল সিনেমা বানাতে থাকে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে সিনেমার নতুন ঢেউ শুরু হয় কোভিড-১৯ মহামারীর সময়, এ সময় ওটিটি-র ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। চরকি, বিঞ্জ, বঙ্গ, আইস্ক্রীন, হৈচৈ এর মতো নতুন বাংলাদেশী ও কোলকাতা ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ‘পরাণ’, ‘হাওয়া’, ‘অপারেশন সুন্দরবন’, ‘দামাল’-এর মতো দর্শক নন্দিত চলচ্চিত্র মুক্তি পায়।

২০২৩ সালের ‘প্রিয়তমা’ বাংলাদেশী সিনেমার ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে এবং সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়কারী বাংলাদেশী চলচ্চিত্র হয়।  নতুন ধারার কিছু উল্লেখযোগ্য পরিচালকের মধ্যে রয়েছেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, আশফাক নিপুন, রায়হান রফি এবং হিমেল আশরাফ। ২০২৪-২৬ সালর মধ্যে ‘মহানগর‘, ‘ঘুম পরী’, ‘লাস্ট ডিফেন্ডার অব মনোগামী’, ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’, ‘মাই নেম ইজ আ্যলেন স্বপন’, ‘উৎসব’, ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’, ‘CACTUS’, ‘চা গরম’, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘তুমি আমি শুধু’ ইত্যাদি ওয়েব ফিল্ম ও সিরিজ মুক্তি পায়। এই সব মুভি গল্পের বৈচিত্র্যময়তা, সংলাপে সমসাময়িক আধুনিকতা, চিত্র ধারণ, শৈল্পিক সম্পাদনা, সংগীত ও শব্দের গতিময়তার কারণে প্রচুর দর্শকপ্রিয়তা পায়। বড় পর্দায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’, ‘প্রেসার কুকার’ ও ‘দম‘ বেশ সাড়া জাগায়।

এই সময়ে মূলধারা বা বাণিজ্যিক ধারার বাইরে সমান্তরাল ঘরানার ছবিও নির্মিত হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অর্থে জহির রায়হান নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ (১৯৭১) অন্যতম। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ (১৯৭৯) – বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি)-এর প্রযোজনা ও পরিবেশনা নেটওয়ার্কের অধীনে নির্মিত হয়েছিল। যদিও দেশে মুক্তি ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তবুও এটি স্বাধীনতা-পরবর্তী যুগে প্রথম আন্তর্জাতিক সাফল্য লাভ করে।

১৯৮৪ সালের ছবি ‘আগামী’র সমালোচনামূলক ও বাণিজ্যিক সাফল্যের কারণে চলচ্চিত্র নির্মাণ একটি আন্দোলনে পরিণত হয়। এই আন্দোলন ‘শর্ট ফিল্ম মুভমেন্ট’ এবং পরবর্তীতে ‘অল্টারনেটিভ ফিল্ম মুভমেন্ট’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’ (১৯৮৪) অন্যতম। ‘আগামী’ দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ পরিচালক বিভাগে রৌপ্য ময়ূর পুরস্কার লাভ করে।

হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমনি’ (১৯৯৪), ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৪), আবু সাঈদের ‘কিত্তনখোলা’ (২০০০), ‘শঙ্খনদ’ (২০০৪), ‘রূপান্তর’ (২০০৮), এনামুল করিম নির্ঝরের ‘আহা’ (২০০৭), গোলাম রাব্বানী বিপ্লবের ‘অন দ্য উইংস অব ড্রিমস’ (২০০৭), মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ব্যাচেলর’ (২০০৩), ’থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ – এই চলচ্চিত্রগুলো পরিচালকেরা নিজেরাই অর্থায়ন করেছিলেন এবং এগুলো প্রেক্ষাগৃহের বাইরে প্রদর্শন করা হয়েছিল। চিত্রনাট্য লেখা, অর্থায়ন, নির্মাণ এবং প্রদর্শন – পরিচালকেরা পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গেই জড়িত ছিলেন। এই ধারাকে সামনে রেখে  অনেক তরুণ নির্মাতা এগিয়ে আসেন। সমসাময়িক মূলধারার চলচ্চিত্রগুলো দেশে বা বিদেশে কোনো প্রশংসা অর্জন করতে ব্যর্থ হলেও, তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম এবং আবু সাঈদের মতো স্বাধীন ধারার পরিচালকেরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ সেসময়ে দারুন সাড়া ফেলে। এমনি আরো কিছু সিনেমা: নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর ‘একাত্তরের যিশু’, মোরশেদুল ইসলামের ‘চাকা’ (১৯৯৩) এবং ‘দীপু নাম্বার টু’ (১৯৯৬), তানভীর মোকাম্মেলের ‘নদীর নাম মধুমতি’ (১৯৯৬), ‘চিত্রা নদীর পারে’ (১৯৯৯), ‘লালশালু’ (২০০১), ‘লালন’ (২০০৪), তারেক মাসুদ এবং ক্যাথরিন মাসুদের ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫) এবং ‘অন্তর্যাত্রা’ (২০০৬), এবং গোলাম রব্বানী ‘বিপ্লবের স্বপ্নদানব’ (২০০৭) উল্লেখযোগ্য।  

এছাড়াও নিজস্ব ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বাংলাদেশের বাংলা ভাষার মূলধারার পাশপাশি পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। জহির রায়হান ফিল্ম ইনস্টিটিউের উদ্যোগে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ‘তংস্মাসে’ (গিরিকন্যা), ম্রো, গারো, বম, খেয়াং, ও সান্তাল মাতৃভাষার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচিত্র নির্মিত হয়েছে। শেরপুরের গারো চলচ্চিত্র, সিলেটের মনিপুরী মেইতেই ভাষায়ও স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যা ৪র্থ চলচ্চিত্র ধারা নামে সমধিক পরিচিত ।

সূত্র: বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের ১০০ বছর – আহমদ মতিউর রহমান।


কুবলেশ্বর ত্রিপুরা | ঢাকা, বাংলাদেশ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হতে পূরকৌশলে স্নাতক। গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল-এর সাথে পড়শীর একান্ত সাক্ষাৎকার

Next Story

উচিৎ সাজা

Latest from রূপালি ফিতার গল্প

চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল-এর সাথে পড়শীর একান্ত সাক্ষাৎকার

তানভীর মোকাম্মেল কাহিনী ও প্রামাণ্যচিত্র মিলিয়ে মোট চব্বিশটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তানভীর ... সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ড. জাকিয়া আফরিন।

উচিৎ সাজা

এই শহরে এক সিনেমা হল ছিলো প্রায় ২০টির মতো। ভাঙাভাঙির পর আজ এসে দাঁড়িয়েছে একটিতে। ... লিখেছেন অনোয়ার হোসেন পিন্টু।

শতবর্ষে পুডভকিনের ‘মাদার’

চলচ্চিত্রের প্রথম তিন দশকে এমন কিছু কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল, যেগুলো সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের মর্যাদা পেয়ে গেছে। ... লিখেছেন শৈবাল চৌধুরী।